জেমস কেমেরন

জেমস কেমেরন

অরিন্দম মুখার্জী বিঙ্ক

 

টাইটানিক মানেই একটি জাহাজ ডুবে যাওয়া নয়, নয় জ্যাক আর রোজের প্রেম কাহিনী। বিশাল টাইটানিক সম্পর্কে আমাদের যেটুকু ধারণা এর সিকি ভাগই জন্ম দিয়েছে জেমস ফ্রান্সিস ক্যামেরনের সিনেমা।
তার জীবনের গল্পটিও অনেকটা চিত্রনাট্যের মতোই। জেমস ফ্রান্সিস ক্যামেরনের জন্ম ১৯৫৪ সালের ১৬ আগস্ট কানাডার অন্টারিও-তে। তার ছোটবেলা কেটেছে কানাডার ছোট্ট একটি শহরে। শহরের তীর ঘেঁষে বয়ে গেছে ছোট্ট একটি নদী। সেখানে রোজ খেলতেন তিনি। নায়াগ্রা জলপ্রপাত ছিল মাত্র চার বা পাঁচ মাইল দূরে। তাই পানির সঙ্গে তার একটা ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল যা কাজেও বার বার উঠে এসেছে। জেমস ক্যামেরনের মা ছিলেন গৃহিণী আর বাবা ছিলেন প্রকৌশলী। মায়ের সঙ্গে দেখে আসা জাদুঘরের বিভিন্ন স্মারকের অবয়ব- সেটি হোক না পুরনো কোনো যোদ্ধার হেলমেট কিংবা মিসরীয় কোনো মমি। এসব কিছু ক্যামেরনকে আবিষ্ট করে রাখত। আবার প্রকৌশল চর্চাতেও আকর্ষণ ছিল প্রচ-। হতে পারে বাবার সম্মান ও পছন্দ ধরে রাখার জন্য এটি একটি চেষ্টা ছিল জেমস ক্যামেরনের পরিবার ১৯৭১ সালে যখন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় চলে আসে তখন তার বয়স ১৭ বছর। সেখানে তিনি ফুলারটন কলেজে পদার্থ বিজ্ঞান বিষয় নিয়ে ভর্তি হন। একাদশ গ্রেডের সময় তার জীবনের জন্য

গুরুত্বপূর্ণ ছিল। জীববিজ্ঞানের শিক্ষক ম্যাকেঞ্জি ঠিক করলেন স্কুলে একটা থিয়েটার বানাবেন। স্কুলে রেসলিং, ফুটবল, বাস্কেটবলের আয়োজন থাকলেও থিয়েটার ছিল না। ক্যামেরন ওই থেকেই কাজ শুরু করলেন। পুরোটাই ছিল একটি চ্যালেঞ্জ এবং সফলও হয়েছেন। সেটি সম্ভব করেছিলেন ম্যাকেঞ্জি। এটিই তার অভিনব একটি বৈশিষ্ট্য। এ জন্যই জীবনের সঠিক সময় এমন কিছু ব্যক্তিত্বের ভূমিকা অনস্বীকার্য যারা জীবন বদলে দেবেন, ভাবনাটি এগিয়ে নিয়ে যাবেন। ছাত্র হিসেবে তিনি ভালোই ছিলেন। তার ছিল জানার প্রতি তীব্র আকর্ষণ। কখনো প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক পড়াশোনা হয়নি যে কাউকে টপকে ভালো করতে হবে! তিনি জানতে ও শিখতে চাইতেন বিজ্ঞান, ইতিহাস, গণিত- সবকিছু। কিন্তু সেখানে বেশিদিন টিকতে পারলেন না। এক বছর যেতে না যেতেই ড্রপ আউট হয়ে গেলেন কলেজ থেকে।


এরপর জেমস ক্যামেরন ট্রাক ড্রাইভারের কাজ ও লেখালেখি করতেন। ওই সময়টাই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সায়েন্স ফিকশন পড়েছেন যা বাস্তবতা ও কল্পনার মাঝের রেখাটি ধীরে ধীরে অস্পষ্ট করে তুলেছে তাকে। বই আর লেখকদের অভিনব জগৎ তাকে অদ্ভুতভাবে টানতো। আর্থার ক্লার্ক, জন ভগট, হারলান এলিসন, ল্যারি নিভেনদের মাধ্যমে তিনি প্রভাবিত হয়ে যান আস্তে আস্তে। জেমস ক্যামেরনকে সবার থেকে আলাদা বানিয়ে দেয় চারপাশের পরিবেশ ও নিজের অভিনব ক্ষমতা। জীবনের ১০টি বছর এমনভাবে কাটিয়েছেন যেখানে তাকে শুনতে হয়েছে অনেক কটাক্ষ কথা। এরপরের ২৫ বছর তার চেষ্টা ছিল শুধু নিজেকে স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে তৈরি করা। সফলতা সেখানে সামান্যই এসেছে। যতো পরিশ্রম করবে ততোই ভাগ্য তোমার সহায় হবে। দীর্ঘ পথের অর্জনে ‘সুযোগ’ বড় কোনো কিছু নয়। কিন্তু একটি মাত্র সুযোগ সবকিছু বদলে দিতে পারে। ২৫-২৬ বছর বয়সে ঠিক করলেন ছবি বানানো নিয়ে অগ্রসর হবেন। নিজেকে ভাবতে লাগলেন ছবি বানানোর কারিগর হিসেবে, পরিচালক হিসেবে নয়। এরপর ১৯৭৭ সালে একটি ঘটনা ক্যামেরনের জীবন পুরোপুরি পাল্টে দিল। যে ছবিগুলোর তেমন কোনো বাধাধরা প্যাটার্ন নেই সেগুলোই তার পছন্দের তালিকায় এসে হাজির হয়। তিনি দেখলেন, নিয়ম-কানুন তার জন্য ঠিক কাজ করে না। যেখানে অনেক হাঙ্গামা থাকবে, শব্দ থাকবে, অস্থিতিশীলতা থাকবে, পরিপূর্ণ কিছু নয়- সেখানেই তো নিজেকে উপস্থাপনের সুযোগ মেলে। যদি সবকিছু আগে থেকেই প্রস্তুত কিংবা টিপটপ হয়ে থাকে তাহলে জাদুকরী কোনো কিছু উপহার দেয়ার জন্য দরজাটা খোলা যায় না।

পরিচালকের মন থেকে মোহনীয় জাদুর স্পর্শটি প্রতিফলিত হয় না। এটি আসে অভিনয় কুশলীর আত্মার মধ্য থেকে। তিনি আন্দোলিত হয়েছেন ‘উডস্টক’, ‘দি গ্র্যাজুয়েট’, ‘বান অ্যান্ড ক্লাইড’, ‘দি গডফাদার’, ‘স্টার ওয়ারস’ প্রভৃতি ছায়াছবি থেকে। এসব চলচ্চিত্র দেখে বুঝতে পারলেন শিল্প ও বিজ্ঞান কতোটা কাছাকাছি থাকতে পারে! এরপর ট্রাক ড্রাইভারের চাকরি ছেড়ে দিয়ে ঝুঁকে পড়লেন চলচ্চিত্রের দিকে। ক্যামেরন দুই বন্ধুকে নিয়ে ১০ মিনিটের একটি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী ‘জেনোজেনেসিস’ (ঢবহড়মবহবংরং)-এর স্ক্রিপ্ট লিখে ফেললেন। কিন্তু শুট করার মতো যথেষ্ট টাকা তাদের হাতে নেই। শেষ পর্যন্ত বন্ধুবান্ধবকে নিয়ে চাঁদা তুলে ৩৩ মিলিমিটার ক্যামেরা, লেন্স, ফিল্ম স্টক ও স্টুডিও ভাড়া করে ফেললেন। তারা ক্যামেরাটি পুরোটা খুলে এর বিভিন্ন অংশ পরীক্ষা করে দেখলেন এটা বোঝার জন্য যে, ফিল্ম ক্যামেরা কীভাবে কাজ করে।


ছবি বানানোর কথা শুনে ক্যামেরনের পরিবার কখনোই তেমন সন্তুষ্ট হয়নি। বাবা নারাজ ছিলেন। তিনি আসলে ক্যামেরনের ব্যর্থ হওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। যেই মুহূর্তে ক্যামেরুন জানাবেন যে, ‘আমার আসলে প্রকৌশলী’ হওয়াই উচিত ছিল। মা অবশ্য অনেক আগে থেকে এ ধরনের সৃষ্টিশীল শিল্পের ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন। তাই আশ্চার্য এক গতি ছিল সেখানে যা তাকে দীর্ঘ সময়েও ওই পথ চলতে সাহায্য করেছিল। অবশ্য তা দেখতে পাওয়া ছিল দুষ্কর।
জেমস ক্যামেরন ছিলেন জেনোজেনেসিস-এর পরিচালক, লেখক, প্রযোজক ও প্রডাকশন ডিজাইনার। এরপর ‘রক অ্যান্ড রোল হাই স্কুল’ চলচ্চিত্রে কাজ করেন প্রডাকশন সহকারী হিসেবে। কিন্তু ওই কাজের জন্য তিনি কোনো স্বীকৃতি পাননি। তবুও থেমে না গিয়ে চলচ্চিত্র বানানোর কায়দা-কানুন নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে লাগলেন। রজার কোরম্যান স্টুডিওতে একটি ক্ষুদ্র আকৃতির মডেল বানানোর কাজ শুরু করেন সে সময়। এরপর ১৯৮১ ও ১৯৮২ সাল- এই দু’বছরে চারটি চলচ্চিত্রে আর্ট ডিজাইনার, প্রডাকশন ডিজাইনার হিসেবে কাজ করেন।


জেমস ক্যামেরনের পরিচালিত চলচ্চিত্র ৭টি। পিরানহা মুভির সিক্যুয়াল ‘পিরানহা ২’-তে কাজ করার জন্য ইটালির রোমে যান। সেখানে ফুড পয়জনিংয়ের কারণে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় একদিন রাতে ভয়ানক দুঃস্বপ্ন দেখেন। তা হলো ভবিষ্যৎ থেকে একটি রোবট পাঠানো হয়েছে তাকে খুন করার জন্য। ওই স্বপ্ন থেকেই তিনি তার ‘দ্য টারমিনেটর’ চলচ্চিত্রের আইডিয়া পান। বলা যায়, এখান থেকেই তার উত্থান শুরু। টাইটানিকের আয়ের রেকর্ড ভেঙে দেয় অ্যাভাটার। ১৪টির মধ্যে ১১টি ক্যাটাগরিতেই একাডেমি পুরস্কার বা অস্কার জিতে নেয় সিনেমাটি। জেমস ক্যামেরন পান সেরা পরিচালকের পুরস্কার। টাইটানিক সিনেমার জ্যাকের মতোই ক্যামেরন অস্কারের মঞ্চে উঠে বলেছিলেন, I am the king of the World!
অ্যাভাটারের ওই জনপ্রিয়তার কারণে ২০১০ সালে হলিউডের সবচেয়ে বেশি আয় করা পরিচালকদের মধ্যে এক নম্বরে চলে আসেন জেমস ক্যামেরন। তার সম্পর্কে সমালোচকদের প্রধান যে অভিযোগ তা হলো, তার লেখা স্ক্রিপ্টগুলোর কাহিনীর গভীরতা কম। তবে যে ধরনের সিনেমা তিনি তৈরি করেন সেখানে কাহিনীর গভীরতা থাকা হয়তো অতো আবশ্যকও নয়। কিন্তু পরিচালক হিসেবে তার সমালোচক খুব বেশি নেই। অভিনয় শিল্পীদের কাছ থেকে ষোলো আনা কাজ আদায় করার ক্ষেত্রে তার জুড়ি মেলা ভার। এই কারণে তার সঙ্গে কাজ করা অনেকের কাছেই দুঃস্বপ্নের মতো। তিনি শুটিং শুরু হওয়ার আগে সবার মোবাইল ফোন বন্ধ করে রাখতে বলেন যাতে তা কাজে বিঘœ ঘটাতে না পারে। সিনেমাটি বাস্তবসম্মত করার জন্য জীবন বাজি রাখতেও দ্বিধা বোধ করেননি তিনি। নিজের কাজে ডুবে থাকার কারণে পরিবারকেও সময় দিতে পারেননি বেশি একটা।

ফলে সংসারও ভেঙে গেছে তার। তাও একবার নয়, পাঁচবার! তবুও তিনি থেমে নেই। নাসার উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য জেমস ক্যামেরন। লাল গ্রহ মঙ্গলের গায়ে এখন এলিয়েন গ্রহের তকমা নেই। মঙ্গলই হবে আমাদের আগামীর গ্রহ। সাধারণ মানুষ যারা মহাকাশের গোপন রহস্য বোঝে না তারাও আজ মঙ্গলে মানুষের প্রতিনিধি দেখে খুশি হয়। কল্পনা এখন তাদের চোখের সামনে বাস্তবতা! মানুষ স্বপ্ন দেখতো আকাশ ছোঁয়ার। ওইসব ক্ষুদ্র মানুষের স্বপ্ন এখন মহাকাশে বসবাস।
ক্যামেরন ৬২ বছর বয়সেও যেভাবে এগিয়ে চলেছেন এতে মনে হয়, ওই স্বপ্নের বাস্তবতা অসম্ভব কিছু নয়। হলিউডে আরো অনেক দিন চলবে তার রাজত্ব- এটি নির্দ্বিধায় বলে দেয়া যায়।

Read 218 times

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…