Page 6 of 8

প্রতিটি আবিষ্কার এক একটি
বিজয়স্তম্ভ

অরিন্দম মুখার্জী বিংকু



বাঙালি বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু, তাঁকে দ্বিধাহীন ভাবে বলা যায় প্রথম সফল বাঙালি বিজ্ঞানী। যার সৃষ্টিকর্মে বিজ্ঞান স্বমহিমায় আর্ভিভুত হয়েছিলো। স্যার জগদীশচন্দ্র বসু। শুধু বিজ্ঞানী নন, ছিলেন সাহিত্যিকও। বিজ্ঞান ও সাহিত্য জ্ঞানের সঙ্গে রসের সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন তিনি। পুরো জীবন কাটিয়েছেন গবেষণায়। প্রমাণ করেছেন  বিশ্বে বিজ্ঞানে বাঙালির অবদান কম নয়। তার গবেষণার প্রধান দিক ছিল উদ্ভিদ ও তড়িৎ চৌম্বক। তাঁর আবিষ্কারের মধ্যে উদ্ভিদের বৃদ্ধিমাপক যন্ত্র ক্রেস্কোগ্রাফ, উদ্ভিদের দেহের উত্তেজনার বেগ নিরুপক সমতল তরুলিপি যন্ত্র রিজোনান্ট রেকর্ডার অন্যতম। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম ব্যক্তি, যিনি আমেরিকান প্যাটেন্টের অধিকারী। ২০০৪ সালের এপ্রিলে বিবিসি রেডিওর জরিপে তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে সপ্তম স্থান অধিকার করেন। দেশের প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা, দেশের মানুষের মধ্যে দায়বদ্ধতা, আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপনসহ মানব কল্যাণে নিয়োজিত ছিলেন দেড়’শ বছর আগে জন্ম নেয়া প্রথম বাঙালি বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু। দেড়’শ বছর আগে অর্থাৎ সিপাহী বিদ্রোহের পরের বছরই ১৮৫৮ সালের ৩০ নভেম্বর, ময়মনসিংহ শহরে এক ধনাঢ্য পরিবারে জগদীশ বসু জন্ম গ্রহণ করেন । তাঁদের আদি নিবাস ছিল ঢাকা জেলার রাঢ়িখালে। ভগবান চন্দ্র বসু ও মা বনসুন্দরী দেবীর প্রথম সন্তান। জগদীশের জন্মের সময় বাবা ভগবান চন্দ্র ছিলেন ফরিদপুরের ম্যাজিস্ট্রেট। সে সময় ইংরেজদের স্কুলে ছেলেমেয়েকে পড়ানো ছিল আভিজাত্যের ব্যাপার। কিন্তু ভগবান চন্দ্র বসু তাঁর সন্তানকে  ফরিদপুর রাখলেন না, পাঠিয়ে দিলেন নিজ গ্রামে। সেই গ্রামে কোন স্কুল না থাকায় ছেলেকে কোথায় পড়াবেন ভাবতে ভাবতে ভগবানচন্দ্র তার মায়ের নামে একটা স্কুল প্রতিষ্ঠা করলেন। জগদীশচন্দ্রের পড়াশোনা শুরু হয় সেই স্কুলে। ১৮৬৯ সালে হেয়ার স্কুল, পরে তিনি কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে ভর্তি হন। ১৮৭৫ সালে ষোল বছর বয়সে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন এবং শিক্ষাবৃত্তি লাভ করেন। সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে বিজ্ঞান শিক্ষা শুরু হলো জগদীশ বসুর। সে সময় ফাদার লাঁফো ছিলেন সেন্ট জেভিয়ার্সের নামকরা ফিজিক্সের প্রফেসর। প্রবীণ এই অধ্যাপকের আকর্ষণীয় ক্লাস জগদীশ বসুকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করে। তিনি ক্রমশ পদার্থবিদ্যার প্রতি গভীর আগ্রহ অনুভব করতে শুরু করেন। ১৮৭৭ সালে জগদীশ চন্দ্র বিএ পাশ করার পর ইংল্যান্ডে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। উদ্দেশ্য ছিল আইসিএস পরীক্ষায় পাশ করে দেশে এসে জজ-ম্যাজিস্ট্রেট হওয়া। কিন্তু ভগবান চন্দ্র স্বভাবতই এতে রাজী হননি। ছেলে বিদেশে যাক তা তিনি ঠিকই চেয়েছিলেন, তবে আইসিএস দিতে নয়, আধুনিক কৃষিবিদ্যা শিখে দেশীয় কৃষিকাজের উন্নতি সাধনের জন্য। বাবার ইচ্ছা ও তাঁর আগ্রহের মধ্যে টানাপোড়েনের শেষ পর্যায়ে তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞান পড়বেন বলে স্থির করেন। চিকিৎসাবিজ্ঞান পাঠের উদ্দেশ্যেই লন্ডনের উদ্দেশে পাড়ি জমান ১৮৮০ সালে। ডাক্তারী পড়ার লক্ষ্য স্থির থাকলেও ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে তাঁর স্বাস্থ্য নষ্ট হয়ে যায় ফলে ডাক্তারীতে ভর্তি হয়েও স্বাস্থ্যগত কারণে পড়া হলো না। ন্যাচারাল সায়েন্সে উচ্চতর শিক্ষার জন্য ভর্তি হলেন কেমব্রিজে। উভয় পরীক্ষাতেই পদার্থবিদ্যার পাশাপাশি ল্যাটিন ভাষা ছিল তাঁর অন্যতম বিষয়।

 

১৮৮২ সালে কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি থেকে ফিজিক্সে অনার্স সহ বি-এ পাশ করেন এবং ১৮৮৪ সালে লন্ডন ইউনিভার্সিটি থেকে বি-এসসি পাশ করেন। লন্ডন থেকে ফিরেই ১৮৮৫ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে চাকরিতে যোগদানের চেষ্টা করেন। ‘ভারতীয়রা পড়াতে পারে না’ অজুহাতে কলেজের সেই সময়কার অধ্যক্ষ চার্লস টাউনি এবং বাংলার পাবলিক ইনস্টিটিউটের পরিচালক স্যার আলফ্রেড ক্রফট প্রবল বিরোধিতা করলে জগদীশ চন্দ্র বসু ভারতের ভাইসরয় লর্ড রিপনের শরণাপন্ন হন। শেষমেশ, ভাইসরয়ের হস্তক্ষেপে তিনি শিক্ষক হলেও চার্লস টাউনি এবং স্যার আলফ্রেড ক্রফট তাঁকে অস্থায়ীভাবে নিয়োগ দেন। এমনকি তাঁর বেতন নির্ধারণ করা হয় । মহান বৈজ্ঞানিক গবেষণাসমূহের সূতিকাগার হিসেবে এই কলেজকে আখ্যায়িত করা যায়। আমরা যে জগদীশ চন্দ্রের সাথে পরিচিত ও গবেষণার সূত্রপাতও এখান থেকেই। জগদীশ বসু বৃটিশদের কোন অন্যায়ের সাথেই আপোষ করেননি কখনো। সেই সময় একজন ইংরেজ অধ্যাপককে যে বেতন দেয়া হতো, একজন ভারতীয় অধ্যাপককে দেয়া হতো তার দুই তৃতীয়াংশ। আর চাকরি স্থায়ী না হলে ভারতীয়দের বেতন ছিল সমমর্যাদার ইংরেজদের বেতনের মাত্র এক তৃতীয়াংশ। জগদীশ চন্দ্র এই বৈষম্যের প্রতিবাদ করলেন। ইংরেজ ও ভারতীয়দের বেতন-বৈষম্য না ঘুচলে বেতন নেবেন না ঘোষণা দিলেন। বিনাবেতনে পড়ালেন একটানা তিন বছর। ইংরেজ অধ্যক্ষ বাধ্য হলেন বেতন বৈষম্য ঘোচাঁতে। এতে সব ভারতীয় অধ্যাপক উপকৃত হলেন, কিন্তু ক্ষতি হলো জগদীশের। তিনি ইংরেজ কর্তৃপক্ষের চক্ষুশূলে পরিণত হলেন। এজন্য অনেক অপমান সইতে হয়েছে তাঁকে। ১৮৮৭ সালে জগদীশচন্দ্র বসু আর্থিক কষ্টের মধ্যে ছিলেন একদিকে বাবার  ঋণের বোঝা অন্যদিকে কলেজের বেতন না নেওয়া। এই টানাপোড়েনের মধ্যেই ব্রাহ্ম সমাজের বিখ্যাত সংস্কারক দুর্গা মোহন দাসের কন্যা বিদূষী ডাক্তার ও শিক্ষাবিদ অবলাকে বিয়ে করেন জগদীশচন্দ্র বসু। জগদীশ চন্দ্র বসুর ছাত্রাবস্থাতেই ১৮৭৬ সালের ১৫ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশান ফর দ্যা কালটিভেশান অব সায়েন্স”। ডাক্তার মহেন্দ্র লাল সরকার  ভারতীয় জনসমাজকে বিজ্ঞানের গুরুত্ব স¤পর্কে সচেতন করার উদ্দেশ্যে এই এসোসিয়েশান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৮৮৫ সালে জগদীশ বসু এই এসোসিয়েশানে এক্সপেরিমেন্টাল ফিজিক্সের ক্লাস নিতে শুরু করলেন। এখান থেকেই তাঁর পদার্থবিদ্যার মৌলিক গবেষণা শুরু হয়। এই সময়কালে নিজের মেধা ও পা-িত্য দিয়ে তিনি প্রায় সবার মন জয় করেন। অন্যদিকে নিজের বাড়িতেও একটি গবেষণাগার গড়ে তুলতে থাকেন। তিন বছর পরে কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁকে সসম্মানে, পূর্ণবেতনে অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেয়। আর এই নিয়োগ দেওয়া হয় তিন বছর আগে থেকে। সেই সাথে তিন বছরের বকেয়া বেতনও পরিশোধ করা হয়। সেই টাকা দিয়ে জগদীশ চন্দ্র বসু তাঁর বাবার ঋণ শোধ করেন। সেই সময়ে জগদীশ চন্দ্র বসুর গবেষণার আগ্রহের বিষয়বস্তু ছিল ক্ষুদ্র দৈর্ঘ্যের তরঙ্গ, যা মাইক্রোওয়েভ নামে পরিচিত। সে সময় তিনি কোহেরার নামে একটি ধারণাকে আরেকটু এগিয়ে নিয়ে  সেটিকে মাইক্রোতরঙ্গের গ্রাহক যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন। ১৮৯১ সাল থেকে তিনি বাংলা ভাষায় বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ লিখতে শুরু করেন। মুকুল, দাসী, প্রবাসী, ভারতবর্ষ প্রভৃতি পত্রিকায় লিখেছেন। তাঁর অব্যক্ত বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান রচনার একটি উৎকৃষ্ট নিদর্শন।  বৈষয়িক লোভ-লালসা-মোহ তাঁকে কাবু করেনি এবং বিষয়ী প্রয়োজনও গুরুত্ব পায়নি। জগদীশ বসুই হলেন বিশ্বের প্রথম বৈজ্ঞানিক যিনি ১৮৯৫ সালে বিশ্বে সর্বপ্রথম কৃত্রিম মাইক্রোওয়েভ উৎপাদনে সাফল্য লাভ করেন। রিমোট কন্ট্রোল সিস্টেমের রিমোট সেন্সিং সর্বপ্রথম প্রদর্শন করেন প্রেসিডেন্সি কলেজে। জগদীশ বসু কলকাতার টাউন হলে ৭৫ ফুট দূরে রাখা বারুদের স্তুপে আগুন জ্বালাতে সমর্থ হন নিজের উদ্ভাবিত মাইক্রোওয়েভ কমিউনিকেশানের সাহায্যে। সর্বপ্রথম প্রায় ৫ মিলিমিটার দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট তরঙ্গ তৈরী করেন। এ ধরণের তরঙ্গকেই বলা হয়ে অতি ক্ষুদ্র তরঙ্গ বা মাইক্রোওয়েভ। আধুনিক রাডার, টেলিভিশন এবং মহাকাশ যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই তরঙ্গের ভূমিকা অনস্বীকার্য। মূলত এর মাধ্যমেই বর্তমান বিশ্বের অধিকাংশ তথ্যের আদান প্রদান ঘটে থাকে। একই বছর ইতালির গুগ্লিয়েল্মো মার্কনি দুই কিলোমিটার দূর থেকে বেতার তরঙ্গ রিসিভ করতে সমর্থ হন। মার্কনির আবিষ্কারের কথা যতটা প্রচার পায় একই রকম আবিষ্কার হলেও জগদীশ বসুর আবিষ্কারের কথা তদানীন্তন ভারতের বাইরে তেমন একটা প্রচারিত হয় না। এর পেছনে তদানীন্তন ভারতের ইংরেজ শাসকদের একটা প্রকাশ্য ভূমিকা ছিল। “দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে (১৯৩৫) রেডার আবিষ্কারের পর ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘের বেতার তরঙ্গের নানামুখী প্রয়োগের দিকে বিজ্ঞানীদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়।

 

কিন্তু এর অনেক আগেই জগদীশ বসুর গবেষণা অন্যদিকে মোড় নেয় সেই সাথে আবিষ্কারে একটা নতুন মাত্রা যোগ হয়। জগদীশ বসু ছিলেন পৃথিবীর প্রথম বায়োফিজিসিস্ট। উদ্ভিদও যে উদ্দীপনায় সাড়া দেয় এ তথ্য জগদীশ বসুর আগে কেউ উপলব্ধি করেননি, প্রমাণ করতে পারেননি। পদার্থবিজ্ঞানে জগদীশ বসুর অনেক মৌলিক অবদান থাকা সত্ত্বেও পরীক্ষামূলক পদার্থ বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু আমাদের কাছে উদ্ভিদ-বিজ্ঞানী হিসেবেই বেশি পরিচিত। তিনি উদ্ভিদের শারীরবৃত্ত স¤পর্কে গবেষণা করেছেন পদার্থবিদ্যার প্রয়োগ ঘটিয়ে। এই পদ্ধতির বিস্তৃত প্রয়োগে উদ্ভিদের প্রাণচক্র ও শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া সংক্রান্ত গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ আমরা জগদীশ বসুকে চিনলাম উদ্ভিদবিজ্ঞানী হিসেবে। পদার্থবিদ্যা থেকে উদ্ভিদের প্রাণ ও সংবেদনশীলতা নিয়ে কাজ শুরু করেন। জগদীশ বসু  স¤পূর্ণ নিজস্ব পদ্ধতিতে এবং দেশীয় উপাদানে তৈরি যন্ত্রপাতি দিয়ে জগদীশ বসু একটা বৈদ্যুতিক সংবেনশীল যন্ত্রের মডেল তৈরি করেন যা অনেকটা ক¤িপউটারের সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিটের মত। উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও সংবেদনশীলতা মাপার কাজে ব্যবহৃত হয়েছে এই যন্ত্র। আজ আমরা যে এফএম বা রেডিওতে গানের মূর্ছনায় হারিয়ে যাই তার আবিষ্কারক  জগদীশ বসু, রেডিওর প্রকৃত আবিষ্কারক । বাঙালি বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু ১৮৯৪ সালে বেতার তরঙ্গ নিয়ে মৌলিক গবেষণা শুরু করেন। কোলকাতায় প্রথম বিনা তারে বার্তা প্রেরণ এবং তা গ্রহণ করার একটি কৌশল দেখিয়েছিলেন। ১৮৯৬ সালে  ২৪ জুলাই জগদীশ চন্দ্র বসু অদৃশ্য আলোক স¤পর্কে লিভারপুলের ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশনে মাত্র ১৮ মাসের মধ্যে করা পরীক্ষণগুলোর উপর ভিত্তি করেই  বক্তৃতা  করেন যা ইউরোপীয় বিজ্ঞানীদের চমৎকৃত ও আশ্চর্য্যন্বিত করে।  তারপর আরও সাফল্য আসে। এর সূত্র ধরেই লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় মে মাসে তাকে ডিএসসি ডিগ্রী প্রদান করে। ঐ সময় তাঁর পরীক্ষার খুটিনাটি এত বিশদভাবে তুলে ধরেন যে, তা থেকে যে কেউ পরীক্ষাটির পুনরাবৃত্তি করতে পারবেন। মার্কোনি তাঁর আবিষ্কারে অনেক সূক্ষ যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেছিলেন যার মধ্যে একটি হচ্ছে কোহেরার (২টি ধাতব পাতের মাঝে খানিকটা পারদ), যা ছিল রেডিও বা তারহীন সংকেত পাঠানোর প্রক্রিয়ার মূল বিষয়। মজার ব্যপার হচ্ছে এই কোহেরার এর প্রকৃত আবিষ্কারক স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু। যদি তিনি নিজের নামে বেতার যন্ত্র পেটেন্ট করতেন,তাহলে মার্কোনি না, তিনিই হতেন বেতার যন্ত্রের সর্বপ্রথম আবিষ্কারক। ১৯০১ সালে রবীন্দ্রনাথকে লিখা একটি চিঠিতে জগদীশ বসু লিখেছিলেন আমি যদি একবার টাকার মোহে পড়ে যাই তাহলে আর কোনদিন আর বের হতে পারব না টাকার প্রতি তাঁর লোভ ছিল না বলেই তিনি পেটেন্ট নিজের নামে করেননি, তবে বিনা তারে বার্তা প্রেরণের জনক   জগদীশ চন্দ্র বসু কাজ করেছেন মাইক্রোতরঙ্গ নিয়ে এবং রেডিও যন্ত্রের উদ্ভাবক মার্কনি কাজ করেছেন বেতারতরঙ্গ নিয়ে। ইউরোপ সফরের সাফল্য জগদীশ বসুকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করে এবং ১৮৯৮ সালের এপ্রিল মাসে তিনি ইউরোপ সফর শেষে সস্ত্রীক দেশে ফিরে এসে একটা গবেষণাগার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করলেন। কিন্তু কলেজ কর্তৃপক্ষ সহযোগিতা তো দূরে থাক পদে পদে বাধা হয়ে দাঁড়ালো। নিজের বেতনের টাকা দিয়ে আস্তে আস্তে নিজের কাজের একটা ল্যাব তৈরী করলেন ১৮৯৬ সালে প্রথম সায়েন্স ফিকশান ও নিরুদ্দেশের কাহিনী’ বই ও প্রকাশ করেন । ১৮৯৭ সালে কলকাতায় এসেছেন বিজ্ঞানী লর্ড রেইলে।

কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির ক্যাভেন্ডিজ ল্যাবের এই বিখ্যাত অধ্যাপকের কাছে পড়াশোনা করেছেন জগদীশ বসু। কাজেই প্রিয় স্যারকে নিজের কলেজে পেয়ে নিজের গবেষণা, ল্যাব ঘুরিয়ে দেখালেন জগদীশ। এত সীমিত সুযোগের মধ্যেও জগদীশ যে এত কাজ করছেন দেখে খুব খুশি হলেন লর্ড রেইলে। তিনি জগদীশের অনেক প্রশংসা করলেন কলেজের ইংরেজ প্রিন্সিপালের কাছে। হিতে বিপরীত হলো। লর্ড রেইলে চলে যাবার পর প্রিন্সিপালের কাছ থেকে শো-কজ নোটিশ পেলেন জগদীশ বসু। কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে কলেজের অধ্যাপনায় ফাঁকি দিয়ে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া নিজের ইচ্ছে মত গবেষনা করাটা কেন অপরাধের পর্যায় পড়বে না? এবং ল্যাবের যন্ত্রপাতি চুরির অপবাদও সইতে হয়েছে জগদীশ বসুকে। টাকার অভাবে গবেষণা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে  জগদীশ বসুর ল্যাব।সরকারের কাছে দেওয়া  কিছু অনুদানের জন্য , চিঠির উত্তর পেলেন  “ডক্টর বসু এখন মাসে পাঁচশ টাকা মাইনে পান। কোন নেটিভ সরকারি চাকুরের মাসে পাঁচশ টাকায় পোষাচ্ছে না বলাটা নেহায়েৎ        বোকামি”। তিনি বলতেন, সে-ই প্রকৃত বিজ্ঞানী যে তার ল্যাবরেটরির সঙ্গে ঝগড়া করে না। অর্থাৎ প্রকৃতিবিজ্ঞানী সব সময় নিজের ল্যাবরেটরি তৈরি করে নেন, অন্যকে দোষারোপ করেন না।আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন বন্ধু। রবীন্দ্রনাথ জগদীশ চন্দ্র বসুর তিন বছরের ছোট হলেও তাঁদের বন্ধুত্ব ছিল আমৃত্যু। পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ।একজনের হাতে বিকশিত হয়েছে বাংলায় সাহিত্য আর একজন করেছেন বাংলায় বিজ্ঞান রেনেসাঁর সূচনা। বিভিন্ন জনের কাছ থেকে চাঁদা তুলে তিনি জগদীশ বসুর গবেষণার টাকা জুগিয়েছেন। ১৮৯৮ সালের জানুয়ারি ১৯ তারিখে  ইউরোপে "অন দ্য পোলারাইজেশন অফ ইলেকট্রিক রেইস" বিদ্যুৎরশ্মির সমাবর্তন বক্তৃতার সফলতা ছিল সবচেয়ে বেশি।এই ডিসকোর্সগুলোতে আমন্ত্রিত হতেন একেবারে প্রথম সারির কোন আবিষ্কারক। সে হিসেবে এটি জগদীশচন্দ্রের জন্য একটি দুর্লভ সম্মাননা ছিল।

 

এই বক্তৃতার সূত্র ধরেই বিজ্ঞানী জেমস ডিউয়ার-এর সাথে জগদীশচন্দ্রের বন্ধুত্ব সৃষ্টি হয়। ডিউয়ার এই বক্তৃতা সম্বন্ধে "¯েপক্টেটর" পত্রিকায় লিখা হয়েছিল, "একজন খাঁটি বাঙালি লন্ডনে সমাগত, চমৎকৃত ইউরোপীয় বিজ্ঞানীম-লীর সামনে দাঁড়িয়ে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের অত্যন্ত দুরূহ বিষয়ে বক্তৃতা   দিচ্ছেন- এ দৃশ্য অভিনব।" এই বক্তৃতার পর ফ্রান্স এবং জার্মানি থেকে আমন্ত্রণ আসে এবং তিনি সেখানে কয়েকটি বক্তৃতা দেন। সবখানেই বিশেষ প্রশংসিত হন। বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও অধ্যাপক কর্ন তার বন্ধু হয়ে যায় এবং তিনি ফ্রান্সের বিখ্যাত বিজ্ঞান সমিতি ঝড়পরবঃব ফব চযুংবয়ঁব-এর সদস্য মনোনীত হন। ১৮৯৯ সালে বিদ্যুৎ তরঙ্গ নিয়ে নতুন উদ্যমে গবেষণা শুরু করেন, গবেষণায় জগদীশচন্দ্র বসু  জড়বস্তুর মধ্যে প্রাণ¯পন্দনের অনুরূপ সাড়া প্রত্যক্ষ করেন। তিনি লক্ষ্য করেন প্রাণীদের মত জড়বস্তুও বাইরের উত্তেজনায় সংবেদনশীল। জড় ও জীবের এই গোপন ঐক্য স¤পর্কে পরীক্ষালব্ধ ফলাফল পশ্চিমের বিজ্ঞানীদের কাছে প্রকাশের একটা সুযোগ এসে পড়লো। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় এই মৌলিক গবেষণার জন্য তাঁকে ডি .এস.সি উপাধি প্রদান করেন। ১৯০০ সালে প্যারিসে আয়োজিত পদার্থবিজ্ঞান কংগ্রেসে আমন্ত্রিত হলেন জগদীশ। আমন্ত্রণ পেলেও জগদীশের যাওয়ায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল তদানীন্তন শিক্ষা কর্মকর্তা। তবে এতসব বাধার মুখেও জগদীশ বসুকে সহযোগিতা করেছিলেন লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার জন উডবার্ন। উডবার্নের সহযোগিতায়  জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে জগদীশ বসু দ্বিতীয় বারের মত ইউরোপে গেলেন। বাংলা ও ভারত সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি প্যারিসে পদার্থবিজ্ঞান কংগ্রেসে যোগ দেন এবং জড়বস্তুর সংবেদনশীলতা বিষয়ে তাঁর পরীক্ষালব্ধ ফলাফল তুলে ধরেন। ১৯০৯ সালের শেষের দিকে ইতালির গুগ্লিয়েল্মো মার্কনি আর জার্মানির কার্ল ফার্ডিন্যান্ড ব্রোনকে যখন পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার দেয়া হলো- সারাবিশ্ব জানলো যে বেতার যোগাযোগ ব্যবস্থা আবিষ্কৃত হয়েছে। অথচ আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী মহলে সাড়া মিললেও তেমন প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাননি জগদীশ বসু। বিজ্ঞানীরা কেউ স্বীকার করেনি। পশ্চিমাদের একটা ধারণা ছিল বাঙালি আর কী বিজ্ঞান জানে!” জগদীশ চন্দ্র যদি মাইক্রোতরঙ্গ নিয়ে তাঁর কোহেরারকে আরও এগিয়ে নিতেন, তাহলে ১৯০১ সালের প্রথম নোবেল পুরস্কারটি একজন বাঙালি পেলেও পেতে পারতেন। বসুর তৈরি কোহেরারটি সামান্য পরিবর্তন মার্কোনি করেছিলেন। বসুর কোহেরারটি ছিল ‘ট’ আকৃতির মত আর মার্কোনিরটি ছিল সোজা। নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও জগদীশ বসু ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনার অফার পান। ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটিতে পড়ানোর সুযোগ মানে গবেষণার ব্যাপক সূযোগ হাতে পাওয়া। কিন্তু স্বদেশের সাথে, প্রেসিডেন্সি কলেজের সাথে সব স¤পর্ক ছিন্ন করে বিদেশের মাটিতে পড়ে থাকা জগদীশ বসুর পক্ষে সম্ভব হলো না। তিনি তাঁর দেশকে  তাঁর বিজ্ঞান গবেষণার চেয়েও বেশি ভালবাসতেন। লন্ডন প্রবাস কালে ১৯০০ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯০২ সালের ২০ জুন পর্যন্ত সময়ের মধ্যে লেখা অনেকগুলো চিঠিতে জগদীশ বসু তাঁর প্রিয় বন্ধু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে বার বার তাঁর স্বদেশ প্রেমের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, “আমাদের হৃদয়ের মূল ভারতবর্ষে। যদি সেখানে থাকিয়া কিছু করিতে পারি, তাহা হইলেই জীবন ধন্য হইবে। দেশে ফিরিয়া আসিলে যেসব বাধা পড়িবে তাহা বুঝিতে পারিতেছি না। যদি আমার অভীষ্ট অপূর্ণ থাকিয়া যায়,তাহাও সহ্য করিব”। চিঠির উত্তরে রবীন্দ্রনাথ জগদীশ চন্দ্রকে প্রেরণা জুগিয়েছেন, শুনিয়েছেন অভয়মন্ত্র মুগ্ধ হয়ে  জগদীশচন্দ্র ফিরে আসলেন ভারতবর্ষে। একটি পিছিয়ে পড়া দেশকে জগদীশ চন্দ্র বসু মানব সভ্যতাকে একটি বড় ঝাকুনি দিলেন। ভারতবর্ষেই অধ্যাপনার সাথে সাথে নিজের চেষ্টায় শুরু করলেন গবেষণা। বৈদ্যুতিক উত্তেজনায় উদ্ভিদের সাড়া মাপার জন্য নিজের ওয়ার্কশপেই তৈরি করেছেন স্ফিগমোগ্রাফ, ফটোমিটার, ফটোসিন্থেটিক বাব্লার প্রভৃতি যন্ত্র। এ সব যন্ত্রপাতি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন সাধারণ বাঙালি মিস্ত্রিরাই।

 

বৈজ্ঞানিক যন্ত্রের উপাদান হিসেবে তিনি শজারুর কাঁটা পর্যন্ত ব্যবহার করেছেন। ১৯০৩ সালে এরই ফলশ্রুতিতে ব্রিটিশ সরকার জগদীশ বসুকে কমান্ডার অব ইন্ডিয়ান এমপ্যায়ার উপাধি দেন। ১৯১৫ সালে অধ্যাপনা থেকে অবসরের পর প্রফেসর ইমেরিটাস মর্যাদা পান। ১৯১৭ সালের ৩০ নভেম্বর কলকাতায় বসু বিজ্ঞান মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। কোলকাতার আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রোডে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ
গবেষণাগার। বসু বিজ্ঞান মন্দির ক্রমে হয়ে ওঠে  একটা আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা কেন্দ্র। যা ইড়ংব ওহংঃরঃঁঃব নামে পরিচিত। এই ইনস্টিটিউট ভারতের প্রথম আধুনিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান। মানব জাতির জন্য তিনি ইহা উৎসর্গ করে গেছেন। বাংলার এই সফল বিজ্ঞানী ১৯১৬ সালে নাইটহুড ও ১৯২০ সালে রয়েল সোসাইটির সদস্যপদ লাভ করেন। ১৯২৭ সালে ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসে সভাপতিত্ব করেন। ১৯২৮ সালে ভিয়েনার একাডেমি অব সায়েন্সের বৈদেশিক সদস্য ও রাজকীয় বিজ্ঞান সমিতির ফেলো নির্বাচিত হন। জগদীশচন্দ্র ছিলেন মাতৃভাষা ও স্বদেশী ভাবধারার বিজ্ঞানচর্চার পথিকৃৎ। এক জীবনেই অনেক কিছু ছিলেন, জ্বালিয়েছিলেন আলোকবর্তিকা। সেই আলোর পথ ধরে বিশ্ব আজো এগিয়ে চলছে । অথচ নিজের সময়ের চেয়ে অর্ধশত বছরের বেশি এগিয়ে ছিলেন মেধা-মনন-কর্ম-অধ্যবসায়-সাধনা ও সৃষ্টিতে জগদীশ চন্দ্র বসু। ভারত বিভক্ত হবার ১০ বছর আগে বিহার প্রদেশের ঝাড়খন্ডে ১৯৩৭ সালের ২৩ নভেম্বর জগদীশ বসু ৭৯ বছর বয়সে মারা যান। তার স্ত্রী অবলা বসু মারা যান ১৯৫১ সালে।  কীর্তিমান এ বিজ্ঞানীর কোনো সন্তান ছিল না। মানুষের স্মৃতিশক্তি মাপার সর্বপ্রথম যান্ত্রিক মডেল আবিস্কার করেছিলেন জগদীশ বসু। আজ আমরা ঠিক সেই মডেল ব্যবহার না করলেও বাঙালির বিজ্ঞান চর্চা যতদিন থাকবে বেঁচে থাকবে জগদীশ বসুর কীর্তি,  থাকবে তাঁর জীবন-স্মৃতি।

‘শিকড় খুঁজি
            মাটির টানে
                             প্রাণের মেলায়’

 

বাংলাদেশের মঞ্চনাটকের অন্যতম সেরা নিরীক্ষাধর্মী নাটক ‘মৈমনসিং গীতিকা’ অবলম্বনে লোকনাট্যদল (বনানী)-র ‘সোনাই মাধব’। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত মঞ্চস্থ প্রযোজনাগুলোর মধ্যে একমাত্র সোনাই মাধব সর্বাধিকবার মঞ্চায়িত হয়েছে। এর ১৫০তম মঞ্চায়ন উপলক্ষে লোকনাট্যদল আয়োজন করে বছরের সেরা নাট্যোৎসবের। তাছাড়া বাংলাদেশে বিষয়ভিত্তিক নাট্য উৎসব হয় না বললেই চলে। সেদিক থেকেও লোকনাট্যদল ‘মৈমনসিং গীতিকা নাট্যোৎসব ২০১৪’ আয়োজন করে বাংলাদেশের দর্শককে তার শিকড়ের কথা, সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। গত ২৫ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মূল মিলনায়তনে এ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। তবে উৎসব শুধু মিলনায়তনের ভেতরেই আবদ্ধ থাকেনি, এর পরশ ছড়িয়ে পড়েছিল পুরো শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণজুড়ে। ছয় দিনব্যাপী উৎসবের প্রতিদিনই ছিল মিলনায়তনের বাইরে লোকসঙ্গীত, পালা ও নৃত্য পরিবেশনা। আরো ছিল বাংলা নাটকের অন্যতম পুরোধা বিভাস চক্রবর্তীর সঙ্গে আলাপচারিতা। লোকজ আঙ্গিকে উৎসবের বহিরাঙ্গনের সাজসজ্জা উৎসবটিকে প্রাঞ্জল করে তুলেছিল।


‘সোনাই মাধব’-এর দেড়শতম মঞ্চায়নের আনন্দযজ্ঞ উদযাপন করে নাট্যশিল্পীদের নিয়ে লোকনাট্যদল গতানুগতিকতার বাইরে একটি উৎসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে। মৈমনসিং গীতিকা অবলম্বনে চলমান ছয়টি নাটক নিয়ে এ উৎসব অনুষ্ঠত হয়।
এ উৎসব সম্পর্কে লোক নাট্যদলের বক্তব্য- বাংলা নাট্যে রয়েছে বিভিন্ন লোককাহিনী এবং তা চর্চার ইতিহাস হাজারো বছরের। বিভিন্ন আঙ্গিক ও কৌশলে এসব লোকনাট্য অভিনীত হয়। এ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রয়েছে বহু উপকথা, আখ্যান, উপাখ্যান, কথ্য ও পদ্য রীতিতে অনেক গল্প। লিখিত নয়, শুধু মুখে মুখেই এসব গল্পগাথা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। কিন্তু এসব লোককাহিনীর খুব কমই আবিষ্কৃত ও ব্যবহৃত হয়েছে। লোকসংস্কৃতির এ ভা-ার আজ অবহেলিত, এর রস আস্বাদন থেকে বর্তমান প্রজন্ম বঞ্চিত। কারণ এর চর্চা করার মতো গবেষণা নেই, কিছু থাকলেও আমরা তা পড়ি না, ব্যবহার করি না। অথচ একটি দেশের সম্পদ ও ঐতিহ্য সে দেশের লোকসংস্কৃতি। মৈমনসিং গীতিকা এমন একটি ভা-ার যা বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের মানুষের গানে গানে, ছড়া, কবিতা ও শ্লোকের মাধ্যমে চর্চা করা হতো। মৈমনসিং গীতিকার এসব কাহিনী থেকেই এ দেশে বিভিন্ন সময় নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে। কিন্তু তা খুব বেশি নয়। আমাদের এসব নাটকের আরো মঞ্চায়ন প্রয়োজন যাতে এ দেশের নতুন প্রজন্ম জানতে পারে, ভালোবাসতে পারে লোকসংস্কৃতিটি। এ ভাবনাও একটি বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে এ উৎসব আয়োজনের। আমরা চেয়েছি, বর্তমানে মঞ্চস্থ হচ্ছে মৈমনসিং গীতিকার এমন নাটকগুলোকে একই ফ্রেমে নিয়ে এসে এ দেশের নাট্যদর্শককে এক সঙ্গে উপহার দেয়া। এ জন্যই এ উৎসব।


গত ২৫ সেপ্টেম্বর অত্যন্ত জাঁকজমক ও আড়ম্বর করে উৎসবের উদ্বোধন করা হয়। এটি উদ্বোধন করেন উপমহাদেশের অন্যতম নাট্যনির্দেশক, নাট্যকার বিভাস চক্রবর্তী। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন আইটিআই বিশ্ব সভাপতি নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার, নাট্যজন নাসির উদ্দীন ইউসুফ, বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশানের সভাপতিম-লীর সদস্য ঝুনা চৌধুরী ও সেক্রেটারি জেনারেল আকতারুজ্জামান। এছাড়া সভাপতিত্ব করেন লোকনাট্যদল সভাপতি ও উৎসব কমিটির আহ্বায়ক অভিজিৎ চৌধুরী। উদ্বোধনীতে সোনাই মাধবের বিভিন্ন অংশের কোলাজ দৃশ্য অভিনীত হয়।
উৎসবের প্রথম দিনে মঞ্চস্থ হয় জাহাঙ্গীরনগর থিয়েটারের প্রযোজনা ‘দস্যু কেনারামের পালা’। এটি নির্দেশনা দেন রাসেল রানা। দ্বিতীয় দিন মঞ্চস্থ হয় লোকনাট্যদল প্রযোজনা ‘সোনাই মাধব’ যা এ নাটকের ১৫০তম মঞ্চায়ন। এটি নির্দেশনা দিয়েছেন ইউজিন গোমেজ। নাট্যপ্রদর্শনী শেষে নাট্যজন বিভাস চক্রবর্তী নাটকের কলাকুশলীকে শুভেচ্ছা জানান ও উৎসব স্মারক প্রদান করেন।
উৎসবের তৃতীয় দিন মঞ্চস্থ হয় শিকড় নাট্যসম্প্রদায় কিশোরগঞ্জের প্রযোজনা ‘চন্দ্রাবতী’। এর নির্দেশনা দিয়েছেন ধনেশ চন্দ্র প-িত। চতুর্থ দিনে মঞ্চস্থ হয় নাট্যধারা প্রযোজিত নাটক ‘আয়না বিবির পালা’। এর নির্দেশনা দিয়েছেন রবিউল আলম। উৎসবের পঞ্চম দিনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের প্রযোজনা ‘মহুয়া’ মঞ্চস্থ হয়। নাটকটির নির্দেশনা দিয়েছেন ড. সোমা মুমতাজ। নাটক শেষে নাট্যজন লাকী ইনাম নাট্যনির্দেশক ও সংগঠনকে শুভেচ্ছা স্মারক প্রদান করেন। ষষ্ঠ দিন মঞ্চস্থ হয় তপন হাফিজ নির্দেশিত ও নাট্যতীর্থ-এর প্রযোজনা ‘কমলা সুন্দরী’।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মতো উৎসবের শেষ দিনেও ছিল আলোচনা। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. রনজিৎ বিশ্বাস এবং বিশেষ অতিথি সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ। তারা নাটকের শিল্পী ও কলাকুশলীর হাতে উৎসব স্মারক তুলে দেন।


মৈমনসিং গীতিকা নাট্যোৎসবের বিশেষ আয়োজন ছিল নাট্যজন বিভাস চক্রবর্তীর সঙ্গে আলাপচারিতা তথা নাট্যআড্ডা। এতে অংশ নেন বাংলাদেশের অগ্রজ ও নতুন প্রজন্মের নাট্যকর্মী, নির্দেশক, নাট্যশিক্ষক এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যপ্রশিক্ষণার্থীরা। প্রায় চার ঘণ্টার ওই আলাপচারিতায় উঠে আসে নাট্যজন বিভাস চক্রবর্তীর নাট্যজীবন ও তার নির্দেশিত নাটকগুলো। এর বেশির ভাগ সময়ই ঘুরে-ফিরে আসে তার নির্দেশিত মৈমনসিং গীতিকা অবলম্বনে ‘মাধব মালঞ্চি কইন্যা’ নাটক মঞ্চায়নের পটভূমি ও অভিজ্ঞতার কথা। এছাড়া উঠে আসে দুই বাংলার নাট্যসংস্কৃতির মেলবন্ধনের কথা, সংকট ও সমাধানের পথ নিয়ে আলোচনা। একেবারেই ঘরোয়া ওই আড্ডায় প্রায় ২০০ নাট্যকর্মী অংশগ্রহণ করেন। আলাপচারিতা প্রথম পর্ব সঞ্চালন করেন নাট্যজন মামুনুর রশীদ এবং দ্বিতীয় পর্ব সঞ্চালন করেন নাট্যজন নাসির উদ্দীন ইউসুফ। এসব আড্ডায় অংশগ্রহণ করেন রামেন্দু মজুমদার, আতাউর রহমান, মান্নান হীরা, ঝুনা চৌধুরী, অনন্ত হীরা, মোহাম্মদ বারী, বাবুল বিশ্বাস, গোলাম শফিক, আকতারুজ্জামান, সুদীপ চক্রবর্তী, অভিজিৎ চৌধুরী, গোলাম সারোয়ার, ঠা-ু রায়হান ও একঝাঁক তরুণ নাট্যকর্মী। তারা এ ধরনের বিষয়ভিত্তিক উৎসব আয়োজনের জন্য লোকনাট্যদলের প্রশংসা করেন।
এ উৎসবে যে নাটকগুলো মঞ্চস্থ হয়েছে তা এ প্রজন্মের নাট্যদর্শক ও নাট্যকর্মীদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে, ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে তাদের মধ্যে। এর প্রমাণ প্রতিদিন মিলনায়তনে দর্শকপূর্ণ মঞ্চায়ন। এ অনুপ্রেরণা বেশি করে লোকনাট্য নিয়ে কাজ করতে তরুণদের আগ্রহী করে তুলবে- যে রকম অন্য থিয়েটার ও বিভাস চক্রবর্তীর মাধব মালঞ্চি কইন্যা এখনো আমাদের স্মৃতি ছুঁয়ে যায় এবং লোকনাট্যদলের সোনাই মাধব নাট্যকর্মীদের জন্য হয়ে ওঠে গবেষণা ও শিখনের বিষয়। আমাদের শিকড় থেকে উঠে আসা এ নাটকগুলোর এমন চমৎকার উপস্থাপনা ও অভিনয়ে এক অসাধারণ অনুভূতি জাগায়! সোনাই মাধব এমন একটি সহজ-সরল কাহিনী যা লোকনাট্যদলের উপস্থাপনায় ব্যঞ্জনা পেয়েছে, দর্শকের হৃদয় ছুঁয়েছে। ফলে এটি দুই দশক ধরে মঞ্চস্থ হচ্ছে। এর দেড়শতম মঞ্চায়ন উপলক্ষে লোকনাট্যদল আমাদের উপহার দিয়েছে ‘মৈমনসিং গীতিকা নাট্যোৎসব’-এর মতো একটি আসাধারণ, অবিস্মরণীয় নাট্যোৎসবের। অভিনন্দন লোকনাট্যদল (বনানী)-কে।

 

- আবদুল্লাহ আল হারুন

 বৈশাখ পার্বণ

 শায়মা হক 

 

 


পহেলা বৈশাখ বাঙালির প্রাণের উৎসব। এটি বাঙালির গান ও আনন্দে ঘোরাঘুরির দিন। এর সঙ্গে বাংলার ঐতিহ্যবাহী খানা খাওয়ারও দিন। এ উৎসব ঘিরে থাকে নানান আয়োজন। শহর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জ মেতে ওঠে এ আনন্দ উৎসবে। এদিনটি ঘিরে শহর ও গ্রামে বসে মেলা, পুতুল নাচ, যাত্রাপালা ও নানান সাংস্কৃতিক উৎসব।

পহেলা বৈশাখ ও রমনার বটমূল
রমনার বটমূলে ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ গানটি দিয়ে বর্ষবরণ ছাড়া যেন আসে না বাঙালির নতুন বছর। খুব ভোরেই দেখা যায় কোলের শিশু থেকে শুরু করে পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষকেও লাল-সাদাসহ বাহারি রঙের পোশাক পরে রমনার বটমূলে জড়ো হতে। এক সঙ্গে কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে তারা গায় গান। শিল্পী, কলাকুশলী, সাধারণ জনতার আনন্দ কোলাহলে ভরে ওঠে চারদিক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়Ñ যেখানে ফিরে ফিরে আসে বৈশাখ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সেই ফেলে আসা দিনের প্রবীণ থেকে নবজাগরণে জাগরিত তরুণেরও এ প্রাণের বিদ্যাপীঠ। যে কোনো অনুষ্ঠান, আনন্দ, উৎসবেই জেগে ওঠে জনতা এ বিদ্যাপীঠের পাদদেশে। প্রতিবাদ-প্রতিরোধেও গড়ে তোলে সকণ্ঠ প্রতিবাদী কলরোল। বাংলাদেশের ক্রিকেটের জয়লাভ থেকে শুরু করে যে কোনো জাতীয় উৎসবে ওই প্রাঙ্গণটি হয়ে ওঠে আনন্দমুখর জনতার দিন, বাঙালির দিন। চারুকলার শোভাযাত্রা, টিএসসি বা কলা ভবনের অনুষ্ঠানÑ কী নেই এতে? বাঙালির মনের মতো সব আয়োজনেই সাজানো থাকে এখানে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেও চলে যাওয়া যায় কিছুক্ষণ এ বৈশাখের প্রথম দিনের প্রথম লগনে।

পিঠা, পুলি, মুড়ি, মুড়কি ও বাঙালিয়ানায় ফিরে যাওয়ার বিশেষ একটি দিন
পহেলা বৈশাখ ঘিরে বাঙালির খাদ্যেও চলে নানান আয়োজন। রাস্তার পাশের ছোট্ট ঠেলার ওপর সাজানো দোকানটি থেকে শুরু করে বড় বড় ডিপার্টমেন্ট স্টোরগুলোও সেজে ওঠে বৈশাখী উৎসবে। পাওয়া যায় নানান প্যাক বা বাহারি গামছায় মোড়া বেত-কাঠের ডালা-কুলায় সাজানো গ্রামবাংলার বাঙালির ঐতিহ্যবাহী নানান পিঠা-পুলি ও মুড়ি-মুড়কি। আয়োজন করা হয় বাঙালি নানান খাবারের মেলা। এছাড়া প্রায় প্রতিটি পরিবারেই বিশেষ খাবারের আয়োজন করা হয়। সবাই মিলে পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ বা যে কোনো সদস্যের বাড়িতে জড়ো হন এবং মেতে ওঠেন খানা-পিনা, হাসি-আনন্দ ও গানে।

পান্তা-ইলিশ
কয়েক বছর ধরে এ উৎসবে যোগ হয়েছে পান্তা-ইলিশ ও নানান ভর্তা। এ আয়োজনে বৈশাখের প্রথম লগনটি শুরু করা হয়। এ উপলক্ষে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট থেকে শুরু করে পারিবারিক ও নানান ক্লাব প্রতিষ্ঠানেও আয়োজন করা হয় পান্তা-ইলিশ উৎসব। এর সঙ্গে সঙ্গে পিঠা-পুলি, ক্ষীর, পায়েসসহ মুখরোচক নানান খাবারের আয়োজন থাকে।

লাল-সাদা শাড়ি ও পাঞ্জাবি এবং ফুলে ফুলে সুরভিত সকাল
সবাই রঙিন এবং শুদ্ধতার প্রতীক সাদা ও লালে সেজে ওঠেন। বৈশাখের বহু আগে থেকেই শুরু হয় বিপণি বিতানগুলোয় লাল-সাদা পোশাকের নানান আয়োজন। পরিবারের শিশু থেকে শুরু করে বয়স্ক ব্যক্তির কথা মাথায় রেখেই ফ্যাশন হাউসগুলো সাজিয়ে তোলে তাদের অবয়ব লাল-সাদা বা রঙিন উৎসব পোশাকে। ফুলের দোকানগুলো হেসে ওঠে ফুলে ফুলে। রমনার বটমূলে বেলি ফুলের শুদ্ধতম সৌরভের সঙ্গে হাসে টকটকে গোলাপ বা ঝলমলে হলুদ গাঁদা। প্রিয়তমা স্ত্রী বা প্রেমিকার খোঁপা অথবা বেণীতে এক গোছা বেলি ফুলের মালা ছাড়া যেন ওই সকাল বড়ই ম্রীয়মাণ। তাই ওই রঙিন সুরভিত সকালে গেয়ে ওঠে প্রাণÑ ‘সবার রঙে রঙ মেলাতে হবে।’


রবীন্দ্র সরোবর ও বৈশাখের বিকাল-সন্ধ্যা
রাজধানীতে ধানম-ির লেকের পাশে রবীন্দ্র সরোবরে জেগে ওঠে বৈশাখ তার নানান আয়োজনে, বিশেষ করে বৈশাখের আনন্দময় বিকাল এখানে নিয়ে আসে যেন নতুন বারতা। এখানে মুক্তমঞ্চে আয়োজন করা হয় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। মজাদার নানান খাবারের আয়োজনও ছড়িয়ে থাকে চারপাশে। গরু বা মুরগির চাপের সঙ্গে গরম লুচি অথবা চটপটি-ফুচকা সারা দিনের ঘুরাঘুরি ও আনন্দটি করে তোলে আরো মোহনীয়। লেকের ঝিরঝিরি সান্ধ্যকালীন হাওয়া ভুলিয়ে দেয় সারা দিনের ক্লান্তি। মুছে যায় গ্লানি, ঘুচে যায় জরা।


জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও শহর ছেড়ে একটু দূরের বৈশাখ
প্রকৃতির কাছাকাছি থেকে নতুন বছর বরণ করে নিতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় খুবই উপযোগী। নানান সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও মেলা বা আয়োজনে ভরে ওঠে এ বিদ্যাপীঠের প্রাঙ্গণ। এই খোলামেলা হাওয়ায় গেয়ে ওঠে বুঝি প্রাণÑ ‘তোমার খোলা হাওয়া লাগিয়ে পালে বৈশাখী প্রভাতের মুক্ত হাওয়ায়।’

সোনারগাঁও লোকশিল্প জাদুঘর ও বৈশাখী মেলা
পহেলা বৈশাখের সবচেয়ে বড় মেলাগুলোর মধ্যে একটি হলো সোনারগাঁও লোকশিল্প জাদুঘর বা তৎসংলগ্ন মেলা। বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারক ঢাকার অদূরে সোনারগাঁওয়ের লোকশিল্প জাদুঘর। পানামনগর বা আমাদের সোনালি অতীতে এ মেলাগুলো কেমন ছিল তা জানা নেই। তবে বর্তমানের রঙিন বর্ণালি মেলাও কম আকর্ষণীয় নয়।

হালখাতা ও পহেলা বৈশাখ
বৈশাখ ও হালখাতা ভুলে যাওয়া কোনোমতেই চলে না! মূলত এদিন ঘিরেই আসলে বাঙালির জীবনে শুরু হয়েছিল পহেলা বৈশাখের উৎসব বা আয়োজন। ব্যবসায়ীরা এদিনটিতে পুরনো হিসাব-নিকাশের খাতা ফেলে খোলে নতুন হিসাবের খাতা। এ খাতাটিকেই বলা হয় হালখাতা। এ নিয়মটি এখনো বহাল। তাই আজও বৈশাখের সকালে সব দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেই চলে মিষ্টিমুখের আয়োজন এবং তা চলে দিনব্যাপী।

বৈশাখ বাঙালির জীবনে নিয়ে আসে নতুনের বারতা, আনন্দের সঙ্গীত। বৈশাখের নতুন ভোরে শুদ্ধতার প্রতিজ্ঞায় ভরে উঠুক সব বাঙালির জীবন, দূর হয়ে যাক সব গ্লানি; পুরনো বছরের সব জীর্ণতা, ব্যর্থতা কেটে হেসে উঠুক সব বাঙালির প্রাণ। আমরা সবকিছুর সঙ্গে সঙ্গে আনন্দ উৎসবেও ভুলে যাবো না আমাদের বিবেক ও সচেতনতা। আমাদের ক্ষুদ্র গৃহের প্রত্যেক সদস্যের মতোই আমরা সব বাঙালি জাত-পাত নির্বিশেষে একই পরিবারের সদস্য। পরিবারটির নাম বাংলাদেশ। এ দেশের প্রতিটি পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের মান-সম্মান, স্নেহ-মমতা ও বিবেক বড় বেশি মূল্যবান আমাদের কাছে। তাই নিজের জীবন দিয়ে হলেও এসব কিছু রক্ষার দায়িত্ব আমাদেরই। উৎসবে-আয়োজনে সবাই থাকুন নিরাপদ ও সহনশীল। তবে সবাই চোখ রাখুন হীনমানসিকতা ও স্বার্থান্বেষী কিছু চক্রের দিকে। তারা যেন কোনোভাবেই থামিয়ে দিতে না পারে আপনার-আমার আনন্দময় জীবনের আনন্দগুলো।

উৎসব আয়োজনে নারী-পুরুষ, শিশুসহ সবাই থাকুন নিরাপদ ও আনন্দময়! সবার জন্য রইলো নববর্ষের শুভেচ্ছা।

আমি সত্যিই কি গান লিখি?

মিল্টন খন্দকার

 


স্বপ্ন দেখারও লিমিট থাকা উচিত। আবার স্বপ্ন না দেখাও মৃত মানুষের লক্ষণ। তবুও মফস্বল শহর কুষ্টিয়ার এক বালক। বালক বয়সেই স্বপ্নের লিমিট ক্রস করলো সে। ভেতরে ভেতরেই ঘোষণা দিল, বড় হতে হবে। কিন্তু কতো বড়? আমার মাথা এ ঘরের ছাদ ফুটো করে আকাশ স্পর্শ করার মতো বড়! না, আপাতত ততো বড় নয়। বড় হওয়ার সীমানাটা ৫৬ হাজার বর্গমাইল হলেই চলবে। এরপর সময় বুঝে ব্যবস্থা।
এই যার লক্ষ্যমাত্রা, প্রতিগগা, উচ্চাকাক্সক্ষা- ওই বালকের নাম মিল্টন তথা আমি। তখনো খন্দকার হয়ে উঠিনি। খন্দকার হয়ে ওঠা তারও অনেক, অনেক ও অনেক পরে। মনে হয় যখন বছর তিন বয়স, কথা বলি আধো আধো তখনকার কথা মনে পড়ে। সেই সময় আমার সেজভাই আমাকে বলতো, তুই একটা গান গাইলে তোকে পয়সা দেবো। গান গাইতে পারি কী- জানি না। কিন্তু পাঁচ পয়সার লোভে গান গাইতাম, ‘নাইয়া রে... নায়ের বাদাম তুইল্যা...।’
যতো দূর মনে পড়ে, ওই হচ্ছে আমার গান গাওয়া। আজ ভাবি আর হাসি, আমি তিন বছর বয়স থেকে প্রফেশনাল সিঙ্গার। পাঁচ পয়সার জন্য গান গাইতাম। মাঝখানে মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধের সময় কোথায় কেথায় পালিয়ে বেড়ালাম মায়ের হাত ধরে, ভাইয়ের হাত ধরে! দেশ স্বাধীন হলো। দেশ স্বাধীন হওয়াটা আমার কাছে অতো খুশির ছিল না। খুশির খবর ছিল আমাকে ক্লাস ওয়ান থেকে টু-তে তুলে দিল যখন। সে কী আনন্দ! আনন্দ তখন আরো এক ধাপ বেড়ে গেল যখন স্কুলে আমি ছাড়া জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার লোক ছিল না। আমাকেই গাইতে হতো। এরপর এবাড়ি-ওবাড়িতে যখন বিয়ে হতো তখন মাইক বাজানো অভিজাত পরিবারের রেওয়াজ ছিল। আর অত্র এলাকার গায়ক বলতে ওই সময় বালক মিল্টন অত্যন্ত জনপ্রিয়। তারপর ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টায়। মাস গড়ায়, বছর গড়ায়। আমাকে একদিন ওস্তাদ খন্দকার মিজানুর রহমান বাবলু ডেকে পাঠালেন গান শেখাবেন বলে। প্রথমে মুগ্ধ হলেও পরে হয়েছে দ্বন্দ্ব। বাবলু স্যার আমাকে গান শেখাবেন বলে ডেকেছিলেন বটে তবে আমার পাপী মন বলে, তার সংগঠনে মেয়ের সংখ্যা ছিল বেশি। ছেলের সংখ্যা ছিল নিতান্তই হাতে গোনা। অন্তত একজন মিল্টন বাড়লে একজন ছেলে বাড়ে। কিন্তু না, মিল্টন ছাড়াও আরো ছেলে বাড়লো। এরপরও বাবলু স্যারকে ধন্যবাদ- তিনি আমার ভেতরে গানের বীজটা বুনেছিলেন।


এরপর দ্রুত যেন সময় ফুরিয়ে যায়। আজ এখানে গান করি তো কাল ওখানে নাটক করি। ততো দিনে কুষ্টিয়ায় একটি থিয়েটার ‘বোধন’-এর সঙ্গে নাট্যআন্দোলনে জড়িয়ে পড়ি। বেশকিছু নাটকে অভিনয়ও করি। সঙ্গীত ও নাটকে দ্রুত নাম করলেও মা-বাবার মুখে তখন কালিমা লেপন করলাম যখন ম্যাট্রিকে পর পর দু’বার ফেল করলাম। অবশ্য তিনবারের বেলায় হিমালয় ছোঁয়ার স্বাদ পেলাম। কোনো রকম ডিভিশন ছাড়াই পাস।
পাস তো করলাম। এবার আমি হাঁসফাঁস যে কারণে- বাকিটুকু পড়াশোনা কীভাবে করবো? একজন বুদ্ধি দিল- তুই তো গান জানিস, ঢাকায় মিউজিক কলেজে ভর্তি হয়ে যা। চারটা সাবজেক্ট পড়াশোনা করা লাগবে না।
ওস্তাদ খালিদ হোসেন,ওস্তাদ জহির আলীম, ওস্তাদ আবু বকর সিদ্দিক ও আমার এক বন্ধু নজরুলের সহযোগিতায় মিউজিক কলেজে ভর্তি হলাম। ভর্তি অবশ্য অডিশন দিয়েই হতে হয়েছে। অডিশন যিনি নিলেন তিনি ওস্তাদ নারায়ণ চন্দ্র বসাক।


যাহোক, গান এগোতে লাগলো। একদিকে সঙ্গীত চর্চা, অন্যদিকে গান লেখা ও সুর করার চর্চা। ওই শুরু। ১৯৮৬ সালে আমার কথা ও সুরে প্রথম অ্যালবাম বের হলো ‘সেই তুমি’। কণ্ঠশিল্পী হাসান চৌধুরী। ওই থেকে আজ পর্যন্ত আমার লেখা ও সুরে অ্যালবামের সংখ্যা প্রায় দুইশ’। চলচ্চিত্রে গান আছে পাঁচশ’র বেশি।
অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছি দেশ-বিদেশ থেকে। এর মধ্যে ২০১২ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাই ‘খোদার পরে মা’ সিনেমায় গানের জন্য।
ব্যক্তিগত জীবনে দুই কন্যার বাবা আমি। অবশ্য কন্যা দু’জনই বাবার গানের ভক্ত নন। তারা ভক্ত দেব-এর গানের। নাচতে পারদর্শী মেয়েরা প্রায়ই আমাকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়- বাবা, তুমি নাকি গান লেখো? তুমি গান লিখতে পারো?
আমি পারি না বললে ওরা খুশি হয়। যেদিন জাতীয় পুরস্কার পেলাম, পুরস্কারটি বড় মেয়ের হাতে আর মেডেলটি ছোট মেয়ের গলায় পরিয়ে বললাম, বাবা, আমি সত্যিই কি গান লিখি?
কয়েক সুরকার আছেন যারা গীতিকারদের পেলে ফাই-ফরমায়েশ খাটাতে চান। কারণ যেসব গীতিকার গানের শিক্ষায় শিক্ষিত নন তাদের দিয়ে সুযোগ নিতে চান। ভবিষ্যতে কোনো সুরকার যেন কোনো গীতিকারকে অবহেলা বা তাচ্ছিল্য করার সুযোগ না পান এ জন্য প্রতিষ্ঠা করি ‘গীতিকাব্য চর্চা কেন্দ্র’। এর মূল উদ্দেশ্য- যিনি গান লিখতে পারেন তিনি এসে জানাবেন এবং যিনি জানেন না তিনি জেনে যাবেন।
বর্তমানে গানের পাশাপাশি সিনেমা তৈরির একটি পবিত্র ইচ্ছা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যেই চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় কাহিনীকার জামান আকতার কাহিনী লিখতে শুরু করেছেন। সঙ্গীতনির্ভর ওই সিনেমাটি আশা করছি, আগামী বছরের শুরুর দিকেই দর্শক দেখতে পারবে।


আমরা যখন ইন্টারভিউ বোর্ডে কিংবা টিভি স্টুডিওতে থাকি বা যখন কথাবার্তা বলি তখন মনে হয়, আমার চেয়ে নিষ্পাপ ও সত্যবাদী আর কেউ নেই। নিজেকে ভালো রেখে অন্যকে আঙুল তুলে মন্দ বলায় আমরা পারদর্শী। রক্ত-মাংসের মানুষ, ভালো-মন্দ দুই-ই আমার ভেতরে কাজ করে। জীবনে শুধু ভালো কাজই করেছি- এমন দাবি কখনোই করি না।
কখন, কোন সময় ভুল হয়, কখন শুদ্ধ হয়- ওই হিসাব আছে সৃষ্টিকর্তার খাতায়। আমরা পাপ কুড়িয়ে চলেছি। সাফ মনে একটি কথা বলতে চাই- সৃষ্টিকর্তা বলেছেন, ‘মানুষকে ভালোবাসো, আমাকে পাবে।’ আমি সৃষ্টিকর্তার এ কথাটি অক্ষরে অক্ষরে পালন করে চলেছি। এ জন্য যদি অন্যায় করে থাকি তাহলে আমি করেছি। এতে কারো কিছু বলার থাকলে সে বলুক- আমার কিছু এসে যায় না।

 

 অনুলিখন : জোবায়েদ সুমন

 

স্মৃতিকথা - দি মারশিয়ান

ফুয়াদ বিন নাসের

 

‘দি মারশিয়ান’ চলচ্চিত্রটি দেখতে দেখতেই আমার প্রথম যে কথা বার বার মনে হচ্ছিল তা হলো, এটি একদমই গতানুগতিক ঘরানার একটি ছবি। আপনি যদি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী ও সাই-ফাই বা থ্রিলার চলচ্চিত্রের ভক্ত হয়ে থাকেন তাহলে দি মারশিয়ান-এর কাহিনীর অন্তিমে কী কী হতে পারে তা আন্দাজ করে মিলিয়ে ফেলাটা খুব একটা কঠিন বা কাকতালীয় কাজ হবে না বলেই মনে করি। রিডলি স্কট-এর এ চলচ্চিত্রটি মঙ্গল গ্রহে এক মহাকাশচারীর একা টিকে থাকার সংগ্রামের কাহিনী। খুব সহজ ভাষায় বলতে গেলে ‘রবিনসন ক্রুসো’ ফরমাটের চিত্রনাট্য এটি। এই ফরমাটের অনেক ভালো চলচ্চিত্র আমরা অনেকই দেখেছিÑ ‘কাস্ট অ্যাওয়ে’, ‘লাইফ অফ পাই’, ‘ইন্টারস্টেলার’, ‘গ্র্যাভিটি’ ইত্যাদি। আমি আগে থেকেই জানতাম, এটি ওই ঘরানার চলচ্চিত্র। এমনকি অ্যান্ডি উইয়ার-এর যে উপন্যাস অবলম্বনে এ ছবির চিত্রনাট্য তাও আমার পড়ার টেবিলে পড়ে আছে প্রায় মাসখানেক হলো। কিন্তু রিডলি স্কট, ম্যাট ডেমন, জেসিকা চ্যাস্টেইন ও শন বিনদের রুপালি পর্দার কারিশমার জৌলুস কমে যাওয়ার ভয়ে ওই বইয়ে হাত দেয়া হয়নি।
ম্যাট ডেমন অভিনয় করেছেন মার্ক ওয়াটনি নামে এক আমেরিকান নভোচারীর ভূমিকায়। কমান্ডার মেলিসা লুইসের (জেসিকা চ্যাস্টেইন) নেতৃত্বে নাসা-র একটি নভোচারীর দল মঙ্গল গ্রহে বেসক্যাম্প স্থাপন করে বিভিন্ন পরীক্ষা চালাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ এক ভয়াবহ বালুঝড়ে ইমার্জেন্সি টেক অফ করতে বাধ্য হয় কমান্ডার লুইস। ঝড়ে হারিয়ে যাওয়া ওয়াটনি-কে রেখেই তারা মঙ্গল ছাড়তে বাধ্য হয়। এদিকে পৃথিবীতে খবর চলে যায় ওয়াটনি-র মৃত্যুর। সে আসলে তখনো জীবিত, কোনোমতে বেসক্যাম্পে ফিরে আসে। কিন্তু পৃথিবী বা তার সহযাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ করার উপায় থাকে না। এ জন্য তার লক্ষ্য থাকে যতো বেশিদিন সম্ভব মঙ্গল গ্রহে বেঁচে থাকা। এসব নিয়েই ‘দি মারশিয়ান’ চলচ্চিত্রের কাহিনী এগিয়েছে।
দি মারশিয়ান মুভিটিকে চাইলে আপনি একটি সারভাইভাল টিউটোরিয়াল হিসেবে চালিয়ে দিতে পারেন। পরিচালক রিডলি স্কট সেভাবেই তার চিত্রনাট্য ও সিনেমাটোগ্রাফি সাজিয়েছেন। ওয়াটনি প্রতিদিন নিজের ভিডিও দিনলিপিতে একটি করে অ্যান্ট্রি দেয়। একেকটি ছোট সমস্যা কীভাবে মোকাবেলা বা সমাধান করে এ প্রেক্ষাপটেই তার চরিত্রটি ধীরে ধীরে বিকাশ পেয়েছে রুপালি পর্দায়। ছোট ছোট টিউটোরিয়াল যে কোনো বিজ্ঞান মনস্ক দর্শককেই মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখবে। কীভাবে ফেসপ্লেটের ফাটা সারাবে, নিজের ওপর অপারেশন কীভাবে করবে, মঙ্গলের শুকনো আবহাওয়ায় পানির বন্দোবস্ত কীভাবে করবে, মঙ্গলের মাটিতে কীভাবে আলু চাষ করবে, কীভাবে কথা ছাড়া দ্রুত যোগাযোগ করবে ইত্যাদি ছোট সমস্যার সমাধান করে ওয়াটনির দিন কেটে যায়।


এদিকে পৃথিবীতে নাসা-য় চলছে তোলপাড়। জীবিত এক নভোচারীকে মৃত ঘোষণা দেয়া, তার জীবিত থাকার খবর প্রকাশ করাÑ সব মিলিয়ে নাসার কর্মকর্তারা বিশাল হ্যাপার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জনগণের কাছে নাসার ভাবমূর্তি ঠিক রাখতে ওয়াটনিকে উদ্ধার করতে অভিযান দল পাঠাতে হবে। এতো অল্প সময়ের মধ্যে কি তারা পারবে মঙ্গল গ্রহের জন্য আরেকটা মিশন পুরোপুরি সম্পন্ন করতে? এসব নিয়েই পৃথিবীর কাহিনী এগিয়েছে।
মঙ্গল ও পৃথিবী ছাড়াও দি মারশিয়ানের আরেকটি কাহিনীর সুতা এগিয়েছে ওয়াটনির বাকি ৫ সহযাত্রীকে নিয়ে। তারা মঙ্গল থেকে পৃথিবীর দিকে যাত্রা করছে ওয়াটনিকে ফেলে আসার গ্লানি বুকে নিয়ে। কাহিনীর এ অংশে চমৎকার একটা চমক আছে যেটা হয়তো একটু অভিজ্ঞ সিনেমাপ্রেমীরা সহজেই আন্দাজ করতে পারবেন।
সাই-ফাই চলচ্চিত্র নির্মাণের ব্যাপারে পরিচালক রিডলি স্কট ওস্তাদ ব্যক্তিই বটে। ‘ব্লেইড রানার’ (১৯৮২), ‘এলিয়েন’ (১৯৭৯) এবং সাম্প্রতিক ‘প্রমিথিউস’ (২০১১) মুভি দিয়েই আমরা বুঝতে পারি, এ ধরনের ছবি তৈরি করতে তার থেকে যোগ্য ব্যক্তি খুব একটা বেশি নেই। এদিকে টিভি সিরিজ ‘লস্ট’ ও ‘ওয়ার্ল্ড ওয়ার জেড’ (২০১৩) খ্যাত চিত্রনাট্যকার ড্রিউ গডার্ড ও বিখ্যাত কল্পবিজ্ঞান লেখক অ্যান্ডি উইয়ার-এর সম্মেলনে চলচ্চিত্রটির যে পটভূমি এবং কাহ্নের বিবর্তন হয়েছে তা যতোই গতানুগতিকই হোক না কেন, যে কোনো দর্শককে ধরে রাখার জন্য যথেষ্ট। ম্যাট ডেমন, জেসিকা চ্যাস্টেইন-এর পাশাপাশি মুভিতে দেখা যাবে শন বিন, ড্যানি গ্লোভার, শিওয়েতেল এজিওফর, কেট মারা-র মতো বড় বড় নাম। শ্রেক, নার্নিয়া, প্রিন্স অফ পারসিয়াখ্যাত সুরকার হ্যারি গ্রেগসন উইলিয়ামস-এর মূর্ছনার ব্যবহার করা হয়েছে খুবই সাবলীলভাবে। মুভিটিতে নখ কামড়ানো উত্তেজনার মুহূর্তগুলোর ব্যাপ্তিকাল কম হলেও আকর্ষণ বেশিই। মার্ক ওয়াটনির প্রতিটি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা, বিপদে পড়া বা বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার মুহূর্ত এবং সর্বশেষ ক্লাইম্যাক্সÑ সব জায়গাতেই হ্যারি গ্রেগসন-এর ছোঁয়া মনে দাগ কেটে যাবে।
দি মারশিয়ান চলচ্চিত্রের খারাপ দিক যদি বলতে হয় তাহলে তা আগেই বলেছি, গল্পের প্রেডিক্টিবিলিটি। যা যা ভাববেন, মুভি চলাকালে সেটিই হবে। মুভির চরিত্রগুলোও খানিকটা স্টেরিও টাইপড। সত্যি বলতে কী, ওই মুভিতে নেগেটিভ চরিত্র বলে কিছু নেই। হয়তো নাসার বিজ্ঞাপন প্রজেক্ট বলেই নাসা ও নাসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে একটি ‘ভালো মানুষ’-এর গ-ির মধ্যে নিয়ে আসা হয়েছে। পুরো মুভিতে গতানুগতিক সারভাইভাল মুভির ডার্ক টোনের বদলে হালকা মেজাজ নিয়ে আসার চেষ্টা করা হয়েছে। এক্ষেত্রে অবশ্য অভিনেতাদের সংলাপ ও চিত্রনাট্যকাররা বাহবা কুড়ানোর দাবিদার। ঘন ঘন ওয়াটনি ও অন্যদের হিউমার আপনাকে তার জীবন-মরণ সমস্যার উত্তেজনা থেকে সরিয়ে রাখবে যেটি আসলে মার্ক ওয়াটনিরও উদ্দেশ্য। যেখানে মঙ্গল গ্রহে একা বাকি জীবন কাটানোর ঘোরতর সম্ভাবনা আছে সেখানে সিরিয়াস না হয়ে হালকা মেজাজে থাকাই বরং অধিকতর গ্রহণযোগ্য, কি বলেন?
সব মিলিয়ে দি মারশিয়ান হয়তো রিডলি স্কটের ‘ব্লেড রানার’, ‘এলিয়েন’ বা ‘গ্ল্যাডিয়েটর’-এর মতো তাক লাগানো কোনো চলচ্চিত্র হয়নি। কিন্তু এটিকে আবার ‘প্রমিথিউস’-এর মতো পুরোপুরি হতাশার লাইনেও ফেলে দেয়াটা অন্যায়। যে কোনো দর্শক পুরো ১৪৪ মিনিটই উপভোগ করবে। মুভি শেষে যতো ম্যাট ডেমন বা চ্যাস্টেইন, কেট মারারা থাকুন না কেন, সবচেয়ে ভালোবাসা ও মন খারাপের জন্ম দেবে শ’খানেক আলু!

একুশের চেতনায় রচিত নাটক

‘কবর’

 

 

অনুপম হাসান

 

একুশে ফেব্রুয়ারি ৫২-তে ছাত্ররা পাকিস্তানী তাবেদার প্রশাসন যন্ত্রের ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করলে সরকারি নির্দেশে মিছিলে গুলি চালানো হয়েছিল; ‘কবর’ নাটকে সেকথা নেতার সংলাপে চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে :
জীবিত থাকতে তুমি দেশের আইন মানতে চাও নি! মরে গিয়ে তুমি এখন পরপারের কানুনকেও অবজ্ঞা করতে চাও। কম্যুনিজমের প্রেতাত্মা তোমাকে ভর করেছে, তাই মরে গিয়েও এখন তুমি কবরে যেতে চাও না। তোমার মত ছেলেরা দেশের মরণ ডেকে আনবে। [নেতা]
পাকিস্তানের দোসর নেতার বক্তব্যে ছাত্রের প্রতি অভিযোগ সম্পূর্ণ অন্যায়, অন্যায্য। কারণ, রাষ্ট্র জোরপূর্বক পূর্ব-পাকিস্তানের জনগণের মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার হরণ করতে চেয়েছিল। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর-পরই পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মি. জিন্নাহ ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে ঢাকা সফরে এসে পাকিস্তানের মাত্র সাড়ে সাত শতাংশ মানুষের মুখের ভাষা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করলে, বাঙালি ছাত্রসমাজ ও সাধারণ জনগণ তাৎক্ষণিকভাবেই গভর্নর জেনারেলের অন্যায় প্রস্তাবের বিরোধিতা করে তা প্রত্যাখ্যান করে। বাঙালি জনগণের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় সমঝোতার স্বার্থে ৫৬% মানুষের মুখের ভাষা বাংলার হওয়ার পরও উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়ার দাবি উত্থাপিত হয়। কিন্তু মি. জিন্নাহ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, যারা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করবে, ধরে নেয়া হবে তারা পাকিস্তান রাষ্ট্রের সংহতি চায় না এবং তারা পাকিস্তানের বিরোধী; আর পাকিস্তানের বিরোধী কাউকে বরদাস্ত করা হবে না। মি. জিন্নাহর এ বক্তব্যে বাঙালি জনগণ ভীষণভাবে নিরাশ হন; সদ্য স্বাধীনতা লাভ করেও বাঙালি জাতি অনুভব করতে থাকে পরাধীনতার শৃঙ্খল। ফলে ভাষার দাবিকে সামনে রেখে বাংলার নেতৃবৃন্দ বিশেষত ছাত্রসমাজ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। দফায় দফায় ভাষার আন্দোলন তীব্রতর হতে থাকলে এক পর্যায় তা পাকিস্তান রাষ্ট্রের চূড়ান্ত মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পরিণাতে ছাত্রসমাজের ভাষা-আন্দোলনকে চিরতরে নস্যাৎ করে দেয়ার হীন পরিকল্পনা নিয়ে ৫২-র একুশে ফেব্রুয়ারির পূর্বাহ্ণেই ১৪৪ ধারা জারি করা হয়, যাতে ছাত্ররা মিছিল-মিটিং করতে না পারে। দুর্বিনীত যৌবনের সামনে মৃত্যুভয় তুচ্ছ। তাই ছাত্ররা ২১ ফেব্রুয়ারি একে একে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে জড়ো হয়ে একক বৃহৎ মিছিলের পরিবর্তে খ- খ- মিছিল বের করে এবং পুলিশী বাধার সম্মুখিন হয়। এক পর্যায় পুলিশ গুলি চালালে নিহত হয়Ñ রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার ও নাম না জানা অনেকে।

মুনীর চৌধুরী নিজেও ভাষার দাবিতে বাঙালির আন্দোলনের সাথে ওতোপ্রতোভাবে যুক্ত ছিলেন। তিনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষক। ভাষা আন্দোলনের সাথে যুক্ত থাকার অভিযোগ তিনি গ্রেফতার হয়ে কারাগারে অন্তরীণ হন। প্রতিভাবান শিক্ষক মুনীর চৌধুরী কারারক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে ১৯৫৩ সালের ১৭ জানুয়ারি ‘কবর’ নাটক রচনা করেন। প্রথমবারের মতো ভাষা-শহীদ দিবস পালনের উদ্দেশ্যে ‘কবর’ কারাগারের অন্তরীণ রাজবন্দীদের দ্বারা অভিনয়ের জন্য। ভাষা আন্দোলন নিয়ে রচিত ‘কবর’ই প্রথম সাহিত্যিক প্রতিবাদী প্রয়াস।
একুশে ফেব্রুয়ারি ৫২-তে ছাত্ররা পাকিস্তানী তাবেদার প্রশাসন যন্ত্রের ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করলে সরকারি নির্দেশে মিছিলে গুলি চালানো হয়েছিল; ‘কবর’ নাটকে সেকথা নেতার সংলাপে চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে :
জীবিত থাকতে তুমি দেশের আইন মানতে চাও নি! মরে গিয়ে তুমি এখন পরপারের কানুনকেও অবজ্ঞা করতে চাও। কম্যুনিজমের প্রেতাত্মা তোমাকে ভর করেছে, তাই মরে গিয়েও এখন তুমি কবরে যেতে চাও না। তোমার মত ছেলেরা দেশের মরণ ডেকে আনবে। [নেতা]
পাকিস্তানের দোসর নেতার বক্তব্যে ছাত্রের প্রতি অভিযোগ সম্পূর্ণ অন্যায়, অন্যায্য। কারণ, রাষ্ট্র জোরপূর্বক পূর্ব-পাকিস্তানের জনগণের মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার হরণ করতে চেয়েছিল। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর-পরই পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মি. জিন্নাহ ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে ঢাকা সফরে এসে পাকিস্তানের মাত্র সাড়ে সাত শতাংশ মানুষের মুখের ভাষা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করলে, বাঙালি ছাত্রসমাজ ও সাধারণ জনগণ তাৎক্ষণিকভাবেই গভর্নর জেনারেলের অন্যায় প্রস্তাবের বিরোধিতা করে তা প্রত্যাখ্যান করে। বাঙালি জনগণের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় সমঝোতার স্বার্থে ৫৬% মানুষের মুখের ভাষা বাংলার হওয়ার পরও উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়ার দাবি উত্থাপিত হয়। কিন্তু মি. জিন্নাহ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, যারা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করবে, ধরে নেয়া হবে তারা পাকিস্তান রাষ্ট্রের সংহতি চায় না এবং তারা পাকিস্তানের বিরোধী; আর পাকিস্তানের বিরোধী কাউকে বরদাস্ত করা হবে না। মি. জিন্নাহর এ বক্তব্যে বাঙালি জনগণ ভীষণভাবে নিরাশ হন; সদ্য স্বাধীনতা লাভ করেও বাঙালি জাতি অনুভব করতে থাকে পরাধীনতার শৃঙ্খল। ফলে ভাষার দাবিকে সামনে রেখে বাংলার নেতৃবৃন্দ বিশেষত ছাত্রসমাজ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। দফায় দফায় ভাষার আন্দোলন তীব্রতর হতে থাকলে এক পর্যায় তা পাকিস্তান রাষ্ট্রের চূড়ান্ত

মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পরিণাতে ছাত্রসমাজের ভাষা-আন্দোলনকে চিরতরে নস্যাৎ করে দেয়ার হীন পরিকল্পনা নিয়ে ৫২-র একুশে ফেব্রুয়ারির পূর্বাহ্ণেই ১৪৪ ধারা জারি করা হয়, যাতে ছাত্ররা মিছিল-মিটিং করতে না পারে। দুর্বিনীত যৌবনের সামনে মৃত্যুভয় তুচ্ছ। তাই ছাত্ররা ২১ ফেব্রুয়ারি একে একে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে জড়ো হয়ে একক বৃহৎ মিছিলের পরিবর্তে খ- খ- মিছিল বের করে এবং পুলিশী বাধার সম্মুখিন হয়। এক পর্যায় পুলিশ গুলি চালালে নিহত হয়Ñ রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার ও নাম না জানা অনেকে।
মুনীর চৌধুরী নিজেও ভাষার দাবিতে বাঙালির আন্দোলনের সাথে ওতোপ্রতোভাবে যুক্ত ছিলেন। তিনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষক। ভাষা আন্দোলনের সাথে যুক্ত থাকার অভিযোগ তিনি গ্রেফতার হয়ে কারাগারে অন্তরীণ হন। প্রতিভাবান শিক্ষক মুনীর চৌধুরী কারারক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে ১৯৫৩ সালের ১৭ জানুয়ারি ‘কবর’ নাটক রচনা করেন। প্রথমবারের মতো ভাষা-শহীদ দিবস পালনের উদ্দেশ্যে ‘কবর’ কারাগারের অন্তরীণ রাজবন্দীদের দ্বারা অভিনয়ের জন্য। ভাষা আন্দোলন নিয়ে রচিত ‘কবর’ই প্রথম সাহিত্যিক প্রতিবাদী প্রয়াস।

‘কবর’ মুনীর চৌধুরীর গতানুগতিক নাট্যধারার বাইরে অভিনব রচনা। বাঙালি জাতীয় চেতনার উদ্বোধন এ নাটকে জেলখানার অভ্যন্তরে অভিনয়ের যোগ্য প্রকরণ কৌশলে রচনা করেছিলেন মুনীর চৌধুরী। স্পষ্টতই নাটকটির প্রেক্ষাপট বাঙালি জাতীয় চেতনার উদ্বোধনে যে ভাষার দাবি শুরু হয়েছিল, তা। ৫২-র একুশে ফেব্রুয়ারির পরের বছর [১৯৫৩] মুনীর চৌধুরী তখন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অন্তরীণ অবস্থায় রচনা করেছিলেন। ‘কবর’ রচনা প্রসঙ্গে রামেন্দু মজুমদার জানিয়েছেন :
১৯৫৩ সাল। আগের বছর একুশে ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী ঢকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাজবন্দী। সে সময় কারাগারে তাঁর সঙ্গে আরও ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, আবুল হাশিম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ, অধ্যাপক অজিত গুহ প্রমুখ। অপর একটি কক্ষে অন্যদের সঙ্গে ছিলেন প্রগতিশীল সাংবাদিক-সাহিত্যিক রণেশ দাশগুপ্ত। তিনি গোপনে একটি চিঠি পাঠালেন মুনীর চৌধুরীকে। অনুরোধ ছিল একুশের স্মরণে জেলখানার ভেতরে রাজবন্দীরা অভিনয় করতে পারে এমন একটি নাটক মুনীর চৌধুরীকে লিখে দিতে হবে। নাটক হবে রাত ১০টার পর জেলের বাতি নিভিয়ে দিয়ে হারিকেনের আলোয়।
রণেশ দাশগুপ্তের অনুরোধে একুশের প্রেক্ষাপটে ‘কবর’ রচনা করেছিলেন মুনীর চৌধুরী। ‘কবর’ মূলত রচিত হয়েছিল জেলখানার অভ্যন্তরে অভিনয়ের জন্য প্রথম ভাষা-শহীদ দিবস পালনার্থে। ‘কবর’ রচনার প্রসঙ্গে রামেন্দু মজুমদ জানিয়েছেন :
মুনীর চৌধুরী ভাবলেন সেট ও আলোর ব্যবস্থা থাকবে না; তাই সেই সীমাবদ্ধাতাকে কাজে লাগাতে হবে। তিনি নাটকের ঘটনাস্থল হিসেবে বেছে নিলেন গোরস্থানকে, যেখানে সেটের প্রয়োজন নেই। সময় শেষ রাত। [...] জেলখানায় নারী চরিত্রের অভিনেত্রী যাওয়া যাবে না বলে কবর নাটকে নাট্যকার কোনো নারী চরিত্র রাখেন নি। কেবল নাটকীয় মুহূর্তে ইন্সপেক্টর হাফিজ মাথায় চাদর টেনে নারীর অভিনয় করেন।
নাটকের সেট ও পরিবেশ সম্বন্ধে আগে থেকেই অবহিত থাকার কারণে, মুনীর চৌধুরী অত্যন্ত স্বল্প পরিসরে গুটিকয়েক চরিত্রের সহায়তায় বাঙালির ভাষার দাবির যৌক্তিকতা এবং প্রতিবাদ প্রকাশ করেছেন। মেরুদ-হীন পুলিশ ইন্সপেক্টর হাফিজ পাকিস্তান প্রশাসনের অন্যায় [গুলি করে ছাত্র হত্যা এবং লাশ গুম করার ঘটনা] ধামা-চাপা দেয়ার কাজে নিয়োজিত। কিন্তু কবরস্থানের জীবন্ত বাসিন্দা মুর্দা-ফকির লাশের কথা জেনে গেছে ভেবে রাজনৈতিক নেতা ভয় পেলে ইন্সপেক্টর তাকে আশ্বস্ত করে বলে :
মুর্দা-ফকির ঝড়ও বোঝে না, আগুনও বোঝে না। ও ত একরকম কবরের বাসিন্দা। ভাষার দাবিতে মিছিল বেরিয়েছিল বলে পুলিশ গুলি করে কয়েকটাকে খতম করে দিয়েছেÑ এত কথা বোঝার মত জ্ঞান-বুদ্ধি ওর নেই। [হাফিজ]
পুলিশ ইন্সপেক্টর একথার মাধ্য দিয়ে নেতাকে আশ্বস্ত করতে চাইলেও নেতার মনের সংশয় দূর হয় নি। কারণ, কারফিউ শেষ হওয়ার পর যদি মুর্দা-ফকির এই লাশের খবর ছাত্রদের দেয়, তাহলে আবারো গোলমাল বেধে যাবে, ছাত্রসমাজ আবারো মিছিল বের করবে।

 

নাটকের সেট ও পরিবেশ সম্বন্ধে আগে থেকেই অবহিত থাকার কারণে, মুনীর চৌধুরী অত্যন্ত স্বল্প পরিসরে গুটিকয়েক চরিত্রের সহায়তায় বাঙালির ভাষার দাবির যৌক্তিকতা এবং প্রতিবাদ প্রকাশ করেছেন। মেরুদ-হীন পুলিশ ইন্সপেক্টর হাফিজ পাকিস্তান প্রশাসনের অন্যায় [গুলি করে ছাত্র হত্যা এবং লাশ গুম করার ঘটনা] ধামা-চাপা দেয়ার কাজে নিয়োজিত। কিন্তু কবরস্থানের জীবন্ত বাসিন্দা মুর্দা-ফকির লাশের কথা জেনে গেছে ভেবে রাজনৈতিক নেতা ভয় পেলে ইন্সপেক্টর তাকে আশ্বস্ত করে বলে

 

মুনীর চৌধুরী ‘কবর’ নাটকের সংক্ষিপ্ত পরিসরে ব্যবহার করেছেন রূপক। তিনি সচেতনভাবেই নাট্যঘটনায় রূপক আরোপ করেছিলেন। নাট্যঘটনায় দেখা যায়, কবর থেকে ছাত্রদের লাশ উঠে এসে বাঁচার কথা বলেছে, দাবি তুলেছে। অর্থাৎ ভাষার দাবিতে যারা নিহত হয়েছিল তারা কবরে না থাকার কথা বলেছে। এ ঘটনা সম্পূর্ণ রূপক; এ রূপকের মধ্য দিয়ে নাট্যকার একইসাথে দুটো ব্যাপার হাজির করতে চেয়েছেন :
এক. যে ছাত্রদেরকে ভাষার দাবিতে মিছিল করার অপরাধে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল, তাদের কারোই স্বাভাবিক মৃত্যু বয়স হয় নি; অপঘাতে মৃত্যু না হলে স্বাভাবিক নিয়মে তাদের বেঁচে থাকার কথা।
দুই. ভাষার দাবিতে যারা ৫২-র একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ হয়েছিল, তারা দৈহিকভাবে কবরে গেলেও চির অমর হয়ে মানুষের অন্তরলোকে থেকে যাবে; অথবা বলা যায় বেঁচে থাকবে।
নাট্যকার মুনীর চৌধুরীর এই দূরদর্শী ভাবনা যে কতখানি সঠিক ছিল, তা আজকের দিনে বুঝতে অসুবিধা হয় না। কারণ, ৫২-র ভাষা আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছিলেন, তাঁদের পবিত্র স্মৃতির উদ্দেশ্যে দেশব্যাপী শহীদ মিনার তৈরি করা হয়েছে এবং তাঁদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করেই বিশ্বব্যাপী একুশে ফেব্রুয়ারি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা’ দিবস হিসেবে পালন করা হয়। দৈহিকভাবে হয়তো ৫২-র একুশে ফেব্রুয়ারিতে যারা পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছিল তাদেরকে কবরস্থ করা গেছে; কিন্তু তাদের এই মহান আত্মত্যাগের কোনোদিন মৃত্যু ঘটবে না, তাদের চেতানাকে কবরস্থ করা যায় নি। বরং তা বাংলার ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করে এখন সমগ্র পৃথিবীর মানুষের নিকট পরিচিত লাভ করেছে। অর্থাৎ ভাষার দাবিতে মৃত্যুবরণ করেও রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার প্রমুখ ভাষা-শহীদ চির অমরত্ব লাভ করেছে। মুনীর চৌধুরী নাটকে মুর্দা-ফকিরের সংলাপে ভাষা-শহীদগণের সেই অমরত্বের ইঙ্গিত দিয়ে বলেছে :
এ লাশের গন্ধ অন্যরকম। ওষুধের, গ্যাসের, বারুদের গন্ধ। এ-মুর্দা কবরে থাকবে না। বিশ-পঁচিশ-ত্রিশ হাত যত নীচেই মাটি চাপা দাওনা কেনÑ এ মুর্দা থাকবে না। কবর ভেঙে বেরিয়ে চলে আসবে। উঠে আসবে। [মুর্দা-ফকির]
কথাবাহুল্য, মুনীর চৌধুরীর এ ধারণা যে কতখানি সত্য, তা আজ বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে একুশে ফেব্রুয়ারি পালনের মধ্য দিয়েই প্রতীয়মান। মানুষ অমর নয় জগতে, নশ্বর প্রাণী এবং তার মৃত্যু অনিবার্য। যে মানুষের মৃত্যু বৃহৎ অথবা মানব-কল্যাণে কোনো মহৎ চেতনা প্রতিষ্ঠার জন্য হয়, সেই মৃত্যু পরিণামে যে চির-অমরত্ব লাভ করে, তা ভাষা-শহীদগণের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়েছে।

‘কবর’ নাটকের মূল্যায়ন করতে গিয়ে নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন : ‘বাংলাদেশের প্রথম প্রতিবাদী রাজনৈতিক নাটক কবর। কবর-এর হাত ধরেই পরবর্তীকালে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর রচিত ও প্রযোজিত হয়েছে অনেক প্রতিবাদী নাটক।’ এই বিবেচনায় বাংলাদেশের নাট্যধারায় ‘কবর’ নাটকের মর্যাদা অনেকটা পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

‘কবর’ একাঙ্ক বিশিষ্ট নাটক। চরিত্র বেশি নেই নাটকে। নেতা, পুলিশ ইন্সপেক্টর হাফিজ, মুর্দা-ফকির, কবরস্থানের একজন গার্ড ও কয়েকটি ছায়া-চরিত্র। অল্প এ কয়েকটি চরিত্রের মাধ্যমে মুনীর চৌধুরী ভাষা আন্দোলনের পূর্বাপর প্রেক্ষাপট এবং তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচারী মানসিকতার পরিচয় তুলে ধরেছেন অত্যন্ত সফলভাবে। নাটকে নেতা হচ্ছেÑ শাসকশ্রেণীর অত্যাচারী ও নিষ্ঠুরতার প্রতীক; মুর্দা-ফকির সেই শাসক শ্রেণীর বিরুদ্ধে বাঙালি জাতিসত্তার জাগ্রত বিবেক। ইন্সপেক্টর হাফিজ শাসক শ্রেণীর তোষামুদে মেরুদ-হীন মধ্যবিত্ত চাকুরে শ্রেণীর প্রতিনিধি। ছায়া-চরিত্রগুলো তারুণ্যের প্রতিনিধিত্ব করেছে, যারা মৃত্যুবরণ করার পরও বেঁচে থাকার আকাক্সক্ষা প্রকাশের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের পাতায় অমরত্বের ঘোষণা করেছে। সামগ্রিকভাবে ‘কবর’ ভাষা আন্দোলন নিয়ে রচিত একটি সফল নাটক, যা বাঙালি জাতির বিবেকের প্রতিনিধিত্ব করেছে সমকালে। আজো নাটকটির প্রাসঙ্গিকতা হচ্ছে এইÑ এখানে ভাষার প্রতি মানুষের যে মমত্ববোধ ও সংগ্রামী চেতনার প্রকাশ ঘটেছে, তা কোনো কালেই ম্লান হবে না। ভাষা-সংগ্রামীদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে আজকের মানুষ তার মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার চেতনায় উজ্জীবিত হয়।

 

Page 6 of 8

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…