অনন্য ইনগ্রিড বার্গম্যান

অনন্য ইনগ্রিড বার্গম্যান

শিরিন সুলতানা

 



দায়িত্বটা নিজেই নিয়েছিলেন নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার। জন্মের তিন বছেরের মাথায় যার মা এবং ১২ বছরে বাবা মারা যায় তাকে তো এতোটুকু দৃঢ় হতেই হয়। মা ফ্রিডেল এডলর বার্গম্যান কোনো স্থায়ী স্মৃতি রাখতে পারেননি, ছোট্ট শিশুটির মনে কোনো স্থায়ী স্মৃতি রাখতে পারেননি। তবে বাবা জ্যাস্টাস স্যামুয়েল বার্গম্যান মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আগলে রেখেছিলেন মেয়েকে। ফটোগ্রাফির দোকান ছিল তার। মেয়ের প্রতিভা কিছুটা হলেও টের পেয়েছিলেন। তাই ছোট্ট শিশুর কিছু মোশন চিত্র রেকর্ড করেছিলেন তিনি। স্কুলের পাট চুকানোর পর নিজেই সিদ্ধান্ত নেন অভিনেত্রী হওয়ার।


যাকে নিয়ে এতো কথা তিনি হলেন প্রতিথযশা লাস্যময়ী অভিনেত্রী ইনগ্রিড বার্গম্যান। বলা হয়ে থাকে হলিউডকে দেয়া সে এক মহাশঙ্খ সুইডিশ উপহার। ১৯১৫ সালের ২৯ আগস্ট স্টোকহোমে জন্ম নেয়া এই তুখড় অভিনেত্রী মা-বাবা মারা যাওয়ার পর চাচার কাছেই মানুষ হয়েছিলেন। কৈশরেই তিনি বিভিন্ন ছবির এক্সট্রা হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৩৩ সালে গ্র্যাজুয়েট শেষ করার পর স্টকহোমের রিয়াল ড্রামাটিক থিয়েটার স্কুলে স্কলারশিপ পান। এ সময় তার মঞ্চে অভিষেক ঘটে। চলচ্চিত্রে প্রথম পদার্পণ করে ‘মুন্কব্রোগ্রেভেন’ সুইডিশ ছবিটির মাধ্যমে। খুব একটা নামডাক না হলেও অভিনেত্রী হিসেবে একটা জায়গা তৈরি হয় তার।


১৯৩৬ সালে ইনগ্রিডের জীবনের মোড় ঘুরে যায় গুস্তাফ মোলান্ডারের ‘ইন্টারমেজো’ ছবিতে অভিনয় করে। দারুণ ব্যবসা সফল ছবিটি সাড়া ফেলে সুইডেনে। বিখ্যাত হন ছবির সঙ্গে ইনগ্রিডও। মুগ্ধতায় আবেশিত হয় হলিউড চলচ্চিত্র প্রযোজক ডেভিড সেলজনিকও। ছবিটি হলিউডে পুনর্নির্মাণের প্রস্তাব দেন সেলজনিক। এই একটি ছবি করেই সুইডেনে ফেরার কথা ছিল ইনগ্রিডের। সেখানে তার ডেন্টিস্ট স্বামী ডা. পিটার লিন্ডস্ট্রোম ও কন্যা পিয়াকে রেখে এসেছিলেন। এদিকে হলিউড ভার্সন ‘ইন্টারমেজো : দ্য লাভ স্টোরি’ (১৯৩৯) বক্স অফিস হিট হয়। তারকাখ্যাতি ও হলিউডে থিতু হওয়ার হাতছানি ইনগ্রিডকে মোহাচ্ছন্ন্ করে ফেলে। সেলজনিকের অনুরোধে হলিউডে থিতু হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। জহুরি চোখ ভুল করেনি। প্রযোজক ও চিত্রনাট্যকার সেলজনিক সাত বছরের জন্য চুক্তিবদ্ধ করেন ইনগ্রিডকে। ওই সাত বছরে তিনি মাত্র দুটি ছবিই নির্মাণ করেছিলেন ইনগ্রিডকে নিয়ে। ‘গান উইথ দ্য উইন্ড’ (১৯৩৯) ও ‘রেবেকা’ (১৯৪০) ছবি দুটিই একাডেমি পুরস্কার পায়। ধীরে ধীরে ইনগ্রিডের লস্যময়ী নারীসুলভ, প্রেয়সীর ইমেজের ছোট্ট চারাগাছটি মহীরুহে পরিণত হয় সমগ্র হলিউডে তথা আমেরিকায়।

১৯৪২ সালে নির্মিত হয় কালজয়ী চলচিত্র ‘ক্যাসাব্লাংকা’। ইনগ্রিডের সঙ্গে নায়কের ভূমিকায় ছিলেন হামফ্রে বোগার্ট। হলিউড চলচ্চিত্রে এই ছবিকে মাস্টারপিস হিসেবে গণ্য করা হয়। ছবিতে বোগার্টের সঙ্গে ওই অন্তরঙ্গতা, চুম্বন দৃশ্য, চাহনি, গুমরে ওঠা দীর্ঘশ্বাস সন্তর্পণে লুকানোÑ সবকিছুই যেন দর্শকের মন ও মগজে ঠাঁই করে নেয় অবলীলায়। দর্শক বুঁদ হয়ে আটকে যায় বার্গম্যানের সাবলীল অভিনয়ের ফাঁদে। এলসা নামের সারল্যমাখা রমণীর ওই চরিত্রকে ইনগ্রিডের অভিনিত শ্রেষ্ঠ চরিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার ঐশ্বর্যময় সৌন্দর্য বহুমুখী অভিনয় প্রতিভা, কাজের প্রতি একাগ্রতা, নিয়মানুবর্তিতাÑ সবকিছুর সমন্বয়ই তাকে শিখরে পৌঁছানোর অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। ওই সময় অন্য অভিনেত্রীরা যখন মেকআপের ভারে, পোশাকের চাকচিক্যে ন্যুব্জ হয়ে থাকতেন তখন ইনগ্রিড প্রায় মেকআপহীন সাধারণ পোশাকের মহিমায় হয়েছে উদ্ভাসিত। সম্পূর্ণ বিপরীতধারা থেকেই তিনি জয় করেছেন হাজারো দর্শকের হৃদয়। চরিত্র বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও দারুণ খুঁতখুঁতে ছিলেন তিনি।


১৯৪৩ সালে একটি মাত্রই ছবি করেন বার্গম্যান। আর্নেস্ট হোমিংওয়ের উপন্যাস অবলম্বনে ‘ফর হোম দ্য বেল টোলস’ ছবির মারিয়া চরিত্রটি প্রায় লুফে নেন তিনি। চরিত্রের ক্ষুধা তখন তাকে পেয়ে বসে। ইনগ্রিডের চিরচেনা রূপ থেকে বেরিয়ে এসেও ছোট করে ছাঁটা সোনালি চুলের মারিয়া দারুণ আবেদনময়ী হিসেবে ধরা দেয়। এ ছবিতে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর অস্কার মনোনয়ন পান তিনি। ওই বছর খালি হাতে ফিরলেও পরের বছরই শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর অস্কারটি চলে আসে তার ঝুলিতে। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের পর ইনগ্রিড বার্গম্যান আমেরিকার সবচেয়ে বড় বক্স অফিস সেলিব্রিটি হয়ে ওঠেন। পরবর্তী দুই বছরে আলফ্রেড হিচককের ‘স্পেলবাউন্ড’ ও ‘নটরিয়াস’ ছবি দুটিতে অনবদ্য অভিনয় করেন তিনি। ফলে সাফল্যের মুকুটে হতে থাকে নতুন নতুন পালকের সাবলীল সংযোজন।


প্রত্যেক শিল্পীর কিছু স্বপ্নের চরিত্র থাকে। ‘জায়ান অফ আর্ক’ ছবির জোয়ান চরিত্রটি তেমনই ‘ড্রিম প্রজেক্ট’ ছিল ইনগ্রিডের। দরিদ্র ফরাসি জোয়ান (পরে সন্ন্যাসী হয়ে ওঠে) চরিত্র পাওয়ার জন্য যথেষ্ট কাঠখড় পুরিয়েছেন তিনি। চতুর্থবারের মতো শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর অস্কার মনোনয়ন পায় চরিত্রটি। ইনগ্রিডের পালে তখন নতুন হাওয়ায় তর তর করে এগিয়ে চলছে সাফল্যের তরী। হঠাৎই যেন জমাট মেঘের ষড়যন্ত্র। তিনি ১৯৪৮ সালে ইটালিতে পাড়ি জমান ‘স্টমবলি’ ছবির শুটিংয়ের জন্য। পরিচালক রবার্তো রসেলিনের কাজে আগে থেকেই মুগ্ধ ছিল তিনি। জীবনটা যেন ওলট-পালট হওয়ার অপেক্ষায় ছিল তার। না হলে সাফল্যের চরম শিখরে বসে, স্বামী-সন্তান তুচ্ছ করে প্রেমেই বা পড়বেন কেন রসেলিনের। তুমুল ওই প্রেমের পরিণতিতে সন্তানসম্ভাবা হয়ে পড়েন তিনি। এ খবর চাউর হতে সময় লাগে না। পুরো আমেরিকা হতবাক হয়ে পড়ে এ সম্পর্কে জানার পর। হলিউডপাড়া থেকে সিনেট পর্যন্ত তুমুল ঝড় বয়ে যায়। যাকে সাক্ষাৎ দেবীর আসনে বসিয়েছে বিশ্ববাসী, যে রমণী নারীত্বে মহিমায় উদ্ভাসিত করেছেন নিজেকে তার এমন অধঃপতন (!) দর্শক মেনে নিতে পারে না কিছুতেই। সবাই বয়কট করেন ইনগ্রিডকে। বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ে ‘স্ট্রমবলি’ (১৯৫০)।


এমনতর প্রক্রিয়ায় ইনগ্রিড আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘মানুষ আমাকে জোয়ান অফ আর্ক হিসেবে, সন্ন্যাসী হিসেবে দেখে। আমি তা নই। আমি শুধু একজন নারী, একজন মানুষই।’ এতো ঘটনায় ইটালিতেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তিনি। পরবর্তী সাত বছর এখানেই কাটিয়ে দেন রোসেলিনের সঙ্গে। এ সময় তাদের এক পুত্র ও যমজ কন্যা সন্তানের জš§ হয়। সাত বছর পর যেন ফিনিক্সের মতোই উঠে দাঁড়ান ইনগ্রিড। ১৯৫৬ সালে আবারও সদর্পে হাজির হন হলিউডে ‘অ্যানাস্টাশিয়া’ ছবির টাইটেল চরিত্রে অভিনয় করে। পুরো ছবিটি চিত্রায়িত হয় ইংল্যান্ডে। ততো দিনে রবার্তোকে নিয়ে স্ক্যান্ডাল স্তিমিত হয়েছে। অভিমানে মুখ ফেরানো দর্শক আবার ভালোবাসার আলিঙ্গনে বাঁধে ইনগ্রিডকে। এ ছবিতে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর অস্কার ধরা দেয়। তার জীবনে দীর্ঘ সাত বছরের অভিশাপ যেন ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় ছবিটি। ষাট থেকে সত্তরের দশক তিনি অক্লান্ত কাজ করে যান। পেছনের ভুল সুধরে নিতেই এ অবিরাম চলা। ১৯৭৪ সালে আবারও ওই প্রাপ্তি। ‘মার্ডার অন দ্য অরিয়েন্ট এক্সপ্রেস’ ছবিতে অভিনয় করে শ্রেষ্ঠ পার্শ্বঅভিনেত্রীর অস্কার ঘরে তোলেন। শেষ বয়সে সাফল্যের মুকুটে আরো একটি পালক যোগ হয় ‘অটাম সানাটা’ দিয়ে।
১৯৭৪ সালে ধরা পড়ে তার ব্রেস্ট ক্যানসার। কর্কট কামড়কে উপেক্ষা করেই টিভি সিরিজ ‘অ্যা ওম্যান কল্ড গোল্ড’ শেষ করে ইনগ্রিড। অবশ্য ছবির সাফল্য দেখে যেতে পারেননি। জীবন নদীর ওপার থেকে তিনি কি শুনতে পেয়েছিলেন, অ্যামি অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে দ্বিতীয়বারের মতো শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে তার নাম ঘোষিত হলো?


ক্যানসার ধরা পড়ার আট বছরের মাথায় ঠিক তার জন্মদিনেই ১৯৮২ সালে ৮৭ বছর বয়সে পরপারে পাড়ি জমান ইনগ্রিড। বরফরাজ্যে জন্ম নেয়া রাজস্বী ওই নারী আজন্মের ঠাঁই করে নিয়েছেন লাখো দর্শকের হƒদয়ে।

ছবি : ইন্টরনেট

Read 673 times

3 comments

  • Marcelmot
    18 February 2018
    posted by Marcelmot

    canadian pharmacy cialis 20mg prednisone online pharmacy buy prednisone online samples of viagra and cialis healthymanoviagra.ruwww.healthymanoviagra.runew healthy mannew healthy man reviewsnew healthy manbuy viagrabuying viagraorder viagra onlineviagra where to buyhealthy man viagrahealthy malePurchase Viagra Onlinehealthy men healthy men healthy men viagra .comhealthy manhealthy man viagra offerhealthy male viagrahealthy man viagra scamhealthy man complaintshealthymannew healthy manhealthy man viagra reviewshealthy men viagrahealthy man pillshealthymalehealthy man pharmacyhealthy man viagra pillshealthy man cialishealthy man reviewshealthy man viagra salesviagra healthy mannew healthy man viagrahealthy man viagra radiohealthy man radio adhealthy man generic viagrahealthy man viagra adnew healthy man viagra reviewhealthy man radio adshealthy male internethealthy meds viagrathe healthy man viagrahealthy men viagra offerhealthy male viagra scamcomplaints about healthy man viagrawww.healthy man viagrahealthy male viagra offerhealthy male viagra reviewsgeneric viagra healthy manhealthy man viagra reviewsbuying viagra online sky pharmacy online drugstore ed meds online without doctor prescription viagra 100mg price canadian pharmacy cialis canadian pharcharmy online

  • DavidRed
    17 February 2018
    posted by DavidRed

    can u buy clomid on line canadian non prescription drugs buy cialis cialis generic best price buy propecia online uk buy levothyroxine in uk cheap cialis generic viagra no prescription in canada viagra Periactin

  • Jessiebib
    17 February 2018
    posted by Jessiebib

    generic viagra online canadian pharmacy canada pharmacy online canada pharmacy online no script canadian pharmacy online no script tadalafil cialis from india no prescription in canada viagra canada pharmacy best prices on viagra cialis 5mg tablets viagra canada free sample

Leave a comment

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

Twitter feed

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…