একজন রফিকুল আলম

একজন

রফিকুল আলম

 

শৈশব
আমার ছোটবেলা খুব সাদামাটাভাবে কেটেছে। আমি পরিবারে তৃতীয় ছেলে আর চতুর্থ সন্তান। মায়ের কাছে শুনেছি, কোনোদিনই তাকে বিরক্ত করিনি। খেলাধুলা খুব একটা করতাম না। একটাই পাগলামি ছিল, গ্রামোফোনের গা ঘেঁষে বসে গান শোনা। তবে কিশোর বয়সে একবার ফুটবল খেলতে গিয়ে একটি দুঃর্ঘটনায় আমার ডান কাঁধের কলারবোন ভেঙে যায়। এরপর আর খেলার মাঠে যাইনি। হ্যাঁ, কলেজে ওঠার পর ক্রিকেট খেলেছিলাম। রাজশাহী গভর্নমেন্ট কলেজ টিমের ব্যাটসম্যান হিসেবে সর্বোচ্চ রানও করেছিলাম। কিন্তু আমার গুরু প-িত হরিপদ দাশের নির্দেশে খেলা ছেড়ে দিয়েছিলাম।

কখন কবে থেকে গানের চর্চা শুরু
এই প্রশ্নের উত্তর কখনোই দিতে পারি না। কারণ আমার মনে পড়ে না গানের প্রতি আমার আগ্রহ কখন থেকে শুরু হয়। বাড়িতে গানের পরিবেশ থাকায় বোধহয় এ রকম হয়েছিল। বাড়িতে রেডিও এবং গ্রামোফোনÑ দুটিই ছিল। কিন্তু গ্রামোফোন ছিল আমার সব চেয়ে প্রিয়। তবে এটা ঠিক, আমার বড় ভাই সারোয়ার জাহান অত্যন্ত গুণী শিল্পী হওয়ায় প্রথাগত শিক্ষা বা চর্চাটি খুব সহজেই পেয়েছিলাম। রাজশাহী শহর পঞ্চাশ-ষাটের দশকে সঙ্গীত ও সংস্কৃতির জন্য একটি ঈর্ষণীয় জায়গা ছিল। অনেক সঙ্গীতপ্রেমী ও প-িত ছিলেন। তাদের প্রভাবে একটি বিষয় আমাকে সচেতন করেছিল যে, যতো ভালো গান গাই না কেন, তা একটি শিক্ষার বিষয়। অনেক বড় একটি শাস্ত্র। এরপর একটি বড় সুযোগ এলো। রাজশাহী রেডিওর ‘স্টুডেন্টস ফোরাম’ অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার জন্য বললেন তখনকার
ছাত্রনেতা আকরাম হোসেন। নির্ভয়ে একটি রবীন্দ্রসঙ্গীত ‘যায় নিয়ে যায় আমার নিয়ে যায়’ গানটি গেয়ে বেশ নাম হলো। মেজভাই সারোয়ার জাহান গম্ভীর হয়ে বললেন, রেওয়াজ ছাড়া শিল্পী হওয়া যায় না। এরপরই শুরু হলো চর্চা আর সাধনা।

যুদ্ধ করার স্মৃতি
স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি অল্প কথায় বলা যাবে না। তবু বলছি, ১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অংশে যখন পাকিস্তানি বর্বর বাহিনী বোমা ফেললো ও বহু নিরস্ত্র নিরীহ মানুষ মারা গেল তখন এক মুহূর্তেই সিদ্ধান্ত নিই (আমরা সবাই) যুদ্ধ করতে হবে। স্বাভাবিকভাবে ধরে নিলাম সীমান্তের ওপরে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিতে হবে। পশ্চিমবঙ্গের মালদহ হয়ে বালুঘাটে প্রশিক্ষণের জন্য যখন যাই তখন রাজশাহীর নেতৃস্থানীয় কয়েকজন তথা এমএ জলিল, গোলাম আরিফ টিপুরা বললেন, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে তোমাদের প্রয়োজন, কলকাতায় যোগাযোগ করো। জুলাইয়ের মাঝামাঝি বালিগঞ্জে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’-এর স্টুডিওতে যাই। সেখানে বড় বড় সঙ্গীতজ্ঞ আমাকে গান গাওয়ার সুযোগ দিলেন। আমার প্রযোজনায় ছয়টি গান রেকর্ড হয়। তা হলো ‘যায় যদি যাক প্রাণ’, ‘সাত কোটি আজ প্রহরী প্রদীপ’ ইত্যাদি। এভাবেই মুক্তিযুদ্ধের প্রধান এই বেতার কেন্দ্রে অংশ নিই।

এখানে এসেই বুঝেছিলাম যুদ্ধ শুধু অস্ত্র দিয়েই হয় না। সুর, সঙ্গীত ও কণ্ঠ দিয়েও মুক্তিযুদ্ধ অনেক এগিয়ে নেওয়া যায়।

সংসার এবং একজন রফিকুল ইসলাম
আমি খুব সুখী মানুষ। আমার একটি ছেলে ফারশীদ আলম। কোনো মেয়ে নেই। স্ত্রী আবিদা সুলতানা। তিনিও একজন প্রতিষ্ঠিত সঙ্গীত শিল্পী। ছেলেও গানের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ‘চ্যানেলে ৭১’-এ চাকরি ছাড়া তার কাজিন আলীফের সঙ্গে গান বিষয়ে খুব আধুনিক উপস্থাপনায় একটি অনুষ্ঠান ‘মিউজিক বাজ’ (গটঝওঈ ইটতত) প্রচার করে। দু’জনই হোস্টিং করে। আমার সারা সংসারেই গান ও সুর ছড়িয়ে থাকে। সম্প্রতি আমার পুত্রবধূ ‘লামিয়া’ এসেছে। সে অবশ্য গান করে না। তবে সঙ্গীত অনুরাগী।

শিল্পী রফিকুল আলমের অর্জন
সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে আমার পুরস্কারের ঝুলি খুবই ছোট। আশির দশকে ‘দি সেইলার’ উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি ‘গাঙচিল’ ছায়াছবিতে শ্রেষ্ঠ কণ্ঠশিল্পীর পুরস্কার পাই। ওই সময় জাতীয় পর্যায়ের পুরস্কার ‘বাচসাস’ পুরস্কার পাই। বাংলাদেশ সরকারের দেয়া যুব মন্ত্রণালয়ের শ্রেষ্ঠ পুরুষ কণ্ঠশিল্পীর পুরস্কার পেয়েছি। বিজ্ঞানী সত্যেন বসুর নামে জাতীয় পর্যায়ের পুরস্কার পেয়েছি। ইংল্যান্ডের কার্ডিফের মেয়রের দেয়া একটি সম্মাননাও পেয়েছি।

দাম্পত্যে শিল্পী সত্তা
স্বামী-স্ত্রী এক মঞ্চে গান করলেই জুটি শিল্পী বা সঙ্গীত জুটি হয় না। দু’জনই আলাদা পরিচয় নিয়ে উঠে এসেছি, শিল্পী-দম্পতি হিসেবে নয়। আর দু’জন একসঙ্গে গান করলে কোনো অসুবিধা হয় বলে মনে করি না। কারণ তার জনপ্রিয়তা নিজের যোগ্যতার কারণেই। আর আমার স্বীকৃতি নিজের কোয়ালিটির কারণেই। একসঙ্গে গান গাওয়ার সুবিধাটিই বরং বেশি। ভুল-ভ্রান্তি দু’জনই আলাপের মাধ্যমে সুধরানো যায়। এতে লাভও হয়।

পরিকল্পনা
সঙ্গীত নিয়ে কখনো পরিকল্পনা করে চলিনি। যখন যে রকম চাহিদা বা পরিবর্তন হয়েছে এর সঙ্গে নিজেকে আপডেট করে নিয়েছি। তবে ইচ্ছা আছে কিছু অপ্রচলিত গান নিয়ে কাজ করার। আর কিছু হারিয়ে যাওয়ার মতো গান নতুন আঙ্গিকে গেয়ে রেকর্ড করবো ভাবছি। একটি বড় আকারের ডেমনেস্ট্রেটিভ কনসার্টও করতে চাই।

প্রত্যাশা
প্রত্যাশা তো অনেক। তবে প্রত্যাশা ও উপদেশ একই ভাষায় বলতে চাই। সঙ্গীত হচ্ছে অনেক বড় শাস্ত্র। চর্চা ও অধ্যাবসায় ছাড়া কারোরই এ কাজে আসা উচিত নয়।
চাই বাংলাদেশের সঙ্গীতের একটি আর্ন্তজাতিক পরিচিতি আসুকÑ বাংলাদেশের সঙ্গীতকে সেভাবেই দেখতে চাই এবং তা সম্ভব। বিশেষত আমাদের লোকগান বা লোকজ সুর, পৃথিবীর অন্যান্য গান যেমনÑ হিসপ্যানিক, আফ্রো-আমেরিকান, ক্যারিবিয়ানদের গান আমাদের সঙ্গীত থেকে উপরে নয়। তারা যে আন্তর্জাতিকতা পাচ্ছে এর কারণ অন্য। আমাদের গানের দুর্বলতা নয়। বিদেশে যখন আমাদের প্রবাসীরা অর্থনৈতিকভাবে আরো সবল হবেন তখন আমাদের সঙ্গীত কর্মীরা ভালো কাজ করতে পারবেন। আর সঙ্গীতের সঙ্গে যুক্ত প্রযুক্তিগুলোর সঙ্গে তারা পরিচিত হবেন।
গান নিয়ে আমার অনেক আশা। গানের চর্চা আরো বাড়লে বিপথগামী অনেক ছেলেমেয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে এবং আসছেও। শুধু সরকার নয়Ñ এর জন্য সমাজসেবক, শিক্ষাবিদ ও ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা প্রয়োজন। আর অবদান তো মাপা যায় না! তবু গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, আমার কিছু উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের পর এসেছি তাদের বহুমুখী ও শক্ত প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে আসতে হয়েছে। এক সময় মানুষ ভারতীয়, পাকিস্তানি ও পাশ্চাত্যের গান ছাড়া আমাদের কারো গানই শুনতে চাইতো না। পশ্চিমবঙ্গ শিল্পীর গান ছাড়া ‘আর কোনো গান গানই নয়’Ñ এ রকম মনোভাব ছিল তাদের। সেটি কাটিয়ে উঠতে অনেক বেগ পেতে হয়েছে আমাকে। বেশকিছু মৌলিক আধুনিক গান স্থায়ীভাবে জনপ্রিয় রয়েছে। এ কারণেই অন্তত ‘গুণী শিল্পী’র খেতাবটি পেয়েছি। আমার অনেক গান দিয়েই আমাকে চিহ্নিত করা যায় যে, এটি রফিকুল আলমের গায়কী বা স্টাইল। এতে আমাদের গানের একঘেয়েমি কেটে গেছে। এই পরিবর্তনগুলোয় আমার ভূমিকা অনেক। এরপর অসংখ্য জনসেবামূলক গানও করেছি। ফলে সমাজের কিছু না কিছু উপকার হয়েছে। শুধু ‘পিতার একজন সন্তান’ বলে পরিচিত হয়ে থাকতে চাই না। নিজের সক্রিয়তা আমার গানের মধ্যে আছে। সঙ্গীত একটি অনেক বড় অস্ত্র যা সমাজ থেকে কলুষতা দূর করতে পারে।

Read 52 times

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…