La La Land - ফিল্ম রিভিউ

ঘোরের ভেতর ঘোরে

La La Land

তিয়াষ ইসতিয়াক

 

হলিউডের প্রবল বাস্তববাদী সমালোচক-দর্শক কিংবা উচ্চ হাই টেক সাই-ফাই বা কড়া অ্যাকশনে সমৃদ্ধ সিজিআইয়ে ধোয়া ঝাঁ চকচকে মুভির ভিড়ে মিউজিক্যাল ড্রামা চলচ্চিত্র আজ মৃতপ্রায়। অথচ ওই অনভ্যস্ত চোখগুলোকে সঙ্গীত নির্ভর গল্পের মাধ্যমে ড্যামিয়েন শ্যাজেল পলকহীনভাবে আটকে রাখতে পেরেছেন ‘লা লা ল্যান্ড’ মুভি দিয়ে! পঞ্চাশ-ষাটের দশকের আমেজ কী রাজকীয়ভাবেই না ফিরিয়ে এনেছেন তরুণ ওই স্বপ্নালু গল্পকার ও পরিচালক!
দুটি সরু তারের ওপর দিয়ে হাঁটতে থাকা দু’জনের অনিন্দ্য গল্প বলে চলে ওই মুভি। অভিনেত্রী হওয়ার স্বপ্নে বিভোর রেস্তোরাঁর এক ওয়েট্রেস মিয়া ডোলান। একের পর এক অডিশন দিয়েই যাচ্ছে। সবটিতেই ব্যর্থতা তার সঙ্গী।
আরেকজন সেবাস্টিয়ান ওয়াইল্ডার। জ্যাজ গানের ভক্ত গরিব পিয়ানিস্ট সে। স্বপ্ন দেখে একদিন তার নিজস্ব একটি জ্যাজের ক্লাব থাকবে। কিন্তু বাস্তবতা তাকে বসিয়ে রাখে ক্রিসমাস ক্যারোলের হালকা পার্টিতে সস্তা গোছের গানের সঙ্গে পিয়ানো বাজানোয়। ক্রমেই দুটি তার স্পর্শ করে। দুটি মানুষের মধ্যে ছোঁয়া আদান-প্রদান হয়ে যায়। কতো গল্প, গান, সুর, কল্পনায় হাঁটা, স্বপ্নে বিভোর হওয়া দু’জনায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বাস্তবতার চোখ রাঙানিতে সুরে ছেদ আসে। ভাটা পড়ে কল্পনায় এবং স্বপ্ন ভাঙে রূঢ় জাগরণে। তারপর? এরপর আছে মুদ্রার অপর পাশটার গল্প। চোখের সামনে নদীর মতো বয়ে যাবে সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম সেরা এক সিকোয়েন্সে ঠাসা ফিনিশিং! কান্না পাবে খুব। গলার মধ্যে কী যেন একটি দলা পাকিয়ে থাকবে বেশ কিছুক্ষণ!

 


২০১৬ সালের সেরা সিনেমার সংক্ষিপ্ততম তালিকায় থাকা ‘লা লা ল্যান্ড’-এর রচয়িতা ও পরিচালককে নিয়ে কিছু বলা যাক। ড্যামিয়েন শ্যাজেল। বয়স মাত্র ৩২ বছর। এ বয়সেই ক্যামেরার পেছনে চমৎকার দুটি চোখ আর সৃষ্টিশীল এক মগজ নিয়ে দেখিয়েছেন মুনশিয়ানা। পড়াশোনা হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে। তা প্রথম প্রেম ছিল সিনেমা বানানো। কিন্তু সব সময় চাইতেন মিউজিশিয়ান হতে। মিউজিক, বিশেষত জ্যাজ মিউজিক যে বড্ড টানে তাকে তা তার মুভি হুইপ্ল্যাশ আর লা লা ল্যান্ড দেখলেই পরিষ্কার বোঝা যায়। প্রিন্সটন হাই স্কুলে পড়াকালীন জ্যাজ ড্রামার হওয়ার জন্য সংগ্রাম করেছিলেন খুব। ওই সংগ্রামের অসাধারণ গল্পই সেলুলয়েডের ফিতায় আমাদের বলেছেন হুইপ্লাশ মুভির মাধ্যমে। তবে শুরুটা অনেক আগে।
ছাত্র থাকা অবস্থায় সহপাঠী ও বন্ধু জাস্টিন হারউইটজ-কে সঙ্গে নিয়ে তৈরি করেছিলেন ‘গাই অ্যান্ড ম্যাডেলিন অন অ্যা পার্ক বেঞ্চ’। সেটি অবশ্য বানিয়েছিলেন নিজের থিসিস প্রজেক্টের অংশ হিসেবে। এটিরও বিষয়বস্তু ছিল জ্যাজ মিউজিক। লা লা ল্যান্ডের জন্মটাও ২০১০ সালে হার্ভার্ডের ডরমেটরির ছোট্ট এক কোণে প্রিয় বন্ধু জাস্টিন হারউইটজকে নিয়েই। মাত্র ২৫ বছর বয়সে যে গল্প লিখে ফেলেছিলেন, কস্মিনকালেও কী ভেবেছিলেন ওই গল্প একদিন মানুষের চোখে চোখে ভেসে বেড়াবে!
লা লা ল্যান্ডের পথচলাটিও মিয়া আর সেবাস্টিয়ানের মতো কণ্টকাকীর্ণ। এমন একটি মিউজিক্যাল ‘সেকেলে’ ধাঁচের গল্পটি অর্থায়ন করার জন্য কোনো প্রযোজক বা স্টুডিও খুঁজে পাননি হলিউডে সদ্য পা রাখা শ্যাজেল। বুঝে গিয়েছিলেন সোজা হয়ে দাঁড়াতে হলে পায়ের নিচে লাগবে শক্ত মাটি। ২০১৪ সালে বিশ্ববাসীর সামনে নিয়ে আসেন ‘হুইপ্ল্যাশ’। একরাশ মুগ্ধতা ছড়িয়ে এবার তিনি খুঁজে পান শক্তপোক্ত জমিন। এরপর আর বেগ পেতে হয়নি খুব। লা লা ল্যান্ড প্রজেক্টের জন্য এগিয়ে আসে বিখ্যাত সামিট এন্টারটেইনমেন্ট। বাকিটা ইতিহাস!

লা লা ল্যান্ডে আমাদের মুগ্ধ করে সেবাস্টিয়ান চরিত্রে রায়ান গসলিং। জাত অভিনেতা তিনি। ওই মুভির জন্য শিখলেন নাচ আর গান। টানা ২ মাস ৬ ঘণ্টা করে প্র্যাকটিস করে বশে আনলেন পিয়ানোটাও। মুভিতে পিয়ানোর প্রতিটি শট তার করা। কোনো বডি ডাবল হয়নি, দেয়া হয়নি বাড়তি ইফেক্ট। পর্দায় শ্রুতিমধুর গানগুলোও তারই গলার। ‘সিটি অফ স্টারস’ গানটি তো অস্কার, গোল্ডেন গ্লোবসহ বেশ কয়েকটি পুরস্কার বাগিয়ে নিয়েছে সেরা অরিজিনাল গান হিসেবে। একই সঙ্গে দুর্দান্ত অভিনয় তো আছেই। এতো ডেডিকেশন, পারফেকশন- দেখে মনেই হয় না রায়ান ক্যারিয়ারের মাত্র মাঝামাঝি আছেন।


আরেকজন হলেন এমা স্টোন। হলিউড তার ভবিষ্যৎ দেখছে এমার হাতেই। সদ্য ২৯ বছরে পা দেয়া অসম্ভব শক্তিশালী আর মেধাবী এই অভিনেত্রী নিজেকে পুরোপুরি ঢেলে দিয়েছেন ওই মুভিতে। ২০১৪ সালের মুভি ‘বার্ডম্যান’-এর জন্য প্রায় সব কয়টি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন তখন। তবে শিকে ছেঁড়েনি ভাগ্যে। এবার লা লা ল্যান্ড দিয়ে সব উসুল করে নিয়েছেন। অস্কার, গোল্ডেন গ্লোব, ব্রিটিশ একাডেমি, অস্ট্রেলিয়ান একাডেমিসহ বেশকিছু সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার হাতে নিয়েছেন ওই আমেরিকান সুন্দরী। আগের সব সুঅভিনয় এবার এই মুভি দিয়ে ভেঙে-চুরে দিয়ে দাঁড়িয়েছেন এক অনন্য উচ্চতায়। মিয়া চরিত্রে আর কাউকে আসলে ভাবাই যায় না! রায়ান-এমা জুটির তৃতীয় মুভি হলো লা লা ল্যান্ড। ‘ক্রেইজি, স্টুপিড লাভ’ ও ‘গ্যাংস্টার স্কোয়াড’-এর পর এবার মহাসফল ওই মিষ্টি জুটি। একে অন্যকে চূড়ান্ত সাপোর্ট দিয়ে সুন্দর এক গল্পের মুভিটিকে প্রাণ দিয়েছেন দু’জন। অথচ ওই মুভির জন্য পরিচালক শ্যাজেলের প্রথম পছন্দ ছিল মাইলস টাইলার ও এমা ওয়াটসন!


ওই মুভিতে আরো ছিলেন জনপ্রিয় গায়ক জন লিজেন্ড সেবাস্টিয়ানের বন্ধু কিথ চরিত্রে। ছোট্ট একটি চরিত্রে ছিলেন হুইপ্ল্যাশের ওই ক্ষেপা মিউজিক টিচার জে কে সাইমন্স। লা লা ল্যান্ডের প্লট হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছে লস অ্যাঞ্জেলেস শহরটিকে। এটি মুভির নামের মধ্যে লুকিয়ে আছে। লস অ্যাঞ্জেলেস (খ. অ.) হাজার গল্পের এক শহর। এ শহরে আছে বৈচিত্র্য। আছে ট্রাফিক, আঁকা-বাঁকা হাইওয়ে, ঋতুর পরিবর্তন, ফুল-পাখি-আকাশ। আছে বিচিত্র সব মানুষ ও তাদের কা-কারখানা। আর আছে রঙ, শত-সহস্র রঙ! শ্যাজেলের মুখেই শুনি- ‘আমার কেবলই মনে হয় ওই শহরটিতে কাব্যিক কিছু একটা আছে যে শহর তৈরি হয়েছে মানুষজনের অবাস্তব সব স্বপ্ন দিয়ে এবং তারা তাদের সর্বস্ব বাজি রাখে স্বপ্নটি মুঠোয় পুরার জন্য।’ তাই বুঝি ওই মুভিতে লস অ্যাঞ্জেলেস শহরটিকে দেখানো হয়েছে ‘শতরূপে শতবার’!


‘মিউজিক্যাল ড্রাম’ জনরার মুভি। তাই এখানে আছে প্রচুর গান ও নাচ। পরিচালকের প্রেরণা ছিল হলিউডের বেশকিছু নিখাদ ক্ল্যাসিক সিনেমা। যেমন- ‘দি আমব্রেলাস অফ চেয়ারবার্গ’, দি ইয়াং গার্ল অফ রকফোর্ট’ কিংবা ‘ব্রডওয়ে মেলোডি ১৯৪০’, ‘সিঙ্গিং ইন দি রেইন’ বা ‘দি ব্যাড ওয়াগন’। বাস্তববাদী নাক উঁচু সমালোচকরাও মুগ্ধ হবেন চমৎকার শ্রুতিমধুর সব গানে। প্রতিটি গান কানে বাজবে অনেকক্ষণ। বিশেষ করে ‘সিটি অফ স্টারস’ কিংবা ‘অ্যানাদার ডে অফ দি সান’-এর সুর ও কথাগুলো হৃদয় ছুঁয়ে যায়। ওই মুভিতে গানে গানে প্রচুর গল্প বলা হয়েছে, কথা-বার্তা হয়েছে ছন্দে ছন্দে। তা মুগ্ধতা জাগায়।


দ্বৈত ও দলীয় নাচগুলো ছিল দৃষ্টিনন্দন। সিনেমার শুরুই হয়েছে এক চমৎকার ডান্স সিকোয়েন্স দিয়ে যাতে ছিল ১০০ জনেরও বেশি নৃত্যশিল্পী এবং এর শুট হয়েছে লস অ্যাঞ্জেলেসের মহাসড়কে। মুভিতে মিয়া-সেবাস্টিয়ানের চমৎকার সব নাচের দৃশ্য দেখে মুখে একটি শব্দই আসে- ‘বাহ!’ ছয় মিনিটের প্রিয়াম কারের দৃশ্যটি করতে দুই দিন লেগেছিল। কারণ দৃশ্যটি ধারণ করতে হয়েছে দিনের ম্যাজিক আওয়ার মোমেন্ট বা সূর্যাস্তের সোনালি ঘণ্টার সময়। পুরো মুভিতে আরেকটি জিনিস পাওয়া যাবে। তা হলো রঙ। মন ভালো করে দেয়া রঙের ছড়াছড়ি! নাচ-গান-রঙের সঙ্গে সঙ্গে মুভিটিতে পাওয়া যবে কিছু চূড়ান্ত বাস্তবতার কথা। দেখা যাবে স্বপ্নের খুব কাছেই পড়ে থাকা স্বপ্নভঙ্গের মৃতদেহ। পর্দা থেকে চোখ সরানো যায় না ওই মুভির কালার কম্বিনেশন দেখে। সেটের ডিজাইনে আছে ক্ল্যাসিক মঞ্চের ছোঁয়া। আছে ছবির মতো সব ড্রিম সিকুয়েন্স। শ্যাজেলের পুরনো সেই বন্ধু জাস্টিন হারউইটজের অসম্ভব সুন্দর কম্পোজিশন ও লাইনাস স্যান্ডগ্রিনের চমৎকার সিনেমাটোগ্রাফি চোখ আটকে দেবে পর্দায়। একই সঙ্গে আছে এডিটিংয়ের জাদু। খুব অর্গানাইজড ও ফাস্ট পেস এডিটিং, সাবলীল সিকোয়েন্স চেঞ্জ মুগ্ধতা জাগায় প্রতি মুহূর্তে। ‘লা লা ল্যান্ড’ মুভিটি ৮৯তম অস্কারে ১৪টি নমিনেশন পেয়ে নাম লিখিয়েছে ‘টাইটানিক’ ও ‘অল অ্যাবাউট ইভ’-এর পাশে এবং বগলদাবা করেছে ৬টি পুরস্কার। এছাড়া ৭৪তম গোল্ডেন গ্লোবে রেকর্ড সৃষ্টি করে ঘরে নিয়েছে ৭টি পুরস্কার এবং বাফটায় পেয়েছে ১১টি নমিনেশন। এর ৫টিই জিতে নিয়েছে মুভিটি।


মধুরতম গল্প আর রূঢ় বাস্তবতার মিশেল ওই অনবদ্য মুভির ‘ওগউন’ রেটিং ৮.১/১০। রোটেন টমাটোস (জড়ঃঃবহ ঞড়সধঃড়বং) দিয়েছে ৯২ শতাংশ ফ্রেশ (ঋৎবংয)। ৩০ মিলিয়ন ডলারে তৈরি লা লা ল্যান্ড মুভিটি তুলে নিয়েছে ৪৪৬ মিলিয়ন ডলার। এছাড়া জিতে নিয়েছে কোটি কোটি হৃদয়!

Read 47 times

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…