লিভিং ড্রাগন

লিভিং ড্রাগন

শিরিন সুলতানা

 

 

বয়স তখন তার ১২ বছর। একদিন রাস্তার কিছু বখাটে ছেলে মারধর করে তাকে। এরপর শরীরের ঘা শুকালেও মনে থেকে যায় অনন্ত দহন। মূলত এই ঘটনাই পাল্টে দেয় ছেলেটির জীবন। প্রতিশোধ স্পৃহা অথবা আত্মরক্ষা যে কারনেই হোক না কেনো ছেলেটি নিজেকে তৈরী করতে থাকে অপ্রতিরোধ্য লৌহ মানব হিসেবে। মার্শাল আর্টসের দীক্ষায় নিজেকে সুরক্ষার সাথে সাথে শত্রু ঘায়েল করার নানা কৌশল নিয়ে আসে ছেলেটি তার নখদর্পনে। বলছিলাম কিংবদন্তি ব্রুস লির কথা, মার্শাল আর্টসকে যিনি নিয়ে গেছেন শিল্পের পর্যায়ে।

১৯৪০ সালের নভেম্বর মাসের ২৭ তারিখে জন্ম হওয়া এই অপ্রতিরোধ্য মার্শাল আর্টিস্টের পুরো নাম ‘ব্রুস ইয়ুন ফান লি’। জন্ম মার্কিন মুল্লুকের সান ফ্রান্সেসকোতে হলেও শরীরে ছিল পুরোটাই চিনা রক্ত। লি হোই চুয়েন এবং গ্রেস হো দম্পতির পাঁচ সন্তানের মধ্যে লি ছিলেন চতুর্থ। তার জন্মের সময়টায় চাইনিজ ক্যালেন্ডারে ড্রাগনকাল চলছিল যা কি না শক্তি ও সৌভাগ্যের প্রতীক। হংকংয়ের চায়নিজ অপেরা স্টার বাবার অনুপ্রেরণায় শৈশব থেকেই তিনি শিশু শিল্পী হিসেবে কাজ করতেন। প্রথম অভিনয় করেন মাত্র ৩ মাস বয়সে, ‘দ্য গোল্ডেন গেট গার্ল’ (১৯৪১) ছবিতে।

১২ বছর বয়সে মার খাবার পর মন প্রাণ ঢেলে মার্শাল আর্টের তালিম নিতে শুরু করেন ব্রুস। শিক্ষাগুরু হিসেবে পান ইপম্যানকে। একটানা পাঁচ বছর দীক্ষা নেবার পর লি নিজেস্ব কিছু কলাকৌশল ও দর্শন যোগ করেন কুংফুর সাথে। নাম দেন- জিৎ কুনে দো (The way of the intercepting fist) অস্বাভাবিক ক্ষীপ্রতা তখন তার শিরায় শিরায়। শুন্যে ছুড়ে দেওয়া চাউলের দানা চ্যাপিষ্টিক দিয়ে ধরে ফেলা কিংবা টেবিল টেনিসে নান চাকু দিয়ে খেলে একসাথে দুই প্রতি পক্ষকে নাকানি চুবানি খাওয়ানো ছিলো তার আমুদে খেলা।


একবার এক প্রতিযোগিতায় ১১ সেকেন্ডেই ধরাশায়ী করে প্রতিপক্ষকে। শুধু কি মারামারি? নাচেও দারুন দক্ষ ছিলেন তিনি। হংকংয়ে ঐতিহ্যবাহী ‘চা চা নৃত্যে’ জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে সবাইকে চমকে দেন লি। লিকলিকে পেশীবহুল পেটানো শরীরের মানুষটার মেজাজটাও ছিল বেশ কড়া। এজন্য হংকং পুলিশের সাথে ঝামেলাও পোহাতে হয় তাকে কয়েকবার। সেগুলো অবশ্য কিশোরোত্তীর্ণ বয়সের কথা। বাবা মা তাই ছেলেকে পাঠিয়ে দেন যুক্তরাষ্ট্রে। বয়স তখন ১৯ বছর। সদ্য যুবক লি সেখানে চায়না টাউনে এক আত্মীয়ের রেস্টুরেন্টে কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে সিয়ালটলে ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াশিংটনে ভর্তি হন দর্শন শাস্ত্রে। জীবনে আসে নতুন বাঁক। সখ্যতা হয় একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী লিন্ডা এমেরির সাথে। পরবর্তীতে প্রেম ও সাতপাঁকে বাঁধা। সিয়াটলেই ব্রুস তার প্রথম কুংফু স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। একই সাথে টিভিতে টুকটাক কাজও করতে থাকেন। সেই সুবাদে নাম ডাক হতে শুরু করলে হলিউডের দিকে আস্তে আস্তে অগ্রসর হন লি। হলিউডের ছবিগুলোতে ষ্ট্যানম্যান ও পাশর্^ চরিত্রের কাজ করে আর্থিকভাবে কিছুটা লাভবান হলেও, সেভাবে কারো নজরে আসছিলেন না তিনি। এরপর লি তার পরিবার নিয়ে চলে আসেন হংকংয়ে। ঘরে তখন তার ফুটফুটে দুই সন্তান। ছেলে ব্রান্ডন লি এবং মেয়ে শ্যানোন লি। হংকংএ সময় বেশ কয়েকটি ছবি হয় তাকে নিয়ে। ‘দা বিগ বস’(১৯৭১), ‘ফিস্ট অফ ফিউরি’(১৯৭২) ও দ্য ওয়ে অফ দা ড্রাগন(১৯৭২) তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। শেষোল্লিখিত ছবির রাইটার ডিরেক্টর হিসেবে দুটোতেই সমান দক্ষতা দেখিয়েছিলেন লি। তার নিজের প্রডাকশন হাউজ কনকর্ড পিকচার্স থেকেই রিলিজ হয় ছবিটি।

ব্রুস লি তখন রীতিমত ষ্টার। হলিউডের ঢিসুম ঢিসুম মারামারিকে একহাত দেখিয়ে মার্শাল আর্টসের জয়জয়কার সারাবিশে^। ‘এন্টার দা ড্রাগন’ যে ছবি লি’কে হলিউডে তারকাখ্যাতি এনে দিয়েছে তার কাজ শুরু হয় ১৯৭৩ সালের জানুয়ারী মাসে, হংকংয়ে। শুটিং শেষ হয় মাস ছয়েকের মধ্যেই। সারা বিশ্ব যখন কাপঁছে ব্রুসলি জ্বরে, তখনই ঘটলো সে অপয়া ঘটনা। কয়েকদিন ধরেই মাথায় সেই পুরনো যন্ত্রনা কাতর করছিলো তাকে, সাথে পিঠের ব্যাথা। ডাক্তার অনেক আগেই সনাক্ত করেছিল সেরিব্রাল এডিমা। ব্রেনের একটা অংশে ফ্লুইড জমা হচ্ছিল। অসহ্য ব্যাথাকে পরাভূত করতে ব্যাথা নাশক এ্যাসপিরিন জাতীয় ঔষধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েন লি। পরের সকাল আর দেখা হয় না তার। ‘এন্টার দা ড্রাগন’ ছবি মুক্তির ছয়দিন আগেই পাড়ি জমান তিনি না ফেরার দেশে। ১৯৭৩ এর ২০জুলাই, সারা পৃথিবী যেনো থমকে যায় কয়েক মুহুর্ত এ সংবাদে। অপাজেয় লি’র এরকম মৃত্যু কেউ যেন মেনে নিতে পারছিলেন না।

শুরু হয় চারদিকে গুঞ্জন। কেউ বলে চায়নিজ মাফিয়া চক্র, কেউ বলে হংকংয়ের ফিল্ম ইন্ডাষ্ট্রির প্রভাবশালীদের হাত আছে এই মৃত্যুর পিছনে। কেউ বলে তার বান্ধবী বিষ ক্রিয়ায় মেরেছে তাকে। ঘটনা যাইহোক মাত্র ৩২ বছর বয়সেই জীবনের ইতি টানতে হয় মার্শাল আর্টসের মহারাজাকে। তার দর্শন, তার কবিতা, তার লেখনি, সবকিছুই অন্তরালে থেকে গেছে। মানুষ বুঁদ হয়ে শুধুই দেখেছে তার অস্ত্রবিহীন যুদ্ধ কৌশল। মৃত্যুর পর লি’র তিনটি ছবি মুক্তি পায়, ‘এন্টার দা ড্রাগন’, গেম অব ডেথ ও সার্কল অব আয়রন’। মার্শাল আর্টিষ্ট, প্রশিক্ষক, ছবি নির্মাতা, মানবহিতৈষী, দার্শনিক, অভিনেতা, একের মধ্যে এ যেন অনেক গুনের আষ্টেপৃষ্টে বাঁধন। এ এক অনন্য কিংবদন্তি ব্রুস লি।

 

Read 83563 times

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…