Page 4 of 8

বসনে বৈশাখ

 

 

গনগনে গরমে হঠাৎ দমকা হাওয়া, এলোমেলো বৃষ্টি, সুতির শাড়িতে বৃষ্টি ফোঁটার জলকেলি, কিশোর-কিশোরীর আম কুড়ানোর উদ্দামতা, বৃষ্টিতে মনের অবগাহনে বৈশাখ যেন এভাবেই ধরা দেয় আমাদের কাছে।
ফ্যাশন সচেতন বাঙালি সারা বছর নানান পূজা-পার্বণে ভিন্ন ডিজাইন ও কাপড়ে নিজেকে রাঙিয়ে নিলেও বৈশাখ মাসে যেন সুতিকাপড় ছাড়া অন্য কিছু ভাবতেই পারেন না।
তাপদাহের মধ্যে সুতির চেয়ে আরামদায়ক বসন আর হয় না। পহেলা বৈশাখ যেমন প্রাণের উৎসব ঠিক তেমনিভাবেই লাল ও সাদা রঙটি বৈশাখ
উদযাপনের জন্য বেছে নিয়েছেন উৎসবপ্রিয় বাঙালি। তাই বাংলা ও বাঙালির জন্য বৈশাখের চিরায়ত রঙ লাল ও সাদা।
ছোট্ট ছেলেটি যেমন লাল-সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে বাবার কোলে চড়ে মেলা দেখতে যায় তেমনি লাল চুড়ি ছাড়া মা ও মেয়ের বৈশাখী উৎসব অপূর্ণ রয়ে যায়।
চৈত্র মাসের বিদায় দেয়ার মাধ্যমে বাঙালি প্রস্তুত নতুন সনে বৈশাখ মাস বরণ করে নিতে। তাই রুদ্ররূপী চৈত্র ভুলিয়ে কালবৈশাখী আপন করে নিতে বাঙালি খুলে বসেন হালখাতা। একটি বছরের নানান সাফল্য, কিছু ব্যর্থতা আর প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির মেলবন্ধনে সাড়ম্ব^ড়ে পালিত হয় পহেলা বৈশাখ। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রমনার বটমূলে ছায়ানটের ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো গানটি’ আমাদের বৈশাখ বরণের আয়োজনটি বরাবরই পূর্ণ করে। বৈশাখী মেলা, পিঠা উৎসব, নৃত্য, গান, পুতুলনাচÑ এসব কিছুই যেন বৈশাখটি প্রতি বছরই আবারও নতুনভাবে উপস্থাপন করে। চারদিকে বাঁধভাঙা জোয়ার ও কোলাহল, আনন্দিত কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে নবীন-প্রবীণের মিলিত উল্লাসে শহর এবং গ্রামে বাংলায় হয় বৈশাখ উদযাপন। এ উৎসব চিরায়ত ও জাতীয়। সাধ্যমতো প্রতিটি পরিবার আয়োজন করে পান্তা-ইলিশ, নানান ভর্তা, পায়েস, পিঠা-পুলি ইত্যাদি।

এ তো গেল সর্বজনীন বৈশাখী উৎসব উদযাপনের ভূমিকা মাত্র। আমাদের আজকের বসনে বৈশাখ অপূর্ণ রয়ে যাবে যদি এতে বাঙালির বৈশাখী ফ্যাশন নিয়ে দু’কলম না লেখা হয়। বৈশাখের সঙ্গে আসে প্রচ- গরম। তাই বলে কী আর থেমে থাকবে সাজসজ্জা! বৈশাখজুড়ে বাঙালির আধুনিক সাজসজ্জা ও পোশাকে প্রতিফলিত হয় বাঙালিয়ানা। তপ্ত গরমে চিরায়ত সুতি কিংবা খাদি, একরঙা চিকন পাড়ের শাড়ির সঙ্গেও ব্লক ও বাটিক শাড়ি এখন জনপ্রিয়। লাল ও সাদা ছাড়াও ফ্যাশনে এসেছে হালকা রঙের সঙ্গে উজ্জ্বল রঙের মেলবন্ধন। একই সঙ্গে পরতে পারেন সিøভলেস ব্লাউজ কিংবা বাটিক ব্লাউজ। কানে পরতে পারেন হালকা টপ। তবে উৎসবে ঝুমকাও বেশ মানানসই। গলায় পরতে পারেন লকেট, মাটি কিংবা মেটাল ধরনের গয়না, পায়ে নূপুর, হাতে বিভিন্নরঙা চুড়ি, বালা ও ব্রেসলেট। টিপটাই বা কেন বাদ যাবে! পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে কপালে এঁকে নিতে পারেন টিপ। বাজারে নানান টিপ কিনতে পাওয়া যায়। সেখান থেকেও বেছে নিতে পারেন পছন্দের টিপ। পোশাকের সঙ্গে চুলের স্টাইল অনিবার্য। গরমে অনেকেই সামার লুকের জন্য বেছে নেন ছোট চুলের স্টাইল। আবার লম্বা চুলের মেয়েদের অনেকেই হাতখোঁপা, এর উপর গাঁদা কিংবা বেলি ফুলের সজ্জায় বেশ সাবলীল থাকেন। অন্যদিকে অনেকে এলোচুলেই স্বকীয়।
আধুনিক বাঙালির বৈশাখী ফ্যাশন মানে কিশোরী থেকে নারীÑ সবাই শাড়ি ছাড়াও সুতির আরামদায়ক বিভিন্ন ডিজাইন ও কাটের সালোয়ার-কামিজ, ফতুয়া, ম্যাক্সিড্রেস, লং স্কার্ট, ম্যাগিহাতা টপসে নিজেকে সাজিয়ে নেন।
ছেলেরা গরমে খোঁজেন আরাম। তাই তাদের ফ্যাশনজুড়ে থাকে টিশার্ট, হাফহাতা শার্ট, বারমুডা, সুতি পায়জামা-পাঞ্জাবি ও লুঙ্গি। নারী ও পুরুষÑ উভয়েই পায়ে পরেন কোলাপুরি চপ্পল কিংবা ফ্ল্যাট স্যান্ডেল আর চোখে বিভিন্ন ডিজাইনের সানগ্লাস।

বিগত বছরের দুঃখ, কষ্ট, ক্লেশ ভুলে চলুন এবারও নবআশায় সম্ভাষণ করি বৈশাখ মাসের। উৎসব আয়োজনে যেন নিজের আনন্দ উদযাপনে অন্যের কষ্টের কারণ না হই। অপরের প্রতি হই আরো সহনশীল।

‘মুছে যাক গ্লানি
ঘুচে যাক জরা
অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’

বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ধরে রাখার দায়িত্ব প্রত্যেক বাঙালির। এই বৈশাখে চলুন আরেকবার অঙ্গীকারবদ্ধ হই। বিভেদ ভুলে এক হয়ে যাই। এই বৈশাখে আমাদের সব আয়োজন হোক সফল ও নিরাপদ। এভাবেই জেগে উঠুক পোশাকে বাঙালিয়ানা, আপনরূপে উদযাপিত হোক বসনে বৈশাখ। সবাইকে শুভ নববর্ষ।

 

আয়োজনে : স্বাক্ষর ও বর্ণ

ছবি : কৌশিক ইকবাল

পোশাক : লা রিভ

মডেল : তৌসিফ ও নাজমি

লেখা : ফারহাতুল জান্নাত

 

বৈশাখে লোকজ মেলা ও তারুণ্য

অঞ্জন আচার্য

 

 

পহেলা বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম দিন, তথা বাংলা নববর্ষ। দিনটি বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিশেষ উৎসবের সাথে পালিত হয় নববর্ষ হিসেবে। এছাড়া এ উৎসবে অংশ নেয় ত্রিপুরায় বসবাসরত বাঙালিরাও। সে হিসেবে এটি বাঙালিদের একটি সর্বজনীন উৎসব। সারা বিশ্বের বাঙালিরা এ দিনে বরণ করে নেয় নতুন বছরকে, ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করে অতীত বছরের যাবতীয় দুঃখ-গ্লানি। সবার কামনা থাকে নতুন বছরটি যেন হয় সমৃদ্ধ ও সুখময়। অন্যদিকে নতুনভাবে ব্যবসা শুরু করার উপলক্ষ্য হিসেবে এ দিনটিকে বরণ করে বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা। গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি অনুসারে ১৪ এপ্রিল পালিত হয় এ পহেলা বৈশাখ। আধুনিক বা প্রাচীন যেকোনো পঞ্জিকাতেই মিল রয়েছে এই বিষয়ে। বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৪ এপ্রিল এই উৎসব পালিত হয়। বাংলা একাডেমি নির্ধারিত আধুনিক পঞ্জিকা অনুসারে নির্দিষ্ট করা হয়েছে এই দিন।
অনেক আগে থেকেই বাংলা বারো মাস পালিত হতো হিন্দু সৌর পঞ্জিকা অনুসারে। গ্রেগরীয় পঞ্জিকায় এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু হতো এই সৌর পঞ্জিকার। হিন্দু সৌর বছরের প্রথম দিন আসাম, বঙ্গ, কেরলা, মনিপুর, নেপাল, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, তামিলনাড়– এবং ত্রিপুরার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বহুদিন থেকেই পালিত হতো। এখন যেমন নববর্ষ নতুন বছরের সূচনার নিমিত্তে পালিত একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে, একসময় এমনটি ছিল না। তখন নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ পালিত হতো আর্তব উৎসব তথা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে। তখন এর মূল তাৎপর্য ছিল কৃষিকাজ। প্রযুক্তির যুগ শুরু না হওয়ায় ঋতুর ওপরই নির্ভর করতে হতো কৃষকদের।
ভারতবর্ষে মোঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় করত হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সাথে মিলত না। এতে অসময়ে কৃষকদেরকে বাধ্য করানো হতো খাজনা পরিশোধ করতে। তবে খাজনা আদায়ে সুষ্ঠুতা প্রণয়নের লক্ষ্যে মোঘল সম্রাট আকবর প্রবর্তন করেন বাংলা সনের। তিনি মূলত আদেশ দেন প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনার। সম্রাটের আদেশ মতে সৌর সন এবং আরবি হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম বিনির্মাণ করেন তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহ উল্লাহ সিরাজি। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চ বা ১১ মার্চ থেকে শুরু হয় বাংলা সন গণনা। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় (৫ই নভেম্বর, ১৫৫৬) থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন। পরে তা পরিচিত হয় বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে। আকবরের সময় থেকেই শুরু হয় পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন। তখন প্রত্যেককে চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে পরিশোধ করতে হতো সকল খাজনা, মাশুল ও শুল্ক। এরপর দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে আপ্যায়ন করাতেন মিষ্টান্ন দিয়ে। এ উপলক্ষ্যে আয়োজন করা হতো বিভিন্ন উৎসবের। একসময় এই

 

 

লোকজ সংস্কৃতি : আড়ম্বরপূর্ণ উৎসবের মধ্য দিয়ে এদেশে উদ্যাপন করা হয় পহেলা বৈশাখ। নতুন বছরের এ উৎসবের সঙ্গে রয়েছে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কৃষ্টি ও সংস্কৃতির নিবিড় সম্পর্ক। গ্রামগঞ্জের মানুষ ভোরে ঘুম থেকে ওঠে। নতুন জামাকাপড় পরে বেড়াতে যায় আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের বাড়িতে। পরিষ্কার করা হয় ঘরবাড়ি-আঙিনা, সাজানো হয় মোটমুটি সুন্দর করে। সেই সঙ্গে থাকে বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা। কয়েকটি গ্রামের মিলিত স্থানের খোলা মাঠে আয়োজন করা হয় বৈশাখী মেলার। আবহমান বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য এ মেলা৷ কেবল বাংলাদেশেই বৈশাখের প্রথম সপ্তাহে অন্তত দুই শতাধিক বৈশাখী মেলার আয়োজন বসে৷ সেখানে নানা স্বাদের মুড়ি-মুড়কি আর পিঠাপুলি তো রয়েছেই, সেই আদিকাল থেকে জনপ্রিয় পুতুলনাচের আসরও এই মেলার অন্যতম আকর্ষণ৷ আর নাগরদোলায় হাওয়ায় ভেসে নববর্ষের নতুন মুহূর্তগুলোকে উপভোগ করার অনুভূতি যেন একেবারেই ভিন্ন৷ এছাড়া রয়েছে হরেক রকমের কুটিরশিল্প আর হস্তশিল্পের বাহারি প্রদর্শনী৷ দেখা মেলে বাংলার ঐতিহ্য মাটির তৈরি বিভিন্ন পণ্যেরও৷ অনেক জায়গায় ব্যবস্থা থাকে ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়ার আয়োজন। এই দিনের একটি পুরনো সংস্কৃতি হলো গ্রামীণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। এর মধ্যে নৌকাবাইচ, লাঠি খেলা ও কুস্তি উল্লেযোগ্য। এদেশে এরকম কুস্তির সবচেয়ে বড় আসরটি বসে ১২ বৈশাখ, চট্টগ্রামের লালদিঘী ময়দানে। এটি জব্বারের বলি খেলা নামে বিশেষভাবে পরিচিত। বৈশাখে এসব মেলা হয়ে থাকলেও মেলাগুলো বর্ষবরণ মেলা, নববর্ষের মেলা, বান্নি মেলা আবার কোথাও এলাকার নামে, ব্যক্তি বা অন্যান্য নামে পরিচিতি পেয়ে থাকে। যার অন্যতম দৃষ্টান্ত এ আবদুল জব্বারের বলি খেলাটি। এছাড়া বর্ষবরণ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে মেলা হয়ে থাকে বৈশাখের প্রথম দিন চট্টগ্রাম নগরীর ডিসি হিল, সিআরবির শিরিষ তলা চত্ত্বরসহ বিভিন্ন স্থানে। চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত এসব মেলায় হা-ডু-ডু, কুস্তি লড়াই, লাঠিয়াল নাচ, পুতুল নাচ, সার্কাস, মোরগ লড়াই, ঘুড়ি ওড়ানো, ষাঁড়ের লড়াইসহ থাকে মজার মজার আয়োজন। একসময় এসব মেলায় জনপ্রিয় অনুষঙ্গ ছিল বায়োস্কোপ বাক্স। কিন্তু এখন এটি আর দেখা যায় না। তবে অনেক জায়গায় আয়োজন করা হয় পুতুল নাচ, সার্কাসের। এদিকে ঈশা খাঁর সোনারগাঁওয়ে বসে এক ব্যতিক্রমী মেলা, যার নাম বউমেলা। জয়রামপুর গ্রামের মানুষের ধারণা, প্রায় ১০০ বছর ধরে পহেলা বৈশাখে আয়োজিত হয়ে আসছে এ মেলাটি। পাঁচ দিনব্যাপী এই মেলাটি বসে প্রাচীন একটি বটগাছের নিচে। যদিও হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা সেখানে সমবেত হয় সিদ্ধেশ্বরী দেবীর পূজা উপলক্ষ্যে। বিশেষ করে কুমারী, নববধূ, এমনকি জননীরা পর্যন্ত তাঁদের মনষ্কামনা পূরণের আশায় এই মেলায় এসে পূজা-অর্চনা করে থাকেন। মিষ্টি ও ধান-দূর্বার সঙ্গে মৌসুমী ফল নিবেদন করেন ভক্তরা। এছাড়া মেলাকে ঘিরে পাঁঠাবলির রেওয়াজও বেশ পুরনো। তবে কালের বিবর্তনে বদলে যাচ্ছে পুরনো অর্চনার পালা। এখন ভক্তরা কবুতর উড়িয়ে শান্তির বার্তা প্রার্থনা করেন দেবীর কাছে। অন্যদিকে সোনারগাঁ থানার পেরাব গ্রামের পাশে আয়োজন করা হয় আরেকটি মেলার, যার নাম ঘোড়ামেলা। লোকমুখে প্রচলিত আছে, যামিনী সাধক নামের এক ব্যক্তি ঘোড়ায় চড়ে নববর্ষের এই দিনে সবাইকে প্রসাদ দিতেন।

তাঁর মৃত্যুর পর ওই জায়গাতেই বানানো হয় সাধকের স্মৃতিস্তম্ভ। প্রতি বছর পহেলা বৈশাখে স্মৃতিস্তম্ভে হিন্দুরা একটি করে মাটির ঘোড়া রাখে এবং সেখানে আয়োজন করে মেলার। যার কারণে মেলাটির নাম ঘোড়ামেলা। এ মেলার অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে নৌকায় খিচুড়ি রান্না করা। এরপর সেই খিচুড়ি কলাপাতায় করে খায় আবালবৃদ্ধবনিতা সবাই। সকাল থেকেই মেলাকে ঘিরে ঘটতে থাকে নানা বয়সী মানুষের সমাগম। একদিনের এ মেলাটি জমে ওঠে মূলত দুপুরের পর থেকে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পূজা উপলক্ষ্যে এ মেলার আয়োজন করা হলেও এতে প্রাধান্য থাকে সব ধর্মের মানুষেরই। মেলায় সবচেয়ে বেশি ভিড় লক্ষ করা যায় শিশু-কিশোরদের। মেলাতে বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে রাখা হয় নাগরদোলা, পুতুলনাচ ও সার্কাসের। এছাড়া মেলার ক্লান্তি দূর করতে যোগ হয় কীর্তন গান। খোল-করতাল বাজিয়ে এ কীর্তন গানের আসর চলে মধ্যরাত পর্যন্ত। অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলায় বসবাসরত আদিবাসীদের মধ্যে চলে বর্ষবরণের নানা আয়োজন। সে অঞ্চলের প্রধান তিনটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর রয়েছে স্বতন্ত্র বর্ষবরণ উৎসব। এ উৎসবটি ত্রিপুরাদের কাছে বৈসুক, বৈসু বা বাইসু, মারমাদের কাছে সাংগ্রাই ও চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যাদের বিজু নামে পরিচিত। বর্তমানে এ তিন জাতিগোষ্ঠী একত্রে উৎসবটি পালন করে থাকে। উৎসবের নামের আদ্যাক্ষর দিয়ে যার যৌথ নামকরণ করা হয়েছে ‘বৈসাবি’। এ উৎসবের রয়েছে নানা দিক। ত্রিপুরা সম্প্রদায় শিবপূজা ও শিবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনার মধ্য দিয়ে পালন করেন ‘বৈসুক’ বা ‘বৈসু’ উৎসব। এছাড়া মারমাদের ‘সাংগ্রাই’ উৎসব চলে তিন দিনব্যাপী। উৎসবে মারমাদের সবাই গৌতম বুদ্ধের ছবি নিয়ে নদীর তীরে যান এবং দুধ বা চন্দন কাঠের জল দিয়ে স্নান করান সেটিকে। এরপর আবার ওই ছবিটিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় আগের জায়গায় অর্থাৎ মন্দির বা বাসাবাড়িতে। আদিকাল থেকে অন্যান্য সম্প্রদায় থেকে ভিন্ন আঙ্গিকে পুরনো বছরকে বিদায় এবং নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে এ সাংগ্রাই উৎসব পালন করে আসছে মারমারা। ধারণা করা হয়, ‘সাক্রাই’ মানে সাল শব্দ থেকে ‘সাংগ্রাই’ শব্দটি এসেছে, বাংলায় যা ‘সংক্রান্তি’ নামে পরিচিত। মারমারা ‘সাংগ্রাই জ্যা’র অর্থাৎ মারমা বর্ষপঞ্জি তৈরি মধ্য দিয়ে সাংগ্রাইয়ের দিন ঠিক করে থাকে। 

 

 

১৩৫৯ খ্রিস্টাব্দের আগে থেকেই এ ‘সাক্রাই’ বা সাল গণনা করা হয়, যা ‘জ্যা সাক্রই’ নামে পরিচিত। অন্যদিকে চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যারা উৎসবটি পালন করে চৈত্রের শেষ দুই দিন ও বৈশাখের প্রথম দিন মিলিয়ে মোট তিন দিন ধরে। এর মধ্যে চৈত্রের শেষ দিনটিতে থাকে এ উৎসবের মূল আকর্ষণ। ওই দিন প্রত্যেকের ঘরে পাঁচ প্রকারের সবজি দিয়ে বিশেষ একপ্রকার খাবার রান্না করা হয়। তাদের বিশ্বাস, এই পাঁচনের দৈব গুণাবলী আছে, যা আসছে বছরের সকল রোগবালাই ও দুঃখ-দুর্দশা দূর করে থাকে। এছাড়া এদিন বিকেলে ঐতিহ্যবাহী ঘিলা, বৌচি ইত্যাদি খেলারও আয়োজন করা হয়। কিশোরী-তরুণীরা নদীর জলে ফুল ভাসায়। তিন দিনের এ উৎসবে ওই সম্প্রদায়ের কেউ কোনো জীবিত প্রাণী হত্যা করে না। ‘বৈসাবি’ উৎসবের মূল আয়োজন হলো জলখেলা। উৎসবটি পার্বত্য অঞ্চলে কমবেশি সবার কাছেই জনপ্রিয়। উৎসবে আদিবাসীরা সবাই সবার দিকে জল ছুঁড়ে আনন্দে মাতেন। তাদের মতে, এ জলের মধ্য দিয়ে ধুয়ে যায় বিগত বছরের সকল দুঃখ, পাপ। জলখেলার আগে অনুষ্ঠিত হয় জলপূজা। মারমা যুবকরা এ উৎসবে তাদের পছন্দের মানুষটির গায়ে জল ছিটিয়ে সবার সামনে প্রকাশ করে তাদের ভালোবাসার কথা। এর মধ্য দিয়ে আন্তরিক হয় পরস্পরের সম্পর্কের বন্ধন। তারুণ্যের মেলা : বৈশাখ মানেই বাঙালির উৎসবমুখর একটা দিন। বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব বৈশাখের প্রথম দিনটি। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি নির্বিশেষে সকলেই অংশ নেয় বৈশাখী আয়োজনে। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় ঋদ্ধ এই দিনটিকে বাঙালিরা বরণ করে নেয় অতীত বছরের সব দুঃখ-গ্লানি ভুলে। নতুন বছরটি যেন সুন্দর, সুখময় ও সমৃদ্ধ হয় এই কামনাই থাকে সবার মনে ও প্রাণে। প্রতিবারই এই সর্বজনীন উৎসবটি ভরে ওঠে তারুণ্যের উচ্ছাসে। উৎসবকে ঘিরে প্রস্তুতিরও কমতি থাকে না তরুণদের মধ্যে। রঙিন পোশাকে তরুণ-তরুণীরা হাঁটে আনন্দ-উচ্ছাসে। অস্থায়ী দোকানগুলোতে পসরা সাজানো হয় বাহারি খাবার। থাকে পান্তা-ইলিশ খাওয়া ধূম। বাঙালির ঐতিহ্যের সাথে মিশে গেছে নববর্ষে ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা ভাত। শহুরে জীবনে পান্তা-ইলিশ ছাড়া যেন নববর্ষ অপূর্ণ থেকে যায়। রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ ও মঙ্গল শোভাযাত্রার মধ্য দিয়েই বর্ষবরণ উদযাপন শুরু হয়। ছায়ানটের শিল্পীরা সম্মিলিত কণ্ঠে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে গেয়ে ওঠে রবি ঠাকুরের ‘এসো হে বৈশাখ’ গানটি। এ গানের মধ্য দিয়ে বরণ করে নেয়া হয় নতুন বর্ষকে। কণ্ঠশিল্পীদের অধিকাংশই থাকে তরুণ প্রজন্মের। অন্যদিকে বৈশাখী বা নববর্ষ উৎসবের আবশ্যিক একটি অংশ হচ্ছে মঙ্গল শোভাযাত্রা। ১৯৮৯ সাল থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা পহেলা বৈশাখের অন্যতম একটি আকর্ষণ। এটাও তরুণদের একটি অন্যতম বৈশাখী সংযোজন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে যাত্রা শুরু করে এর। পায়ে পা মেলায় লাখো মানুষ। শোভাযাত্রায় ফুটিয়ে তোলা হয় আবহমান গ্রামবাংলা ও জীবনের ছবি। এ মঙ্গল শোভাযাত্রায় স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করে বিভিন্ন রংবেরঙের মুখোশ পরে তরুণরা। ঢাক-ঢোলের আওয়াজ আর বৈশাখী নানা গানের আয়োজনে এ দিনটি হয়ে ওঠে আরও উৎসবমুখর। মূলত রমনা বটমূল এই উৎসবের কেন্দ্রস্থল। এসব অনুষ্ঠানে তুলে ধরা হয় বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে। এছাড়া বৈশাখ উপলক্ষে প্রতি বছরই মোবাইল কোম্পানিগুলো নিয়ে আসে তরুণদের জন্য হরেক রকম অফার। আর এ অফারগুলোর সঙ্গে নানা রকম উপহার সামগ্রী তো থাকেই। কী গ্রাম কী শহর সব জায়গাতেই সৃষ্টি হয় প্রাণচাঞ্চল্য। আনন্দে মাতে পুরো দেশের তারুণ্য। পহেলা বৈশাখের বেশ কিছু দিন বাকি থাকতেই শুরু হয় এর প্রস্তুতি। বৈশাখ মানে লাল-সাদার মিশেল। বৈশাখ শুধু লালকে ধারণ করে না; বরং পুরো বিশ্বের কাছে আমাদের রঙিন হওয়ার ঐশ্বর্যকে প্রথম মাত্রা দেয়। তাই বহুকাল ধরেই লাল-সাদার ধারাবাহিকতায় এই বৈশাখেও তরুণদের দিনটি হয়ে ওঠে লালের সম্ভাবনায় উজ্জ্বল, লালের ঐশ্বর্যে সুখময় আর লালের দীপ্তিতে রঙিন। ভোরের আলো ফুটতেই তরুণদের শুরু হয় সাজসজ্জা। আর বৈশাখ এলেই গায়ে ওঠে পাটভাঙা তাঁতের শাড়ি। লাল ও সাদা তো থাকেই, সঙ্গে থাকে বাহারি রং। কিংবা অন্য কোনো রঙের শাড়িতে সেজে কপালের টিপ আর হাতের চুড়িটা পরে লাল। অথবা শাড়িতে চাই কোনো বাঙালি মোটিফ। বৈশাখকে ঘিরে তরুণদের চাহিদার থাকে পাঞ্জাবি, ফতুয়া, বৈশাখী শার্ট, গামছাসহ কিছু নতুন ও ব্যতিক্রমী প্রসাধনী সামগ্রী। ফতুয়ায় বাঙালির ঐতিহ্যবাহী ঢোল, একতারার ডিজাইনগুলো কিছুটা ব্যতিক্রম ও নজরকাড়া। আর সেদিকেই ঝুঁকে অধিকাংশ ফ্যাশন-সচেতন তরুণ প্রজন্ম। পহেলা বৈশাখকে আনন্দময় করে গড়ে তুলতে থাকে বৈচিত্র্যময় আয়োজন। ‘এসো এসো এসো হে নবীন, এসো এসো হে বৈশাখ এসো আলো, এসো হে প্রাণ ডাক কাল বৈশাখীর ডাক।’ তারুণ্যের প্রতি সুকান্তের এ আহ্বানই বৈশাখকে করে তোলে আরও বেশি তরুণ। প্রতি বছরেই বৈশাখ আসে নতুন রূপে নতুন সুরে নতুনের আহ্বানে। ‘মুছে যাক গ্লানি ঘুচে যাক জরা, অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা। এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ জীর্ণতাকে পেছনে ফেলে নতুনের পথে এগিয়ে চলার গানটি

বৈশাখের প্রথম দিনটিতে তরুণদের মুখে মুখে ফেরে। সূর্য একটু তাতিয়ে উঠলে তরুণেরা গেয়ে ওঠে ফিডব্যাকের ‘মেলা যাইরে’। বছরের সারাটা সময়ে এ আয়োজনে মেতে ওঠার অপেক্ষায় থাকে তরুণরা। আবার অনেকে বৈশাখ আসার আগেই বিভিন্ন হিসাব-নিকাশ করে রাখে বৈশাখের দিনটা কীভাবে কাটাবে ভেবে। ঢাকা কলেজের গণিত বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র অমিতের কাছে বৈশাখের প্রথম দিনটা সবসময়ই অন্যান্য দিনগুলোর চেয়ে আলাদা। এই দিনটাকে নিয়ে সবসময়ই থাকে তার আলাদা পরিকল্পনা। এ ক্ষেত্রে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়াটা প্রাধান্য পায় সবার আগে। এর সাথে যোগ হয় দিনব্যাপী ঘোরাঘুরি। আর খাওয়া-দাওয়া? সেটার কথা তো হিসাবের বাইরে। কোথায় কী খাওয়া হবে, তার নেই ঠিক। একই বিভাগের খায়রুলের দিনটা কাটে আর সবার মতোই। দারুণ আনন্দ নিয়ে সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে বন্ধুদের সাথে বেরিয়ে পড়ে সে। গন্তব্য রমনার বটমূল। তারপর রমনাতে গিয়ে সবাই মিলে পান্তা-ইলিশ খাওয়াটা তো এখন একটা রেওয়াজ। সুতরাং তার পান্তা ইলিশ চাই-ই চাই। আর মেলায় ঘোরাঘুরি ছাড়া পহেলা বৈশাখ জমেই না। তাই রোদে পুড়ে, ঘামে ভিজে বৈশাখ উপভোগ করেন শ্রাবন্তী। এদিকে ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির বিবিএ-এর শিক্ষার্থী ফারিয়া, অনিষা, নাফিম, মোনা, মৌ কথায় ওঠে আসে দিনটি উদ্্যাপনের বিবরণ। তাদের কথা, ওই দিনটি কেবলই নিজেদের মতো করে পালন করার দিন। ওই দিন আত্মীয়দের বাড়িতে যাওয়া হয়ে উঠে না কারো। তাই এ দিনটাকে বেড়ানোর কাজেই সারাদিন কাটায় ওরা। ফারিয়ার কথা, বৈশাখের প্রথমদিনে সকালে গোসল সেরে নতুন শাড়ি পরে মোটামুটি কাছের সব আত্মীয়-স্বজনদের বাসায় অল্প সময়ের একটি পরিকল্পনা করে সে। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মিথিলা থাকে রোকেয়া হলে। সবসময় বাড়িতে যাওয়া হয়ে উঠে না তার। বৈশাখের এই দিনগুলোতে ছুটি পায় বলে বাসায় চলে যায় সে। ওখানে এই দিনটাতে সকালবেলা সবার আগে বাবা-মায়ের কাছে যায়। এরপর নাস্তা সেরে দেখা করে সব স্কুল ও পাড়ার বান্ধবীদের সাথে। এই দিনটাতে নতুন করে আড্ডায় মেতে উঠে সবাই। তারপর সবচেয়ে প্রিয় আমভর্তা তৈরি করে একসাথে খায় সবাই মিলে। সব মিলিয়ে এই দিনটা তরুণরা হৈ হুল্লর করেই কাটিয়ে দেয়।

বিচিত্র রূপের হালখাতা

সাইমন জাকারিয়া

 

 

হালখাতা বাংলা নববর্ষ উদযাপনের বিচিত্র রূপ ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সাধারণত বাংলাদেশের গ্রামীণ ব্যবসায়ীরা বাংলা নববর্ষ এলে হালখাতার আয়োজন করেন। তারা এ সময় মূলত নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা দোকানের সুহৃদ ক্রেতা ও বিভিন্ন লেনদেনকারী ব্যক্তিকে আমন্ত্রণের মাধ্যমে মিষ্টিমুখ করান। এই মিষ্টিমুখ করানোর ফাঁকে ব্যবসায়ীরা বিগত বছরের হিসাবের খাতার পাট চুকিয়ে নতুন খাতায় নতুন বছরের ব্যবসার হিসাব শুরু করে থাকেন। সুহৃদ ক্রেতারাও হালখাতার আয়োজনে যোগ দিয়ে সারা বছরের বকেয়া পরিশোধ করেন। হালখাতা নামটির ভেতর সংস্কৃতির এই রহস্য লুকিয়ে আছে। আসলে আরবি ‘হাল’ শব্দের সঙ্গে ফার্সি শব্দ ‘খাতা’ মিলে হালখাতা রূপ ধরেছে। আরবি ভাষার ‘হাল’ শব্দটির অর্থ হলো বর্তমান বা চলতি এবং ফার্সি ‘খাতা’ শব্দটির অর্থ হলো বই বা বহি। তাই সামগ্রিক বিচারে ‘হালখাতা’র অর্থ হলো চলতি বছরের হিসাবের খাতা বা বই। পুরনো বছরের পাট চুকিয়ে নতুন বছরের জন্য নতুন খাতা বা বইয়ে হিসাব লেখার সূচনা করার আনুষ্ঠানিক সংস্কৃতি পালনের নামই ‘হালখাতা’।
বাংলাদেশের এমন কোনো অঞ্চল হয়তো খুঁজেই পাওয়া যাবে না যেখানে বাংলা নববর্ষ উৎসবের অংশ হিসেবে হালখাতার অনুষ্ঠান হয় না। আগে ওই আয়োজন গ্রামীণ সমাজের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী এবং তাদের দরিদ্র ক্রেতার মধ্যে প্রচলিত ছিল। এখন ওই দৃশ্যপট পরিবর্তিত হয়েছে। বর্তমানে বড় ব্যবসায়ীরাও হালখাতার আয়োজন করে থাকেন। একই সঙ্গে হালখাতার আয়োজন গ্রাম ছাড়িয়ে নগর সমাজেও বিস্তৃত হয়েছে। ঢাকা মহানগরের অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এখন বাংলা নববর্ষের সময় হালখাতার আয়োজন করতে দেখা যায়।
এক সময় গ্রামে হালখাতার আয়োজনে মিষ্টি হিসেবে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তথা দোকানের পাশেই গরম জিলাপি ভাজা হতো এবং ক্রেতারা এসে বকেয়া পরিশোধের মাধ্যমে মজা করে ওই জিলাপি খেতেন। শুধু তা-ই নয়, ক্রেতারা যখন ফিরে যেতে উদ্যত হতেন তখন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা দোকানের মালিক কর্তৃপক্ষ তাদের হাতে তুলে দিতেন বাড়ির সদস্যদের জন্য একটি জিলাপির ঠোঙা।
তাই গ্রামীণ সমাজে হালখাতার জন্য শুধু ব্যবসায়ীরা অপেক্ষা করতেন না, ক্রেতা ও তাদের পরিবারের সদস্যরাও অপেক্ষা করতেন যুগপৎ। শুধু জিলাপিই নয়, হালখাতার আয়োজনে কোথাও কোথাও স্থানীয় বিভিন্ন মিষ্টান্ন তথা ম-া-মিঠাই অভ্যাগতদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। বড়দের পাশাপাশি হালখাতার আয়োজনে শিশুদেরও সরব উপস্থিতি ঘটে। মূলত অভিভাবকদের হাত ধরেই শিশু-কিশোররা হালখাতার আয়োজনে শরিক হয়ে থাকে। বড়দের মতো শিশু-কিশোরদের জন্যও দেওয়া হয় রসে ডুবুডুবু ধবধবে সাদা বড় রাজভোগ যার ভেতরে থাকে ছোট ক্ষীরের পুঁটলিতে পোরা সুগন্ধি একটি এলাচদানা। খুব তৃপ্তি নিয়ে সব বয়সী মানুষ হালখাতার মিষ্টান্ন যেমন আহার করে থাকেন তেমনি কোথাও দেওয়া কালিজিরা ছিটানো হালকা গেরুয়া রঙের নিমকি খেয়ে কারও মন গলে যায়। নিমকির মচমচে ভাজায় অন্তর চাঙ্গা হয়ে ওঠে। কোথাও আবার গন্ধ কর্পূূর মেশানো ঠা-া এক গ্লাস পানি হৃদয়টি শীতল করে দেয়। রাজভোগের মিষ্টতার বিলাসী আবেশের সঙ্গে নোনতা নিমকির নিরপেক্ষ স্বাদ দুই বিপরীত রসের স্রোতে রসনায় বৈচিত্র্য আনে বৈকি।
হালখাতার আয়োজন উপলক্ষে নববর্ষ আসার আগের দিন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করা হয়। নববর্ষের দিন হালখাতা উপলক্ষে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সামনে দুটি বা চারটি কলার গাছ লাগিয়ে একটি প্রবেশপথ তৈরি করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন রঙিন কাগজ দিয়ে দোকান বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি দারুণভাবে সাজানো হয়। জ্বালানো হয় সুগন্ধি আগরবাতি। ব্যবসায়ী বা তার আমন্ত্রিত ক্রেতারা ওই রঙিন ও সুগন্ধ ছড়ানো আয়োজনের মধ্যে আসেন নতুন রঙিন বা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পোশাক পরে। সব মিলিয়ে একটা ফুরফুরে ও সুন্দর ভাব সৃষ্টি হয় হাতখাতার পুরো আয়োজন ঘিরে।
আরেকটা ব্যাপার উল্লেখ করা প্রয়োজন। তা হলো, হাতখাতার এ ধরনের আয়োজনের আগেও কিছু কাজ থাকে। যেমন আমন্ত্রপত্র তৈরি, বিতরণ অথবা মৌখিকভাবে আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়। তবে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হাতখাতার জন্য প্রস্তুতকৃত আমন্ত্রণপত্রের মাথায়, এমনকি কখনো কখনো হালখাতার জন্য সজ্জিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রবেশপথের মুখে একটা না একটা স্বস্তিবচন লেখা থাকে। ওই স্বস্তিবচন মূলত ব্যবসায়ীদের নিজস্ব ধর্ম বিশ্বাস অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে অর্থাৎ তারা ইসলাম, সনাতন, বৈষ্ণব, বৌদ্ধ, ক্রিশ্চিয়ান ইত্যাদি যে ধর্ম মতের অনুসারীই হোন না কেন, যার যার ধর্ম মতের প্রচলিত বিশ্বাস ও ভক্তিভাব অনুযায়ী স্বস্তিবচনের শিরোনাম বা বন্দনাস্তবক লেখা হয়ে থাকে। কোথাও হয়তো লেখা থাকে, ‘এলাহি ভরসা’, কোথাও ‘নমো গণেশায় নমঃ’, ‘শ্রীহরি’, ‘জয় রাধা-কৃষ্ণ’ বা ‘বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি’, ‘ধম্মং শরণং গচ্ছামি’, ‘সঙ্ঘং শরণং গচ্ছামি’ ইত্যাদি। কোথাও আবার একটা ‘ক্রুশ’চিহ্নও এঁকে দেওয়া হয়। এ ধরনের স্তবক লিখন দেখে হালখাতার অনুষ্ঠানটি ধর্ম প্রভাবিত বলা চলে না। কারণ এ ধরনের লিখনের ভেতর দিয়ে মূলত ব্যবসায়ীর নিজস্ব বা ব্যক্তিগত ধর্ম বিশ্বাস প্রতিফলিত হয়। কিন্তু আমন্ত্রণপত্রটি বিতরিত হয় সব ধর্মের ক্রেতা বা আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে।
প্রখ্যাত প-িত মুহম্মদ এনামুল হকের মতে, বর্তমানে হালখাতা ব্যবসায়িক অনুষ্ঠান হলেও আসলে এ হচ্ছে একটা কৃষি বিষয়ক অনুষ্ঠান। প্রাচীনকালে ‘দ্রব্য’ বিনিময়ের মাধ্যমে (‘মুদ্রা’ বিনিময়ের মাধ্যমে নয়) যখন ব্যবসা চলতো তখন গৃহস্বামী তার উৎপন্ন দ্রব্যের কতোটুকু নিজের জন্য রেখে অবশিষ্টটুকুর দ্বারা নিজের প্রয়োজনীয় অন্য দ্রব্য নেবেন এ সম্পর্কে একটা হিসাব। তা যে কোনো উপায় হতে পারে। যেমন রাশিতে গেরো দিয়ে, পাথর বা মাটির ঢেলার স্তূপ জমিয়ে তাকে রাখতে হতো। তারপর অনেক পরে তিনি তালের পাতায় ‘টোকা’ রেখে অথবা তুলট কাগজে ‘চোতা’ বানিয়ে ওই কাজ সেরেছেন। বর্তমানে হালখাতা এরই বিবর্তিত রূপ।
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হালখাতা এখন অনেকভাবে হয়ে থাকে। মানিকগঞ্জ ও বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে হালখাতা উপলক্ষে ‘লাঠিখেলা’, ‘বুড়া-বুড়ির সঙ’ ‘কিচ্ছা’ ইত্যাদি পরিবেশনামূলক লোকশিল্পের আয়োজন করা হয়। এতে একই সঙ্গে স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে হালখাতার নিবিড় সম্পর্ক রচিত হয়। আমাদের ধারণা, হালখাতার সঙ্গে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের এ ধরনের আয়োজন নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে হালখাতার এ ধরনের সাংস্কৃতিক আয়োজন বাংলাদেশের সব অঞ্চলের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে বলেই প্রত্যাশা রাখি।

স্বপ্নের ফেরিওয়ালা

অরিন্দম মুখার্জী বিংকু

 


ভারতের অবহেলিত জাদুবিদ্যাটি শ্রেষ্ঠত্বে সিংহাসন পাইয়ে দেয়ার পর না থেমে জাদুশিল্প সব রাষ্ট্রে ছড়িয়ে দিয়ে বিশ্বের বুকে বাংলা ও বাঙালিকে গৌরবোজ্বল জাতি হিসেবে নতুনভাবে পরিচিত করেছেন পিসি সরকার।
স্বাধীনতা-উত্তর ভারতের দুর্বল আর্থিক কাঠামোর মধ্যেও মানুষ যাকে ঘিরে জীবন চ্যালেঞ্জ জয়ের স্বপ্ন দেখতো তিনিই পিসি সরকার তথা স্বপ্নের ফেরিওয়ালা।
আন্তর্জাতিক ওই জাদুকর ১৯৫০ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত জাদু দেখিয়েছেন। পিসি সরকার শুধু জাদুশিল্পীই ছিলেন না, লেখকও ছিলেন। জাদুশিল্পে পিসি সরকারের কৃতিত্ব হলো, তিনি বহুল প্রাচীন জাদু খেলার মূল সূত্র আবিষ্কার করেন। তার অন্যতম প্রদর্শনী ছিল ‘ইন্দ্রজাল প্রদর্শনী।
ভবিষ্যতের জাদু সম্রাটের জন্মও যেন একটি ম্যাজিক। ১৯১৩ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের টাঙ্গাইল জেলার ছোট্ট একটি গ্রাম অশোকপুরের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন পিসি সরকার অর্থাৎ প্রতুল। বাবা ভগবান চন্দ্র সরকার ও মা কুসুম কামিনী দেবীর প্রথম পুত্র সন্তান তিনি। প্রতুল ছিলেন সাত মাসের প্রিম্যাচুরড বেবি। ওই সময়ের যে চিকিৎসা ব্যবস্থা, এতে তার বেঁচে থাকারই কথা নয়। কিন্তু যিনি ভবিষ্যতে গোটা দুনিয়ায় তাক লাগিয়ে দেবেন, তাকে বাঁচিয়ে রাখতে রাখে হরির ম্যাজিক দেখিয়েছিলেন খোদ ঈশ্বর। তারা ছিলেন দুই ভাই। পিসি সরকার অর্থাৎ প্রতুল চন্দ্র (পিসি) সরকার বড় ও ছোট ভাই অতুল চন্দ্র (এসি) সরকার বা এসি সরকার।
চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বেড়ে ওঠা প্রতুল ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। বাবার ইচ্ছা ছিল, বুইড়া ছেলের আদরের ডাকনাম হবে বুড়ো। বুড়ো বড় হয়ে শিক্ষকতা করবেন। তিনি চাইতেন না ম্যাজিকটি পেশা হিসেবে নিন প্রতুল। সমাজ সাদরে গ্রহণ করবে না ভেবে সরকার পরিবার গোপনে চালিয়ে গেছে নিজেদের জাদু সাধনা। তন্ত্র-মন্ত্রে নয়, প্রকৃত অর্থে বিজ্ঞান সাধনা। সেকালের বিখ্যাত জাদুকর ঘনপতি চক্রবর্তী ছিলেন তার জাদুবিদ্যার গুরু। হাতে-কলমে জাদু জাদুবিদ্যা শেখা ও চর্চার আরো সুযোগ হয় তার। এর সঙ্গে দেশি-বিদেশি বই থেকেও চলতে থাকে জ্ঞান আহরণ। সেই প্রাথমিক শিক্ষাক্রম ডালপালা মেলে একদিন মহীরুহে পরিণত হলো। কিন্তু ভাগ্যের লেখনী একেবারেই আলাদা। তাই অংকের ছাত্র হয়েও জাদুবিদ্যাই হয়ে ওঠে প্রতুলের ধ্যান-জ্ঞান।


ভাই অতুল ১৯ বছরের ছোট। দাদার প্রথম দিকের পেশাদার জীবনের সঙ্গী ছিলেন তিনি। পরে মতান্তর হওয়ায় একাই ওই শিল্প মঞ্চস্থ করতেন আলাদাভাবে।
প্রতুলের শিক্ষা জীবন শুরু হয় বাড়ির পাশেই শিবনাথ হাই স্কুলে। স্কুলে যাতায়াতের পথে একটা খালের দু’পাশে ছিল ‘মাদারী’দের বাস। তাদের কাছেই প্রতুলের জাদুবিদ্যার হাতেখড়ি।
পারিবারিক সূত্রে জাদু ছিল তার রক্তেই। সেই আত্মারাম থেকে শুরু ষষ্ঠ প্রজন্মের দ্বারকানাথ সরকার পর্যন্ত সবাই অল্পবিস্তর ম্যাজিক জানতেন। সপ্তম প্রজন্মের ভগবান চন্দ্রও বাবার কাছ থেকে ওই বিদ্যা চর্চা করেন। কিন্তু তখনকার সমাজ জাদুকরদের খুব একটা সুনজরে দেখতো না। আত্মারামের ওপর সেই সময়ের কাপালিক ও তন্ত্র সাধকরা এতোটাই রুক্ষ ছিলেন যে, আজও তাদের তন্ত্র-মন্ত্রে বারবার এগিয়ে আসে তার নাম। ওই থেকেই সরকার পরিবারের কেউ প্রকাশ্যে কখনো জাদু দেখাননি। তবে প্রতুল সপ্তম  অষ্টম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় স্কুলের অনুষ্ঠানে  ক্লাসের বন্ধুদের কাছে দেখানো শুরু করেন।
কিছুটা বংশগত ঐতিহ্যও পিসি সরকারকে বাল্যকাল থেকেই জাদুবিদ্যার প্রতি কৌতূহল এ পেশায় আগ্রহী করে তোলে। কিন্তু আদতেই জাদুবিদ্যা শিখবেন কি না, তা নিয়ে পরিবারের মধ্যে মত বিরোধ ছিল।
সমাজ তখন কুসংস্কারাচ্ছন্ন, শ্রেণী বৈষম্যে বিভক্ত ছিল। তুকতাক, ঝাড়ফুঁক করে অসাধ্য সাধন বা মন্ত্রবলে স্বপ্ন পূরণ হওয়ার পেছনে আমল রহস্য ধরে ফেলেন বিজ্ঞানমনস্ক দুই ভাই আত্মারাম ও বাঞ্চারাম সরকার। কিন্তু আধুনিকতায় অনভ্যস্ত সমাজ তা মানতে চায়নি। সহজ-সরল ও নিরক্ষর মানুষকে তা বোঝাতে গেলে আত্মারামের প্রাণনাশ হয় ‘মাদারী’ গোষ্ঠীর হাতে। আর বাঞ্চারাম পালিয়ে বাঁচেন। কারণ তাদের জীবন ধারণের অন্যতম উপায় ছিল জাদুবিদ্যা। উপস্থিত বুদ্ধি ও হাতের কারসাজি দিয়ে তিলটি তাল করে সাধারণ মানুষকে এক কল্পনার জগতে ছায়া দেখাতেন তারা।


ছোট প্রতুলের ওই খেলা বেশ ভালো লাগতো। আগ্রহ তার এতোটাই ছিল যে, একদিন তাদেরই একটা খেলা দেখিয়ে দিলেন তিনি। প্রথমে তারা বিরক্ত হলেও পরে তাকে অনেক খেলা শেখায়। পরবর্তী সময় টাঙ্গাইলে পড়া অবস্থায় সহপাঠীদের জাদু দেখিয়ে তাক লাগিয়ে দেন। মূলত তখন থেকেই শুরু হয় তার জাদুবিদ্যার পথ চলা।  
১৯২৯ সালে শিবনাথ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক ও করটিয়া সা’দাত কলেজ থেকে ১৯৩১ সালে মানবিক শাখা থেকে আবারও প্রথম বিভাগে পাস করেন। এরপর আনন্দ মোহন কলেজে বিএ ক্লাসে ভর্তি হন। সেখান থেকে বিএ পাস করার পর সম্পূর্ণ মায়ার জগতে প্রবেশ করেন প্রতুল। জাদু সম্রাটের পথটি মোটেও মসৃণ ছিল না। শিল্পের ক্ষেত্রে জায়গা করে নিতে ম্যাজিকের কপালেও কোনো ম্যাজিক জোটেনি। অনেক সংগ্রাম  ও দরিদ্রতার মধ্য দিয়ে রীতিমতো লড়াই করার পর একদিন ওই নাম ছাপিয়ে বড় হয়ে দাঁড়ালো পিসি সরকার।
বঙ্গ তখন অগ্নিগর্ভ। পিসি সরকার বিতাড়িত হয়ে পরিবারকে নিয়ে কলকাতায় এসে হাজির হন প্রতুল সুফিয়া স্ট্রিটের ভাড়া বাড়িতে। ম্যাজিক দেখিয়ে সংসার চালানো এক সময় দুঃসহ হয়ে উঠেছিল। লোহা-লক্কড়ের ব্যবসায়ী তথা তার এক বন্ধু সহ্য করতে না পেরে গ্রামে একটি মাস্টারি চাকরির ব্যবস্থা করলেন। ঠিক ওই সময় আরেকটি চিঠি এসে হাজির। চিঠিতে তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের গভর্নরের বিদায়ী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে অনুরোধ করা হয়েছে জাদুকর হিসেবে প্রতুলকে। ফলে আর চাকরি করা হলো না তার।


এরপর পেরিয়ে গেল অনেক বছর। ততোদিনে ইউরোপ-আমেরিকার চোখে কালো জাদু ও তন্ত্র-মন্ত্রের দেশ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে ভারত। তাই বলে ওই জাদুবিদ্যার লুট করার কোনো ফন্দি ছিল না ব্রিটিশদের। পরাধীন দেশে ইংরেজরা পথঘাটের জাদুকর মাদারী খেলা দেখিয়ে তাদের কারিগরি বেশকিছু শিখে নিয়েছে।
ভারতীয় ঐতিহ্য ও পরম্পরার সঙ্গে মিশে গেছে পশ্চিমি আধুনিকতা। পরে এপার বাংলা থেকে কলকাতায় চলে আসা সরকার পরিবার পারিবারিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ম্যাজিক দেখিয়ে উপার্জন করতে থাকে। এদিকে নিজের ক্যারিশমাও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরো গভীর হতে থাকে। সেই সঙ্গে একটু করে বেড়ে উঠতে থাকে ইন্দ্রজালের মায়া।
পিসি সরকারের জাদু শব্দটিতেই আপত্তি ছিল। তিনি মনে করতেন, ওই শব্দটি বড় তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে ব্যবহৃত হয়। যেহেতু হিন্দু ধর্মের দেবরাজ ইন্দ্র হলেন মায়াবিদ্যার প্রতীক সেহেতু ওই ভাবনা থেকেই তার মঞ্চ উপস্থাপনার নাম হয় ইন্দ্রজাল। এর সঙ্গে যোগ হয় বিনোদন।


১৯৩০ সাল থেকে জনপ্রিয় হওয়া শুরু হয়। তখন কল্লোলনী বিভক্ত ছিল হোয়াইট ও ব্ল্যাক কলকাতা হিসেবে। ওই বিভেদের বেড়াজাল ভাঙতে জাদু সম্রাট নিউ এম্পায়ার থিয়েটার হলটিই বেছে নেন নিজের ম্যাজিক পরিবেশনের মঞ্চ হিসেবে। উঁচু বর্ণ ও সম্ভ্রমের নিউ এম্পায়ার মাসের পর মাস হাউসফুল হয়েছে ব্ল্যাক কলকাতা। জাদুর জগতে ব্যাপক প্রচার লাভের উদ্দেশ্যে তিনি এক সময় নিজের পদবী সরকার বাদ দিয়ে ইংরেজি ‘সোরসার’ শব্দ ব্যবহার করতে শুরু করের। কারণ শব্দটির অর্থ জাদুকর। তবে জনপ্রিয়তার শীর্ষে আরোহণ করার পর তিনি আবার নিজের সরকার পদবীই গ্রহণ করেন। তা বিদেশিদের ছোঁয়ায় হয়ে ওঠে আরো আকর্ষণীয়। কিন্তু সেসব খেলার উৎস যে আমাদের দেশীয় সেটিই উহ্য থেকে যায়। দরকার ছিল এমন একজনÑ যিনি ওই দেশের জাদুবিদ্যা বিশ্বে ছড়িয়ে দেবেন।
বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় চলে যাওয়া ওই কা-ারি চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেন প্রতুল চন্দ্র সরকার। তিন দশকের মাঝামাঝি থেকেই তিনি প্রচারের আলোয়। ক্রমেই শুরু হলো স্টেজ শো দেশে-বিদেশে। দেশীয় ম্যাজিকগুলো নতুন জাদুতে বুঁদ হলো দুনিয়া।
১৯৩৪ সালে তিনি সর্বপ্রথম বিদেশ গমন করেন। তিনি জাপান, ফ্রান্স, আমেরিকাসহ ৭০টির মতো দেশে জাদু প্রর্দশন করে ব্যাপক খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা লাভ করেন। এ সময় তিনি পর্যপ্ত অর্থও উপার্জন করেন। তার জাদুর ছোঁয়ায় বিশ্বের দরবারে নতুন পরিচিত হলো ভারতবর্ষ। উন্নত বিশ্ব জানলো এবং মানলো, বেঁদে, ওঝা, ঝাড়ফুঁক ও বাজিকরের দেশ ভারতবর্ষ বিজ্ঞান নির্ভর ম্যাজিকও দেখাতে পারে। জাদু মানচিত্রে পিসি সরকারই হয়ে দাঁড়ালো আলাদা ব্র্যান্ড, আলাদা প্রতিষ্ঠান।


১৯৩৮ সালে পিসি সরকার কলকাতার বাসন্তী দেবীকে বিয়ে করেন। সংসার জীবনেও তিনি খুব সুখী ছিলেন। তার তিন ছেলে মানিক, প্রদীপ (পিসি সরকার জুনিয়র) ও পি সরকার ইয়ং। বাসন্তী দেবী ২০০৯ সালের ৬ ডিসেম্বর মারা যান।  
‘ওয়াটার অফ ইন্ডিয়া’  কারো অজানা নয়। এটি পিসি সরকারের জনপ্রিয় খেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম। কোনো শো-র প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত একটি ছোট চৌবাচ্চা থেকে অনবরত ভরে চলতে থাকে গ্লাসের পর গ্লাস।
তিনিই বলে গেছেন, ‘আমি চিরজীবন শুধু ম্যাজিকের জগতেই বসবাস করেছি। স্বপ্নের রঙ গায়ে মেখে জীবন কাটিয়েছি। পৃথিবীর অনেক দেশেই গিয়েছি। সেখানকার মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করেছি। যতোই তাদের নৈকট্য বেড়েছে, ততোই নিজের দেশকে বেশি করে শ্রদ্ধা করতে ও চিনতে পেরেছি। ম্যাজিক একটি শিল্প। এতে বিজ্ঞান, টেকনোলজি, শারীরিক দক্ষতা ও শোম্যানশিপÑ সবই লাগে। এতে কোনো অলৌকিক কিছুই নেই।’
তাচ্ছিল্য ও অবহেলার বিরুদ্ধে লড়াই করে পথের ধুলায় পড়ে থাকা মাদারীর খেলাটি পিসি সরকার নিয়ে গিয়েছিলেন বিশ্বের দরবারে। ভ- সাধুদের ভোজবাজি মানুষকে ঠকানোর কলমঞ্চে উপস্থাপন করে তিনি প্রমাণ করে দিয়েছিলেন বিজ্ঞানই অলৌকিক পিতা। ডাইনিবিদ্যার নামে অন্ধকারে পড়ে থাকা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সংমিশ্রণ ভারতীয় জাদুটি তিনি তুলে ধরে ছিলেন বিশ্বের দরবারে। আত্মœবিস্মৃত জাতি তাকে ভুলে গেলেও ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে উত্যুজ্জ্বল হয়ে রয়েছে তার নাম।
ভারতীয় জাদু তথা বৌদ্ধতন্ত্র ও হিন্দুতন্ত্রের দশ মহাবিদ্যার মধ্যে দীর্ঘদিন অনাদরে পড়ে ছিল। পথে পথে ঘুরে বেড়াতো মাদারীর ঝোলায়। এগুলো নিয়ে বিশ্বে বিখ্যাত জাদুকরদের সঙ্গে একই মঞ্চে জাদু প্রদর্শন করতে লাগলেন পিসি সরকার।


জাদুবিদ্যার বিষয়ে পিসি সরকারের ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ইংরেজি, বাংলা ও হিন্দি ভাষায় প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ২০। এগুলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ম্যাজিক শিক্ষা, হান্ড্রেড ম্যজিক্স, ইউ ক্যান ডু, ছেলেদের ম্যাজিক, ম্যাজিকের কৌশল, সহজ ম্যাজিক, ম্যাজিকের খেলা, মেস মেরিজাম, জাদুবিদ্যা, হিন্দু ম্যাজিক, হিপনোটিজম, ইন্দ্রজাল প্রভৃতি।
নিউইয়র্কের টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ ‘এক্স-রে আই’ করাত দিয়ে মানুষ দ্বিখ-িত করা খেলাটি দেখানোর জন্য পিসি সরকারকে বিশেষ বিমানে আমেরিকায় নিয়ে আসে। তার ওই খেলাটি দেখে দর্শক অভিভূত হয়ে পড়ে। তার অপূর্ব প্রকাশভঙ্গির অসাধারণ বাস্তবতার গুণে অনেকে অজ্ঞান হয়ে যান। দ্বিখ-িত তরুণীটির খবর জানতে বিবিসি অফিসে এতো টেলিফোন আসতে থাকে যে, দুই ঘণ্টা টেলিফোন লাইন জ্যাম হয়ে যোয়।  খেলাটি দেখানোর পর তিনি অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা ও সম্মান লাভ করেন।
ফোর্স রাইটিংয়ের জাদু খেলাটি দেখিয়ে সংবাদপত্র মহলে অলোড়ন ফেলে দেন পিসি সরকার। কলকাতা ইম্পেরিয়াল রেস্টুরেন্টে এ কে ফজলুল হককে যে জাদু দেখিয়ে মুগ্ধ করেন এর শিরোনাম ছিল, ‘বাংলার মন্ত্রীদের পদত্যাগ’। এ শিরোনামে একটি সাদা কাগজে প্রথমে তিনি শেরেবাংলা ফজলুল হককে কিছু লিখতে বলেন এবং এর নিচে মন্ত্রীরা স্বাক্ষর করেন। কিছুক্ষণ পর শেরে বাংলা ফজলুল হক নিজের লেখার পরিবর্তে দেখেন, ‘এই মুহূর্তে আমরা মন্ত্রীরা পদত্যাগ করলাম এবং আজ থেকে জাদুকর পিসি সরকারই বাংলার মুখ্যমন্ত্রী।’ ঠিক এর পরের দিনই বিদেশে একটি দ্রুতগামী ট্রেন আসার মাত্র ৩৮ সেকেন্ড আগে তিনি হ্যান্ডকাফ বন্ধ অবস্থায় ট্রেনলাইন থেকে মুক্ত হয়ে আসেন। ওই হ্যান্ডকাফটি খুলতে ১৭টি চাবি ব্যবহার করা হতো। এ জন্য তাকে ইংল্যান্ডের জাদুকর সম্মিলনীর তৎকালীন প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি উইল গোল্ড ও স্টোন বলেছিলেন, ‘তুমি জন্মসিদ্ধ জাদুকর।’
পিসি সরকারের জাদু বিভিন্ন টেলিভিশনে যথা অস্ট্রেলিয়ান টেলিভিশন, বিবিসি, শিকাগোর ডাবলিউজিএনটিভি এবং নিউইয়র্কের এনবিসি ও সিবিএস টেলিভিশনে বহুবার প্রদর্শিত হয়েছে।
প্রতুল চন্দ্র সরকার কোনো টাইম ফ্রেম বা সমাজের কোনো শ্রেণীর গ-িতে আবদ্ধ ছিলেন না। ম্যাজিকের মহারাজা হয়েও তিনি ছিলেন সাধারণ মানুষ।
পিসি সরকার ১৯৫৫ সালে পশ্চিমবঙ্গের মহানায়ক উত্তম কুমারকে দিয়ে ‘ছায়া যায় কায়া থাকে’ অত্যাশ্চর্য খেলাটি দেখিয়ে ছিলেন। স্টেজে উত্তম কুমারকে তিনি আমন্ত্রণ জানান এবং পেছনে একটি সাদা স্ক্রিনে তাকে দাঁড় করিয়ে রাখেন। পর্দায় তীব্র সার্চলাইটের আলো ফেলার সঙ্গে সঙ্গে উত্তম কুমারের ছায়া পর্দায় ভেসে ওঠে। স্টেজে তাকে আসন গ্রহণ করতে বলেন। উত্তম কুমার পর্দা থেকে সরে গেলেও তার ছায়াটি বন্দি করে রাখেন। পুরো পৃথিবীতেই ওই খেলা পিসি সরকার ছাড়া অন্য কেউ দেখাতে পারেননি।


নিউ এম্পায়ার প্রেক্ষাগৃহ হয়ে ওঠার পর আর কলকাতায় সেভাবে ম্যাজিক দেখাননি জাদু সম্রাট। এর অন্যতম কারণ ছিল, পর্যাপ্ত পরিকাঠামোযুক্ত হলের অভাব।
১৯৫৭ ও ১৯৬৭ সালে আমেরিকা এবং ১৯৬২ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মস্কো ও লেনিনগ্রাদ শহরে জাদু প্রর্দশন করে পিসি সরকার প্রচুর সুনাম অর্জন করেন। তিনিই প্রথম রাজকীয় পোশাক ও আকর্ষণীয় পাগড়ি পরে জাদু প্রদর্শনের প্রচলন করেন।
পিসি সরকারের জাদুর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে রঙিন চলচ্চিত্র ‘গিলি গিলি গে’ এবং দূরদর্শন তার ফটোগ্রাফির অ্যালবাম প্রকাশ করে। জাদুশিল্পে অসাধারণ পারদর্শীর জন্য বিশ্ববাসীর কাছ থেকে জাদু সম্রাট এবং কালের শ্রেষ্ঠ সম্রাট উপাধী লাভ করেন তিনি।
জাদু দেখিয়ে পিসি সরকার দেশে-বিদেশে অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯৪৬ ও ১৯৫৪ সালে সর্বশ্রেষ্ঠ স্টেজ ম্যাজিকের জন্য আমেরিকার জাদুর অস্কার নামে পরিচিত ‘দ্য ফিনিক্স’ পুরস্কার দু’দুবার লাভ করেন। জার্মান ম্যাজিক সার্কেল থেকে ‘দ্য রয়াল মেডিলিয়ন’ পুরস্কার পান। এছাড়া তিনি গোল্ডবার পুরস্কার, ‘সুবর্ণ লরেন মালা’ নামে জাদুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় জার্মান পুরস্কার, হল্যান্ডের ট্রিকস পুরস্কার এবং ১৯৬৪ সালে ভারত সরকার প্রদত্ত পদ্মশ্রী উপাধি লাভ করেন। জাদু খেলায় কৃতিত্বে জন্য মিয়ানমারের (বার্মা) তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মার্কিন নু তার নাম দিয়েছিলেন ‘এশিয়ার গর্ব’। ভারত সরকার ‘জাদু সম্রাট পিসি সরাকার নামে কলকাতায় একটি সড়কের নামকরণ করেছে। ১৯১০ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ভারত সরকার তার প্রতি সম্মান জানিয়ে একটি ৫ রুপির স্ট্যাম্প চালু করে।


পিসি সরকার ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের স্বার্থে ১৯৩৭ সালে জাপান সফরের সব অর্থ দান করেন। তিনি ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, জার্মান, বেলজিয়াম ও জাপানে ম্যাজিশিয়ান ক্লাবের সদস্য এবং বিলাতের রয়াল এশিয়াটিক সোসাইটির আজীবন সদস্য ছিলেন। ইউরোপের বিখ্যাত লেখকরা তার ওপর বেশ কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। এগুলোর মধ্যে ‘সোরকার’ ও ‘মহারাজা অফ ম্যাজিক’ গ্রন্থ দুটি উল্লেখযোগ্য।
প্রতুল চন্দ্রের গোটা জীবনই ছিল আক্ষরিক অর্থে জাদুতে মোড়া। পিসি সরকার বিদেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শো করেন জাপানেÑ ৩৭ বার। তার জীবনের শেষ অধ্যায় রচিত হয় ওই দেশেই। ১৯৭০ সালের শেষ দিকে আরো একবার জাপান সফরে গিয়েছিলেন তিনি। ১৯৭১ সালের ৬ জানুয়ারি তিনি জাপানের আশাহিকা  ওয়ারের নিকটবর্তী জিগেৎসু শহরে হোক্কাইডো মঞ্চে ‘ইন্দ্রজাল’ বিস্তারে ব্যস্ত ছিলেন। মুগ্ধ দর্শকের সামনেই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মঞ্চ থেকে অদৃশ্য হন চিরকালের জন্য। মাত্র ৫৭ বছর বয়সে তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে। ফলে দেশ হারালো তার বরপুত্রকে। ভারতীয় ম্যাজিকে আমদানি হলো এক নতুনধারা।   
ইন্দ্রজালবিদ্যার অম্বেষণে পরবর্তী প্রজন্মকে তৈরি রাখতে তার পরিকল্পনা ছিল আরও বড়। কিন্তু তার অকাল মৃত্যু তখনকার পরিকল্পনাগুলো ভানুমতির বাক্সেই বন্ধ করে দেয়।
ভারতবর্ষের আধুনিক বাঙালিদের মধ্যে ক্ষণজন্মা আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিখ্যাত জাদুকর ঐন্দ্রজালিক পিসি সরকারকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। তিনি বিশ্বাস করতেন, দ্য  শো মাস্ট গো অন। ঠিক তা-ই হয়েছে। পরিবারের উত্তরসূরিরা বয়ে নিয়ে চলেছে তার জাদু। তাদের সঙ্গে ওই ম্যাজিকের ধারা বয়ে চলেছে ওয়াটার অফ ইন্ডিয়ার অনাবিল গ্রোথের মতো।
অন্ধকার কুস্কারাচ্ছন্ন ওই জাদু বিজ্ঞানটি ঘষে-মেজে প্রতুল চন্দ্র নিয়ে এলেন বিশ্বের জনমঞ্চে। আমেরিকা, ইংল্যান্ড জার্মানির দর্শক অপলক অবোলকন করলো ভারতীয় জাদুকরের ইন্দ্রজাল।
বহু বছর পেরিয়ে গেছে। সরকার দ্য সিনিয়র মায়াপুরের বাসিন্দা হয়েছেন। এতো বছর দাঁড়িয়েও অনেকে তার মতো হয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখেন। তাকেই রোল মডেল করে এগিয়ে চলেন নতুন জাদুকররা। অনেক দূরের তারা হয়ে পুরো ভূমিকায় সিনিয়র। আমাদের বাঙালির বুক আজও তার জন্য গর্বে ফুলে ওঠেÑ বাংলাদেশেরই সন্তান তিনি।

মঘেমল্লার



১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। পুরো বাঙালির জন্য ঐতিহাসিক এক বেদনাদায়ক অধ্যায়। তা আমাদের সত্তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এ পর্যন্ত অনেক চলচ্চিত্র এ দেশে নির্মাণ হয়েছে, হচ্ছে দেশের বাইরেও। সম্প্রতি মুক্তি পায় মুক্তিযুদ্ধের কাহিনী নিয়ে নতুন চলচ্চিত্র ‘মেঘমল্লার’। এর কাহিনিতে আমরা দেখা গেছে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক আটক অবস্থায় গল্পের মূল চরিত্র নূরুল হুদা (শহীদুজ্জামান সেলিম) বাংলাদেশের একটি মফস্বল শহরের সরকারি কলেজের রসায়ণের শিক্ষক। স্ত্রী আসমা ও পাঁচ বছরের মেয়ে সুধাকে নিয়ে তার সুখ-দুঃখের মধ্যবিত্ত সংসার। তাদের সঙ্গে থাকে নূরুল হুদার শ্যালক মানে আসমার ছোট ভাই মিন্টু। একদিন কাউকে কিছু না জানিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে চলে যায় সে। নূরুল হুদাকে রেখে যায় জীবন-মৃত্যুর কঠিন সংকটের মধ্যে। এরপরও নূরুল হুদা নিয়মিত কলেজে যায় এবং পাকিস্তানপন্থি শিক্ষকদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার চেষ্টা করে। মধ্যবিত্তের শঙ্কা, ভয়, পিছুটান তাকে প্রতিনিয়ত অসহায় করে তোলে।
মুষলধারে বৃষ্টির এক রাতে মুক্তিযোদ্ধারা নুরুল হুদার কলেজ এবং পাশের আর্মি ক্যাম্পে আক্রমণ চালায়। ফলে কোনো কারণ ছাড়াই পাকিস্তানি আর্মিরা নূরুল হুদা ও তার বন্ধু আবদুস সাত্তারকে ধরে নিয়ে যায়। বৃষ্টির মধ্যে যাওয়ার সময় আসমা তার ভাই মিন্টুর একটা ফেলে যাওয়া রেইনকোট নুরুল হুদাকে পরিয়ে দেয়। পাকিস্তানি আর্মির সামনে নূরুল হুদা প্রথমে ভয় পেয়ে যায়। প্রমাণ করার চেষ্টা করে, সে শিক্ষক মাত্র। মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে তার সংশ্রব নেই। কিন্তু নির্যাতনের মাত্রা ক্রমেই বাড়তে থাকে। আঘাতে নূরুল হুদার নাক-মুখ দিয়ে রক্ত ঝরতে থাকে।

রক্তের দিকে তাকিয়ে হঠাৎই তার মিন্টুর কথা মনে হয় এবং নিজেকেও মুক্তিযোদ্ধা ভাবতে শুরু করে। এ জন্য মৃত্যু বা আত্মদান কোনো ব্যাপারই নয়। সে বলেÑ আমি সবকিছু জানি। কিন্তু কিছুই বলবো না। এরপর পাকিস্তানি আর্মির মেজর তাকে গুলি করে হত্যা করে।
চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্যে নুরুল হুদার স্ত্রী আসমা ও তার মেয়ে সুধা চরিত্রে অপর্ণা ঘোষ অভিনয় করেন। চলচ্চিত্রটি গত ১২ ডিসেম্বর সারা দেশে মুক্তি পায়। পরিচালক জাহিদুর রহিম অঞ্জন দীর্ঘদিন ধরে চলচ্চিত্রের ওপর শিক্ষকতা ও গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ত। কিছুটা দেরিতে এই প্রথম তিনি নির্মাণ করলেন মুক্তিযুদ্ধের গল্প নিয়ে মেঘমল্লার। এটি তার প্রথম ফিচার ফিল্ম। মুক্তিযুদ্ধের গল্প নির্বাচন, সিনেমার মেকিং ও অন্যান্য ক্ষেত্রে যথেষ্ট সফলতা রেখেছেন তিনি। তার চলচ্চিত্রটি যৌথভাবে প্রযোজনা করেছে বাংলাদেশ সরকার ও বেঙ্গল এন্টারটেইনমেন্ট লিমিটেড।
কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছোটগল্প ‘রেইনকোট’ অবলম্বনে নির্মিত ওই চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য রচনা ও পরিচালনা করেছেন জাহিদুর রহিম অঞ্জন। শুরুতে এর নাম রেইনকোট নির্ধারিত হলেও পরে করা হয়েছে ‘মেঘমল্লার’। কারণ ভারতে ঋতুপর্ণ ঘোষ পরিচালিত ‘রেইনকোট’ চলচ্চিত্র রয়েছে। তাই নাম পরিবর্তন করা হয়। বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় চলচ্চিত্র অনুদানের সহযোগিতা ও বেঙ্গল এন্টারটেইনমেন্ট লিমিটেডের প্রযোজনায় চলচ্চিত্রটি পরিবেশন করেছে বেঙ্গল ক্রিয়েশনস।                                                                                     

 

লেখা : দিগন্ত সৌরভ

বিয়ে

 

 

বিয়ে, সাদী, বিবাহ, নিকাহ্ এই চারটি শব্দের সাথে বাঙালি বাংলা ভাষাভাষি সকলেই পরিচিত। বিয়ে সব নারী পুরুষের জীবনেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বা অধ্যায়। পৃথিবীর সকল ধর্মেই বিবাহকে উৎসাহীত করা হয়েছে। এটি একটি প্রাচীন প্রথা, প্রাচীন একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান। অবাধ যৌনাচার শুধু সামাজিক অনাচার তৈরী করে না উৎপাদন ঘটায় এমন কতগুলো রোগ শোক যা সকল অর্থেই ঝুকিপূর্ন এবং অসম্মানজনক। সামাজিক শৃংখলা বংশ ধারা রক্ষায় বিয়ের প্রয়োজনীয়তা উপেক্ষা করার কোনো পথ নেই। বিয়ের আয়োজন সকল ধর্ম জাতি গোষ্ঠির মধ্যেই আনন্দের এক সাজ সাজ রব। বিয়েকে কেন্দ্র করে বর কনে উভয় পক্ষের মধ্যে আনন্দ বেদনা আর নতুন সম্পর্কের সেতু বন্ধন এ এক স্বর্গীয় সুষমা। আধুনিক বিজ্ঞান প্রমান করেছে যে শুধু মানব সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রেম ভালোবাসার সৃষ্টি হয় এমন নয়, মানুষ ছাড়াও অন্যান্য পশু পাখির মধ্যেও প্রেম ভালোবাসার নিদর্শন প্রত্যক্ষ করা যায়। পশু পাখিদের মধ্যে প্রথাগত মন্ত্র উচ্চারণ করে বিয়ে হয় না কিন্তু বিপরীত লিঙ্গের নর ও নারী তারা একত্রে র্দীর্ঘদিন বসবাস করে সুখের সংসার রচনা করে। বিয়ে নিয়ে সারা পৃথিবীজোড়া প্রবাদ প্রবচন সহ অনেক উন্নত মানের সাহিত্য রচনার ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করা যায়।

বিয়ের আয়োজনে প্রত্যেক ধর্ম জাতি গোষ্ঠির মধ্যে নিজ নিজ রীতি নীতি আচার অনুষ্ঠান বিদ্যমান। আজকাল মানুষের জীবন যাত্রার নাগরিক যে তাড়া বেড়েছে তার কোনো বাহানার শেষ নেই ফলে সকল আয়োজনেই তার প্রভাব পড়ছে। এক সময় লক্ষ্য করা যেত যে বিবাহের আয়োজন নিয়ে দু’টি পরিবার শুধু নয় একটি মহল্লা কিংবা একটি পুরো গ্রাম আনন্দের জোয়ারে ভাসছে। বেশ দুরে থেকে মাইকে, কলের গান, বিয়ের গান বিয়ের গীত কখনো রেকর্ড, ক্যাসেট কিংবা সমবেতভাবে নানা বয়সী নারী পুরুষে কণ্ঠে শোনা যেতো। আজ আর সেই ধরনের আয়োজন খুব একটা লক্ষ্য করা যায় না। নানা বর্ণের কাগজ কেটে ত্রিকোণ নিশান, ঝালর কেটে পুরো বাড়ি সাজিয়ে তোলা এ কাজগুলো চলতো দিনের পর দিন অংশ নিতো পাড়া প্রতিবেশী, তরুণী-তরুণ তখনো চলতো নাচ, গান, ছড়াকাটা, ধাঁধাঁ বলা, কবিতা আবৃত্তি ইত্যাদি। আজ আর মানুষের অত সময় নেই তাই খবর দেয়া হচ্ছে ডেকোরেশন কোম্পানীগুলোকে, যে আমাদের বাড়ীতে বিয়ে সাজিয়ে দিয়ে যাও আর অমনি হাজির হয়ে গেলো লাল, নীল, হলুদ বাতি আরো কত কী সাজানোর সরঞ্জাম। আর এখন হাল ফ্যাশনের অনেক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে বিবাহের আনন্দ আয়োজনকে কত আধুনিক আরো কত আনন্দঘন করা যায় সেই বিবেচনা মাথায় রেখে।
এমন অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে যে আপনাকে কোনো ঝামেলেই আর যেতে হবে না। আপনি শুধু অর্থের যোগন দেবেন আর কী চাইছেন তাই জানিয়ে দিন, সেই সেই মতো সকল কিছু হাজির হয়ে যাবে আপনার সামনে। ব্রাইডাল ম্যানেজমেন্ট, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানীর কোনো কমতি নেই আপনার হাতের কাছে। 
বিয়ের রীতিনীতি জাতি ধর্ম ভেদে বিবাহের রীতিনীতি বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানের মধ্যে সম্পন্ন হয়ে থাকে। বাংলাদেশে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ধর্মালম্বীদের বিয়ের আয়োজন প্রায়ই আমাদের চোখে পড়ে এবং আমরা নানা অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করে সামাজিক দায়িত্ব পালন ও আনন্দ অনুভব করে থাকি। এই ভারতীয় উপমহাদেশে বিবাহের বহু মাত্রিক আয়োজন বিভিন্ন ধর্মের আচার অনুষ্ঠানের মধ্যে পরষ্পর প্রবেশ করেছে স্বাভাবিক স্বাচ্ছন্দে। কন্যা দর্শন, কন্যা পছন্দ, বর পছন্দ এর সাথে যে সামাজিক আচার অনুষ্ঠানগুলো আমরা লক্ষ্য করি তা মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে কিছু খুব ভিতর গত পার্থক্য ছাড়া প্রায় সব একই রকম। আর এটি সংক্রমিত হয়েছে র্দীর্ঘ দিনের সৌহার্দপূর্ণ সহবস্থানের মধ্যে দিয়ে সাম্প্রদায়ীক সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্তও এটি। মুসলিম বিবাহের প্রাথমিক পর্যায়ে কন্যার বাড়িতে যে প্রস্তাব নিয়ে মুরুব্বীগণ উপস্থিত হন একে প্রস্তাব বা পায়গাম বলা হয়ে থাকে। তারপর কন্যা দর্শনের দিনক্ষন ঠিক করা, ঠিক একই পদ্ধতিতে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে কন্যা দর্শনের রীতি রয়েছে। কন্যা দর্শনের পরে খ্রিষ্ট সম্পদায়ের বিবাহের প্রস্তাবটি কিছুটা ভিন্ন, বর কণে পক্ষ উভয়ে সম্মত হলে পরে বর এবং কণের নাম গির্জায় প্রধান ধর্ম যাযক এর কাছে লিপিবদ্ধ করতে হয় । ফাদার পরপর তিন রোববার তাদের বিস্তারিত পরিচয়সহ বিবাহের প্রস্তবটি তুলে ধরবেন এতে কারো কোনো প্রকার আপত্তি না থাকলে প্রস্তাবটি গৃহীত হবে। পরবর্তী কোনো শুভ দিনক্ষণ দেখে র্গিজায় বিবাহ সম্পন্ন হবে তবে রেওয়াজ আছে যে রবিবার এবং যিশু খ্রিষ্টের জন্মের মাসে কোনো বিবাহ সম্পন্ন হবে না। গির্জায় এই পদ্ধতিতে নাম লেখানোকে বন্দ বা বন্ধন বলা হয়ে থাকে।
হিন্দু বা সনাতন ধর্মের প্রাচীন রীতির মধ্যে ছিল বিবাহ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত পাত্র-পাত্রী কোনো আহারই গ্রহণ করতে না। গায়ে হলুদে ব্যবহৃত হলুদ ছেলের গায়ের স্পর্শ করে কনের বাড়িতে পাঠানো হতো। সেই হলুদ কনের গায়ে লাগানো হতো। নিয়ম ছিল গায়ে হলুদের সময় বর সেলাই করা কোনো কাপড় পরিধান করতো না। পাত্র পাত্রীকে বরণ করতে কালো কাজললতা, দেশলাই, সুতো, হলুদবাটা, চন্দন, পঞ্চ শষ্যসহ আরো নানা বিধ উপকরণ দিয়ে বরণ ডালা সাজানো হতো। (এখানে উল্লেখ্য যে ঠিক একই আয়োজনে মুসলিম, খ্রিষ্ট এবং বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে হলুদ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়ে থাকে।)
সম্প্রতিক সময়ে মানুষের জীবনযাত্রায় গতির সঞ্চার বৃদ্ধি পেয়েছে সাথে নানাবিধ কুসংস্কার মুক্ত হয়ে মানুষ নিজেকে আবিষ্কার করেছে আলোর দিকে ফলে অনেক পুরোনো রীতিনীতি এখন আর গ্রাহ্য করা হচ্ছে না। ১৯৬১ সালে জারিকৃত অধ্যাদেশে বলা হয়েছে সকল ধর্ম বর্ণ গোষ্টির বিবাহ অবশ্যই স্থানীয় সরকার প্রশাসনের মাধ্যমে রেজিষ্ট্রি করাতে হবে।

 

বিয়ে, সাদী, বিবাহ, নিকাহ্ এই চারটি শব্দের সাথে বাঙালি বাংলা ভাষাভাষি সকলেই পরিচিত। বিয়ে সব নারী পুরুষের জীবনেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বা অধ্যায়। পৃথিবীর সকল ধর্মেই বিবাহকে উৎসাহীত করা হয়েছে। এটি একটি প্রাচীন প্রথা, প্রাচীন একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান। অবাধ যৌনাচার শুধু সামাজিক অনাচার তৈরী করে না উৎপাদন ঘটায় এমন কতগুলো রোগ শোক যা সকল অর্থেই ঝুকিপূর্ন এবং অসম্মানজনক। সামাজিক শৃংখলা বংশ ধারা রক্ষায় বিয়ের প্রয়োজনীয়তা উপেক্ষা করার কোনো পথ নেই। বিয়ের আয়োজন সকল ধর্ম জাতি গোষ্ঠির মধ্যেই আনন্দের এক সাজ সাজ রব। বিয়েকে কেন্দ্র করে বর কনে উভয় পক্ষের মধ্যে আনন্দ বেদনা আর নতুন সম্পর্কের সেতু বন্ধন এ এক স্বর্গীয় সুষমা। আধুনিক বিজ্ঞান প্রমান করেছে যে শুধু মানব সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রেম ভালোবাসার সৃষ্টি হয় এমন নয়, মানুষ ছাড়াও অন্যান্য পশু পাখির মধ্যেও প্রেম ভালোবাসার নিদর্শন প্রত্যক্ষ করা যায়। পশু পাখিদের মধ্যে প্রথাগত মন্ত্র উচ্চারণ করে বিয়ে হয় না কিন্তু বিপরীত লিঙ্গের নর ও নারী তারা একত্রে র্দীর্ঘদিন বসবাস করে সুখের সংসার রচনা করে। বিয়ে নিয়ে সারা পৃথিবীজোড়া প্রবাদ প্রবচন সহ অনেক উন্নত মানের সাহিত্য রচনার ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করা যায়।

বিয়ের আয়োজনে প্রত্যেক ধর্ম জাতি গোষ্ঠির মধ্যে নিজ নিজ রীতি নীতি আচার অনুষ্ঠান বিদ্যমান। আজকাল মানুষের জীবন যাত্রার নাগরিক যে তাড়া বেড়েছে তার কোনো বাহানার শেষ নেই ফলে সকল আয়োজনেই তার প্রভাব পড়ছে। এক সময় লক্ষ্য করা যেত যে বিবাহের আয়োজন নিয়ে দু’টি পরিবার শুধু নয় একটি মহল্লা কিংবা একটি পুরো গ্রাম আনন্দের জোয়ারে ভাসছে। বেশ দুরে থেকে মাইকে, কলের গান, বিয়ের গান বিয়ের গীত কখনো রেকর্ড, ক্যাসেট কিংবা সমবেতভাবে নানা বয়সী নারী পুরুষে কণ্ঠে শোনা যেতো। আজ আর সেই ধরনের আয়োজন খুব একটা লক্ষ্য করা যায় না। নানা বর্ণের কাগজ কেটে ত্রিকোণ নিশান, ঝালর কেটে পুরো বাড়ি সাজিয়ে তোলা এ কাজগুলো চলতো দিনের পর দিন অংশ নিতো পাড়া প্রতিবেশী, তরুণী-তরুণ তখনো চলতো নাচ, গান, ছড়াকাটা, ধাঁধাঁ বলা, কবিতা আবৃত্তি ইত্যাদি। আজ আর মানুষের অত সময় নেই তাই খবর দেয়া হচ্ছে ডেকোরেশন কোম্পানীগুলোকে, যে আমাদের বাড়ীতে বিয়ে সাজিয়ে দিয়ে যাও আর অমনি হাজির হয়ে গেলো লাল, নীল, হলুদ বাতি আরো কত কী সাজানোর সরঞ্জাম। আর এখন হাল ফ্যাশনের অনেক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে বিবাহের আনন্দ আয়োজনকে কত আধুনিক আরো কত আনন্দঘন করা যায় সেই বিবেচনা মাথায় রেখে।
এমন অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে যে আপনাকে কোনো ঝামেলেই আর যেতে হবে না। আপনি শুধু অর্থের যোগন দেবেন আর কী চাইছেন তাই জানিয়ে দিন, সেই সেই মতো সকল কিছু হাজির হয়ে যাবে আপনার সামনে। ব্রাইডাল ম্যানেজমেন্ট, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানীর কোনো কমতি নেই আপনার হাতের কাছে।
বিয়ের রীতিনীতি
জাতি ধর্ম ভেদে বিবাহের রীতিনীতি বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানের মধ্যে সম্পন্ন হয়ে থাকে। বাংলাদেশে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ধর্মালম্বীদের বিয়ের আয়োজন প্রায়ই আমাদের চোখে পড়ে এবং আমরা নানা অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করে সামাজিক দায়িত্ব পালন ও আনন্দ অনুভব করে থাকি। এই ভারতীয় উপমহাদেশে বিবাহের বহু মাত্রিক আয়োজন বিভিন্ন ধর্মের আচার অনুষ্ঠানের মধ্যে পরষ্পর প্রবেশ করেছে স্বাভাবিক স্বাচ্ছন্দে। কন্যা দর্শন, কন্যা পছন্দ, বর পছন্দ এর সাথে যে সামাজিক আচার অনুষ্ঠানগুলো আমরা লক্ষ্য করি তা মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে কিছু খুব ভিতর গত পার্থক্য ছাড়া প্রায় সব একই রকম। আর এটি সংক্রমিত হয়েছে র্দীর্ঘ দিনের সৌহার্দপূর্ণ সহবস্থানের মধ্যে দিয়ে সাম্প্রদায়ীক সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্তও এটি। মুসলিম বিবাহের প্রাথমিক পর্যায়ে কন্যার বাড়িতে যে প্রস্তাব নিয়ে মুরুব্বীগণ উপস্থিত হন একে প্রস্তাব বা পায়গাম বলা হয়ে থাকে। তারপর কন্যা দর্শনের দিনক্ষন ঠিক করা, ঠিক একই পদ্ধতিতে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে কন্যা দর্শনের রীতি রয়েছে। কন্যা দর্শনের পরে খ্রিষ্ট সম্পদায়ের বিবাহের প্রস্তাবটি কিছুটা ভিন্ন, বর কণে পক্ষ উভয়ে সম্মত হলে পরে বর এবং কণের নাম গির্জায় প্রধান ধর্ম যাযক এর কাছে লিপিবদ্ধ করতে হয় । ফাদার পরপর তিন রোববার তাদের বিস্তারিত পরিচয়সহ বিবাহের প্রস্তবটি তুলে ধরবেন এতে কারো কোনো প্রকার আপত্তি না থাকলে প্রস্তাবটি গৃহীত হবে। পরবর্তী কোনো শুভ দিনক্ষণ দেখে র্গিজায় বিবাহ সম্পন্ন হবে তবে রেওয়াজ আছে যে রবিবার এবং যিশু খ্রিষ্টের জন্মের মাসে কোনো বিবাহ সম্পন্ন হবে না। গির্জায় এই পদ্ধতিতে নাম লেখানোকে বন্দ বা বন্ধন বলা হয়ে থাকে।
হিন্দু বা সনাতন ধর্মের প্রাচীন রীতির মধ্যে ছিল বিবাহ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত পাত্র-পাত্রী কোনো আহারই গ্রহণ করতে না। গায়ে হলুদে ব্যবহৃত হলুদ ছেলের গায়ের স্পর্শ করে কনের বাড়িতে পাঠানো হতো। সেই হলুদ কনের গায়ে লাগানো হতো। নিয়ম ছিল গায়ে হলুদের সময় বর সেলাই করা কোনো কাপড় পরিধান করতো না। পাত্র পাত্রীকে বরণ করতে কালো কাজললতা, দেশলাই, সুতো, হলুদবাটা, চন্দন, পঞ্চ শষ্যসহ আরো নানা বিধ উপকরণ দিয়ে বরণ ডালা সাজানো হতো। (এখানে উল্লেখ্য যে ঠিক একই আয়োজনে মুসলিম, খ্রিষ্ট এবং বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে হলুদ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়ে থাকে।)
সম্প্রতিক সময়ে মানুষের জীবনযাত্রায় গতির সঞ্চার বৃদ্ধি পেয়েছে সাথে নানাবিধ কুসংস্কার মুক্ত হয়ে মানুষ নিজেকে আবিষ্কার করেছে আলোর দিকে ফলে অনেক পুরোনো রীতিনীতি এখন আর গ্রাহ্য করা হচ্ছে না। ১৯৬১ সালে জারিকৃত অধ্যাদেশে বলা হয়েছে সকল ধর্ম বর্ণ গোষ্টির বিবাহ অবশ্যই স্থানীয় সরকার প্রশাসনের মাধ্যমে রেজিষ্ট্রি করাতে হবে।

বরযাত্রা
বরযাত্রা বিবাহ অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষনীয় একটি পর্ব। অল্প কিছুদিন আগেও বরযাত্রায় পালকি ঘোড়ার গাড়ি জল পথে বাহারী বাহারী নৌযান ব্যবহার করা হতো। বরযাত্রা সাজানো নিয়েও মানুষের সার্মথ অনুযায়ী আয়োজনের শেষ নেই। একটি বিশেষ দিনকে আরো প্রাণবন্ত স্মরণীয় করে রাখতে, পোশাক থেকে শুরু করে গাড়ীর বহর, আতশবাজী পোড়ানো সব কিছুতেই আনন্দকে ধরে রাখতে প্রাণান্ত চেষ্টা।
বরযাত্রা কণের বাড়ীতে উপস্থিত হওয়ার ক্ষণযেন আরো এক আনন্দের হিলোøাল। সদর দরজা থেকে অন্দরমহল পর্যন্ত এক কলকাকলী গুঞ্জরণ, বর এসেছে বর এসেছে। কণের নিকট আত্মীয় ভাই বোনেরা গেট আগলে ধরে নতুন বরের কাছ থেকে বক্শীস আদায় করা তখন উভয় পক্ষে মিঠে কড়া নানা কথা পরিবেশকে করে তোলে যেন আরো অম্ল-মধুর।
বর বিয়ের গেট থেকে ছাড়া পেয়ে গিয়ে বসলো তো বরের স্টেজে আর অমনি লুকানো হয়ে গেল বরের নতুন নাগরা জুতো। আর এ নিয়ে নানা হাস্যরস , এমনি করেই যেন নতুন সম্পর্ককে আরো নিবীর করে তোলা।
হাল ফ্যাশানেও বরযাত্রার আয়োজনে নানা বৈচিত্র লক্ষ্য করা যায়। মটর শোভাযাত্র ছাড়াও এখন প্রায়ই দেখা যায় ঘোড়ার গাড়ীতে বরযাত্রার আয়োজন। প্রতীকি পালকির ব্যবহারও শহরে-নগরে চোখে পড়ে আজকাল।

কন্যা দান
বিবাহের যাবতীয় আপ্যায়ন অনুষ্ঠানিকতা শেষে আসে কন্যা দান পর্বটি। এটি একটি বেদনা ভারাক্রান্ত মুহূর্ত এই বিদায় ক্ষণটিতে নিকট আত্মীয় সকলেই অশ্রু সজল হয়ে ওঠে। জীবনের দীর্ঘ সময় পিতা-মাতার অকৃত্রিম ¯েœহে ভালোবাসায় লালিত পালিত হয়ে স্বামীর ঘরে চলে যাবার বিদায় লগ্নটি যেন হৃদয়ের অতলে গিয়ে স্পর্শ করে। পরিবারের মুরুব্বীগণ কন্যাকে স্বামীর হাতে তুলে দেন তাদের ভালোবাসার ধন তখন নানা আবেগঘণ কথা শোনা যায় উভয় পক্ষে। বর পক্ষ থেকে দেয়া হয় নানা প্রবোধ বাণী। মায়ার জাল ছিন্ন করে অশ্রুভরা নয়নে কন্যাকে বিদায় নিতে হয় জীবনের নতুন এক দীর্ঘ
যাত্রাপথের সূচনায়।


চাঁদ দেখা
বিবাহ অনুষ্ঠানের মধ্যে এ পর্বটি বেশ আমোদঘন একটি সময় আপ্যায়নের কিছু পরে এই সুন্দর মুহূর্তটি আসে, বরকে নিয়ে আসা হয় কণের কাছে, তখন কণের হাতে বর গ্রহণ করেন শরবত ও মিষ্টান্ন। মালাবদলও চলে পরস্পর বর কনের মধ্যে। এ সময় উপস্থিত থাকেন সাধারণত আনন্দমহলের নারীগণ মা, খালা, দাদী, মামী, ফুফু, বোন, সই পাড়া-প্রতিবেশি সকলে। তারপর ওড়না কিংবা লাল বেনারসি কাতানে বর ও কণে মাথা ঢেকে আড়াআড়িভাবে নিচে রাখা হয়, আয়নায় তখন এক সাথে বর কণের সুন্দর অবয়ব ভেসে ওঠে। পরস্পর দৃষ্টি বিনিময় হয় একে শাহ্্-নজর Ÿলা হয়ে থাকে।

বৌভাত
এই পর্বটি অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে বরের বাড়িতে। বউ ঘরে তোলার পর বর পক্ষের সকল আত্মীয়-স্বজনসহ পাড়া প্রতিবেশি বন্ধু-বান্ধবদের নিমন্ত্রন করা হয়। বৌভাতের অনুষ্ঠানে নতুন দম্পতি সকলকে স্বাগত জানান আপ্যায়ণ পর্বে। এই অনুষ্ঠাটিতে আর কোন ঝামেলা থাকে না। আপ্যায়ণ তদারকি করা আর উপহার সামগ্রী গুছিয়ে রাখা


বরযাত্রা বিবাহ অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষনীয় একটি পর্ব। অল্প কিছুদিন আগেও বরযাত্রায় পালকি ঘোড়ার গাড়ি জল পথে বাহারী বাহারী নৌযান ব্যবহার করা হতো। বরযাত্রা সাজানো নিয়েও মানুষের সার্মথ অনুযায়ী আয়োজনের শেষ নেই। একটি বিশেষ দিনকে আরো প্রাণবন্ত স্মরণীয় করে রাখতে, পোশাক থেকে শুরু করে গাড়ীর বহর, আতশবাজী পোড়ানো সব কিছুতেই আনন্দকে ধরে রাখতে প্রাণান্ত চেষ্টা।
বরযাত্রা কণের বাড়ীতে উপস্থিত হওয়ার ক্ষণযেন আরো এক আনন্দের হিলোøাল। সদর দরজা থেকে অন্দরমহল পর্যন্ত এক কলকাকলী গুঞ্জরণ, বর এসেছে বর এসেছে। কণের নিকট আত্মীয় ভাই বোনেরা গেট আগলে ধরে নতুন বরের কাছ থেকে বক্শীস আদায় করা তখন উভয় পক্ষে মিঠে কড়া নানা কথা পরিবেশকে করে তোলে যেন আরো অম্ল-মধুর।
বর বিয়ের গেট থেকে ছাড়া পেয়ে গিয়ে বসলো তো বরের স্টেজে আর অমনি লুকানো হয়ে গেল বরের নতুন নাগরা জুতো। আর এ নিয়ে নানা হাস্যরস , এমনি করেই যেন নতুন সম্পর্ককে আরো নিবীর করে তোলা।
হাল ফ্যাশানেও বরযাত্রার আয়োজনে নানা বৈচিত্র লক্ষ্য করা যায়। মটর শোভাযাত্র ছাড়াও এখন প্রায়ই দেখা যায় ঘোড়ার গাড়ীতে বরযাত্রার আয়োজন। প্রতীকি পালকির ব্যবহারও শহরে-নগরে চোখে পড়ে আজকাল।

কন্যা দান
বিবাহের যাবতীয় আপ্যায়ন অনুষ্ঠানিকতা শেষে আসে কন্যা দান পর্বটি। এটি একটি বেদনা ভারাক্রান্ত মুহূর্ত এই বিদায় ক্ষণটিতে নিকট আত্মীয় সকলেই অশ্রু সজল হয়ে ওঠে। জীবনের দীর্ঘ সময় পিতা-মাতার অকৃত্রিম ¯েœহে ভালোবাসায় লালিত পালিত হয়ে স্বামীর ঘরে চলে যাবার বিদায় লগ্নটি যেন হৃদয়ের অতলে গিয়ে স্পর্শ করে। পরিবারের মুরুব্বীগণ কন্যাকে স্বামীর হাতে তুলে দেন তাদের ভালোবাসার ধন তখন নানা আবেগঘণ কথা শোনা যায় উভয় পক্ষে। বর পক্ষ থেকে দেয়া হয় নানা প্রবোধ বাণী। মায়ার জাল ছিন্ন করে অশ্রুভরা নয়নে কন্যাকে বিদায় নিতে হয় জীবনের নতুন এক দীর্ঘ
যাত্রাপথের সূচনায়।
চাঁদ দেখা
বিবাহ অনুষ্ঠানের মধ্যে এ পর্বটি বেশ আমোদঘন একটি সময় আপ্যায়নের কিছু পরে এই সুন্দর মুহূর্তটি আসে, বরকে নিয়ে আসা হয় কণের কাছে, তখন কণের হাতে বর গ্রহণ করেন শরবত ও মিষ্টান্ন। মালাবদলও চলে পরস্পর বর কনের মধ্যে। এ সময় উপস্থিত থাকেন সাধারণত আনন্দমহলের নারীগণ মা, খালা, দাদী, মামী, ফুফু, বোন, সই পাড়া-প্রতিবেশি সকলে। তারপর ওড়না কিংবা লাল বেনারসি কাতানে বর ও কণে মাথা ঢেকে আড়াআড়িভাবে নিচে রাখা হয়, আয়নায় তখন এক সাথে বর কণের সুন্দর অবয়ব ভেসে ওঠে। পরস্পর দৃষ্টি বিনিময় হয় একে শাহ্্-নজর Ÿলা হয়ে থাকে।

বৌভাত
এই পর্বটি অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে বরের বাড়িতে। বউ ঘরে তোলার পর বর পক্ষের সকল আত্মীয়-স্বজনসহ পাড়া প্রতিবেশি বন্ধু-বান্ধবদের নিমন্ত্রন করা হয়। বৌভাতের অনুষ্ঠানে নতুন দম্পতি সকলকে স্বাগত জানান আপ্যায়ণ পর্বে। এই অনুষ্ঠাটিতে আর কোন ঝামেলা থাকে না। আপ্যায়ণ তদারকি করা আর উপহার সামগ্রী গুছিয়ে রাখা

Page 4 of 8

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…