বৈশাখী বসনে অতীত-বর্তমান

বৈশাখী বসনে অতীত-বর্তমান

 

বৈশাখ শব্দটি ঝড়োহাওয়ার মতো মন মাতানো। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের মন, দেহ ও পোশাকে পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগে। নববর্ষ বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনা তুলে ধরে। তাই মন, প্রাণ ও পোশাকে আমরা সব সময়ই বাঙালি। অতীতের বৈশাখী পোশাক যেমন বাংলার সংস্কৃতি বহন করছে তেমনি বর্তমানের বর্ণিল ও উজ্জ্বল বৈশাখী পোশাকেও রয়েছে পরিপূর্ণ সংস্কৃতির ছাপ।

ষাটের দশকে রমনার বটমূলে পহেলা বৈশাখ উৎসব পালনের শুরু থেকেই মূলত পোশাকের প্রবর্তন হয়। সেখানে মেয়েরা সাদা শাড়ি আর ছেলেরা পাঞ্জাবি পরে গান গায়। শান্তির রঙ সাদা আর নতুন দিনের সূর্যের প্রতীক লাল রঙ। আর দুইয়ের সংমিশ্রণে লালপেড়ে সাদা শাড়ি। উৎসবের পোশাক হিসেবে লাল-সাদা ধরে নিলেও নতুন শাড়ি বা নতুন পোশাকই মুখ্য ছিল সব সময়। নতুন পোশাক পরাই ছিল অন্যতম আনন্দের উৎস। মেয়েরা পরতো মোটা পাড়ওয়ালা সাধারণ সুতির শাড়ি বা ঠাসা বুননের তাঁতের শাড়ি বাগরদের শাড়ি। সালোয়ার-কামিজও ছিল ছিটকাপড়ে তৈরি অতি সাধারণ। রঙের তেমন বৈচিত্র্য ছিল না বললেই চলে। মেয়েরা ফুলের তৈরি গহনায় নিজেকে সাজাতো। পায়ে পরতো আলতা। ছিল ঘটিহাতা ব্লাউজের চল। একটু উঁচুতে কপালে টিপ আর বল খোঁপা ছিল তখনকার শৌখিন রমণীর সাজ। ছেলেদের পোশাক ছিল ধুতি, লুঙ্গি, পায়জামা আর পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবি ছিল অতি সাধারণ সোজা-সাপটা ডিজাইন। শিশুদের পোশাকও ছিল খুব সাদাসিধা।


সময়ের পালাবদলে পোশাকের ভাবনাতেও আসে পরিবর্তন। অধুনা ওই পরিবর্তনই আজ ফ্যাশন। রঙে এসেছে বৈচিত্র্য। যুক্ত হয়েছে আনন্দের সব রঙ ও হরেক নক্শা। এবার বৈশাখী ফ্যাশনের তুঙ্গে ছিল রঙধনুর রঙে রাঙানো পোশাক। পুরো শাড়িতে রঙধনুর রঙ অথবা সাদা শাড়ির ওপর রঙধনুর ছোঁয়া। লাল-সাদা রঙ তো রয়েছেই, কিছু নতুন রঙও প্রাধান্য পেয়েছে বিগত বছরগুলোয়। যেমনÑ কমলা, হলুদ, সবুজ, সোনালি, বাসন্তী ও নীল রঙ। অনেক আগে থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছিল টেইলর মাস্টারদের ব্যস্ততা, বুটিক হাউসে নকশার সেলাই, ব্লক-বাটিকের কাজ, ডিজাইনারদের কাছে সিরিয়াল দেয়া। হয়েছে উপচে পড়া ভিড় ফ্যাশন হাউসগুলোয়। এবারও চুটিয়ে ব্যবসা করেছে কাপড় ব্যবসায়ী ও ফ্যাশন
হাউসগুলো। টপ ডিজাইনারের পোশাক এখন ফ্যাশনেবল প্রত্যেক ছেলে-মেয়ের স্বপ্ন। পহেলা বৈশাখ বর্ণিল হয়ে ওঠার দিন। তাই অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছিল এ-দোকান, ও-দোকান ঘোরাঘুরি। নিজের ও পরিবারের জন্য সাধ্যমত সকলে বেছে নিয়েছে ফ্যাশনেবল পোশাকটি। সাধারণ সাজেও বাঙালি হয়ে উঠেছিল দৃষ্টিনন্দন ও আকর্ষণীয়। একরঙা সুতির শাড়িতে চিকন পাড়, কপালে বড় টিপ বৈশাখের জন্য একটি আকর্ষণীয় সাজ। বাঙালি স্টাইলে শাড়ি পরলেও বেশ

মানায়। কেউ আবার পছন্দ করেন জামদানি, সিল্ক ও গরদ। গরমের কারণে অনেকে সালোয়ার-কামিজে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তবে উৎসবটি একেবারেই দেশীয় সংস্কৃতির। ফলে মেয়েদের জন্য শাড়ি আর ছেলেদের জন্য পাঞ্জাবিই হবে ট্রাডিশনাল।
বৈশাখের সাজের জন্য মাটির গহনাই উত্তম। মাটির মালা হতে হবে লম্বা। আবার কাঠ, রুপা, মুক্তা বা সুবাসিত ফুলের গহনাও ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী ফ্যাশনের অন্তর্গত। বাহারি ফুলের মৌসুম এখন। তাই ফুলের গহনায় মনের মত করে সেজেছে মেয়েরা। শাড়ির পাড়ের সঙ্গে মানানসই রঙের গার্নেট বা কুন্দনের গহনাও বেশ জনপ্রিয়। হাতভর্তি চুড়ি না থাকলে বাঙালি নারীর সাজ থেকে যায় অপূর্ণ। গহনা না পরলেও হাতভর্তি রেশমি কাচের চুড়ি সাজে আনে পূর্ণতা। মাটি বা কাঠের চুড়িও বেশ জনপ্রিয়। শাড়ির রঙের সঙ্গে ম্যাচ করা টিপ, পায়ে আলতা আর মানানসই নূপুর ঝলমলিয়ে দেয় উচ্ছল তরুণীর সাজ। এমন একদল তরুণীকে দূর থেকে মনে হয় যেন একঝাঁক পরী।

মেয়েদের পছন্দের তালিকায় এখন দেখা যাচ্ছে বুকে ও হাতে রঙবেরঙের লেস দিয়ে কাজ করা এন্ডিকটন কামিজ, লং টপসের সঙ্গে ফুল কটন খাদি কামিজ, সাদা জর্জেট কাপড়ে লাল পাড় অথবা লাল জর্জেট কাপড়ে গোল্ডেন পাড়ের আনারকলি। স্কিন প্রিন্টের ওপরে সুতার কাজ অথবা কালারফুল সেডের দোপাট্টা।শাড়ির সঙ্গে ম্যাচিং চুড়ি, জুতা ও ব্যাগ এখন আর কোনো বাহুল্যতা নয়, সাজেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। হরেক রঙের কাপড়, চামড়া, জুটের তৈরি ব্যাগ ও ছোট বটুয়া বা ক্লাচ পার্স বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। কবিতা আবৃত্তি, বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের গান ও কবিতা আবৃত্তিতে চোখে ভেসে ওঠে জামদানি শাড়ি, বেলোয়ারি চুড়ি অথবা পাথরসেটের গহনা। এছাড়া কপালে বড় টিপ, পায়ে আলতা ও নূপুর এবং হাতে মেহেদির আলপনা, চুলে বেলি ফুলের মালা। তাই অনুষ্ঠানের শিল্পীরা ওই ধরনের সাজটিকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। ইদানীং স্বামী-স্ত্রী, প্রেমিক-প্রেমিকা, ভাই-ভাই, বোন-বোন, ভাই-বোন অথবা ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মধ্যে ম্যাচিং পোশাক পরার ধুম পড়েছে বেশ। ম্যাচিংটি হয় একই রঙের অথবা কন্ট্রাস্টে।

ভাবনাটি ফ্যাশন সচেতন মানুষের মধ্যে বেশ আলোড়ন তৈরি করেছে। চেয়ে চেয়ে দেখার মতোই এক দৃশ্য যেন! বিগত বছরগুলোয় ছেলেদের পাঞ্জাবির সঙ্গে যোগ হয়েছে উত্তরীয়। পাঞ্জাবির রঙের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উজ্জ্বল রঙের উত্তরীয় বৈশাখের আমেজে বেশ মানিয়ে যায়। তরুণরা হাতে ঘড়ি অথবা পাঞ্জাবির রঙের বালা পছন্দ করছেন। ছেলেরা পছন্দ করছে পাতলা খাদি কাপড়ের ওপর বিভিন্ন রকমের প্যাচওয়ার্ক, কাঁথা ফোড়ের কাজ, বুকের প্লেটে ঘন লুপ বোতামের ডিজাইন, হাতে প্যাচওয়ার্ক কাজের পট্টি দিয়ে দৃষ্টিনন্দন নকশা। ছোটদের পোশাক মা-বোনরাই নির্বাচন করে থাকেন। তবে ছোটদের পছন্দতেও এখন অগ্রাধিকার দেয়া হয়। ছোটদের জন্যও আলাদাভাবে তৈরি হচ্ছে বৈশাখী পোশাক। অথচ ওই ভাবনা অতীতে ছিলই না।
বাঙলা নববর্ষ বাঙালির ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি। নতুন বছরটিকে বরণ করা বহু বছর ধরে এ দেশের সংস্কৃতিতে চলে আসছে। বর্ণিল পোশাক, পরিবর্তনশীল পোশাক এই সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। সংস্কৃতির ঐতিহ্য বজায় রেখেই চলে পোশাকের বিবর্তন। সরকারের একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ ‘বৈশাখী ভাতার ব্যবস্থা’। এ কারণে পোশাক নির্বাচনে এখন আর কার্পণ্য নয়। তাই, ছোট-বড় সবাই নতুন পোশাকে নিজেকে সাজিয়ে সজীব করে তুলেছে নববর্ষের আনন্দ। ১৪২৫ সনের নতুন সূর্যালোক পুরনো বছরের অন্ধকার সরিয়ে নতুন আলোয় ভরে তুলুক নতুন বছরÑ এই প্রত্যাশা করি।

 

মডেল : জেনিন, অবনী, শাকিব, সাফা
সান, লিন্ডা, হিমেল, মিষ্টি ও আদি
ছবি : স্বাক্ষর জামান
মেকওভার : পুতুল ওয়াংশা ও সুমন রাহাত
পোশাক : আর রাফিউ. রাকিব খান
লেখা : ফারজানা মুল্ক তটিনী

 

Read 113 times

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…