Page 5 of 8

INTERSTELLAR

ফুয়াদ বিন নাসের আবির

 

 

‘ইন্টারস্টেলার’ মুভিটি দেখতে যাওয়ার সময় বেশ ভয়ে ছিলাম। চলচ্চিত্রটি মুক্তি পাওয়ার প্রায় দুই সপ্তাহ পর দেখতে যাচ্ছি। কাজেই মানুষের খুব প্রশংসায় এটি নিয়ে প্রত্যাশা বেড়ে গিয়েছিল দশগুণ। একজন পাঁড় নোলানভক্ত (মতান্তরে নোলানয়েড) হিসেবে এর আগেও প্রত্যাশার ভারে ইনসেপশন ভালো লাগেনি। তাই ভয়ে থাকাটা স্বাভাবিক। কেমন লাগলো তা হয়তো এখন বোঝানো যাবে না। তবে এতটুকু বলতে পারি, আমরা কয়েকজন হল থেকে বের হয়ে ১৫ মিনিট কোনো কথা বলতে পারিনি। সবার মস্তিষ্কই ব্যস্ত ছিল চলচ্চিত্রটির অন্তিম মুহূর্তগুলো হজম করার দুরূহ কাজে।
ইন্টারস্টেলার ছিল জোনাথান নোলানের মস্তিষ্ক প্রসূত একটি উচ্চাভিলাষী প্রজেক্ট। সে প্রজেক্টটি হাতে নিয়েছিলেন শিতফেন স্পিলবার্গকে মাথায় রেখে। তবে শুরুতেই জুরাসিক ওয়ার্ল্ডের শুটিংয়ে ব্যস্ত হয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক পছন্দ হিসেবে প্রজেক্টে চলে আসে বড় ভাই ক্রিস্টোফার নোলান। ওই দুই ভাইয়ের জুটির অন্যান্য চলচ্চিত্রের মতো (মেমেন্টো, প্রেস্টিজ, ইনসেপশন, ফলোয়িং) এখানেও স্ক্রিপ্ট লেখার কাজ শুরু করে জোনাহ। ছবির বিজ্ঞান অংশ যথাযথ রাখার জন্য নিয়োগ দেয়া হয় ক্যালটেকের বিখ্যাত অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট কিপ থর্নকে। কিপ থর্নকে নিয়োগ দেয়া ছিল চলচ্চিত্রটির ‘গুড’ থেকে ‘গ্রেট’ হওয়ার পথে প্রথম ধাপ। স্ক্রিপ্টের সিংহভাগ ও স্পেশাল এফেক্টের প্রায় পুরোটাই কিপ থর্নের থিওরেটিকাল গবেষণার অংশ ছিল। চলচ্চিত্রটি বক্স অফিস মাত করে দিলেও পদার্থ বিজ্ঞান পরীক্ষায় যেন ফেল না করে এ বিষয়ে নোলান আগেভাগেই নিশ্চিত করেছে এভাবেই। কিপ থর্নের মডেল অনুসরণ করে যেভাবে ওয়ার্মহোল, ব্ল্যাকহোল বা ফিফথ ডাইমেনশান নোলান আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন তা নিঃসন্দেহে শ্বাসরুদ্ধকর অভিজ্ঞতা।

মহাকাশবিদ্যাই কি এ চলচ্চিত্রটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক? অবশ্যই নয়। চলচ্চিত্রটির পটভূমিটিই বড় অদ্ভুত। ভবিষ্যতের পৃথিবী। সেখানে ভূমি এমনই ঊষর হয়ে গেছে। এতে গুটিকয়েক শস্য ছাড়া অন্য কিছুই ফলানো সম্ভব নয়। এ পৃথিবীতে মানুষের প্রধান পেশা কৃষি কাজ, জৈবজ্বালানির ভা-ার প্রায় নিঃশেষ। এর মধ্যে ক্ষণে ক্ষণে হানা দেয় ভয়ানক বালুঝড়। মানব জাতি কোনোমতে টিকে আছে পৃথিবীতে। এ রকমই একটি সময় মহাকাশচারী কুপার (ম্যাথু ম্যাককনাহে) ও তার পরিবার নিয়ে শুরু হয় ইন্টারস্টেলারের কাহিনী। ভবিষ্যতের পৃথিবীতে মহাকাশযাত্রা বন্ধ হয়ে গেছে অনেক আগেই। কাজেই সবার মতো কুপারের পেশাও কৃষি কাজ। তার বড় ইচ্ছা ছেলে ও মেয়ে দু’জনই মহাকাশ বিজ্ঞান পড়বে। কিন্তু স্কুল থেকে বলা হয়, পৃথিবীতে এখন মহাকাশচারীর থেকে কৃষক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এরই মধ্যে কুপারের মেয়ে মার্ফের (ম্যাকেঞ্জি ফয়) রুমে এক অশরীরী অস্তিত্ব প্রায়ই হানা দেয়। বই আপনাআপনি পড়ে যায় শেলফ থেকে, মাঝে মধ্যে দুর্বোধ্য সংকেত দেয়ারও চেষ্টা করে। এ রকমই এক সংকেতের মর্ম উদ্ধার করে কুপার আবিষ্কার করে নাসার এক অতি গোপনীয় প্রজেক্ট। সে জানতে পারে, মানব জাতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার শেষ ভরসা নাসার ওই মিশন। মিশনে তার সঙ্গে যোগ দেন মিশনের হেড প্রফেসর ব্র্যান্ডের মেয়ে (অ্যান হ্যাথওয়ে)। মিশনের সবাই জানে- তারা যাচ্ছে অনেক দূরে। আমাদের এই মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি ছাড়িয়ে অজানা অন্য কোনো গ্যালাক্সিতে বসবাসযোগ্য গ্রহের সন্ধানে। সেখানে হয়তো গড়ে উঠবে মানব জাতির নতুন বাসস্থান। তারা সবাই জানে, ফিরে আসার সম্ভাবনা শূন্যের কোঠায়। যদি ফিরে আসা হয়, তাহলে পৃথিবীতে পেরিয়ে যাবে অনেক সময়। তাই নিজেদের পরিবারকে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে পড়েন অজানার উদ্দেশে।


চলচ্চিত্রটির এই বিন্দু থেকে কাহিনী দু’ভাগে ভাগ হয়ে যায়। এক পটভূমিতে আমরা দেখি, কুপারের নেতৃত্বে মহাকাশযান এন্ডিউরেন্সের অভিযান। সেখানে সময়ের ¯্রােত ধীরে বইছে। কারণ তারা ততক্ষণে পৌঁছে গেছে একটি কৃষ্ণ গহ্বরের খুব কাছাকাছি। অন্যদিকে আমরা দেখতে পাই, পৃথিবীতে যেখানে সময় বইছে খর¯্রােতা নদীর মতো সেখানে ছোট্ট মার্ফ বড় হয়ে (জেসিকা চ্যাসটেইন) কাজ করছে অশীতিপর বৃদ্ধ প্রফেসর ব্র্যান্ডের (মাইকেল কেইন) অধীন। সে মেলানোর চেষ্টা করছে এক দুরূহ ইকুয়েশন। তা দেবে মানবমুক্তির সন্ধান। আরও মেলানোর চেষ্টা করছে তাকে তার বাবা ছেড়ে যাওয়ার বেদনা এবং বাবার প্রতি অভিমানটি এক সুরে।
ইন্টারস্টেলারের বিশ্লেষণ করতে গেলে ভবিতব্য হিসেবেই সবার প্রথম চলে আসবে কুব্রিকের ম্যাগনাম ওপাস ‘২০০১ : আ স্পেস ওডিসি’র সঙ্গে তুলনা। স্পেস ওডিসি ওই সময়ের সাই-ফাই ছবির একটি মাইলফলক ছিল। তা অনেক বছর পর্যন্ত কেউ ছুঁতে পারেনি। তেমনি নোলানের ম্যাগনাম ওপাস ইন্টারস্টেলারও এই যুগের সাইাফাই ছবির মাইলফলক হয়ে থাকবে- এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। এ চলচ্চিত্রটি মাইলফলক হয়ে থাকবে গত বছরের সেরা অভিনেতার অস্কার বিজয়ী ম্যাথু ম্যাককোনাহে, অ্যানে হ্যাথওয়ের ক্যারিয়ারেও। কারণ সেলুলয়েডের ক্যানভাসে ফুটে ওঠা বিজ্ঞানের জটিল থিওরি, ইকুয়েশন বা মহাজাগতিক সত্য ছাপিয়ে দিন শেষে উঠে এসেছে দুই বাবা ও তাদের দুই মেয়ের বিচ্ছেদ এবং তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রামের কাহিনী। মহাজাগতিক একাকিত্ব, অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনার মতো ভয়, অহানায় হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা- এ ধরনের অনন্যসাধারণ কিছু অনুভূতি নিয়ে খেলা করেছেন নোলান। তার বাছাই করা অভিনেতাদের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স সবকিছু ছাপিয়ে আবেগটিই রুপালি পর্দায় সার্থকভাবে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। অস্কারজয়ী সংগীত পরিচালক হান্স জিমারের সুরের মূর্ছনা ও নিউ ডিল স্টুডিওর চোখ ধাঁধানো স্পেশাল ইফেক্টস- সব মিলিয়ে ইন্টারস্টেলার নোলানের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা কাজ হওয়ার জোর দাবিদার।
সবশেষে যারা এখনো ইন্টারস্টেলার দেখেননি তাদের জন্য ছোট একটা উপদেশ হলো, ছবিটি দেখার আগে ব্ল্যাকহোল, ওয়ার্ম হোল, স্পেশাল ও জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটি নিয়ে যদি কিছুমাত্রায় হোমওয়ার্ক করে যান তাহলে মুভিটি উপভোগের আনন্দ দ্বিগুণ হয়ে যাবে। এছাড়া আপনিও আমার মতো ছবি শেষ করার পর ১৫ মিনিট কোনো কথা বলতে পারবেন না- এটি গ্যারান্টি!

নবান্নের দেশে

 

 

“জমি উপড়ায় ফেলে গেছে চাষা
নতুন লাঙ্গল তার পড়ে আছে পুরানো পিপাসা
জেগে আছে মাঠের উপরে;
সময় হাঁকিয়া যায় পেঁচা ওই আমাদের তরে
হেমন্তের ধান ওঠে ফ’লে
দুই পা ছড়ায়ে বস এইখানে পৃখিবীর কোলে ”


‘রূপসী বাংলা’র কবি জীবনানন্দ দাশ তাঁর কবিতার পঙ্তিতে এঁকেছেন বাংলার শাশ্বত রূপের রঙিন অবয়ব যা গ্রাম-বাংলার প্রতিটি জনপদের পরিচিত যাপিত জীবন। সময়ের নাগরদোলায় বৈচিত্র্যে অনিন্দ্য বাংলার মাসগুলো বৃত্তাকারে ঘুরে ঘুরে আমাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক সর্বোপরি প্রাকৃতিক জীবনকে রেখেছে সচল। ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে ছয়টি ঋতুর মোড়কে বারোটি মাস জলে-স্থলে অন্তরীক্ষের ক্যানভাসে আঁকে স্বকীয় রূপ। ষড়ঋতুর এই বঙ্গে হেমন্তের অবস্থান চতুর্থ। ইংরেজী মধ্য অক্টোবর থেকে মধ্য ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্তিক ও অগ্রহায়ণ এই দুই মাস হেমন্তের খামে বাঙালির ঘরে-বাইরে হাটে-মাঠে-ঘাটে আচার ও সংস্কৃতিতে নিয়ে আসে অভাব ও সমৃদ্ধির দ্বৈত উপহার। কার্তিক মূলত কৃষিগৃহস্থ জীবনে অভাব-অনটনের মাস হিসেবে পরিচিত। কৃষি প্রধান গ্রাম-বাংলায় এই সময় অকাল বন্যাসহ নানারকম প্রাকৃতিক দূর্যোগের ফলে কৃষকের কাজ থাকে না। গোলাঘর থাকে শূন্য। বহুমুখি ফসল উৎপাদন উপযোগী জমিও প্রস্তুত না থাকায় প্রতিটি জনপদে একরকম হাহাকার লক্ষ্য করা যেত কিছুদিন আগেও। বর্তমানে এই পরিস্থিতির খুব যে ব্যত্যয় ঘটেছে তা বলা যাবে না। শরতের শুভ্র শরীর বর্ণিল হতে থাকে হেমন্তের শুরুতে তবে অগ্রহায়ণের উপস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে দেয় প্রকৃতির দৃশ্যপট। মসৃণ ও স্পষ্টতার অনুভব নিয়ে ষড়ঋতুর এ দেশে ঋতুরানীর পরে হাজির হয় ঋতুকন্যা হেমন্ত। মৌন, শীতল ও অন্তর্মুখী হওয়া এ ঋতুর প্রধান বৈশিষ্ট্য।

উৎসব মানেই আমরা বুঝি হেমন্তকে। এর নেপথ্যে যথার্থ কারণও রয়েছে, সুজলা-সুফলা এ দেশের প্রধান ফসল ধান। বর্ষার শেষ দিকে বোনা আমন-আউশ শরতে বেড়ে ওঠে। আর হেমন্তের প্রথমে তাতে পাক ধরে। হেমন্তের প্রথম মাস কার্তিকের শেষ দিকে পাড়াগাঁয়ের মাঠে মাঠে ধান কাটার ধুম পড়ে। পাকা ধানের গন্ধে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে ম-ম গন্ধ। কবি সুফিয়া কামাল তাঁর কবিতায় সেই ফসল তোলার চিত্রটি এঁকেছেন দারুণভাবে “রিক্তের অঞ্চল ভরি, হাসি ভরি, ক্ষুধার্তের মুখে/ভবিষ্যৎ সুখের আশা ভরি দিল কৃষকের বুকে”। মাঠে মাঠে হেমন্তের ধানক্ষেতের রূপ নিয়ে কবি জসীমউদ্দীন লিখেছেন “সবুজে হলুদে সোহাগ ঢুলায়ে ধানক্ষেত,/পথের কিনারে পাতা দোলাইয়া করে সাদা সঙ্কেত। কৃষাণ কনের বিয়ে হবে, হবে তার হলদি কোটার শাড়ি/হলুদে ছোপায় হেমন্ত রোজ কচি রোদ রেখা-নাড়ি।” এছাড়াও অসংখ্য কবিতা এবং শিল্পীর রকমারি সুর অবিরত গেয়ে চলে উৎসবমুখর হেমন্তের বৈচিত্র্যময় জয়গান। শীতের আগমনী বার্তা ও তেজোদীপ্ত রৌদ্রকিরণের বিদায় নিয়ে আসে হেমন্ত। এসময় দিক পরিবর্তনে বাতাস উত্তর থেকে দক্ষিণে বইতে থাকে, নাতিশীতোষ্ণ। কার্তিকের পরের মাস চিরায়ত বাংলার আমন প্রধান অঞ্চলে অগ্রহায়ণ নিয়ে আসে আশির্বাদ। ধান কাটার ভরা মৌসুম এ অগ্রহায়ণ। ফসলি মাঠের ঢেউ উপচে পড়ে কৃষকের গোলায়, আঙিনায়, চাতালে। এই সময়ে নতুন ধানে কিষাণ-কিষানীদের আনন্দ আর ব্যস্ততার সীমা থাকে না। পুরুষরা সারাদিন মাঠে ধান কাটে। নারীরাই সেই ধান সারাদিন মাড়াই করে সেগুলোকে সেদ্ধ করে ও রোদে শুকায় আর গোলায় ভরে।


যদিও বর্তমান সময়ে কৃষিকাজের সকল ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। হেমন্তের এই শেষ মাসটি সারাবছরের পরিশ্রমের ঘামে ফলানো ফসল কৃষকের মরমে সোনালি প্রলেপ মেখে দেয়। তাই যুগযুগ ধরে এই মাসটি ‘নব অন্ন’ নতুন ভাত বা ‘নবান্ন’ নামে পরিচিতি পেয়ে আসছে। এই সময় সকল কৃষকের ঘরে থাকে নতুন ধান। সেই ধানের চাল দিয়ে কৃষকপরিবার পিঠা-পুলির ধুম পড়ে যায়। অগ্রহায়ণ তখন রূপ নেয় উৎবের আমেজে। এই উৎসবে হরেক রকম পিঠা তৈরি হয়। নামের মতই বৈচিত্র্যময় পিঠাগুলো স্বাদে অনন্য, যেমন- চিতই, পাকানো, পাকোয়ান বা পাক্কন, পাটিশাপটা, কুশলি, ভাপা, পাতা, ভাত, কাটা, নকশি, পুলি, দুধ বা ভিজানো, ছিটা, লবঙ্গ, গোকুল, ম্যারা, মুঁঠা, সিদ্ধ, পুতুল, লরি, চাছি, সাগুদানা, ঝুড়িসীতা, তারাজোড়া, জামাই, জামদানি, হাদি, পাটা, তেজপাতা পিঠাসহ আরও অসংখ্য বাহারি নামের পিঠা বাড়িতে বাড়িতে তৈরি করা হয়। এই সময় আতœীয় স্বজনরা বেড়াতে আসে। তাদের নতুন চালের পিঠা দিয়ে আপ্যায়ন করানো হয়। এভাবেই গ্রাম বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে নবান্নের আমেজ। স্মরনাতীত কাল থেকেই ধন-ধান্যে ভরা অগ্রহায়ণ মাসকে বছরের প্রথম মাস ধরে বর্ষ গণনার রীতির প্রচলন ছিল এ অঞ্চলে। অগ্রহায়ণ হলো বছরের অগ্রে যে যায়। তাই অগ্রহায়ণের স্থলে গ্রীষ্মের বৈশাখ কী করে বাংলাবর্ষের প্রথম মাস হলো তা এখনো রহস্য। নতুন ধানে, নতুন অন্নে ধীমান প্রকৃতির মেজাজ বাঙালির ফসল কাটার উৎসবকে উসকে দেয় বহুগুণে। হেমন্তের শেষ মাসটিতে রোদের আঁচ কম থাকায় না শীত, না গরম এমন আরামপ্রদ তাপমাত্রায় সময়ের টানে ছোট হতে থাকে দিন। সকালে সবুজ ঘাঁস ও আমন ধানের পাতায় শিশির বিন্দু মুক্ত দানার মতো চিক চিক করে। বৃন্তচ্যুত শিউলী ফুল এসময় সৌরভ ছড়ায়। বেলি, সন্ধ্যা মালতি, দোপাটি, বক, জুঁই, কামিনী, গোলাপসহ অসংখ্য ফুল হেমন্তে ফুটে প্রকৃতিকে সুরভীত করে তুলে। বর্তমান অর্থনীতিতে বিশেষত আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে যদিও উৎপাদন বেড়েছে তবে পরিবহণের বেহাল দশা ও বাজারে মধ্যসত্ত্বভোগীদের স্বেচ্ছাচারীতার কারনে কৃষক ফসলের নায্য মূল্য থেকে প্রায়ই বঞ্চিত হয়। যার ফলে নবান্নের আনন্দ সর্বজনীন হয়ে ওঠে না। কেবল কৃষি নির্ভর গ্রাম নয়, বাংলাদেশের শহরগুলোতেও কার্তিক ও অগ্রহায়ণ স্বকীয় বৈশিষ্ট্যম-িত। নগরের ইট-কাঠ কংক্রিটের জঞ্জালে বেঁচে থাকা জীবনও সমান তাড়িত হয় কার্তিকের কৃপণতা আর অগ্রহায়ণের সুদিন সন্দেশের পরশে। অগ্রহায়ণের শুরু থেকেই শহরের রাস্তায় মৌসুমী পিঠার দোকান বসে। ভাপা, পটিশাপটা ইত্যাদি পিঠার বেচা বিক্রি নেহাত কম নয়।
আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে জ্বর, খুশখুশে কাশিসহ নানারকম রোগ-
বালাইয়ের কমবেশি প্রাদুর্ভাব দেখা যায় শহর ও গ্রামে। সনাতন ধর্মালম্বী বাড়িগুলোতে হেমন্তকালে কলেরা আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে আকাশবাতি জ্বালানোর প্রচলন ছিল। সময় বদলেছে। বর্তমানে মোটামুটি দৃঢ়তার সাথে বলা যায় খাদ্যাকালের মতো দূর্যোগ আর কলেরার মতো মহামারি বাংলাদেশের জীবন বাস্তবতায় অতীত।

 

লেখা : শাকিল সারোয়ার
মডেল : মুনমুন
পোশাক ও স্টাইলিং : মোঃ রাকিব খান
মেকওভার : ক্লিওপেট্রা বিউটি সেলুন 
ছবি : তানভীর মাহামুদ শোভন
সহযোগিতায় : আলী ইমাদ সরকার

Boyhood - ফিল্ম রিভিউ 

ফুয়াদ বিন নাসের আবির

 

পরিচালক রিচার্ড লিংকলেটার যখন জানান দিয়েছিলেন, ‘বয়হুড’ চলচ্চিত্রটি তার ১২ বছরব্যাপী প্রজেক্ট তখন অনেকে ভ্র কুঞ্চিত করেছিলেন, কী এমন ছবি বানাচ্ছেন যার জন্য এক যুগ ধরে গবেষণা করতে হবে? যারা বয়হুড দেখে ফেলেছেন তারা হয়তো আঁচ করতে পারবেন, কেন ১২ বছর ধরে এর পেছনে শ্রম দিয়েছেন পরিচালক। এ চলচ্চিত্রটি সম্পর্কে বলা যায়, সেলুলয়েডের কাব্য দিয়ে বাস্তব জীবনের যতটা কাছে যাওয়া সম্ভব এর থেকেও এক-দুই পা সামনে এগিয়ে গিয়েছেন রিচার্ড লিংকলেটার।
নাম থেকেই ছবির বিষয়বস্তু সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। ৭ বছর বয়সের ছোট্ট ছেলে মেসন জুনিয়রের (এলার কোলট্রেইন) ছেলেবেলার দিনগুলোর কাহিনী বয়হুড। এখানে গবেষণার সুযোগ কোথায়? ঠিক গবেষণা নয়, পরিচালক ইচ্ছা করলেই ভিন্ন বয়সের মেসনের চরিত্রে অন্য অভিনেতাদের দিয়ে কাজ চালিয়ে নিতে পারতেন। কিন্তু সোজা পথে না গিয়ে তিনি বেছে নিয়েছেন এক অনিশ্চয়তাপূর্ণ এক্সপেরিমেন্ট করার সুযোগ। চলচ্চিত্রটির মুখ্য অভিনেতা এলার কোলট্রেইন ৭ বছর বয়স থেকে শুরু করে টানা এক যুগ প্রায় প্রতি উইকএন্ড কাটিয়েছেন পরিচালক রিচার্ড লিংকলেটারের প্রডাকশন সেটে। এর ফলই হচ্ছে এই অনন্য চলচ্চিত্র।


ওই ছবিটি এগিয়ে গেছে লিনিয়ার টাইমলাইনে ২০০২ সাল থেকে শুরু করে সামনের দিকে। পুরো ছবিটি সত্যিকার অর্থে মেসন জুনিয়র ও তার পরিবারের কাহিনী নিয়ে বানানো কিছু স্বল্পদৈর্ঘ্যরে চলচ্চিত্রের সমন্বয় বলা যায়। কিন্তু গোটা ছবিতে কখনোই আমরা কোনো চরিত্রের মুখ থেকে সরাসরি জানতে পারিনি এটি কোন বছর চলছে। পরিচালক বিভিন্ন কৌশলে দর্শককে জানান দেন সময়ের ব্যাপারে। কখনো ইরাক যুদ্ধের প্রসঙ্গ, কখনো বা হ্যারি পটার মুভির রিলিজ বা ওই আমলের কোনো একটি জনপ্রিয় গান আমাদের মনে করিয়ে দেয় সে বছরটির কথা। হয়তো অন্য কোনো একটি দৃশ্যে মেসনের চুলের কাটিং বা চেহারা দেখে আমরা বুঝতে পারি, কিছু সময় পার হয়েছে। ছোট কিছু ঘটনা যার গুরুত্ব হয়তো দর্শক তৎক্ষণাৎ ধরতে পারে না। কিন্তু অনেক বছর পর এর পুনরাবৃত্তি আবার দর্শককে মনে করিয়ে দেয়। পুরো ছবির ব্যাপারটি যেন নস্টালজিয়া লেইনে এক চক্কর মারার মতো। এক্ষেত্রে কেবল নিজের স্মৃতি সরণিতে না হেঁটে আমরা পরিচালকের হাত ধরে হাঁটছি ছোট্ট এক ছেলের স্মৃতির লেনে।
পুরো ছবি আমরা দেখি মেসন জুনিয়রের দৃষ্টিকোণ থেকে। ইরাক যুদ্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ তার জগতে কোনো ঢেউ খেলায় না, বরং সে পরবর্তী হ্যারি পটার মুভির রিলিজ ডেট নিয়ে বেশি উৎসাহী হয়। আমরাও একই সঙ্গে তার উত্তেজনা উপভোগ করি। সে যখন হাসে-কাঁদে তখন আমরাও হাসি বা কাঁদি। আমাদের চোখের সামনে সে বড় হয়ে ওঠে। আমরা প্রত্যক্ষ করি তার মা-বাবার ভালো গুণগুলো কীভাবে বয়সের সঙ্গে তার মধ্যে প্রস্ফুটিত হচ্ছে। কোনো ভালো গল্পকারের মতো পরিচালক সরাসরি আমাদের কিছু বলে দেন না। তবুও আমরা বুঝতে পারি।


পর্দায় শুধু মেসন জুনিয়র নয়, আমরা দিন গড়ানোর সঙ্গে পরিণত হতে দেখি তার মা-বাবাকেও। মেসনের মা-বাবা ডিভোর্সড। তার মা অলিভিয়া (প্যাট্রিসিয়া আর্কেট) তাকে ও তার বোনকে নিয়ে টেক্সাস চক্কর মারেন। বাবা মেসন সিনিয়র (ইথান হক) সন্তানদের কাস্টডি পাননি। কাজেই তাকেও প্রায়ই চক্কর মারতে হয় নিজের সন্তানদের সঙ্গে দেখা করার জন্য। অলিভিয়া বুদ্ধিজীবী ঘরানার মানুষ, লিবারেল ফেমিনিস্ট ও কলেজের প্রফেসর। দুই সন্তান, বয়ফ্রেন্ড, সাবেক স্বামী- এত সম্পর্কের টানাপড়েনে তার জীবন চক্কর দেয়। মেসন সিনিয়র মধ্যবয়স্ক চাকরীজীবী। কিন্তু তিনি জীবন কাটাতে চান ব্যাচেলরের মতো। দায়-দায়িত্বহীন নির্ভার মানুষের মতো তিনি আনন্দ খুঁজের বাড়ান তার আশপাশ থেকে। মজার ব্যাপার হলো, মেসন তার সামনে দু’জনকে পাশাপাশি দেখে- একজন কর্মক্লান্ত একঘেয়ে জীবনযাপনে অভ্যস্ত, অন্যজন আনন্দ-ফুর্তিতে মত্ত। এই চলচ্চিত্রে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা শুধু মেসনের চিন্তা-ভাবনা পরিণত হতে দেখি তা নয়। আমাদের চোখের সামনে তার মা-বাবার চরিত্রেও পরিবর্তন আসে। তাদের চিন্তা-ভাবনার বিবর্তন দেখি। তাদের ছেলের মতো তারাও বড় হতে থাকেন। মেসনের মতো তারাও বুঝতে পারেন, ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’-এর মর্মার্থ।
বয়হুড চলচ্চিত্রে ছোটখাটো বেশ কিছু খুঁত আছে, বিভিন্ন দৃশ্যায়নে আছে কিছু অসঙ্গতি। কিন্তু দিন শেষে পৌনে ৩ ঘণ্টার রুপালি পর্দার এ যাত্রাটিকে কখনোই আলাদা দৃশ্য বা চরিত্র অথবা সংলাপ দিয়ে বিচার করতে যাওয়া উচিত নয়। এই কাব্যের শক্তি এর সামগ্রিকতা ও সারল্যে। ছবির দ্বিতীয় দৃশ্যেই আমরা দেখতে পাই মেসন সবুজ ঘাসের ওপর শুয়ে আছে, চোখ অসীম আকাশে। কোনো সংলাপ নেই, অভিব্যক্তির কোনো পরিবর্তন নেই। তার ছোট্ট মাথায় কী খেলা করছে তা জানার উপায় নেই।
বিফোর সানরাইজ, সানশেড, মিডনাইটখ্যাত পরিচালক লিংকলেটারের অন্যান্য ছবির মতো এটিও আপনাকে ভাবাবে, খেলা করবে আপনার আবেগ-অনুভূতি নিয়ে। এই ছবির সবচেয়ে ভালো দিক হলো, পরিচালক কোনো কিছুই জোর করে বোঝাতে চেষ্টা করেননি, কোনো কিছুই প্রমট করা হয়নি পর্দার অন্তরাল থেকে। যা হয়েছে তা স্বাভাবিক সারল্যেই হয়েছে। ছবিটি দেখার পর যে অনুভূতির পরশ পাবেন তা একান্তই আপনার নিজস্ব, পরিচালক এখানে ভাগ বসাতে আসবেন না।

জীবন ও পতনের গল্প

 


সিনেমার কাহিনীতে দেখা যায়, নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে মিঠু। চাকরি খোঁজে এখানে সেখানে। বিভিন্ন কোম্পানীর অফিসে সিভি জমা দেয় কিন্তু তার মতো হাবা টাইপের ছেলেকে কেউই পাত্তা দেয় না। কেউ সিভি গ্রহণ করলেও পরক্ষণে তা ফেলে দেয়। এভাবেই চলতে থাকে তার চেষ্টা। ঘটনাচক্রে এক ব্যক্তির মাধ্যমে সে যুক্ত হয় ‘মাল্টি লেবেল মার্কেটিং’ বা এমএলএম ব্যবসার সঙ্গে। সেখান থেকে তাকে হাজারো রঙিন স্বপ্ন দেখানো হয়। একদিন সে অনেক টাকার মালিক হয়ে যাবে, বাড়ী, গাড়ি কোন কিছুরই তার অভাব থাকবে না। এই ভেবে সে শুধু স্বপ্ন দেখতেই থাকে। একদিন চোরাই মোবাইল কিনতে গিয়ে জনপ্রিয় নায়িকা রিমার একটি মোবাইল তার হাতে আসে। মোবাইলটিতে নায়িকা রিমার বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে একটি প্রাইভেট ভিডিও ক্লিপ ছিল। ভিডিও ক্লিপটিতে নায়িকা রিমা ও তার বয়ফ্রেন্ডের ব্যক্তিগত ও অন্তরঙ্গ কিছু সময় ভিডিওতে ধারণ করা আছে। যা কোনভাবে কারও হাতে গেলে ফেসবুক, ইউটিউব এসকল স্যোসাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়তে পারে, এতে রিমার ইমেজ ও ক্যারিয়ারে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে, সেই আতঙ্কে থাকে রিমা। মিঠু সেই সুযোগটি কাজে লাগায়। শুরু হয় রিমার জীবনে নতুন উপদ্রব। একপর্যায়ে একদিন ‘সিনেমাতে স্বামী-স্ত্রী যেভাবে মেলামেশা করে, একজন আরেকজনকে ভালোবাসে, মিঠু এই রকম একটা প্রস্তাব রিমাকে দিয়ে বসে। মিঠুর এই জাতীয় প্রস্তাবে রিমা আকাশ থেকে পড়ে। মিঠু রিমাকে ভিডিওটির কপি আছে বলে ভয় দেখায়। রিমা তার কথায় বাধ্য হয়ে অনেক কিছুই করে কিন্তু সব করতে সে রাজি হয় না। মিঠুকে একপর্যায়ে রিমা চড় মারে, তার অমানবিক আচরণের জন্য। মিঠু অমানবিক হয়ে ওঠে। অনেকটাই ‘সাইকো’! সে শুধু রিমা নয়, টাকা নেয় বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে। হঠাৎ পত্র-পত্রিকায় এমএল এম নিয়ে নেতিবাচক লেখালেখি, তদন্ত এসবের কারণে এই বাণিজ্য বন্ধ হয়ে পড়ে। পাওনাদারেরা টাকার জন্য তাগাদা দেয় মিঠুকে। তার বাড়িতে এসে খোঁজে। মিঠু বাড়িছাড়া, ঘরছাড়া। পালিয়ে বেড়ায়। যখন তাকে বাড়িতে দেখা যায়, তখন সে অনেকটাই অপ্রকৃতিস্থ। এদিকে রিমা ও তার ভিডিও ক্লিপটি ফাঁস হওয়ার আতঙ্কে ভয়ে থাকে। এভাবেই এগিয়ে যায় পরবর্তী কাহিনী।

পিঁপড়াবিদ্যা জীবন ও পতনের গল্প। ইঙ্গিত প্রতীকী দৃশ্যে এই সময়ের বাংলাদেশকেই তুলে ধরে। পরিচালক ইঙ্গিত করেছেন অনেক কিছুই, যা সমকালীন নানা বাস্তবতার ওপর ফোকাস করে। এমএলএম কর্মকর্তার দারিদ্র্য জাদুঘর তত্ত্ব, সেক্স ভিডিও ক্লিপ

 

ইত্যাদি। রিমার বাড়িতে খাবার টেবিলে মিঠুর পানি খাওয়ার দৃশ্যটিতে অবদমিত কাম স্পষ্ট
ফুটে ওঠে। চাবি দেওয়া পুতুলটির মাথা নেড়ে অনিচ্ছা ও অনৈতিকতার কথা মনে করিয়ে
দেয়। মিঠুর তিনবার মুখ ধোয়াও সিগনিফিকেন্ট। অসংখ্য পিঁপড়া মিঠুর মুখে কিংবা পিঁপড়া নেই অথচ মেঝেতে পিঁপড়া মারতে চাওয়া লোভের জালে আটকে যাওয়ারই ইঙ্গিত। ম্যানিকুইনের সঙ্গে মিঠুর রাত্রিবাস,
সেলফোন কোম্পানি, করপোরেট পলিটিক্স বাদ যায়নি, মিঠুর বান্ধবীর স্বামী চরিত্রের মধ্য দিয়ে। তার চরিত্রটি বোকা ও ডেমো মনে হলেও, দুর্নীতির নানা চিত্র ফাঁস হয় কল্পিত বর্ণনায়।
লংশট, মিডশট, ক্লোজশট, ব্যাকরণ আর সময়কালের ব্যাপ্তি কখনও ছবির একমাত্র শর্ত হতে পারে না। ভালো ছবির তো অবশ্যই না। ছবি যদি সময়কে ধারণ করে, জীবন যদি উপজীব্য হয়, দর্শক যদি নিজের বা অন্যের জীবনকে মেলাতে পারে ছবির সঙ্গে, তবে তাই ছবি। মনে রাখতে হবে, ছবি জীবনের অনুকরণ। ইমিটেশন অব লাইফ। সরাসরি সম্প্রচার বা লাইভ ব্রডকাস্ট আর যাই হোক, তাকে চলচ্চিত্র বলা যায় না।
বাংলাদেশে গত কয়েক দশক থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণ করে আসছেন মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। একে একে নির্মাণ করেছেন ব্যচেলর, মেইড ইন বাংলাদেশ, থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার, টেলিভিশন ও সর্বশেষ সম্প্রতি মুক্তি পায় ‘পিঁপড়া বিদ্যা’। তার চলচিত্রের গল্প বলার ঢং সব সময়ই একটু আলাদা গৎবাধাঁ নির্মাণ নিয়মের বাইরে। সমাজে গঠিত অনেক কিছুই ঘটে যা কিনা, সেখানে যেমন উঠে আসে পরিবার, মহল্লা, প্রেম, যৌনতা, হটকারিতা, রাজনীতি আরও নানান বিষয়। ‘টেলিভিশন’ ছাড়া তার পূর্বের প্রায় সকল পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে নাগরিক জীবনের নানান অলিগলি ফোকাস হলেও এই চলচ্চিত্রে মধ্যবিত্ত এক তরুণের গল্প, মিডিয়া, মাল্টিলেবেল মার্কেটিং বিষয়গুলোকেই প্রাধান্য দেয়া হয়েছে।

লেখা : দিগন্ত সৌরভ
ছবি : গোলাম মাওলা নবীর ও আব্দুল্লাহ আল মুক্তাদির

আবু হেনা মোস্তফা কামাল
তাঁর গান ও আমি

সুজিত মোস্তফা



আমার বাবা সম্পর্কে কিছু লেখাটা আমার জন্য সব সময়ই একটু কঠিন একটা বিষয়। এ রকম বহুগুণ সম্পন্ন অমিত প্রতিভাধর একটি মানুষ সম্পর্কে লিখতে যে রচনাশৈলী ও প্রজ্ঞার দরকার এর কোনোটিই আমার নেই। কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ছাত্রছাত্রীরা তাঁর কাছে পাঠ নিয়েছেন বা বক্তব্য শুনেছেন বা তাঁর সঙ্গে আড্ডায় মেতেছেন তারা সবাই জানেন কী ধরনের প্রতিভা, ব্যক্তিত্ব, নীতি, জ্ঞান এবং গুণের সমন্বয় ছিল তাঁর। এমন মানুষের মূল্যায়ন করা আমার সাধ্যাতীত। কিন্তু এ রকম ভার্সেটাইল উচ্চমান সম্পন্ন মানুষ খুঁজতে গেলেই বুঝতে পারি, তিনি কী অসাধারণ মানুষ ছিলেন! ছোটবেলায় তাঁর প্রখর ব্যক্তিত্বের সামনে আমরা প্রায় কাচুমাচু অবস্থায় বড় হয়েছি। তবে শাসনের মধ্যেও আমাদের স্বাধীনতা ছিল অপার। যে যার ইচ্ছামতো বিষয় নিয়ে পড়তে পেরেছি। সব কাজের জবাবদিহিতা ছিল না তেমন। সাংসারিক খোঁজখবরের দায়িত্ব মোটামুটি আমার মায়ের ওপর ছেড়ে দিয়েই স্বস্তিতে থাকতেন তিনি। তবে ছোটবেলা থেকেই অর্থকষ্ট ছিল আমাদের সংসারজুড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরির বেতন আর টুকটাক গান বা কবিতা লিখে এ দেশে তখন ভালো উপার্জন করা ছিল একটা দুরূহ কাজ। আর গান লেখার তার প্রবাহমানতার ধারাটি সবচেয়ে বেশি বহমান ছিল যে সময়, ঠিক সে সময়টি বিভিন্ন রাজনীতির স্বীকার হয়ে তাকে ঢাকা ছাড়তে হয়। সেসব জায়গায় অর্থ জোগানোর জন্য গান লেখার না ছিল চাপ, না ছিল সে রকম প্রেরণা। কিছু গান তিনি ঢাকার বাইরে থাকা অবস্থায় লিখেছিলেন শিক্ষক জীবনে। সেগুলোর মধ্যে অনেক জনপ্রিয় গান আছে। কিন্তু ছাত্র অবস্থায় লেখা তাঁর অনেক গান কালজয়ী হয়েছে। এর মধ্যে ‘আমি সাগরের নীল’, ‘ভ্রমরের পাখনা যতদূরে যাক না’, ‘আমার প্রথম দেখার সে ক্ষণটিরে ভুলবো কেমন করে’, ‘তোমার কাজল কেশ ছড়ালো বলে’, ‘পথে যেতে দেখি আমি যারে’, ‘সেই চম্পা নদীর তীরে’, ‘কথা দিলাম আজকে রাতে’- এ রকম অনেক গান রয়েছে। গান লেখা ছিল অনেকটা তার হাতে ছেলের হাতের মোয়ার মতো। কিন্তু স্বভাবে  বোহেমিয়ান ছিলেন বলে কোনো গান বা লেখার কোনো কপি সংরক্ষণ করতেন না। কবি নজরুলের মতোই বলতেন, সমুদ্র থেকে এক ঘঁটি জল গেলে কিছু আসবে যাবে না।
‘আমি যে তোমার কাছে চৈত্র শেষের ঝরাপাতা/আমার এই দীর্ঘশ্বাসে হয় না কারো মালা গাঁথা॥’


একবার চট্টগ্রাম বেতারে সুর করে গাওয়ানোর জন্য গোটা দশেক গান আমার গুরু মিহির লালার হাতে দিয়েছিলেন তিনি। যথানিয়মে কোনো কপি রাখেননি। এর মধ্যে আমার রেডিওতে কর্মরত চাচা আবুল হায়াৎ মোহাম্মদ কামাল মিহির কাকুর কাছ থেকে গানগুলো নিয়ে একটি গান সৈয়দ আনোয়ার মুফতিকে দিয়ে সুর করে গাইয়েছিলেন। গানটি ছিল-
‘আমি বাতাসে শুনেছি তোমার নিমন্ত্রণ/বহুদিন পর পেয়েছি তোমার চিঠি/যাবো কি যাবো না ভাবি আজ সারাক্ষণ॥’
উমা খানের গাওয়া গানটি বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল তখন। অন্য গানগুলো যে কী হলো সে খোঁজ আর পাইনি কোনদিন। আব্বার ভীষণ জনপ্রিয় গান খুব অবলীলায় অন্য গীতিকারের নামে তার জীবদ্দশাতেই চলতে শুনেছি। এমনকি কয়েকদিন আগেও আমার এক ছাত্রী ইউটিউব থেকে নামিয়ে কণ্ঠে তুলেছে একটি গান- ‘শত জনমের স্বপ্ন তুমি আমার জীবনে এলে’। এটি ‘রাজলক্ষ্মী-শ্রীকান্ত’ ছবির একটি বিখ্যাত গান। বাবার লেখা ও আলাউদ্দিন আলির সুর। অথচ ইউটিউবে উল্লেখ আছে অন্য গীতিকারের নাম। যাই হোক। এসব অবিচার তার প্রতি সারা জীবন হয়েছে, মৃত্যুর পরও হবে, অস্বাভাবিক কী?
আব্বা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা অবস্থায় রুনা লায়লার জন্য লিখে দিয়েছিলেন, ‘অনেক বৃষ্টি ঝরে তুমি এলে’, ‘হাতের কাঁকন ফেলেছি খুলে’ ইত্যাদি গান। এগুলোর জনপ্রিয়তার ব্যাপারে সবাই জানেন। জনপ্রিয় অনেক গানই হয়। কিন্তু আবু হেনা মোস্তফা কামালের গানগুলো পড়ে দেখলে বোঝা যায়, উপমা অনুপ্রাসের কী দুর্দান্ত ব্যবহার! তার গানের কবিতায় কোনো কম্প্রোমাইজ নেই। এমনকি চলচ্চিত্রের গানও তিনি লিখেছেন দৃশ্য চাহিদা অনুযায়ী কবিতায় কোনো ছাড় না দিয়ে। তার লেখা, ‘তুমি যে আমার কবিতা’ বাংলাদেশে চলচ্চিত্রের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য গান হিসেবে স্বীকৃত। তিনি ঢাকার বাইরে থাকার কারণে চলচ্চিত্রে খুব বেশি গান লেখেননি। কিন্তু যা লিখেছেন তা অসাধারণ মান বজায় রেখে লিখেছেন।


প্রায় দুই হাজার গান লিখেছিলেন আমার বাবা। আমি মাত্র আড়াইশ’র মতো উদ্ধার করতে পেরেছি। এর মধ্যে বেশির ভাগ গানেরই সুর পাইনি। সুর নিজে কিছু করে নিচ্ছি। হয়তো কিছু অন্য কাউকে দিয়ে করাবো। তবে অসাধারণ যেসব পঙ্্ক্তিমালা হারিয়ে গেছে সেগুলোর শোক আমাকে আমরণই বয়ে যেতে হবে।
আব্বার গলা ছিল মধুমাখা। ‘আমি এত যে তোমায় ভালোবেসেছি’ গানটি তিনি এমন এক মাদকতা নিয়ে গাইতেন যার তুলনা নেই। আমরা জানি, এটা শ্যামল গুপ্তের লেখা মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের নিজের সুরে গাওয়া একটি গান এবং আধুনিক বাংলা গানের ইতিহাসে এটি একটি মাইলফলক। অথচ ওই গানটি গেয়ে মানবেন্দ্র আমাকে যতটা আকর্ষিত করেছিলেন এর চেয়ে বেশি করেছিলেন আমার বাবা। কোনো পক্ষপাত নিয়ে বলছি না। তালাত মাহমুদের কণ্ঠের একটু অনুকরণ তুলে তিনি মাতিয়ে দিতে পারতেন শ্রোতাকে। গানটি নিয়ে তাঁর ভাবনার কেন্দ্রটি ছিল হয়তো অনেক আলাদা। এ কারণে সেটি আমার কাছে অন্য মাত্রায় প্রতিভাত হয়েছিল। একবার বাবাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তুমি এত ভালো গাওয়ার পরও গানের লাইনে কেন গেলে না? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, একাডেমিক লাইনে আমার ক্ষমতা ও সম্ভাবনা বেশি ছিল, তাই। বাংলাদেশে ভালো কবিরা সহজে গান লিখতে চান না। গান লেখা বোধহয় আরও একটু কঠিন। এর সীমাবদ্ধ ফরম্যাটের মধ্যে অল্প কথায় গীতলতার সঙ্গে যে গল্প তুলে আনতে হয় তা সম্ভবত সবাই পারেন না। আমার মনে হয়, আব্বা গাইতে পারতেন বলে গানের কবিতার ব্যাপারে তাঁর অনুভব অনেক গভীর ছিল।
তাঁর গান নিয়ে যে সুরস্রষ্টারা কাজ করেছেন তাদের মধ্যে আবদুল আহাদের সঙ্গে তার কম্বিনেশনটি খুব ভালো কাজ করতো বলে মনে হয়। কোনো মানুষের আসলে বেশি ভার্সেটাইল হওয়া ভালো নয়। সব কাজই যিনি পারেন, কোনো বিশেষ একটি কাজে সম্পূর্ণ নিবিড়ভাবে তো তিনি সময় দিতে পারেন না। ফলে তার কাজের সময় ভাগ হয়ে যায়। বাবা যদি শুধু গীতিকার বা কবি কিংবা গবেষক অথবা উপস্থাপক বা শুধু অন্য কিছু হতেন তাহলে হয়তো ওই একমাত্র চর্চিত মাধ্যমটিকে অসম্ভব কোনো উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারতেন। ‘আমি সাগরের নীল নয়নে মেখেছি’ গানটিতে তিনি যখন লেখেন- ‘অঙ্গ ভরেছি তোমার প্রেমের অপরূপ তন্দ্রাতে’ তখন আমি এই শব্দ কল্পনা ও প্রকাশভঙ্গির অসামান্য সৌন্দর্যে প্রশংসা করার ভাষা হারিয়ে ফেলি। এ রকম অসংখ্য লাইন তাঁর বিভিন্ন গানের মধ্যে অবলীলায় বার বার ব্যবহৃত হয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাকে বা তাঁর সৃষ্টি নিয়ে আমরা আলোচনাবিমুখ হয়ে আছি। সম্ভবত তিনি যথাযথভাবে আলোচিত হলে অনেক মুখোশধারীর প্রকৃত দীনতা প্রকাশ পেয়ে যাবে।

আমার গানের জগতে আসাটা যেন জন্ম থেকেই নির্ধারিত ছিল। ৬ বছর বয়সে আমার হাতে আসে গীতবিতান। এটি যে গানের বই তা জানতাম না। অথচ সেগুলো ওই বয়সেই সুর কল্পনা করে গুন গুন করে গাইতাম। এরপর ১০ বছর বয়সে সঙ্গীতে হাতেখড়ি হলো রাজশাহীর অনুপ কুমার দাশের হাতে। চট্টগ্রামে মিহির লালা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এসে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের তালিম দেয়া শুরু করলেন। কিন্তু উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের মন্দ্রতা, গভীরতা ও সৌকর্য আমাকে টান দিল অন্য কারণে। কলেজে প্রথম বর্ষে পড়া অবস্থায় মোটরসাইকেল চালাতে গিয়ে অ্যাক্সিডেন্ট করি। এরপর পিঠে ব্যথা শুরু হয়। আমাকে দেড় মাস একটি কাঠের তক্তার ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে থাকতে হয়েছিল। বাসায় বই ছাড়া সময় কাটানোর জন্য কিছুই ছিল না। এমনকি একটা রেডিও পর্যন্ত ছিল না। যার মোটরবাইকে অ্যাক্সিডেন্ট করেছিলাম সেই অর্থনীতিবিদ স্বপন আদনান কাকা তাঁর অপরাধ বোধ থেকে কি না জানি না, আমাকে তার স্পুল টেপ রেকর্ডারটি ধার হিসেবে দিলেন। বাজানোর মতো পুরনো দুটো স্পুল বাসায় ছিল। আমাদের একটি স্পুল রেকর্ডার ছিল যেটি ১৯৭১ সালে লুট হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু দুটো স্পুল বেঁচে গিয়েছিল। এগুলোয় রেডিও থেকে ধারণ করা কিছু গান ছিল। আমার কলেজের প্রিন্সিপ্যাল হারুন স্যার ছিলেন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতভক্ত। তাঁর কালেকশনে ছিল অল ইন্ডিয়া রেডিওর শনিবার রাতের ন্যাশনাল ক্ল্যাসিকাল প্রোগ্রামের বড় একটা সংগ্রহ। আমাকে সময় কাটানোর জন্য সেগুলো শুনতে দিলেন তিনি। যেহেতু কিছু করার নেই সেহেতু শোনা শুরু হলো উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত। কানের কাছে ক্রমাগত ঘ্যানর ঘ্যানর ঘ্যান। অসহ্য লাগতো। শিল্পী ছিলেন সব মহীরুহ। যেমন- উস্তাদ আলাউদ্দীন খান, বিলায়েৎ খান, রবিশঙ্কর, নিখিল ব্যানার্জি, এটি কানন, ওঙ্কারনাথ ঠাকুর, ডিভি পালুসকার, করিম খান, ফৈয়াজ খান, আমির খান, গোলাম মুস্তাফা খান, হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়া, পান্নালাল ঘোষ, ভীম সেন যোশীসহ অনেকে। ওই নামগুলোর সঙ্গে আমার পরিচয়ই ঘটলো এ স্পুলগুলোর কল্যাণে। আমি অবাক বিস্ময়ে দেখলাম এই ঘ্যানর ঘ্যানর ঘ্যান এক সময় তার অপরূপ রূপ মাধুর্য নিয়ে আমাকে এক অনিন্দ্যসুন্দর জগতে নিয়ে যাচ্ছে। এই শুরু হলো আমার রুচির পরিবর্তন। আমি প্রায় কৈশোরেই বুঝে গিয়েছিলাম কোনো শ্রোতার রুচি তৈরি করতে হলে তাকে প্রয়োজনে বাধ্য করতে হবে ক্রমাগত মানসম্পন্ন সঙ্গীত শুনতে। এখন যেমন টিভি চ্যানেলগুলো ক্রমাগত অধিকাংশ ক্ষেত্রে রুচি ধ্বংসের কাজটি প্রবল মুনশিয়ানার সঙ্গে করে যাচ্ছে।


যাই হোক। ওই সময়েই স্পুল টেপ রেকর্ডারটিতে মান্না দে’র বেশকিছু গান রেকর্ড করে নিয়েছিলাম এক বন্ধুর সংগ্রহ থেকে। ওই গানগুলো শুনতে শুনতে এমনিই গলায় এসে গিয়েছিল। সেগুলো আবার নিজেই শিখে ওই রেকর্ডারে ধারণ করে রাখতাম। আমার রাগী বাবাকে সেগুলো শোনানোর সাহস ছিল না। এ রকম সময়ে আব্বার খুব প্রিয় ছাত্র সারোয়ার জাহান চাচা এসেছিলেন আমাদের বাসায় রাজশাহী থেকে। তিনি গানগুলো শুনে আমাকে যেন আবিষ্কার করেছিলেন। আমাকে না জানিয়ে বাবাকে শুনিয়েছিলেন সেসব গান। ব্যস, আমার গানের সবচেয়ে বড় ভক্ত হয়ে গেলেন বাবা। ঢাকায় এসে ছায়ানটে ভর্তি হলাম এবং বেশকিছু গানের বন্ধু জুটে গেল যারা কম-বেশি সবাই ভালো গান করতো। আমাদের সার্বক্ষণিক আলোচনা ছিল সঙ্গীত নিয়ে। তবে আঁতলামোরও অন্ত ছিল না। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত ছাড়াও আমরা নজরুল, রবীন্দ্র ও আধুনিক বাংলা গান নিয়ে উঠেপড়ে লাগলাম। প্রতিটি গানের চুলচেরা বিশ্লেষণ, ভালো লাগা, মন্দ লাগার অকপট উচ্চারণ, হাকিম চত্বরে বসেই রাগ-রাগিণী বিশ্লেষণ, তান বিস্তারের খেলা- কত কী! বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে ‘ডাকসু’র সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় নাম দিয়ে একের পর এক প্রাইজ আনা শুরু করলাম ঘরে। পড়াশোনা শেষ করেছিলাম হেলাফেলায়। কারণ মনের মধ্যে স্বপ্ন ছিল একটাই, গান শিখবো। ১৯৮৬ সালের ৫ ডিসেম্বর ভারত সরকারের বৃত্তি নিয়ে সঙ্গীত অধ্যয়ন করতে শান্তিনিকেতন যাত্রা করলাম। পরদিন ঢাকায় এলেন আমার স্বপ্নের সঙ্গীতশিল্পী মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়। আব্বার সঙ্গে তাঁর দেখা, গান, গল্প-গুজব আড্ডা হওয়ার খবর পেলাম। কিন্তু আমি তাঁর দেখা পেলাম না। শান্তিনিকেতন থেকে ১৯৮৭ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি কলকাতা গেলাম দুটি উদ্দেশ্য নিয়ে। এক. মানবেন্দ্রর সঙ্গে দেখা করবো এবং দুই. আমার প্রথম স্কেল চেঞ্জার হারমোনিয়াম কিনবো। সারা দিন হারমোনিয়ামের বাজারে কাটিয়ে বিকেলে গেলাম যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে শিল্পীর বাড়িতে। শিল্পী দেখাই দিলেন না। ভেতর থেকে জানিয়ে দিলেন, সময় নেই। আমার আকুতি বুঝেই বোধহয় বললেন পরের দিন সকালে যেতে। তখন মাত্র ৬০০ টাকা স্কলারশিপ পাই। এটাতেই আমার থাকা, খাওয়া ও অন্যান্য খরচ চালাতে হয়। এক রাত কলকাতায় থাকা তখন আমার হিসেবে এক কাঁড়ি টাকার শ্রাদ্ধ। সেখানে যাতায়াতও তখন ছিল কষ্টকর, ব্যয়সাধ্য। কলকাতাজুড়ে কাটা রাস্তা, খানাখন্দর, আন্ডারগ্রাউন্ড রেলওয়ে নির্মাণের কাজ চলছিল। যাই হোক। ওই রাত কোনো রকমে যাপন করে আমি ও আমার সহপাঠী জহর দত্ত সকাল ১০টায় গেলাম মানবেন্দ্র-এর বাড়িতে। ফিনফিনে শাদা ধুতি ও ঘিয়ে রঙের ফতুয়া গায়ে নজরুল সঙ্গীতের রাজকুমার ড্রয়িংরুমে এসে বসলেন। ‘কী চাও তোমরা?’
বাবার পরিচয় দিয়ে বললাম, আমি আপনার গানের ভীষণ ভক্ত, আপনাকে একটু সামনাসামনি দেখতে চেয়েছিলাম।
‘দেখা তো হলো, এখন যাও।’


স্তম্ভিত হয়ে তাঁর উত্তর শুনলাম। অনেক ভয়ে বললাম, ‘আপনার কণ্ঠে সামনাসামনি একটা গান শোনার ভীষণ ইচ্ছা ছিল।’
ভ্রƒ কুঞ্চিত করে মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় বললেন, ‘যে কেউ মানবেন্দ্রর বাসায় আসবে এবং বলবে, আপনার একটা গান শুনতে চাই আর তিনিও       হারমোনিয়ম টেনে সহাস্যে একটা গান শুনিয়ে দেবেন, তাই না? বিষয়টি এতই সহজ?’
আমার মুখে কোনো ভাষা ছিল না। প্রত্যাখ্যানের বেদনা নয়, মানবেন্দ্রর আচরণ আমার স্বপ্নের জগৎ ভেঙে খান খান করে দিচ্ছিল। এরপরও অনেক কষ্ট ও সাহসে বললাম, আপনার গান শুনেই নজরুলের গান গাই। একটা গান যদি অন্তত আপনাকে শোনাতে পারতাম!
তিনি ভ্রƒ দুটি আরো কুঞ্চিত করে আমার দিকে বেশ খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। বিদেশি অতিথি বলেই কি না জানি না, বললেন- ‘বেশ শোনাও।’ স্ত্রীকে উচ্চকণ্ঠে ডাক দিয়ে বললেন হারমোয়িমটি দিয়ে যেতে।
আমি হারমোনিয়মে হাত দিতেই বললেন, ‘এটি আমার খুব শখের যন্ত্র, সাবধানে বাজাবে।’
আমি তখন অপমানে অপমানে প্রায় স্থবির। খুব হালকা আঙুল চালিয়ে চোখ বন্ধ করে নজরুলের ঠুমরি অঙ্গের আমার অসম্ভব প্রিয় একটি গান গাইলাম। গান শেষ হলে চোখ খুললাম। দেখি, শিল্পী আমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছেন- ‘তুমি কেমন গাও, তুমি জানো?’ আমাকে নিশ্চুপ দেখে বললেন, ‘ইউ আর গুড, টু গুড, ইউ আর টেরিফিক। তুমি আরেকটি গান শোনাও তো?’ পরের গান শুনে বললেন, ‘এইচএমভি থেকে তোমার একটি লং প্লে আমি বের করে দেবো?’
আমার জীবনের অনেক ব্লান্ডারের একটা বোধহয় ছিল সেটি। বললাম, আমি আসলে শিখতে এসেছি। দিল্লি যাওয়ার চেষ্টা করছি প-িত অমরনাথের কাছে পিওর ক্ল্যাসিকাল শেখার জন্য। বাকি গল্প স্বপ্নের মতো। নিজে হারমোনিয়ম টেনে নিয়ে আমাদের ৭ খানা গান শোনালেন তিনি। স্ত্রীকে ডেকে আমাদের সঙ্গে আলাপ করালেন। তাদের মেয়ে মানসীর বয়স তখন ১৪-১৫ বছর হবে। তাকে ডেকে আলাপ করালেন। ভেতর বাড়ি থেকে চা-মিষ্টি এলো। এরপর বললেন দুপুরে খেয়ে যেতে। আমি আর বেশি কিছু চাইনি। ওই সঞ্চয়টুকুই আমাকে বহুদূর নিয়ে যাবে মনে হয়েছিল। আমি সেই বহুদূরের পথের যাত্রী এখনো। জীবনে গান নিয়ে আরো কত ঘটনা, কত গল্প! মনে হয়, শুধু গান শোনা, শেখা বা রেওয়াজের তালিম নয়- এই দুর্বিনীত আকাক্সক্ষায় সঙ্গীতের সূত্র খোঁজার পুরো পরিক্রমণটিই একটা তালিম। এই দুর্গম পথের কণ্টকে কীর্ণ হওয়া আসলে সুন্দরের পথে এক অনবদ্য যাত্রা। আমি এই পথের অক্লান্ত পথিক। তবে পথের অনুপ্রেরণা ছিলেন আমার বাবা, আমার মা। আমি এখনো অনুভব করি আমার সুর, সংগ্রাম, আবিষ্কার, কষ্ট, আনন্দে ছায়ার মতো তাদের হাতগুলো আমার মাথার ওপর অটল প্রহরীর হয়ে অবস্থান করছে।

দর্শকের বিবেক

টুম্পা রায়

 


ছোট নদী। এর রয়েছে খরস্রোতা ঢেউ। জানো কি কেউ? নদীটি সুদূরে কতটুকু গেছে বয়ে? ছোট নদীও অনেক দূর বয়ে যায়। এরও থাকে খরস্রোতা ঢেউ! তাহলে আকার-আকৃতিতে ছোট মানুষও তো উদ্বেল। প্রাণোচ্ছ্বাসে আমাদের নিরানন্দ বুকে তাদের গুণ ও কাজে তরঙ্গ তুলতে পারে। ছোটখাটো দুই পায়ে বিশাল আকারের জুতা, পরনে টাইট কোট, বিরাট ঢোলা প্যান্ট, হাতে বেতের ছড়ি, বিশেষ ভঙ্গিতে নাকের নিচে একটুখানি ছাঁটা গোঁফে গুজে রাখা চুরুট, মাথায় ডার্বি হ্যাট, ছোট আর আঁকা কালো দুই চোখ- আমাদের পরিচিত এই চেহারা চলচ্চিত্র জগতের এক আইকন। বিংশ শতাব্দীর কিংবদন্তি স্যার চার্লস স্পেন্সার চ্যাপলিন আমাদের প্রিয় চার্লি চ্যাপলিন। বিশ্বের চলচ্চিত্র জগতের বিখ্যাত শিল্পী। অসাধারণ অভিনয়শৈলী ও মেধা দিয়ে তিনি জয় করেছেন সারা পৃথিবীর মানুষের হৃদয়। তার উদ্ভট কা--কারখানায় হেসে কুটি কুটি হয় বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ। পাঁচবার মনোনীত হয়ে তিনবার একাডেমি অ্যাওয়ার্ড বা অস্কার পেয়েছেন তিনি। জীবনে কৃতিত্বের জন্য রানী এলিজাবেথ কর্তৃক তিনি নাইট উপাধি লাভ করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগ দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু উচ্চতা ও ওজন কম হওয়ায় ওই সুযোগ মেলেনি চার্লি চ্যাপলিনের। এ জিনিয়াসকে নিয়ে লিখেছেন  টুম্পা রায়।
 
চ্যাপলিন ১৮৮৯ সালের ১৬ এপ্রিল লন্ডনের স্ট্রিট ওয়ালওয়ার্থ-এ জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্ম নিয়ে সর্বদাই কুয়াশা রয়েছে। তার বাবা ভার্সেটাইল সঙ্গীতশিল্পী ও অভিনেতা চার্লস স্পেন্সার চ্যাপলিন সিনিয়র এবং মা অভিনেত্রী ও সঙ্গীতশিল্পী (লিলি হারলে) হান্না চ্যাপলিন। তারা ছিলেন তিন ভাই- সিডনি জন চ্যাপলিন (জারজ), চার্লি চ্যাপলিন ও জর্জ হুইলার ড্রয়ডেন। ১৮৯১ সালে হান্না চ্যাপলিন প্রেমে পড়েন লিউড্রাইড্রেনের এবং জর্জ হুইলার ড্রয়ডেন গর্ভে থাকা অবস্থায় চার্লস স্পেন্সার মধ্যে বিয়ে বিচ্ছেদ ঘটে। লন্ডনের ক্যানিংটন জেলায় লিউড্রাইড্রেনের বাড়িতে সিডনি ও তিন বছর বয়সী চ্যাপলিনকে নিয়ে মা হান্না বসবাস শুরু করেন। ওই সময় বাবার কাছ থেকে আর্থিক সাহায্য না পাওয়ায় চ্যাপলিনের শৈশব কাটে খুবই দারিদ্র্য ও কষ্টের মধ্যে। দুস্থ শিশুদের (সেন্ট্রাল লন্ডন ডিস্ট্রিক স্কুলের অধীন) নরউড স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। সেখানে ১৮ মাস থাকার পর তার মায়ের কাছে তিনি ফিরে আসেন। তার মা আবার পাঠানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তিনি আর যেতে রাজি হন না। কষ্টের মধ্যে থাকায় তিনি উপলদ্ধি করতেন দেয়া ও পাওয়ায় কী আনন্দ! শৈশব সম্পর্কে তিনি বলতেন, ‘আমার শৈশব ছিল অত্যন্ত কষ্টের। কিন্ত এখন তা আমার কাছে নস্টালজিয়া, অনেকটা স্বপ্নের মতো।’ মানুষের জীবন সম্পর্কে বলতেন, ‘মানুষের জীবন ক্লোজ শটে দেখলে ট্র্যাজেডি। কিন্তু লং শটে সেটিই কমেডি।’
১৮৯৪ সালের কথা। মা গান গাইছেন। গান গাইতে গাইতে ক্রমেই তার গলা বসে যেতে থাকে। এক সময় অবস্থা এমন হয় যে, তার গলা থেকে আর কোনো শব্দই বের হলো না। দর্শক চিৎকার-চেঁচামেচি ও হৈ-হুল্লোড় শুরু করে দিল। বালক চ্যাপলিন স্টেজে পর্দার আড়াল থেকে সব দেখছিল। স্টেজ থেকে মা লিলি নেমে গেলে সে সোজা স্টেজে উঠে গান ধরল। তার চমৎকার গলা শুনে দর্শক অবাক হয়ে যায়! উপস্থিত সবাই, এমনকি তার মাও ছেলের প্রতিভা দেখে অবাক হয়।
১৮৯৮ সালে মা হান্না চ্যাপলিন মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে হাসপাতালে ভর্তি হন। কাজেই অত্যাধিক দারিদ্র্যের জন্যই ন’বছর বয়স থেকেই আয়-রোজগারে নামতে হয় চ্যাপলিনকে। তাকে কাজ করতে হয়েছে মুদি ও ওষুধের দোকানে, ছাপাখানায়, এমনকি অন্যের বাড়িতেও। আমেরিকায় অনেক বিখ্যাত ব্যক্তির মতো তাকেও কাগজ ফেরি করে বেড়াতে হয়েছে।
চ্যাপলিন সেই সময়ের জনপ্রিয় লোকদল ‘জ্যাকসন্স এইট ল্যাংকাসায়ার ল্যাডস’-এর সদস্য হিসেবে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। ১৯০১ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি উইলিয়াম জিলেট অভিনিত ‘শার্লক হোমস’ নাটকে কাগজ বিলিওয়ালার চরিত্রে অভিনয় করেন। এই সুবাদে ১৯১০ সালে ‘ফ্রেড কার্নো’ থিয়েটার কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে ইংল্যান্ড থেকে চলে যান যুক্তরাষ্ট্রে এবং অভিনয়ের ক্ষমতা দিয়ে বুঝিয়ে দেন আগামীর সম্ভাবনা।
অভিনয়ের সূত্রেই দলের সঙ্গে ১৯১০ সালে নিউইয়র্কে আসেন চ্যাপলিন। ১৯১৩ সালে হলিউড। ১৯১৪ সালের ফ্রেডরিক জনওয়েস্টকট পরিচালিত ‘মেকিং অ্যা লিভিং’ ছবির মাধ্যমে ২৫ বছর বয়সে প্রথম পর্দায় অভিনয় জীবন শুরু করেন তিনি। মুখ্য চরিত্রটি তারই সৃষ্টি। নির্বাক ছায়াছবি ‘ভবঘুরে: দ্য ট্রাম্প’-এ তিনি যেন স্বপ্নের জায়গাটি খুঁজে পেলেন। বিশ্ব চলচ্চিত্রে আলোড়ন সৃষ্টি করলেন। দরিদ্র অথচ সজ্জন, অমায়িক এক ভবঘুরের জীবনে শিল্প, সংস্কৃতি, রাজনীতি থেকে শুরু করে শ্রমিক, সমাজ, প্রেম-প্রীতি, ভালোবাসা ও সামাজিক দুর্দশার কাহিনী নিয়ে এই ছবি। ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, পুর্তগালে ‘শার্লট’ নামে পরিচিত চ্যাপলিনের ট্রাম্প ভবঘুরে হলেও ব্রিটিশ ভদ্রজনোচিত আদব-কায়দায় সুসংস্কৃত এবং সম্মানবোধে অটুট। শার্লটের পরনে চাপা কোট, সাইজে বড় প্যান্ট, বড় জুতা, মাথায় বাউলার হ্যাট, হাতে ছড়ি, টুথব্রাশ ও গোঁফ। তার বর্ণময় ব্যক্তিজীবন তথা সমাজ জীবনে খ্যাতি ও বিতর্ক- দুয়েরই নি¤œ থেকে শীর্ষবিন্দু ছুঁয়ে গেছে।
নাকের নিচের ছোট্ট গোঁফটি আজও ‘চ্যাপলিন গোঁফ’ হিসেবেই পরিচিত। ৭৫ বছরের ক্যারিয়ারে তিনি কৌতুক অভিনয় দিয়ে জয় করেছেন দর্শকের হৃদয়। দেখতে দেখতে অশ্রুও ঝরেছে তাদের। নির্বাক যুগ থেকে শুরু করে সবাক ছবির জগতেও তার মতো অন্য কোনো শিল্পী ছায়াছবির জগতে এতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি। তার ক্যারিয়ারের প্রথম দিকে আয় ছিল সপ্তাহে ১৫০ ডলার। ২ বছরের মধ্যেই ওই আয় বেড়ে দাঁড়ায় সপ্তাহে ১২ হাজার ৮৪৪ ডলার।
নির্বাক চলচ্চিত্র যুগের অন্যতম মৌলিক এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব চ্যাপলিন ছিলেন একাধারে অভিনেতা, পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও সঙ্গীতকার। প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা তার ছিল না। সবকিছুতেই ছিলেন স্বশিক্ষায় শিক্ষিত। এমনকি চেলো, বেহালা ও পিয়ানো বাজানোতেও ছিলেন সিদ্ধহস্ত। এসবও শিখেছিলেন কোনো গুরুর সহায়তা ছাড়াই। প্রতিটি ছবির সংগীত রচনা করেছেন নিজে।


চ্যাপলিনের শুধু শিল্পী নন, দার্শনিকও! ‘নোংরা ফেলার পাত্রে এক চিলতে রোদ বা নর্দমায় ভেসে যাওয়া একটি গোলাপ ফুল’- সৌন্দর্য নিয়ে এই দর্শনের প্রকাশ ঘটেছে তার সব ছবিতেই। ছোট-বড় সব মিলিয়ে প্রায় ৮০টি ছবি তৈরি করেছেন তিনি। তার ওই ছবিগুলোকে ‘ট্র্যাজিক’ বা ‘কমিক’- এমন কোনো তকমা দিয়ে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই। হলিউডে যখন চৌকস সুপুরুষ বীররা পর্দার নায়ক, চ্যাপলিন তখন হতদরিদ্র এক ব্যর্থ ভবঘুরেকে করলেন তার মূল চরিত্র। খেয়াল করলে দেখা যাবে, ভবঘুরের বরাবর এক সঙ্গী রয়েছে যে তার চেয়ে লম্বা, বলশালী ও নির্মম। তার ওই সঙ্গীর নাম আসলে ‘বাস্তব’। এই পুঁজিবাজারে বিকোয় না। পদে পদে অপদস্ত হয় সে।
বিপরীতের দ্বন্দ্বে সৃষ্টি হয় যে সৌন্দর্য এর মুখোমুখি করেই আমাদের সামনে তিনি খুলে দেন বাস্তবতার খোলস। ক্লেদাক্ত বাস্তবতার নর্দমায় এক নিষ্কলুষ ফুল হয়ে ভেসে বেড়ায় এই ভবঘুরে। তার ‘সেলফ মকারি’র মাধ্যমে স্পষ্ট করে সে বাস্তবতার স্তরে স্তরে জমে থাকা ভ-ামি এবং আমাদের স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের দ্বন্দ্বটি। তাই মানবতার অপমান হিসেবে ভবঘুরের অপমান দেখা দেয় আমাদের কাছে। অর্থ, লোভ, প্রতিযোগিতার রমরমা যে বাস্তব এর অ্যান্টিথিসিস হিসেবে হাজির হয় বেমানান এই ভবঘুরে। যার পুঁজি কেবল আদিম সারল্য, অকৃত্রিম সততা ও অগাধ প্রেম।


চ্যাপলিনের ছবিতে স্বতঃস্ফূর্ত প্রবল হাসি ও অশ্রুর মতো মানুষের মৌলিক দুটি প্রবৃত্তিকে সমান্তরালে উসকে দিয়ে আনন্দ-বেদনার নাগরদোলায় চড়িয়ে তার চলচ্চিত্রগুলো জীবন, রাজনীতি, মানব সম্পর্কের আশ্চর্য জঙ্গমতায় ঠেলে দিয়েছে। ওই ভবঘুরের পোশাকের ভেতর আসলে ঢুকে আছেন এক অনন্যসাধারণ শিল্পী। তার চলচ্চিত্রের সেই অসাধারণ অভিনেতাটি শুধু নন, তিনি ওই চলচ্চিত্রের
চিত্রনাট্যকার, পরিচালক, শিল্পনির্দেশক, সঙ্গীত পরিচালকও। তার চলচ্চিত্রে থাকে বৈচিত্র্য, বিস্তার, গভীরতা, বয়স, মেধা নির্বিশেষে এর সর্বজন মর্মস্পর্শ দক্ষতা।
নির্বাক চলচ্চিত্রের ওই কিংবদন্তি সবাক চলচ্চিত্র সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘শব্দ খুবই দুর্বল। এটিকে হাতির চেয়ে বড় কিছুই বলা যায় না।’
১৯১৮ সালের ২৩ অক্টোবর অভিনেত্রী মিড্রেল হ্যারিসকে বিয়ে করেন চ্যাপলিন। এক সন্তানের জননী। কিন্তু সন্তান জন্মের তৃতীয় দিনের মাথায় সন্তান মারা যায়। তখন চ্যাপলিনের বয়স ২৯ বছর। ১৯২০ সালের তাদের বিয়ে বিচ্ছেদ হয়। তাই হয়তো তিনি বলতেন, বৃষ্টিতে হাঁটা খুবই ভালো। কারণ এই সময় কেউ তোমার চোখের অশ্রু দেখতে পায় না।’
১৯২১ সালে চ্যাপলিন প্রথম প্রযোজনা করলেন ‘দ্য কিড’ ছবি। এতে তিনি হাজির হন তার চিরাচরিত ট্র্যাম্প বা ভবঘুরে স্টাইলে। দ্য ট্র্যাম্প এখানে অনাথ এক শিশুর পালক পিতা! প্রথম অংশে দেখা যাবে বাপ-বেটার খুনসুটি, জোচ্চুরি, বিভিন্ন কিসিমের অদ্ভুত কা-। দ্বিতীয় পর্বে দর্শক আবেগে সিক্ত হবে বাপ-ছেলের বিচ্ছেদের সময় পিতার প্রতি সন্তানের আকুলতা দেখে।
ওই সময়ের জনপ্রিয় অভিনেত্রী লিটা গ্রে-কে ৩৫ বছরের চ্যাপলিন ১৯২৪ সালের ২৬ নভেম্বর বিয়ে করেন। তাদের দুই সন্তানের জন্ম হওয়ার পর ১৯২৭ সালের ২৫ আগস্ট আবার বিয়ে বিচ্ছেদ হয়। তখন চ্যাপলিনের জীবনে নেমে আসে আবার কালো অন্ধকার। ‘না হেসে একটা দিন পার করা মানে একটা দিন নষ্ট করা’- এই বলে নিজেকে সান্ত¡না দিয়ে আবার হাতে নিলেন ‘দ্য সার্কাস’।
ভালোবাসার মানুষকে শুধু নিজের করে পাওয়াই কি জীবনের সার্থকতা লাভ? না। প্রিয় মানুষকে আজীবন নিঃস্বার্থভাবে উজাড় করে ভালোবাসতে পারাই হলো সত্যিকারের ভালোবাসা। চ্যাপলিন ভালোবাসার জয়গানটিকে মূলমন্ত্র করে নির্মাণ করলেন ১৯২৮ সালে দ্য সার্কাস। এক সার্কাসকন্যার প্রেমে মজে আমাদের ভবঘুরে। কিন্তু প্রিয় মানুষকে নিজের করে পেয়েও বাস্তবতার কাছে হার মানে আমাদের ভবঘুরে। তার আর কিছু না থাকুক, আছে বুক ভরা ভালোবাসা।
অস্কার হিসেবে পরিচিত একাডেমি অ্যাওয়ার্ড চলচ্চিত্র পুরস্কারের শুরু হয় ১৯২৯ সালে। অস্কারের প্রথম আসরেই সার্কাস (১৯২৮) ছবিতে অভিনয়, পরিচালনা ও প্রযোজনা ক্ষেত্রে বহুমুখী এবং অসাধারণ প্রতিভার জন্য বিশেষ পুরস্কার পান চ্যাপলিন।


পঞ্চাশের দশকে যুক্তরাষ্ট্রে কমিউনিস্ট-বিরোধী যে গণউন্মাদনা দেখা দিয়েছিল এর শিকার হলেন চ্যাপলিন। ১৯৫২ সালে ‘লাইমলাইট’ ছবির উদ্বোধনী প্রদর্শনীতে পরিবারসহ লন্ডনে গিয়েছিলেন তিনি। প্রদর্শনী শেষে দেশে ঢুকতে পারেননি! একজনকে হত্যা করলে যদি কেউ খুনি হয় তাহলে হাজার জনকে হত্যা করে সে বীর হয় কী করে?
বিশ শতকের প্রথম ভাগে যখন আমেরিকা পুঁজির দাপটে নিজেদের এক স্বপ্নপুরী গড়ে তোলার ঘোরে ব্যস্ত তখন সে দেশের অকাল মন্দরা তামাশার আড়ালে তার চলচ্চিত্রের বিপদের ইশারা দেখতে পান। হলিউডের সংগঠন ‘মোশন পিকচার্স অ্যালায়েন্স ফর প্রিজারভেশন অফ আমেরিকান আইডিয়াল’ চ্যাপলিনকে কমিউনিস্ট ঘোষণা করে মামলা ঠুকে দেয়। স্নায়ুযুদ্ধের ওই দিনগুলোয় আমেরিকায় কমিউনিস্ট অভিধা ছিল গুরুতর অপরাধ। বাকস্বাধীনতার দেশ আমেরিকা এই বিপজ্জনক কৌতুক অভিনেতাকে অবশেষে তার দেশ থেকে বহিষ্কার করে ১৯৫২ সালে। সে সময় কমিউনিস্ট রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত সোভিয়েত ইউনিয়নেও চ্যাপলিন নিষিদ্ধ ছিলেন। সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদে বিশ্বাসী নন বলে সেখানে তিনি প্রতিক্রিয়াশীল শিল্পী হিসেবে চিহ্নিত।


প্রগতি-প্রতিক্রিয়ার ওই দোলাচালে বিরক্ত, হতাশ, ক্ষুব্ধ চ্যাপলিন শেষে আশ্রয় নেন সুইজারল্যান্ডের এক নিভৃত গ্রামে। সেখানে তার সঙ্গী, বন্ধু ও স্ত্রী প্রখ্যাত নাট্যকার ইউজিন ও নিলের মেয়ে উনার সহচর্যে কাটে শেষ জীবন। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থাকার সময় দুটি ছবি বানিয়েছেন। তাহলো ‘অ্যা কিং ইন নিউইয়র্ক’ (১৯৫৭) ও ‘অ্যা কাউন্টেস ফরম হংকং’ (১৯৬৭)। শেষ ছবির পর মাত্র ১০ বছর বেঁচে ছিলেন তিনি।
চ্যাপলিন ১৯৩১ সালে তৈরি করেন ‘সিটি লাইটস’ অন্ধ এক মেয়ের জন্য যার বুকে লুকিয়ে আছে সত্যিকারের ভালোবাসা। ভালোবাসার প্রতিদান দেয় ভবঘুরে দুর্দান্তভাবে। সর্বকালের সেরা রোমান্টিক ছবির যে কোনো তালিকায় এটি সব সময়ই উপরের দিকের স্থান দখল করে। মডার্ন টাইম ১৯৩৬ সাল। চল্লিশের দশকে তিনি প্রযুক্তির এ রকম দুর্দান্ত কাজ কী করে দেখালেন তা ভীষণ আশ্চর্যের ব্যাপার! ছবিটির গভীরতাও দুর্দান্ত। প্রযুক্তির অভাবনীয় সাফল্যে মানুষের জীবন বদলে গেছে। জীবন সহজতর হলেও তা হয়ে পড়ছে যান্ত্রিক। এই সময় চ্যাপলিনের বয়স ৪৭ বছর। অভিনেত্রী পাওলেত্তে গোদারদকে ১৯৩৬ সালের ১ জুন বিয়ে করেন। তিনি উপলব্ধি করেন, বেঁচে থাকার জন্য আমাদের যন্ত্রের প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন ভালোবাসার। ছবিতে তৎকালীন সময়ে বিশ্ব অর্থনীতির মন্দা অবস্থা তুলে ধরেন। এমন একটি সময়কে তিনি ফ্রেমে তুলে ধরেছেন যখন অর্থনৈতিক মন্দা ও যান্ত্রিক সভ্যতার বিকাশের কারণে মানুষ চাকরি হারাচ্ছে, পাচ্ছে না কোনো কাজ। বৃহৎ জনগোষ্ঠী ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের কাছে নিজেদের সঁপে দিতে বাধ্য হচ্ছে। ওই ছবিতে একটি নাচের দৃশ্যে তিনি অভিনয় করেন। মজার বিষয় হলো, নাচের সঙ্গে নিজেই যে গানটি করছিলেন তা অর্থবোধক ছিল না। প্রতীকী ওই অংশটি যেন জানান দেয় বেঁচে থাকার জন্য অর্থহীন কত কিছুতেই না জড়িয়ে যেতে হয়! ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের কাছে অসহায় মানুষের যখন টিকে থাকাটাই গুরুত্বপূর্ণ তখন কোনো কিছুই আর অর্থহীন নয়, নয়


অপ্রয়োজনীয়। ১৯৪০ সালে বিশ্বব্যাপী যখন দুঃসময় তাড়া করে ফিরছে, মানবিকতা ও শ্রমিক শ্রেণীর বিরুদ্ধে পুঁজিবাদ-ফ্যাসিবাদ বিষাক্ত থাবা ফেলেছে তখনই তৈরি হলো অমর ছবি ‘দ্য গ্রেট ডিরেক্টর’। ব্যঙ্গের অস্ত্র দিয়ে আঘাত করলেন ফ্যাসিবাদকে। চ্যাপলিনের জনপ্রিয়তা সম্পর্কে হিটলার জানতেন। অনেকের মতে, ওই জনপ্রিয়তা কাজে লাগানোর জন্যই নাকি তার মতো গোঁফ রাখেন হিটলার। পরে অবশ্য তা হিটলারের নামেই পরিচিত হয়ে যায়। হিটলারকে ব্যঙ্গ করেই তিনি তৈরি করেছিলেন দ্য গ্রেট ডিক্টেটর ছবিটি। এটি তার সবাক ছবি। দুর্দান্ত সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন ওই ছবিটি বানিয়ে। ফলে আবারও প্রমাণ করেছিলেন, তিনি পর্দার সামনে আসেন দর্শকের শুধু বিনোদন দিতে নয়, আসেন দর্শকের বিবেক হয়ে। চ্যাপলিনের বিপরীতে ছিলেন তার স্ত্রী পাওলেত্তে গোদারদ। ছবিটির শুরু প্রথম বিশ্বযুদ্ধে এবং শেষ হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে। এতে তিনি দ্বৈতচরিত্রে অভিনয় করেছেন- ইহুদি নাপিত ও ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রনায়কের ভূমিকায়। তিনি একটি স্বপ্ন দেখেছিলেন। তা হচ্ছে সংঘাতমুক্ত সুন্দর পৃথিবীর। ছবিটি ছিল তার ওই চিন্তা-চেতনার বহিঃপ্রকাশ। একটি হৃদয়গ্রাহী ভাষণের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রটি শেষ হয়। পুরো ছবিটির সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যায় একটি ভাষণে। ছবিটির অ্যাডনয়েড হিংকল চরিত্রটি ছিল অ্যাডলফ হিটলারেরই চ্যাপলিন ভার্সন। ছবিটি ১৯৪০ সালে জার্মানিতে নিষিদ্ধ করা হয়।
১৯৪২ সালের ৪ জুন স্ত্রী পাওলেত্তে গোদারদ সঙ্গে চ্যাপলিনের বিয়ে বিচ্ছেদ হয়। তখন ‘শ্যাডো অ্যান্ড সারটেন্স’ মুভি তৈরি পরিকল্পনা চলছিল। ১৯৪৩ সালের ১৬ জুন অনা চ্যাপলিনকে বিয়ে করেন তিনি। তাদের ঘরে আট সন্তান এবং চ্যাপলিনের মৃত্যু পর্যন্ত তারা এক সঙ্গেই ছিলেন।


আমেরিকার তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার তিক্ত অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে ১৯৪৭ সালে চ্যাপলিন তৈরি করেছিলেন ‘মঁসিয়ে ভের্দু’ ছবি। এতে একটি ব্যঙ্গের অস্ত্র দিয়ে আঘাত করলেন শক্তিশালী রাষ্ট্রটিকে। এটি দিয়েই ধীরে ধীরে চলচ্চিত্র জগতে রাজ্য বিস্তার শুরু। ওই ছবিতে চ্যাপলিন অভিনয় করেছিলেন পেশাদার খুনির চরিত্রে। ত্রিশের দশকের ডিপ্রেশনে আমেরিকার বহু মানুষ চাকরি খুইয়ে নিঃসম্বল হয়ে খুনকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিল। ছবিতে আদালতে দাঁড়িয়ে ভের্দু বলে, নরহত্যার ওপর এই সমাজ ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে। আমি তো সামান্য শখের খুনি। সে বলে, একজনকে খুন করলে খুনি বলা হয়। আর গণহত্যা যারা করে তারা হয়ে উঠে বীর। এই হলো সংখ্যার মাহাত্ম্য। ফাঁসির আগে ভের্দুকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তোমার পাপের জন্য তুমি অনুতপ্ত নও? উত্তরে সে বলেছিল, পাপ কাকে বলে আমি জানি না। তাছাড়া পৃথিবীতে পাপ না থাকলে আপনাদের চলত কী করে! এমন একটি ছবির জন্য চ্যাপনিলকে আমেরিকা ছাড়তে হয়েছিল। এ জন্য অবশ্য তাকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে।


শৈশবের সেই বঞ্চনা ও অপমানটিকেই যেন চ্যাপলিন মোকাবেলা করেছেন তার চলচ্চিত্রের ভেতর দিয়ে। প্রবল বঞ্চনার ভেতর দাঁড়িয়েও কী করে পৃথিবীকে ভালোবাসতে হয় সে শিক্ষা তিনি পেয়েছেন তার মায়ের কাছ থেকে। বয়স হয়ে আসছিল। কিন্তু জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কমিক চরিত্রে অভিনয় করে গেছেন। শিল্প কী প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘শিল্প হচ্ছে পৃথিবীর কাছে লেখা এক সুলিখিত প্রেমপত্র।’ তার অনবদ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে এমন একেকটি প্রেমপত্রই পাঠিয়েছেন পৃথিবীর মানুষের কাছে। ওই প্রেমপত্রগুলো আজকের এই ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ পৃথিবীতেও সমান প্রাসঙ্গিক। তার চলচ্চিত্রগুলো এখনো প্রাণবন্ত হাসির স্রোতে ভাসতে ভাসতে মহৎ বেদনায় আর্দ্র হওয়া যায়। তাই আজও তিনি চমৎকার।
১৯৫২ সালে আজন্ম মানবতাবাদী শিল্পী চ্যাপলিনকে সমাজতান্ত্রিক আখ্যা দিয়ে আমেরিকা তার দেশ থেকে বহিষ্কার করে। এর পাশাপাশি সোভিয়েতেও তখন তিনি নিষিদ্ধ। ক্ষুদ্ধ চ্যাপলিন অবশেষে তার শেষ জীবন কাটান সুইজারল্যান্ডে। সেখানেই ১৯৭৭ সালের ২৫ ডিসেম্বরে তিনি প্রায় নিঃসঙ্গ অবস্থায় ৮৮ বছর বয়সে ঘুমের মধ্যেই ঘুমিয়ে যান চিরদিনের জন্য।

Page 5 of 8

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…