বৈশাখে ঘর ও আপনি...

বৈশাখে ঘর ও আপনি...

 

এসেছে বৈশাখ। এসেছে বাংলা নতুন বছর। প্রতি বছরের মতো এবারও বাংলা নতুন বছরটিকে সাদরে বরণ করে বাঙালিদের মধ্যে পড়ে গিয়েছিল সাজ সাজ রব। একটু চোখ-কান খোলা রাখলেই দেখা যায় শহর ও নগরে এই আসন্ন বৈশাখের আগমনী বারতার দোলা লেগেছিল যেন চারদিকেই। বিপণি বিতানগুলো সেজে উঠেছিল বৈশাখী সাজে। বৈশাখী আয়োজনে ব্যস্ত ছিল নৃত্য-গীত শিল্পীরা, কলা-কুশলী ও চিত্রকররা। বাংলাদেশি খাবার মুড়ি-মুড়কি, গজা-কদমার কারিগর ও বিক্রেতাদের মধ্যেও শুরু হয়েছিল বিশেষ কর্মতৎপরতা। বৈশাখ বা বৈশাখী মেলা উপলক্ষে শিশুদের জন্য কাঠ, শোলা, মাটি কিংবা বেতের নানান খেলনা তৈরিতে কারিগরদের মধ্যেও ছিল বৈশাখী ব্যস্ততা।

বৈশাখ বা বাংলা নতুন বছর পালন নিয়ে চারদিকে আয়োজনের যেন শেষ নেই। তবে ওই আয়োজনের সিংহভাগই বুঝি অসম্পূর্ণ থেকে যেতো যদি বাংলার রমণীকুল বৈশাখী আয়োজনে না সাজতো। তাই ওই বিশেষ দিনটি ঘিরে ছোট-বড়, ধনী-দরিদ্র- সবার ঘরেই চলেছে সাধ্যমতো আয়োজন। একটা সময় পর্যন্ত শুধু লাল পাড়-সাদা শাড়ি, কপালে লাল টিপ, খোঁপা বা বেণীতে দোলানো বেলিফুলের মালা, হাতভর্তি কাঁচের চুড়ি আর আলতা রাঙানো পা- এসবই ছিল বৈশাখের সাজ। এগুলো বাদ দিয়ে আজও বর্ষবরণের সাজ পূর্ণতা পায় না! তবে যুগের পরিবর্তনে বাঙালির সাজে শুধু ওই লাল-সাদা কনসেপ্ট ছেড়ে উঠে এসেছে কমলা, হলুদ, বেগুনি, সবুজসহ নানান বর্ণালি রঙের বাহার। আর নকশায় দেশি বাদ্যযন্ত্র আর ব্যবহার্য জিনিসের জায়গায় ধীরে ধীরে উঠে এসেছে বাংলার প্রকৃতি আর নানান কারুকার্যময় আলপনার ছবি। তো দেখা যাক কীভাবে সেজেছে বাঙালি বৈশাখী সাজে-

প্রথমেই আসি শাড়ি প্রসঙ্গে। বৈশাখে শাড়ি নির্বাচনে ম্যাটারিয়াল হিসেবে কটন বা সুতি এক বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বৈশাখ যেহেতু প্রচ- গরমের মাস সেহেতু এই তীব্র গরমে সুতি বা তাঁতের শাড়িই সবচেয়ে বেশি উপযোগী। খাদি কাপড় একটু মোটা হলেও বৈশাখে খাদি শাড়িও থাকে কারো কারো পছন্দের তালিকায়। সুতি জামদানিরও প্রচলন রয়েছে। তবে সান্ধ্যকালীন অনুষ্ঠান বা বিশেষ জাঁকজমকপূর্ণ বৈশাখী অনুষ্ঠানে সিল্ক, মসলিন, টিস্যু বা গরদ কিংবা জমকালো জামদানি ও অন্যান্য ম্যাটারিয়ালেরও প্রচলন দেখা যায়। আগে সুতি শাড়ির পাশাপাশি গরদের কাপড়ও সমানভাবে ব্যবহার হতো। এবারেও কেউ কেউ বৈশাখে বেছে নিয়েছে সনাতনী গরদ। রঙের ক্ষেত্রে সম্প্রতি সাদা ও লালের পাশাপাশি কমলা, বেগুনি, হলুদ, সবুজ, নীলসহ নানান নকশাদার শাড়ির প্রচলন শুরু হয়েছে। বৈশাখের শাড়িতে বাড়তি সংযোজন হিসেবে ঝুনঝুনি, টারসেল, আয়না, পুঁতি, কাঁচ বা ছোট ছোট স্টোনও কেউ কেউ ব্যবহার করেছেন। শাড়ি ছাড়াও সালোয়ার-কামিজ যারা পরেছেন তারাও ম্যাটারিয়াল হিসেবে সুতিই প্রাধান্য দিয়েছেন। আর রঙের ক্ষেত্রে বেছে বেছে নিয়েছে রঙ-বেরঙের বৈচিত্র্য।


যাহোক, এবারে আসি শাড়ির সঙ্গে ব্লাউজের ডিজাইন বা নকশার ব্যাপারে। বৈশাখী সাজে ব্লাউজের ডিজাইনে থাকে গ্রামীণ আবহ। ঘটিহাতা, গলায় কুচি, লেস ফিতায় ব্লাউজ, প্রিন্ট বা চেক কাপড়ের ব্লাউজ অনায়াসে মানিয়ে যায় বৈশাখী শাড়ির সাজে।
যাহোক, ফুটপাথ থেকে শুরু করে যে কোনো প্রসাধনীর দোকানে পাওয়া যায় নানান টিপ। কাজেই নিজের পছন্দ ও চাহিদামতো টিপ চাইলেই সংগ্রহ করা কঠিন কিছু নয়। এছাড়া কুমকুম দিয়েও নিজের মনের মতো নকশা করে টিপ এঁকে নেয়া যায়। এক পাতা সাধারণ টিপ ১০ থেকে শুরু করে গুণ, মান ও নকশাভেদে ৫০, ১০০ বা ১৫০ টাকা পর্যন্ত দাম হতে পারে। শাড়ি আর চুড়ি যেন একে অন্যের পরিপূরক। শাড়ির সঙ্গে হাতে রিনিঝিনি কাচের চুড়ি না থাকলে তো সাজে পূর্ণতা আসে না! বৈশাখে লাল-সাদা চুড়ি ছাড়াও রঙ-বেরঙের চুড়ি পরতে দেখা গেছে পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে বা কনট্রাস্ট করে। কামিজের সঙ্গেও একইভাবে পরা যায় এক মুঠো রিনিক-ঝিনিক রেশমি চুড়ি। কাঁচের চুড়ি ছাড়াও অন্যান্য ম্যাটারিয়ালের চুড়িও বেশ মানিয়ে যায় বৈশাখের সাজের সঙ্গে। রেশমি চুড়ি ৫০ টাকা ডজন এবং জরি বা চুমকি বসানো কাচের চুড়ি ৫০ থেকে ৬০ টাকা ডজন। স্টিলের চুড়ির সেট ৬০ টাকা থেকে শুরু। অক্সিডাইজ ও ব্রোঞ্জের চুড়ি জোড়ার দাম শুরু ৮০ থেকে। মাটির চুড়ি জোড়া ৩০ এবং কাঠের চুড়ি জোড়া ২০ থেকে ৪০ টাকা। কাঁচাফুলের মালা বৈশাখী সাজে খোঁপা বা বেণীতে দোলানো ফুল বা ফুলের মালা যেন এক চিরায়ত সৌন্দর্যের প্রতীক। তীব্র গরমে বৈশাখী সাজে আরামদায়ক আর স্নিগ্ধ অনুভূতি আনতে খোঁপা বা বেণীতে একগুচ্ছ সাদা বেলি বা রজনীগন্ধার তুলনা হয় না। এছাড়া বাজারে পাওয়া গোলাপ, জারবেরা ফুলেও সাজিয়ে নেয়া যায় চুলের সাজটি। কাঁচাফুলের মালার দাম ফুলভেদে হয়ে থাকে ভিন্ন।

গ্রামের মেয়েদের আলতা রাঙা পা তো নিত্যদিনের প্রসাধনী। বাঙালি সাজে ওই সাজটি শহর বা নগরেও ওই বিশেষ দিনে আনা যায় বাঙালিয়ানার বৈশিষ্ট্য হিসেবে। প্রসাধনীর দোকানগুলোয় আলতা পাওয়া যায় ১০০ থেকে ২৫০ টাকায়।
পায়ের সাজে আরেকটি অলঙ্কার নূপুর বা মল। মেহেদী দিয়ে নকশা রাঙানো হাতও বাঙালিয়ানার সাজেই পড়ে। কাজেই অনেকে দু’হাত রাঙিয়ে নিয়েছেন বিশেষ দিনটিতে। এছাড়া মাটি, পুঁতি, কাঠ, বাঁশ, বেত বা নারিকেলের মালার তৈরি দুল, মালাও এই বৈশাখের সাজে মানিয়ে যায় দারুণ। এই গেল বৈশাখী সাজের গল্পগুলো। তবে শুধু নিজে সাজলেই তো চলবে না। বৈশাখী সাজে গৃহসজ্জার ব্যাপারটিও মাথায় রাখতে হবে। লাল, সাদা, নীল, হলুদ, সবুজ বা কমলায় রঙিন করে তোলা যায় গৃহকোণ এই বিশেষ দিনটিতে। গৃহসজ্জার ক্ষেত্রে যে ঘরটি প্রথমেই প্রাধান্য পায় সেটি হচ্ছে বসার ঘর। কারণ অতিথি এলে এই ঘরেই তাকে অভ্যর্থনা জানানো হয়। তাই এই ঘরটি সাজিয়েছেন আকর্ষণীয় ও রঙিন করে।


বাংলা নববর্ষ যেহেতু বাঙালির উৎসব সেহেতু গৃহসজ্জায় বাঙালিয়ানা ছাপ রাখতে হয়। মাটির শোপিস, মাটির পুতুল, টেপা পুতুল, ঘণ্টা, মাটির চাইম, প্রদীপ, নকশিকাঁথা, হাতপাখা, আলপনা- এসব দেশীয় উপাদানের সমন্বয়ে তৈরি বৈশাখী গৃহসজ্জা। বসার আয়োজনে ভিন্নতা আসে। শীতলপাটি, নকশিকাঁথা ও রঙিন কুশন সাজিয়ে বসার আয়োজন করা যেতে পারে। ঘরের কোণে সবুজ গাছ, পটারি বা টেরিরিয়াম সাজিয়ে দেয়া যায়। দেয়ালে ঝোলানো হয় কাগজ, কাঠ, বাঁশ, বেত, মাটির নানান মুখোশ। একটি মাটির পাত্রে পানি নিয়ে পছন্দমতো ফুলের পাপড়ি ছড়িয়ে এতে জ্বালিয়ে দেয়া হয় রঙ-বেরঙের ফ্লোটিং মোমবাতি। এছাড়া ব্যবহার করা হয় নানান ল্যাম্পশেড। আলপনা ও প্রদীপ জ্বালিয়ে পূর্ণাঙ্গ করে তোলা হয় বৈশাখী সাজের বসার ঘর।
খাবার ঘরে খাবার টেবিলটি ঢেকে দেয়া হয় তাঁতের ব্লক প্রিন্ট বা হ্যান্ড পেইন্টের টেবিল কভারে। নতুনত্ব হিসেবে আদিবাসীদের রঙিন থামি (লুঙ্গি) দিয়ে টেবিল কভার বানানো যেতে পারে। টেবিল রানারটি শীতলপাটি, বাঁশ অথবা নকশিকাঁথার তৈরি হতে পারে। আদিবাসীদের তৈরি রেশমি সুতার বর্ণিল চকচকে ওড়নাও রানার হিসেবে ব্যবহার করা যায়। রানারের ওপর মাটির মোমদানি বা মাটির ফুলদানি ফুলসহ সাজিয়ে দেয়া যেতে পারে। খাবার টেবিলে তৈজসপত্রে মাটি ও কাঠের ব্যবহার আনা হয়। কাঠ, মাটি বা বেতের তৈরি বাসন-কোসনে বিকালে পরিবেশন করা যায় খৈ, মুড়ি, বাতাসা, নিমকিসহ দেশীয় মুখরোচক খাবার। রঙ-বেরঙের খাদি বা সুতি কাপড়ের পর্দার ব্যবহারও ঘরটিকে ভিন্ন মাত্রা দেয়। ঘরের দেয়ালগুলো বাঁশের ওয়াল ডেকোরেশন বা মাটির টেরাকোটা দিয়ে সাজানো হয়। শোবার ঘরের বিছানায় বিছিয়ে দেয়া হয় উজ্জ্বল রঙের বেডশিট। বিছানার চাদরের সঙ্গে মিলিয়ে পর্দার রঙেও আনা যেতে পারে বর্ণিল নকশার ব্যবহার। বিছানার ওপর বিছিয়ে দেয়া যায় শীতলপাটি। এছাড়া ফেলে রাখা যায় একটা নকশি হাতপাখা। অন্যদিকে মেঝেতে রঙিন শতরঞ্জি বিছিয়ে ঘরটি আকর্ষণীয় করে তোলা যায়। শতরঞ্জির পরিবর্তে মাদুরও বিছিয়ে দেয়া যেতে পারে। দেয়ালে ঝোলানো যায় কারুকার্যম-িত আয়না বা রঙিন পেইন্টিংস।

বৈশাখে রঙিন হয়ে উঠুক গৃহকোণসহ প্রত্যেকের অন্তর ও চারদিক। বৈশাখের ওই আনন্দে বিরাজিত হোক সব সত্য ও সুন্দর!

 

 

আয়োজন : শুভ

ছবি : কানন মাহমদুল

মেকওভার : ক্লিওপেট্রা বিউটি স্যালন

মডেল : অর্পিতা জাহারাত

লেখা : শায়মা হক

Read 464 times

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…