Page 3 of 8

মুনলাইট

ফুয়াদ বিন নাসের

 

ব্যারি জেনকিন্স তার ‘মুনলাইট’ ছবিটিকে খুব সহজেই তিনটি পৃথক চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারতেন। বর্তমানের প্রিক্যুয়াল-সিক্যুয়াল ও রুপালি পর্দার ব্যবসায়িক সাফল্যের যুগে হয়তো সেটিই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটির ফিল্ম ডিপার্টমেন্টের ছাত্র ব্যারি যশ-খ্যাতি বা অর্থ-বিত্তের হাতছানিতে সাড়া দেয়ার মানুষ নন। ‘মেডিসিন ফর মেলানকলি’ চলচ্চিত্রেই তার ওই দর্শনের অনেকটা আঁচ পাওয়া গিয়েছিল। মুনলাইট ছবিটি তিনটি পর্বে বিভক্ত- ‘লিটল’, ‘কাইরন’ ও ‘ব্ল্যাক’। তিনটি নামই ছবির মূল চরিত্রের নাম। একই মানুষের ভিন্ন তিনটি বয়সের তিনটি রূপ মায়ামির রৌদ্রস্নাত পটভূমিতে আঁকার চেষ্টা করেছেন পরিচালক ব্যারি জেনকিন্স। মাদকাসক্তি, একাকিত্ব,
সমকামিতার মতো প্রেক্ষাপট নিয়ে পরিচালক খেলা করেছেন মূল চরিত্র কেন্দ্র করে।


মুনলাইট চলচ্চিত্রটির প্রথম পর্ব ‘লিটল’ আবর্তিত হয় মায়ামির এক বস্তি অঞ্চলে যেখানে দেখা, আমাদের মূল চরিত্র কাইরন ব্ল্যাকের শৈশব। সহপাঠীদের কাছে তাড়া খাওয়া, মায়ের অবহেলা ও বাবার অভাবে নিশ্চুপ হয়ে যাওয়া ছেলেটি বাবার ছায়া খোঁজে এলাকার পান্ডা হুয়ানের কাছে। হুয়ানও এই অদ্ভুত ও চুপচাপ ওই শিশুকে পছন্দ করে ফেলে এবং নিজের বাসায় নিয়ে যায়। তাকে হুয়ানের কাছে ঘেঁষতে দিতে চায় না লিটলের মাদকাসক্ত মা। কিন্তু স্নেহের লোভে লিটল বার বার ওই হুয়ানের চৌকাঠেই ফিরে যায়। হুয়ান এলাকার মাদক ব্যবসায়ী। সবাই সমীহ করে তাকে। কিন্তু লিটলের মায়ের অবহেলা থেকে তাকে রক্ষা করতে না পেরে অসহায় বোধ করে। লিটলের জন্য সুস্থ্য-স্বাভাবিক জীবন চায় হুয়ান। আবার মুদ্রার অন্য পিঠে হুয়ানের মাদকের চালানই অন্ধকার নামিয়ে আনে লিটলের


পরিবারে। ওই চক্র চলতেই থাকে।
এরপর দেখতে পাই কৈশোরের কাইরনকে। লিটলের বয়স খানিকটা বেড়েছে। কিন্তু তার একাকিত্ব কাটেনি। সে অনুভব করে, তাকে পছন্দ করে এ রকম কেউ থাকতেই পারে না। নিজের সেক্সুয়ালিটি নিয়েও তার মধ্যে শঙ্কা কাজ করে। এলাকা ও স্কুলে সহপাঠীদের অত্যাচার এবং অপমানের শিকার কাইরন মুখ ফুটে তার আসল রূপ প্রকাশ করতে পারে না। তার কথা বলার একমাত্র সঙ্গী কেভিনের প্রতি যে আকর্ষণ বোধ করে তা নিয়েও সে সন্ত্রস্ত থাকে। তার আশপাশের জগতে সে দেখে মানুষের নরপশুসুলভ আচরণ ও হিংস্রতা। স্বাভাবিক জীবনে ফেরার শেষ আশাটুকুও ছেড়ে দেয় কাইরন।
মুনলাইট-এর শেষ পর্বে দেখি যুবক কাইরন ব্ল্যাককে। এখানেই পরিচালক ব্যারি তার সর্বোচ্চ মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। আগের দুই পর্বের সব ইতিহাস, হতাশা, আবেগ এক হয়ে পূর্ণতা লাভ করে সেলুলয়েডের অন্তিমভাগে। ব্যারি জেনকিন্স কোনো নীতিকথা প্রচার করার চেষ্টা করেননি, কোনো উপদেশ দেয়ার প্রয়াসও দেখাননি। মুনলাইটের এই শেষ অংকে বোঝা যায়, ছোট এক ছেলের বড় হয়ে ওঠার কাহিনী- কোনো পরিবারের ভালোবাসা, বন্ধুদের সমর্থন, সমাজের সাহায্য ছাড়াই। এ রকম অনেক লিটল, কাইরন ও ব্ল্যাকই অশ্রুর মতো সবার অগোচরেই মায়ামির সমুদ্রে হারিয়ে যায়। কিন্তু আমরা বার বার তাকে ফিরে আসতে দেখি সব বাধা, অবহেলা, তাচ্ছিল্য ও অপমান ডিঙিয়ে। তিন বছর বয়সের কাইরন ব্ল্যাককে রূপায়িত করেছেন এলেক্স হিবার্ট, অ্যাশটন স্যান্ডার্স ও ট্রেভান্তে রোডস। পরিচালক জেনকিন্স এখানে তিন অভিনেতার মধ্যে সমন্বয় করার চেষ্টা করেননি, বরং তিনজন তিনটি চরিত্রই রূপায়ণ করেছেন। চমৎকার সংলাপ ও সিনেম্যাটোগ্রাফির কারণে কাইরন ব্ল্যাকের বেড়ে ওঠা আমাদের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেছে রুপালি পর্দায়। মায়ামির ঝকঝকে রৌদ্রোজ্জ্বল বালুকাবেলায় শত
হাসিমুখের ভিড়েও যে বিষণ্ণতার বীজ লুকিয়ে থাকে সেটিই পরিচালক অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে চিত্রায়িত করেছেন। সেরা ছবির পুরস্কার মুনলাইটেরই প্রাপ্য।

মহাকালের রথের ঘোড়া : সমরেশ বসু

অরিন্দম মুখার্জী বিংকু

 

 

তারাশঙ্কর থেকে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়। আবার সুনীল, শীর্ষেন্দুদের যুগ। এ দু’যুগের মাঝে সমরেশ বসু ছিলেন সেতু হিসেবে। তাঁর জীবন যাপন, ছেলেমানুষি আচরণ অনেকটাই ছিল ফরাসিদের মতো। এক মাথা ঝাঁকড়া চুল আর অপূর্ব একটা ট্রেড মার্ক হাসি। ঢাকা জেলার মুন্সীগঞ্জ মহকুমার অন্তর্গত রাজনগর গ্রামে পৈতৃক বাস্তুভিটায় ১৯২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর জন্ম নেন সমরেশ বসু। বাবা ছবি আঁকতে ভালোবাসতেন। কাগজের ম- দিয়ে মূর্তি তৈরী করতেন। বাড়ির পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সমরেশের আদলটা একটু আলাদা। পাঠ্য বই পড়ায় মন নেই তাঁর। বাঁধাধরা শিক্ষার বাইরের জীবন যাপনই তাঁকে বেশি টানে। তবু তাঁকে পাঠানো হলো গিরিশ মাস্টারের পাঠশালায়। পরে গে-ারিয়া গ্র্যাজুয়েট স্কুলে পড়লেন সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত। পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ায় বাবা তাঁকে পাঠালেন নৈহাটির রেল কোয়ার্টার্সে দাদা মন্মথ’র কাছে। দাদা ১৯৩৯ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি নৈহাটির মহেন্দ্র স্কুলে তাঁকে ভর্তি করালেন অষ্টম শ্রেণিতে। স্কুলের পড়াশোনা বাদ দিয়ে, নাটক অভিনয়, খেলাধুলা, শরীর চর্চা ও সাহিত্য চর্চায় মনোনিবেশ করেন। সেসময় কিছু লেখালেখিও শুরু করেন হাতে লেখা পত্রিকা বীনায়।


দেবশংকর বন্দোপাধ্যায় ছিলেন তখন তাঁর ঘনিষ্ট বন্ধু। বন্ধুর বাসায় যাওয়া আসার সুবাদে প্রেমে পড়ে সমরেশ বন্ধুভগ্নি গৌরীর সাথে। ‘সমরেশ’ নামটি গৌরীরই দেয়া। তাঁরা যখন পালিয়ে বিয়ে করে সমরেশ তখন ১৮ গৌরী ২১। এই বিয়ে দুই পরিবারের কেউই মেনে নিলেন না। ফলে নৈহাটি থেকে চার মাইল দূরে আতপুরের পুলিশ ফাঁড়ির পেছনে ২ টাকায় ঘর ভাড়া নিলেন। আতপুরে সমরেশের জীবন এক বড় বাঁক নেয়। শুরু হয় জীবনযুদ্ধ। জগদ্দল আতপুরের শ্রমিকপাড়া ও জীবিকার জন্য লড়াই নৈহাটির কাঁঠালপাড়ার দিন যাপনের থেকে বহুলাংশেই আলাদা। এক পোলট্রি ফার্মের সঙ্গে কমিশনের শর্তে ডিম, মুরগি, সবজি বিক্রি করে কোনো রকমে টিকে থাকার চেষ্টায় প্রাণপাত পরিশ্রম করতে লাগলেন। সপ্তাহে ৩-৪ দিন খাওয়া জোটে, বাকি দিন অভুক্ত অবস্থায় কাটে।

বিয়ের পর শুরু হয় জীবনের আসল যুদ্ধ সপ্তাহে তিন চার দিন খাবার জোটে তো বাকি দিনগুলোতে অভূক্ত থাকতে হয়। চরম দারিদ্রতায় সাহিত্য চর্চা ছাড়েননি তিনি। ১৯৪৩ সালের জানুয়ারিতে ইছাপুর রাইফেল ফ্যাক্টরির ইন্সপেক্টরেট অব স্মল আর্মস-এর ড্রইং অফিসে ট্রেজারের চাকরি পেলেন সমরেশ। ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত ৬ বছর এখানেই কাজ করেন তিনি। ওই সময় তাঁর জীবনে অনেক ঘটনা ঘটে যায়। প্রথম সন্তান বড় মেয়ে বুলবুলের জন্ম ১৯৪৩ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। দ্বিতীয় সন্তান বড় ছেলে দেবকুমারের জন্ম ১৯৪৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। তৃতীয় সন্তান মেজছেলে নবকুমারের জন্ম ১৯৪৬ সালের ডিসেম্বর। চতুর্থ সন্তান ছোট মেয়ে মৌসুমীর জন্ম ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বর। এর পাশাপাশি বারাকপুরে জুটফ্রন্টে পার্টির ট্রেড ইউনিয়নের কাজ করতেন। সমরেশ আর গৌরী পার্টি সদস্যপদ লাভ করলেন। সংগঠনের কাজের ফাঁকে ‘উদয়ন’ পত্রিকায় আঁকা ও লেখা শুরু করলেন। উদয়ন লাইব্রেরিতে পড়াশোনা। সাহিত্যের ক্ষেত্রে প্রথম ছোটগল্প ‘শের সর্দার’ প্রকাশিত হয় ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকায়। উদয়ন পত্রিকা তো আছেই, সবচেয়ে বড় ঘটনা ১৯৪৬ সালে শারদীয় ‘পরিচয়’ পত্রিকায় ‘আদাব’ গল্প প্রকাশের সময়। উদয়ন পত্রিকার জন্য আদাব গল্পটি তিনি লিখেছিলেন। কিন্তু বন্ধু গৌর জোর করে ‘পরিচয়’ পত্রিকায় গল্প পাঠিয়ে দেন। বাংলা সাহিত্যে ওই অর্থে সমরেশের প্রবেশ এ গল্পের মধ্য দিয়েই। ১৯৪৯ সালে কমিউনিস্ট পার্টি বেআইনি ঘোষিত হলে সমরেশ ও তাঁর পরিবারকে আবারও দারিদ্রের মধ্যে পড়তে হয়। একই বছর চৌদ্দই ডিসেম্বর সমরেশ গ্রেফতার হয়ে প্রেসিডেন্সি জেলে এক বছর কারাবাস করেন। তিনি বন্দি থাকায় সংসার অচল। মুখ্যমন্ত্রী ডাক্তার বিধান রায়ের শরণাপন্ন হয়েছিলেন বিপর্যস্ত গৌরী দেবী। তিনি বন্দি সমরেশের পরিবারের জন্য দেড়শ’ টাকা মাসোয়ারার বন্দোবস্ত করে দিয়েছিলেন। কারমুক্ত হয়ে সমরেশ নিজেকে আবিষ্কার করেন একজন নিঃসঙ্গ ও বেকার মানুষ হিসেবে। এখান থেকেই তাঁর লেখার সংকল্প জেগে ওঠে। লিখেই জীবন বাঁচাতে মনেপ্রাণে তিনি প্রস্তুত হতে থাকলেন। চারটি নাম নিয়ে সাহিত্যের ক্ষেত্রে সমরেশ পদচারণা করেছেন- সমরেশ বসু, কালকূট, অশোক ঠাকুর ও ভ্রমর।

বাল্যকালে সমরেশের দারুণ ইচ্ছা ছিল আর্টিস্ট হওয়ার। তাই ছাত্র জীবনে কয়েক বন্ধু মিলে হাতে লেখা কয়েকটা ম্যাগাজিনে গল্প, বিভিন্ন ধরনের হাতে আঁকা ছবি ছাপাতেন। বিভিন্ন পত্রিকায় অলঙ্করণও করতেন। তারপর কৈশোর থেকে যৌবন। ওই সময় সাহিত্যের দিকে ভীষণ ঝোঁক এলো। বিভিন্ন গল্প, প্রবন্ধ লিখতে শুরু করলেন। তাঁকে ছবি আঁকা থেকে
লেখালেখির জগতে নিয়ে আসেন ‘সত্য মাস্টার’। এদিক থেকে বলা যেতে পারে, ‘সত্য মাস্টার’ এর সঙ্গে সমরেশের সাক্ষাৎ বাংলা সাহিত্যেরই এক মাইলফলক। এর মধ্যেই সমরেশের প্রথম উপন্যাস ‘উত্তরঙ্গ’ প্রকাশ পায়। তিনি এর উপাদান সংগ্রহ করেছিলেন ইছাপুর রাইফেল ফ্যাক্টরির ইন্সপেক্টরেট অব স্মল আর্মস-এ চাকরিকালে। তা রূপ পেয়েছিল প্রেসিডেন্সি জেলে বন্দি থাকাকালে। ‘উত্তরঙ্গ’ উপন্যাস বিক্রি করে শোধ করলেন এক বছরের বাড়ি ভাড়া। দ্বিতীয় উপন্যাস ‘বিটি রোড়েব ধারে’। এরপর ‘শ্রীমতী কাফে’। প্রথম গল্প সংকলন ‘মরশুমের একদিন’।

সমরেশের প্রথম লেখা উপন্যাস ‘নয়নপুরের মাটি’। ‘উত্তরঙ্গ’-এর বহু আগে (১৯৪৬ সালে) ওই বই লেখা। সাহিত্য আসরের দরজার চৌকাঠটা তখন দূর থেকে উঁকি মেরে দেখেছিলেন তিনি। বছরখানেক ধরে উপন্যাসটির অংশ ‘পরিচয়’ মাসিক পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয়েছিল। নানান কারণে তা মাঝপথেই থেমে যায়। অনেক দিন পর আবার তা বই আকারে প্রকাশিত হয়।  সমরেশ ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর ‘সাতকড়ি মাসী’ আর ‘জয়নাল’সহ বেশ কয়েকটি গল্প লিখেছিলেন ‘তরণি’ পত্রিকায়। গল্পটি দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর পার্টির বিরাগভাজন হন। পার্টির সঙ্গে ক্রমেই তাঁর দূরত্ব বাড়তে থাকে। অবশেষে তা তলানিতে এসে ঠেকে। তাকে সাহিত্য ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করে ‘গঙ্গা’ উপন্যাস।

১৯৫৮ সালে সমরেশ সাহিত্যে ‘আনন্দ’ পুরষ্কার পেলেন। উদ্দ্যম গতিতে এগিয়ে চলে লেখলেখির কাজ। এরই মাঝে সমরেশ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন ছোট শ্যালিকা ধরিত্রীর সাথে। সমরেশ তখন চার সন্তানের পিতা। কল্যাণীতে স্ত্রী গৌরী বসু ও ছেলেমেয়েদের নিয়ে ভরা সংসার। ওই সময়ই ছোট শ্যালিকার সঙ্গে শরীর ও মনের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। গৌরী ছিলেন বাড়ির বড় মেয়ে আর ধরিত্রী ওরফে টুনি সবচেয়ে ছোট, প্রায় সমরেশের মেয়ের বয়সীই। লোকলজ্জার কথা ভাবলে, হয়তো সব দায় ঝেড়ে ফেলে তিনি বেরিয়ে আসতেই পারতেন। কিন্তু ওই পথে হাঁটেননি। ভারতীয় প্রখ্যাত বাঙালি লেখক ও ঔপন্যাসিক সমরেশ বসু পরকীয়ার জেরে শ্যালিকাকে বিয়ে করেন ১৯৬৭ সালের ১৪ই মার্চ এবং দুই বোনকে নিয়ে একসঙ্গে সংসার করেছিলেন। এ অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন গৌরী তথা সমরেশের স্ত্রী, ধরিত্রীর দিদি। সমরেশের দ্বিতীয় বিয়েতে সম্মতি দিলেন। বুক ফেটে গেলেও মেনে নিলেন নিজের বোনের সঙ্গে স্বামীর বিয়ে।

বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধের সময় সবার মত সমরেশও আন্দোলিত হয়ে ছিলেন। তখন বাংলা সাহিত্যে রাজা বাদশা ছিল না, তিনিই ছিলেন যুবরাজ। সমরেশ বসুর মত ব্যাক্তিরা বাউ-েলে বলেই জীবনকে দেখতে পেরেছিলেন নানা বৈচিত্র্যে, তুলে আনতে পেরেছিলেন পানাপুকুর, কখনও জমিদার বাড়ির খিলান থেকে কখনও বা ট্রাক ড্রাইভারের ডেরা থেকে জীবনাবর্তন।
জীবনের বৈচিত্র্যতা খুঁজে ফেরার মাঝেই ১৯৮৮ সালের ১২ই মার্চ নিজের জীবনরে পরিসমাপ্তি ঘটে। ৪০ বছরের কিছু সময় ধরে বাংলা সাহিত্যে তাঁর ছিল অবাধ বিচরণ। হয়তো ভবঘুরে হয়েই যদি আরো কিছুকাল আনাগোনা করতেন তাহলে বাংলা সাহিত্য আরো সমৃদ্ধ হতো।

 

পেইনটিং অমিত রায়

এ জীবন সঙ্গীতেরই জীবন...

ফরিদা পারভীন

 

আমার জন্ম নাটোর জেলার সিংড়া উপজেলার শাঐল গ্রামে ১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর। বাবা মৃত ডা. দেলোয়ার হোসেন ও মা মৃত রউফা বেগম। বাবা সরকারি চিকিৎসা পেশায় থাকার কারণে দেশের বিভিন্ন জেলাশহরে আমাদের থাকতে হয়েছে।
ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি আমার একটা টান ছিল। মা-বাবার একমাত্র সন্তান হওয়ায় আদর-যত্ন বেশি পেতাম। আমার আবদার তারা রাখতেন। আমাদের বাসা তখন মাগুরায়। পাশের বাড়িতে হারমোনিয়াম ছিল। আমিও বাবার কাছে হারমোনিয়াম চাইলাম। কিন্তু দিই-দিচ্ছি করে গড়িমসি করতে লাগলেন। অবশ্য ভেতরে ভেতরে চাইতেন তার একমাত্র সন্তান গানের সঙ্গে জড়িত হোক। তিনিও গান পছন্দ করতেন। এক পর্যায়ে বাড়িতে মিস্ত্রি ডেকে এনে হারমোনিয়াম বানিয়ে দিলেন। আর যার কাছে আমার হাতেখড়ি তিনি হচ্ছেন মাগুরার কমল চক্রবর্তী। তার মাধ্যমেই আমার শুরু গানের পথচলা। 


আজ পর্যন্ত কত গান গেয়েছি এর হিসাব রাখিনি। তাছাড়া সংখ্যা দিয়ে তো শিল্পীর মান বিচার করা যায় না! যেমন- বলা যেতে পারে, অনেক গান আছে। তবে শুনতে একটি গানও ভালো লাগে না। ড. আবু হেনা মোস্তফা কামালের ভাষায়- কুকুর অনেকগুলো ছানা প্রসব করে। কিন্তু সিংহের শাবক বেশি হয় না। যে কয়টা গান আজ পর্যন্ত গেয়েছি এর সংখ্যা বেশি না হলেও মানুষের মনে গেঁথে আছে। ভালোবাসা দিয়ে শ্রোতার হৃদয়ের কাছে অবস্থান করে নিয়েছে। সঙ্গীত যেহেতু গুরুমুখী বিদ্যা সেহেতু বেশ কয়েকজন ওস্তাদের কাছে আমার তালিম নেয়া হয়। ওস্তাদ ইব্রাহিম খাঁ, ওস্তাদ রবীন্দ্রনাথ রায়, ওস্তাদ ওসমান গণী, ওস্তাদ মোতালেব বিশ্বাসসহ প্রায় সবাই আমাকে ধ্রুপদী (ক্ল্যাসিকাল) গান শেখাতেন। নজরুল সঙ্গীতের গুরু হলেন ওস্তাদ আব্দুল কাদের ও ওস্তাদ মীর মোজাফফর আলী।

কিন্তু স্বাধীনতার পর আমার লালন সাঁইজির গানের গুরু হচ্ছেন মোকসেদ আলী সাঁই। তার কাছে সাঁইজির গানের শিক্ষা নিই। অনেকটা অনিচ্ছাকৃত ছিল এই তালিম। লালন সাঁইজির জীবদ্দশায় তার অনুসারীদের নিয়ে দোল পূর্ণিমায় মহাসমাবেশ করতেন। এরই ধারাবাহিকতায় এ দেশে স্বাধীনতার পর ওই অনুষ্ঠানে গান করার জন্য আমার গুরু মোকসেদ আলী সাঁই অনুপ্রাণিত করেছিলেন। সেটিও সাঁইজির একটি গান যা শিখে শ্রোতার কাছে উপস্থাপন করি। ‘সত্য বল সুপথে চল ওরে আমার মন’ গানটি তখন এতো জনপ্রিয়তা পেল যে, সঙ্গে সঙ্গেই সিদ্ধান্ত নিলাম সাঁইজির গানই গাইবো। তখন যে অনুভূতি আমার হয়েছিল সেটি বিশ্লেষণ করা যায় না। কিন্তু এখন পর্যন্ত উপলব্ধির মধ্যেই আছে। আর তখন থেকেই লালনকে লালন করে চলেছি।


আগেই বলেছি, লালন সাঁইজির গানে আমার কোনো ভালোবাসা ছিল না। আল্লাহর অভিপ্রায় ছাড়া কোনো কিছুই সম্ভব নয়। তা হলো, এখনো যেখানেই অনুষ্ঠান করি না কেন, সর্বত্রই দেশপ্রেমের গান দিয়েই শুরু করি এবং সঙ্গতকারণেই লালন সাঁইজির গান দিয়ে শেষ করি। কারণ মায়ের কাছে একাধিক সন্তান যেমন স্নেহে আবদ্ধ থাকে ঠিক তেমনি আমার কাছে দেশাত্মবোধক গান আর লালন ফকিরের গান সমানভাবে সন্তানের মতো। আবু জাফর সম্পর্কে আমার কিছু কথা বলবো। তিনি অনেক বড় মাপের গীতিকার ও সুরকার। যেসব গান লিখেছেন, সব কালজয়ী। যদিও তার গানের সংখ্যা খুব বেশি নয় তবুও বাংলা ভাষাভাষীর মানুষ যতদিন থাকবে পৃথিবীজুড়ে ততদিন তাদের কাছে আবু জাফরের দেশপ্রেম ও প্রেম পর্যায়ের গানগুলো কখনোই বিস্মৃত হবে না।


অনেক গীতিকারের গান গাওয়ার সুযোগ আমার হয়েছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কবি নাসির আহমেদ, সাবির আহমেদ, কবি জাহিদুল হক, যামিনী কুমার দেবনাথ অন্যতম। আমি চার সন্তানের জননী। সবার বড় হচ্ছে মেয়ে জিহান ফারিয়া মিরপুর বাংলা কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক, বড় ছেলে ইমাম নিমেরি উপল সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের সিনিয়র অফিসার, মেজছেলে ইমাম নাহিল অস্ট্রেলিয়ান এমবাসির কর্মকর্তা ও ছোট ছেলে ইমাম জাফর নোমানী উত্তরা ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক।


সংগীতের কথা আমি সব সময়ই বলবো। কারণ সংগীত নিয়েই আমার সব জল্পনাকল্পনা। তবে সংগীতের ক্ষেত্রে বলতে হয়, বিশুদ্ধ সংগীত হলো গুরুমুখী বিদ্যা। এর সঙ্গে নিষ্ঠা, সততা তো লাগবেই, অধ্যবসায়ও জরুরি। এ জন্য গুরুর চরণ ধরে পড়ে থাকতে হয়। কোনো মানুষ- সে যে ধর্মেরই হোক না কেন, তার অভিপ্রায় ছাড়া কোনো কিছুই সম্ভব নয়। মানুষ শুধু চেষ্টা করে যেতে পারে মাত্র। গানের মধ্যে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে কিছু কথা না বললেই নয়। অপ্রাপ্তি বলে কিছুই নেই। যা আছে, সবই প্রাপ্তি। আর তা হলো ১৯৮৭ সালে ‘একুশে পদক’, ১৯৯৩ সালে ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার’ (অন্ধপ্রেম), ২০০৮ সালে এশিয়ার নোবেলখ্যাত জাপানের ‘ফুকুওয়াক কালচারাল অ্যাওয়ার্ড’ প্রাপ্তি। এছাড়া দেশ-বিদেশের অসংখ্য পদক-সম্মাননা আমার প্রাপ্তির ভা-ারটি ভরে তুলেছে। ২০১০ সালে বাংলা
একাডেমির ফেলো নির্বাচিত হই।


সঙ্গীত নিয়েই আমার যত ভাবনা। এ জীবন সঙ্গীতেরই জীবন। তাই একটি প্রতিষ্ঠান ‘ফরিদা পারভীন ফাউন্ডেশন’ গড়ে তুলেছি। এখানে বেশ কয়টি প্রজেক্ট চালু আছে। সেগুলো হলো অচিন পাখি, বাঁশি, অন্যান্য যন্ত্র (একুস্টিক), গবেষণা, স্বরলিপির কাজ, স্টাফ নোটেশন, আঁকাআঁকি ইত্যাদি। পর্যায়ক্রমে ওই ফাউন্ডেশনে লালনের দর্শন নিয়ে ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় আছি। এ প্রজন্মের গায়ক-গায়িকাদের কথা বলতে গেলে বলতে হয়, এখন শিকারি হিসেবে অনেক চ্যানেল অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। কাজটি প্রথমত ভালো। কিন্তু পরে ওই ধারা টিকে থাকছে না। এর কারণ হচ্ছে অল্পতেই অর্থ হস্তগত করা, ভালোভাবে না শিখেই নাম করার প্রবণতা। এ জন্য দায়ী করবো তাদের মা-বাবাকে। এ কথা এ কারণেই বলছি, অনেক ছেলেমেয়ে একেবারে অর্থহীনভাবে বেড়ে ওঠে। অথচ ওই পরিমাণ জ্ঞান তারা রাখে না। বলা যায়, কেউ কেউ শুধু অর্থের মোহে পড়ে রেওয়াজ করাই ছেড়ে দেয়। সঙ্গীত যে দীর্ঘ পথপরিক্রমায় প্রতিষ্ঠা পায় এ নিয়ম-নীতি ওইসব বাবা-মা তাদের সন্তানদের শেখান না। আর সন্তানরা তো চিরকালই অবুঝ! সবশেষে একটি কথা না বললেই নয়। তা হলো, সঙ্গীত আধ্যাত্মিকতার বিষয়। এটি এতো সহজে ধরা যায় না। অনেক অধ্যবসায় ও অনুশীলন দিয়েই অর্জন করা যায় সুর। আমি বলবো, আগামী প্রজন্মের যারা গান করবে তাদের বেশি করে জ্ঞান অর্জন করতে হবে। প্রতিদিন রেওয়াজ করতে হবে। সর্বোপরি সবার আগে ভালো মানুষ হতে হবে। তবেই গান হয়ে উঠবে প্রকৃত গান।

গোফ গপ্পো

 

সেই প্রস্তর যুগে পাথরের ক্ষুর দিয়ে মানুষের ক্ষৌরি করার প্রচলন শুরু হয়। সম্ভবত তখনই মানুষের মধ্যে গোঁফ নিয়ে ফ্যাশন করার ধারণার গোড়াপত্তন ঘটে। অবশ্য খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ সালে প্রথম গোঁফ রাখার খোঁজ মিলেছে। গোঁফ হলো পুরুষের নাকের নিচে এক চিলতে রোমশরেখা। তা কারো সরু, কারো মোটা, কারো গাঢ়, কারো আবার পাতলা। অথচ ওই এক চিলতে জিনিসই নারী-পুরুষের মধ্যে বিরাট পার্থক্য গড়ে দেয়ার এক মোক্ষম ‘অস্ত্র’! একই সঙ্গে আলাদা ব্যক্তিত্ব প্রকাশেরও অস্ত্র।
গ্রিক Mustak শব্দ থেকে গোঁফের ইংরেজি Moustache শব্দের উৎপত্তি। Mustak অর্থ উপরের ঠোঁট। পুরুষের মুখে ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার পর্যন্ত চুল গজায়। এর মধ্যে গোঁফে থাকে ৬০০টির মতো। গোঁফ গজানো বা কম-বেশি হওয়ার পেছনে যে হরমোনটি ‘দায়ী’ এর নাম টেস্টোস্টেরন। এই গোঁফ মহাশয় আবার বড্ড আলসে। প্রতিদিন গড়ে মোটে ০.০০১৪ ইঞ্চি করে বাড়ে। আর বছরে বাড়ে ৫-৬ ইঞ্চি করে।


আদিকাল থেকেই গোঁফ মানুষের বড় এক আলোচনার বিষয়বস্তু। জনপ্রিয় ছড়াকার সুকুমার রায় তার ‘গোঁফ চুরি’ ছড়ায় তো ঘোষণাই দিয়ে দিয়েছেনÑ

‘গোঁফকে বলে তোমার আমার, গোঁফ কি কারো কেনা?
গোঁফের আমি গোঁফের তুমি, তাই দিয়ে যায় চেনা।’

অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তার ‘গোঁফ এবং ডিম’ প্রবন্ধে গোঁফের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
গোঁফ নিয়ে বাংলায় প্রবাদ-প্রবচনের শেষ নেই। গোঁফ খেজুরে, গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল, গোঁফে তা দেয়া, শিকারি বিড়াল গোঁফে চেনা যায় ইত্যাদি প্রবাদ দৈনন্দিন ঘুরে বেড়ায় আমাদের মুখে। তবে শুধু শিকারি বিড়ালই নয়, গোঁফ দিয়ে চেনা যায় অসংখ্য জনপ্রিয় মানুষকেও। তাদের নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে আশ্চর্য একজোড়া গোঁফ!
যাদের আইকনিক ট্রেডমার্ক গোঁফ তাদের তালিকায় সম্ভবত সবচেয়ে উপরের দিকে থাকবেন স্যার চার্লি চ্যাপলিন ও অ্যাডলফ হিটলার। দু’জনই প্রায় একই রকম অদ্ভুতুড়ে গোঁফধারী ছিলেন। কিন্তু একজন পুরো পৃথিবীতে দিয়েছেন হাসির খোরাক, অন্যজন দিয়েছেন কান্নার উপলক্ষ। জনগণের দৃষ্টি আলাদাভাবে আকর্ষণের জন্য হিটলারের দুর্দান্ত উপায় ছিল তার ওই অদ্ভুত গোঁফের ফ্যাশন। ১৯২৩ সালে নাজি প্রেস সেক্রেটারি ড. সেজুইক অবশ্য হিটলারকে পরামর্শ দিয়েছিলেন একটি স্বাভাবিক গোঁফের ছাঁট লাগাতে। হিটলার উত্তর
দিয়েছিলেন এভাবেÑ ‘আমার গোঁফ নিয়ে একদম ভাবতে হবে না। যদিও এটি এখনো ফ্যাশন হয়নি তবুও এক সময় ঠিকই ফ্যাশন হয়ে দাঁড়াবে!’
গোঁফ থেকে বিচ্ছুরিত আত্মবিশ্বাস!!
রাজা-বাদশাহরা প্রচুর সময় নষ্ট করতেন ওই গোঁফের পেছনে। এছাড়া প্রচুর অর্থও নাকি ঢালতেন। বড় ও বাহারি গোঁফ ছিল শৌর্যের প্রতীক। মোগল বাদশাহদের ছিল শৌখিন গোঁফ। সম্রাট আকবরের গোঁফ ছিল মুগ্ধ হওয়ার মতো। তাছাড়া সুন্দর গোঁফ ছিল টিপু সুলতান, নবাব সিরাজ-উদ-দৌলারও।
বিখ্যাত গুঁফোদের মধ্যে আরো আছেন সালভাদর ডালি, জোসেফ স্টালিন, চে গুয়েভারা প্রমুখ।

 

______________________

লেখা : তিয়াষ ইসতিয়াক
মডেল : নীল
ছবি : শোভন আচার্য্য অম্বু

 

পারফিউম...

 

সুগন্ধি ব্যবহারের প্রচলন সুপ্রাচীনকাল থেকে। মানুষ এক সময় বিভিন্ন সুগন্ধি ফুল আর লতা-পাতার নির্যাস সুগন্ধি হিসেবে ব্যবহার করত। প্রাচীনকাল থেকে সুগন্ধি উদ্ভাবনের ইতিহাস খুঁজলে খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ বছর আগে মেসোপটেমিয়া সভ্যতার এক কেমিস্ট ‘টাপুট্টি’র নাম পাওয়া যায়। তাকে সর্বপ্রথম সুগন্ধি তৈরিকারক হিসেবে ধরা হয়। এরপর সভ্যতা থেকে সভ্যতার হাত ধরে এগিয়েই চলছে সুগন্ধির জয়যাত্রা।
সুগন্ধি এমন একটা অনুষঙ্গ যা মানুষের পঞ্চইন্দ্রিয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ঘ্রাণের সঙ্গে জড়িত। মন খুশিতে ভরিয়ে দিতে পারে একটি ভালো সুগন্ধি। তা এনে দিতে পারে স্নিগ্ধ একটি অনুভব।
আধুনিককালে সুগন্ধির ঊন্মেষস্থল হিসেবে একচ্ছত্র অধিপতি ধরা হয় ইউরোপের ফ্রান্সকে। ওই দেশে এখন পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সুগন্ধি তৈরি হয়ে থাকে। সুগন্ধি উদ্ভাবন ফ্রান্সের শিল্পসত্তার বিকাশ ও অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রতভাবে জড়িত। বিশ্বের নামি-দামি সুগন্ধি প্রস্তুতকারকরা ফ্রান্সের অধিবাসী। ২০০৬ সালে টমটাইকার পরিচালিত ‘পারফিউম : দি স্টোরি অফ অ্যা ম্যার্ডারার’ মুভিটি দেখেনি এমন মানুষ খুব কমই খুঁজে পাওয়া যাবে। এ মুভিটিতে আমরা খুঁজে পাই পাগলপ্রায় ঠা-া মাথার এক খুনির সুগন্ধি
উদ্ভাবনের শিহরিত পথচলা।


এ প্রসঙ্গে একটি কথা না বললেই নয়, একটা সময় ছিল যখন সুগন্ধির ব্যবহার শুধু সমাজের অভিজাত শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সুগন্ধি ছিল শুধু বিলাসিতার অঙ্গ। এর পেছনে কারণও ছিল। আগে সুগন্ধি তৈরির নির্যাস ও কাঁচামাল ছিল দুর্লভ এবং অনেক দামি। এর মানে বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এখন কৃত্রিম উপায়েই এসব কাঁচামাল ও নির্যাস উৎপাদিত হচ্ছে। ফলে সুগন্ধি তৈরি ও এর ব্যবহার এখন অনেকটাই সহজলভ্য। তাই সুগন্ধির ব্যবহার এখন শুধু বিলাসিতার অংশ নয়, বরং সব বয়সের মানুষের কাছে ফ্যাশনের অন্যতম অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে ব্যবহৃত নিত্যনতুন সুগন্ধি তৈরির ফর্মুলা ও উপকরণ সুগন্ধি ব্যবহারের আবেদনটি বাড়িয়ে তুলেছে সবার মধ্যে।
আমাদের দেশের আবহাওয়া নাতিশীতাষ্ণ হলেও গরমের প্রভাব বেশি। গরমে ঘাম হবেÑ এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু সুগন্ধি শুধু যে ঘামের দুর্গন্ধ এড়াতেই কাজ করে তা নয়, বরং এর পরশে আমরা হয়ে উঠতে পারি আরো সতেজ ও প্রাণবন্ত।
এ দেশে নব্বইয়ের দশকের শেষের দিক থেকে বিকশিত হয়েছে সুগন্ধির বাণিজ্য। এর আগে এ দেশের বিশ্বখ্যাত সব ব্র্যান্ডের ভালো ভালো সুগন্ধি তেমন সহজলভ্য ছিল না। অনেকেই তাদের প্রিয় সুগন্ধিগুলো বিদেশ থেকে কিনে নিয়ে আসতেন। কিন্তু এখন আমাদের দেশেই নারী-পুরুষের জন্য আছে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সুগন্ধি।
পুরুষের প্রিয় কিছু সুগন্ধির মধ্যে আছে লাকস্ত রেড, হুগো বস, বারবেরি, আজারো, আরমানি ইত্যাদি। অন্যদিকে নারীদের জন্য আছে গুচি, বুশেরন, স্যানেল, ডলসি গাবানা, এস্কাডা ইত্যাদি। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সুগন্ধি পাওয়া যায় ‘পারফিউম ওয়ার্ল্ড’-এর
আউটলেটগুলোয়।

 

_____________________
লেখা : সোনাম চৌধুরী
মডেল : রিবা হাসান
ছবি : কৌশিক ইকবাল

কিউট ইন কুর্তি

 

ফ্যাশন পরিবর্তন হচ্ছে প্রতিনিয়ত। আর এই পরিবর্তনের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বৈচিত্র্যময় ডিজাইনের পোশাক। তবে ফ্যাশনের কথা আসলেই একটা বড় অংশ জুড়ে থাকে মেয়েদের পোশাকের কথা। নিত্যনতুন ডিজাইনের পোশাকের মাধ্যমে নিজেকে আলাদা ও ব্যতিক্রমী হয়ে ওঠার চেষ্টায় ছুটছে সবাই শপিংমলগুলোতে, কিনছে মনের মতো প্রিয় পোশাক। সব শ্রেণীর মেয়েদের কাছেই সালোয়ার কামিজ বেশ জনপ্রিয়। নারীরা সেলোয়ার কামিজে অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দবোধ করে। উপরি পাওনা হিসেবে জাকজমকপূর্ণ সালোয়ার কামিজে একটি নারী হয়ে ওঠে আরও আকর্ষণীয়। শুধু উৎসবেই নয় যে কোন অনুষ্ঠানে সালোয়ার কামিজ পরে নিজেকে অতুলনীয় করে তোলা যায়। সুতরাং নিজেকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে চলুন বেঁছে নিই পছন্দের সালোয়ার কামিজ। বর্তমান ট্রেন্ড-এ সেলোয়র কামিজের ডিজাইন নিয়ে আমাদের কথা হয়েছিল ‘ক্ষনিকা’র স্বত্ত্বাধিকারী ডিজাইনার মারিয়ান ফয়সালের সাথে।

মেরুন সিল্ক
সিল্কের এই কুর্তিতে রয়েছে একটু বড় চড়ষশধ উড়ঃ এর প্রিন্ট। বল গুলোর উপরে করা স্টোন ওয়ার্ক পোশাকটিতে এনেছে পার্টি আমেজ। ভিন্নতা আনতে কালো ছাড়াও এর সাথে গোল্ডেন কালারের দোপাট্টা ও স্যাটিনের পালাজ্জো ভাল লাগবে।

হলুদ
নজর কাড়া হলুদ এই কুর্তি আপনাকে অফিস কিংবা বন্ধুদের আড্ডায় করবে স্বপ্রতিভ। ফুলস্লিভ হাতা, কর্ড পাইপিং আর ব্যান্ড কলারের সমন্বয়ে লিনেন এই কুর্তির নিচের অংশের বাম পার্শ্বে রয়েছে সাদা এমব্রয়ডারি। সাথে পরতে পারেন অফ হোয়াইট বা সাদা রঙের সেলোয়ার।

 

 

লাল
লাল মানেই মন ভাল করে দেওয়া উজ্জ্বলতা তা সে হোক ‘লাল গোলাপ’ অথবা লাল জামা। ইউনির্ভাসিটি কিংবা অফিস ও সান্ধ্যকালীন আড্ডায় যে কোন ঈড়সঢ়ষবীরড়হ-এর মেয়েকে মানিয়ে যাবে। কাফতান গলা, ফোর কোয়ার্টার হাতার চড়ষশধ উড়ঃ এর লিনেন এই কুর্তিতে রয়েছে ব্ল্যাক এমব্রয়ডারি। সাথে পরতে পারেন গাঢ় নীল বা সাদা পালাজ্জো।

সাদা
যেকোন দাওয়াতের অনুষ্ঠানে সাদা এই কুর্তি আপনার লুক-এ এনে দেবে জৌলুস। কাফতান গলা, লেস আর বাটনের কম্বিনেশনে এই কুর্তিটির গর্জিয়াস উপস্থাপন। সাথে পরতে পারেন বেইজ কালার পালাজ্জো ও দোপাট্টা।

বেগুনী
মেঘলা দিনের একঘেঁয়েমি ও উঁষষহবংং কাটাতে উজ্জ্বল বেগুনী এই কুর্তিটি পড়ে নিমিষেই নিজেকে চনমনে ও আকর্ষনীয় ভাবে উপস্থাপন করতে পারেন। মডেলের পরনে যে কুর্তিটি রয়েছে তা লিনেন কাপড়ের উপর ঈড়ৎফ পাইপিং দিয়ে করা। ইধহফ কলার আর ফুলস্লিভ হাতায় এই কুর্তির প্রধান আকর্ষন গাঢ় বেগুনীর উপর হালকা বেগুনী রঙের এমব্রয়ডারি যা অফিসে কিংবা বন্ধুদের আড্ডায় আপনার উপস্থিতি উজ্জ্বল করবে। কুর্তির সাথে পরতে পারেন বেগুনী অথবা সাদা রঙের শেডেড দোপাট্টা ও সালোয়ার।

ফ্লোরাল প্রিন্ট
ফ্লোরাল প্রিন্টেড এই কুর্তিতে লেস বসিয়ে আনা হয়েছে গর্জিয়াস লুক। যা সহজেই বিভিন্ন গেট টুগেদারে পরে যেতে পারেন। সাথে পরতে পারেন ডেনিম অথবা টাইটস্।

 

____________________________________

লেখা : ফারহাতুল জান্নাত
মডেল : মহতী তাপসী ও সায়মা রুসা
পোশাক : ক্ষনিকা
মেকওভার : ক্লিওপেট্রা বিউটি স্যালন
ছবি : শোভন আচার্য্য অম্বু
সহজ স্টুডিও
কৃতজ্ঞতা : মারিয়ান ফয়সাল

 

Page 3 of 8

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…