Page 7 of 8

ফেক আইডি

শিবশংকর দেবনাথ

 

মাথার পেছনে কেউ খোঁচা মারছে। ভাবলাম, কেউ হয়তো ভুল করে মেরেছে। দ্বিতীয়বার ভদ্রতা দেখানোর ভান করে পেছনে তাকালাম না। কিন্তু তৃতীয়বারও মারল। এখন সিরিয়াসলি নিতেই হয়। পেছনের সিটে তাকিয়ে দেখি খুব পরিচিত মুখ। জীবনের চরম এক মঞ্চস্থ গল্পের সহকারী শিল্পী এখন আমার পেছনের সিটে বসা। ফুলের নামে যার নাম, ফুলের মতোই সুন্দর হাসি যার- সেই সুন্দর মনের অধিকারী বকুল। অবশ্য গল্পে আমারও চরিত্র ছিল। একটি নয়, দুটি- নায়ক ও ভিলেন।
হাস্যোজ্জ্বল ভঙ্গিতে বকুল বললেন, কষ্ট করে মাথা ঘুরিয়ে পেছনে তাকানোর জন্য ধন্যবাদ। আমাকে চিনতে নিশ্চয় আপনার কোনো সমস্যাই হয়নি।
-সমস্যা হওয়ার প্রশ্নই আসে না। যে গল্প আমাকে আজও তাড়িয়ে বেড়ায় সেই গল্পের সহকারী শিল্পী আপনি। আর আপনাকেই ভুলে যাবো? এটাও কি সম্ভব! তা যাচ্ছেন কোথায়?
ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে, আপনি?
-আপাতত আমারও লক্ষ্য ময়মনসিংহ। এরপর হয়তো নেত্রকোনায়ও যেতে পারি।
স্বপ্ন ভাই, আপনি কি সেই মেয়েটির পরিবারের সন্ধান পেয়েছিলেন?
-হুম, পেয়েছিলাম। কিন্তু আমিই ভিলেন- এটা বলতে পারিনি। অনেকবার চেষ্টা করেছি বলতে। কিন্তু...।
ভাগ্যচক্রে তারুণ্যের সাপ্তাহিক ‘টিনএজ’ পত্রিকার সহ-সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়েছিলাম। সব সহকর্মীকে নিয়ে আনন্দেই কেটে যাচ্ছিল দিনগুলো। যতটা না সময় অফিসে সম্পাদনার কাজে কাটাতাম, এর চেয়ে বেশি কাটাতাম ফেসবুকে। সহকর্মী কাম বন্ধু বকুল মাঝে মধ্যে এসে খোঁচা মারলেও খুব একটা ঝামেলা করতো না। ওই ঝামেলাবিহীন সময়ে নিজের আসল আইডির পাশাপাশি ফেক আইডিতে মেয়েদের সঙ্গে চ্যাট করে সময় কাটানোর নেশায় এক ধরনের আসক্তই হয়ে পড়ি।
একদিন রাতে সাপ্তাহিক পত্রিকার আউটপুট দেয়ার পর আমি ও বকুল অফিসেই থেকে যাই। আমি মগ্ন ফেসবুক ফেক আইডিতে চ্যাটে আর বকুল ঋৎবব ঈবষষ তাস খেলায়।
তানজিনা ফেরদাউস নামে একটি আইডির সঙ্গে আমার ফেক আইডির ‘আমি মানুষ’ ঘনিষ্ঠতা বেশ পুরনো। প্রায় প্রতিদিনই হাই, হ্যালো চলে আমাদের মধ্যে। তানজিনা এবিসি ইউনির্ভাসিটিতে ফ্যাশন ডিজাইনে পড়তো। আর ‘আমি মানুষ’ মানে আমার ফেক আইডির পরিচয় ছিল সদ্য জার্মানি থেকে ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফেরা ধনী বাবার একমাত্র আদরের সন্তান। তানজিনা সেদিন রাতেও অনলাইনে ছিল। কিন্তু আমার চ্যাটে সাড়া দিচ্ছিল না। অনবরত হাই-হ্যালো করতে করতে এক সময় তানজিনা জানালো, তার মন ভালো নেই। তাই চ্যাট করতে তার ইচ্ছা করছে না। কারণ জিজ্ঞাসা করলে সে জানালো, ফিনানশিয়াল প্রবলেম। শিক্ষা সফরে যেতে তার ৩০ হাজার টাকা লাগবে। ২০ হাজার টাকা কোনো রকমে ম্যানেজ হলেও আর ১০ হাজার টাকার জন্য সে যেতে পারছে না। টিউশনি করে যা ইনকাম করে, তা দিয়ে কোনো রকমে হোস্টেল ও নিজের খরচ হয়ে যায়। আর সেমিস্টার ফি আসে গ্রামের বাড়ি থেকে। এ অবস্থায় শিক্ষা সফর তার কাছে কিছুটা বিলাসিতাও বটে।

বলে রাখা ভালো, ফেক আইডির আড়ালে চ্যাট করতে করতে আমারও একটা সফট কর্নার তৈরি হয়েছিল তানজিনার প্রতি। কিন্তু ভয়ও পেতাম এই মনে করে, যদি তানজিনার আইডিও ফেক হয়! মনে মনে ভাবলাম, সুযোগটা হাতছাড়া করা মোটেও উচিত হবে না। তার আইডিও ফেক কি না তা যাচাইয়ের এটিই উত্তম সময়। আমি চালাকি করে তানজিনাকে জানালাম, বন্ধু হিসেবে শিক্ষা সফরের ১০ হাজার টাকা ধার দিতে রাজি আছি। আমার মোবাইল ফোন নাম্বার দিয়ে বললাম সকাল ৯টায় ধানম-ি ৮ নাম্বারে এসে টাকা নিয়ে যেতে।
আমি ভেবেছিলাম, আমার মতো হয়তো তানজিনাও অনেকটা মজা করার জন্য এই নাটক করেছে। কিন্তু তা হয়নি। সকাল ৯টা বাজার আগেই তানজিনার ফোন। সে এখন ধানম-ির ৮ নাম্বারে রবীন্দ্রসরোবরের সামনে দাঁড়িয়ে।
আমি ঘাবড়ে গেলাম। কী করব এখন? সামনে যাবো কী করে? বকুল বললো, চলেন আমরা মেয়েটাকে দেখে আসি। আর দেখতে গেলে টাকা লাগবে কেন? মেয়েটা আপনাকে চিনবে কী করে? ফেক আইডিতে আপনার কি অরিজিন্যাল ছবি আছে?
দু’জন রবীন্দ্রসরোবরে গিয়ে তানজিনার মোবাইল ফোনে কল দিলাম। জানতে চাইলাম, কী ড্রেস পরে এসেছে সে। লক্ষ্মী মেয়ের মতো তানজিনা বললো, লাল কামিজ, ওড়না ও সালোয়ার সবুজ। ফোন কেটে দিয়ে বকুলকে নিয়ে আড়ালে লুকিয়ে তানজিনাকে দেখি।
ছবির থেকেও বাস্তবের চেহারা সুন্দর। তবে কেমন যেন একটা আতঙ্কের ছাপ। লাল কামিজ, সবুজ সালোয়ার-ওড়নায় চমৎকার মানিয়েছে। দেখে ভদ্রঘরের মেয়েই মনে হলো। আর এ দেখা থেকেই সফট কর্নার আরো সফট হয়ে পড়ে। নিজেকে প্রেমিক প্রেমিক ভাবতে লাগলাম। কিন্তু ১০ হাজার টাকা তো আমার পকেটে নেই। টাকা ম্যানেজ করার জন্য এই বন্ধু, ওই বন্ধুকে ফোন করতে লাগলাম। কাছের কোনো বন্ধুকে বাকি রাখিনি। একেকজন একেক ধরনের বাহানা তুলে কেউই টাকা দিতে রাজি হলো না। অবশেষে কিছুটা দূরের এক বন্ধু রিপন টাকা দিতে রাজি হলো। কিন্তু টাকা নিয়ে আসতে কম করে হলেও এক ঘণ্টা সময় লাগবে। এরই মধ্যে বার বার ফোন দিচ্ছে তানজিনা। একবার বলি, রেডি হচ্ছি। অন্যবার বলি, বের হচ্ছি। এমন নানান কথা বলে সময় ক্ষেপণ করতে লাগলাম। কেননা সত্যি কথা বলতে এই মুহূর্তে সৎসাহস আমার হচ্ছে না যদি ভুল বুঝে রাগ করে চলে যায়!
এক ঘণ্টার আগেই রিপন টাকা নিয়ে হাজির। অফিসের সামনে এসেই ফোন দিল আমাকে।
যাক, এবার তাহলে তানজিনার মুখোমুখি হওয়া যাবে। রিপনের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নিয়ে তানজিনা যেখানে দাঁড়িয়েছিল সেখানে গেলাম। কিন্তু কোথায় সেই লাল ড্রেস পরা তানজিনা? এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখি কোথাও নেই। ফোন দিলাম, সুইচ অফ। বেশ খানিকটা দূরে মানুষের জটলা চোখে পড়লো। আগ্রহ নিয়ে আমরা জটলার কারণ অনুসন্ধানে এগিয়ে গেলাম। জটলা ভেদ করে ভেতরে ঢুকেই আমি হতবাক! বকুল আর আমি একে অন্যের দিকে তাকাচ্ছি। রক্তে লাল হয়ে লাল ড্রেস পরা মেয়েটার নিথর দেহটা পড়ে আছে রাস্তায়। একটু আগেও যে বার বার আমাকে অজানা আতঙ্ক নিয়ে ফোন দিচ্ছিল, এখন সে মহাকালের পথে। গল গল করে চোখ বেয়ে জল পড়ছে। বুক চাপড়ে কাঁদতে ইচ্ছা করছে। এই ভুলের কি প্রায়শ্চিত্ত সম্ভব? একটি মিথ্যা, একটি ভুল, একটু রসিকতা এতো নির্মম বাস্তবতার সম্মুখীন করবে- স্বপ্নেও কখনো চিন্তা করিনি।
বকুলের ধাক্কায় ঘোর কাটলো। এরই মধ্যে বাস ময়মনসিংহের মাসকান্দায়, সঙ্গে আমরাও। এখন নামতে হবে।

 লরেন্স অফ অ্যারাবিয়া: ওমর শরীফ

টুম্পা রায়

 

চলচ্চিত্র সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না। ইউরোপে পড়াশোনা করার ফলে একদিন অভিনয়ের নেশা ঢুকে যায় মাথার ভেতর। গণিত আর পদার্থবিদ্যায় জ্ঞান অর্জন করে কীভাবে একজন অভিনয়ের প্যাশন মাথায় বহন করে ঘুরে বেড়ায় এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বিশ্ব চলচ্চিত্রে এক প্রাজ্ঞজন মিসরীয় অভিনেতা ওমর শরিফ।
‘লরেন্স অব অ্যারাবিয়া’, ‘ডক্টর জিভাগো’, ‘ম্যাকেনাস গোল্ড’ ও ‘ফানি গার্ল’ ছবির অভিনেতা ওমর শরিফ। তার পুরো নাম মাইকেল দিমিত্রি শেলুব। তার অভিনীত বেশকিছু বিখ্যাত চলচ্চিত্রের মধ্যে অস্কার পুরস্কারের জন্য তিনি একবার মনোনীত হয়েছিলেন। তিনবার ‘গোল্ডেন গ্লোব’ ও একবার ‘সিজার’ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
১৯৩২ সালের ১০ এপ্রিল মিসরের আলেকজান্দ্রিয়া শহরে লেবাননের বংশোদ্ভূত লেবানিজ ক্যাথলিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ওমর শরিফ। তার আসল নাম ছিল মিচেল শালহাউব। তার বাবা জোসেপ শেলুব বিশ শতকের ধনাঢ্য কাঠ ব্যবসায়ী। লেবানন থেকে তিনি বসত গড়েন মিসরে। এখানেই জন্ম হয় বিখ্যাত অভিনেতা ওমর শরিফের। এরপর তার পরিবার চলে যায় কায়রোয়। তখন তার বয়স চার। তার মা ক্লোয়ার সাদা ছিলেন তৎকালিন কায়রোর অভিজাত নারীদের মধ্যে খুবই জনপ্রিয়। তখনকার মিসরের রাজা ফারুক ১৯৫২ সালে সিংহাসনচ্যুত হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রায় নিয়মিতই আসতেন তার মায়ের কাছে।
বিখ্যাত এই অভিনেতা ১৯৬২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ধ্রুপদী চলচ্চিত্র ‘লরেন্স অফ অ্যারাবিয়া‘র মাধ্যমে প্রথম চলচ্চিত্রপ্রেমী মানুষের নজরে আসেন। এ ছবিটি ছিল তারকাবহুল। পিটার ওটুল, আলেগ গিনেস, অ্যান্থনি কুইন, জ্যাক হকিংসের মতো জাঁদরেল অভিনেতাদের সঙ্গে এ ছবিতে ছিলেন ওমর শরিফও। শেরিফ আলি চরিত্রে তার অনবদ্য অভিনয় তাকে তারকাখ্যাতি এনে দেয়। এতে অভিনয়ের জন্য তিনি সেরা পার্শ্বচরিত্রের অভিনয়শিল্পী হিসেবে একাডেমি অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনীত হন।
মিসরীয় বংশোদ্ভূত এই শিল্পী আলেকজান্দ্রিয়া শহরের ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্র থাকাকালেই নিজের মেধার প্রমাণ দেন ‘ভাষার’ ওপর। কিন্তু তিনি কায়রো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞান ও গণিতে স্নাতক পাস করে পারিবারিক কাঠ ব্যবসা শুরু করেন বাবার সঙ্গে। অভিনয়ে আগ্রহী হয়ে উঠলে লন্ডনের রয়াল অ্যাকাডেমি অফ ড্রামাটিক আর্টে ভর্তি হন নাটক বিষয়ে। এরপর তিনি চলচ্চিত্রজগতে আসেন। ওমর শরিফ শুধু মিসরীয় অভিনেতাই নন, বিশ্ব চলচ্চিত্রের প্রভাবশালীও বটে। অভিনয়ের ঝোঁক থেকে হঠাৎ একদিন রিয়াল লাইফ থেকে রিল লাইফে ঢুকে পড়েন অভিনয় সাম্রাজ্যের এই মহান পুরুষ। এর আগে অভিনয়ের ওপর পড়াশোনাও করেন। লন্ডনে নাট্যকলার ওপর পড়ালেখা করে নিজ ভূমি মিসরে ফেরেন তিনি। ১৯৫৪ সালে মিসরীয় ‘শাইতান আল সাহারা’ অর্থাৎ ‘ডেভিল অব দ্য ডেজার্ট’ ছবিতে প্রথম অভিনয়ও করেন। গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে না হলেও নিজের অজান্তেই যেন তার ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার দাঁড়িয়ে যায় চলচ্চিত্রের পথে। ছোট্ট চরিত্র। তবুও তার অভিনয় ক্ষমতায় মুগ্ধ হন স্বয়ং নির্মাতা ইউসুফ চাহিনি। ওই বছরেই তাকে আরেকটি সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্রের জন্য নির্বাচন করেন ইউসুফ। মাত্র একটি ছবিতে ছোট্ট চরিত্রে অভিনয় করেই কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে যাবেন তা ভাবতেই পারেননি ওমর! প্রকৃতপক্ষে দ্বিতীয় ছবি ‘স্ট্রাগল ইন দ্য ভেলি’র মধ্য দিয়েই রিল লাইফ ও রিয়াল লাইফে গতিসঞ্চার করেন ওমর। এ ছবির শ্যুটিং করতে গিয়ে মোহাবিষ্ট হয়ে পড়েন তিনি। বিভিন্ন কারণেই ছবিটি বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বা লিখনীতে তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দিক বলে উল্লেখ করেছেন। কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে তার প্রথম ছবি বলেই এটি গুরুত্বপূর্ণ নয়। মূলত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে বলা যেতে পারে, এ ছবিতে অভিনয় করতে গিয়েই প্রথম প্রেমে পড়েন তিনি!
ওমর শরিফের সাক্ষাৎ হয় ওই সময়ের জনপ্রিয় ও বিতর্কিত অভিনেত্রী ফাতেন হামামার সঙ্গে। তার রূপে মুগ্ধ ছিলেন তখনকার মিসরীয় ধনাঢ্য ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে খ্যাতিমান তারকারাও। ওই হিসেবে চলচ্চিত্রে নবাগত ওমর শরিফ ছিলেন চুনোপুঁটি। দ্বিতীয় ছবি করতে ক্যামেরার সামনে তিনি যখন দাঁড়িয়েছেন তখন ফাতেন ৪০টিরও বেশি ছবিতে অভিনয় করে ফেলেছেন। ওই ছবিতে প্রেমিক-প্রেমিকার হিসেবে ওমর ও ফাতেন-এর একটি চুমুর দৃশ্য ছিল। প্রথমে ওমর দৃশ্যটি নিয়ে ইতস্তত করছিলেন। কারণ এর আগে তো এমন পরিস্থিতে তাকে পড়তে হয়নি। অবশেষে ক্যামেরার সামনে ফাতেনকে চুমু দিতে দাঁড়িয়ে গেলেন তিনি। খুব সুন্দরভাবে ইউসুফ তা ক্যামেরাবন্দি করলেন। কিন্তু পর্দার ওই চুমু তাদের বাস্তব জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। এক চুমু দিয়েই প্রেমে হাবুডুবু খান ওমর-ফাতেন। তাদের প্রেম আরো গাঢ় হতে থাকে। এক সময় তারা সিদ্ধান্ত নেন বিয়ে করবেন। কিন্তু তাদের ধর্ম তো এক নয়। ফাতেন মুসলিম ঘরের সন্তান। অন্যদিকে ওমর খ্রিস্টান ক্যাথলিক। ফলে যা হয়! ওমর তার জন্মসূত্রে পাওয়া ধর্ম ত্যাগ করে মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করেন। গ্রিক ক্যাথলিক এই অভিনেতা মাইকেল দিমিত্রি মিশেল শেলুব হয়ে যান ওমর শরিফ। ১৯৫৫ সালে ওমর-ফাতেন পরস্পর বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৫৭ সালে তাদের ছেলে তারেক আল শরিফের জন্ম হয়। কিন্তু এতো সাধের সম্পর্কও একদিন ভেস্তে যায়। মাত্র দশ বছর একসঙ্গে বসবাসের পর ১৯৭৪ সালে তাদের মধুর সম্পর্কের যবানিকাপাত ঘটে। ওমরকে ডিভোর্স দেন ফাতেন। স্ত্রী ফাতেনের ছেড়ে যাওয়া ওমরের মধ্যে এক গভীর রেখাপাত করে। এ জন্য ধর্মকর্ম ত্যাগ করলেন তিনি। যাকে ভালোবেসে বিয়ে করলেন তার এভাবে ছেড়ে যাওয়া মেনে নিতে পারলেন না। ফলে আর কোনো নারীর সঙ্গে তিনি সম্পর্কে জড়াননি। এমনকি যতো দিন জীবিত ছিলেন ততোদিন অন্য নারীকে বিয়েও করেননি। একাকী নিঃসঙ্গ কেটেছে তার যাপিত সময়! ভালোবাসার মানুষ ওমরকে ছেড়ে গেলেও নাম, যশ, খ্যাতি তাকে ছেড়ে যায়নি। বরং মিসরের গ-ি পেরিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি লাভ করতে থাকেন। ব্রিটিশ মেধাবী নির্মাতা ডেভিড লিনের হাত ধরে বিশ্ব চলচ্চিত্রের পথে যাত্রা করেন তিনি। অভিনয় করেন ‘লরেন্স অব অ্যারাবিয়া’ ছবিতে। ডেভিড লিনের এই ছবিতে অভিনয় করে বিশ্ব খ্যাতি অর্জন ছাড়াও তার ক্যারিয়ারে জোটে অস্কারের মতো সর্বোচ্চ স্বীকৃতি এবং বেস্ট সাপোর্টিং রোলের জন্য জিতে নেন ‘গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ড’।
ডেভিড লিনের লরেন্স অব অ্যারাবিয়া-র পর ওমর শরিফ একে একে কাজ করেন ফ্রেইড জেইনম্যানের ‘বিহোল্ড অ্যা পেল হর্স’, যুগোসøাভিয়ার যুদ্ধ নিয়ে ‘ইয়েলো রোলস রয়েস’, মঙ্গোলীয় দিগি¦জয়ী চেঙ্গিস খানকে নিয়ে ‘চেঙ্গিস খান’, জার্মান জেনারেলের জীবনী নিয়ে ‘দ্য নাইট অব দ্য জেনারেলস’ এবং আর্জেন্টাইন ‘প্রলেতারিয়েত’ ও কিউবা বিপ্লবের জনক আর্নেস্টো চে গুয়েভারার জীবনী নিয়ে নির্মিত প্রথম ছবি ‘চে!’তে। তবে তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সমাদৃত ও গুরুত্ব বহন করা ছবি বলা হয় ‘ডক্টর জিভাগো’। বরিস পাস্তরনাকের লেখা উপন্যাসের চিত্রায়ণ এটি। এর সেট সাজানো হয় পুরো প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কার রাশিয়ান বিপ্লবের। অস্কারের বিভিন্ন শাখায় ছবিটি জিতে নেয় একাধিক পুরস্কার।
ওমর শরিফ অভিনীত অনেক ছবি নন্দিত হয়েছে। তা হলো ‘দ্য রেইনবো থিফ’ (১৯৯০), ‘ম্যাকানাস গোল্ড’ (১৯৬৯), ‘চে’ (১৯৬৯), ‘ফানি গার্ল’ (১৯৬৮), ‘দ্য পিংক প্যান্থার স্ট্রাইকস এগেইন’ (১৯৭৬) প্রভৃতি।
ওমর শরিফ ইংরেজি ভাষায় নির্মিত লরেন্স অব অ্যারাবিয়া ছবিতে অভিনয়ের আগে মিসরীয় চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৬৫ সালে ডক্টর জিভাগো চলচ্চিত্রে অভিনয় করে বুঝিয়ে দেন ইংরেজি ছবিতেও অভিনেতা হিসেবে রয়েছে তার পোক্ত আসন। এ দুটি ছবির জন্যই গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলেন। ফলে তিনি এক অন্য দুনিয়ার স্বাদ পেয়েছেন। তবে একাকিত্ব ঘোচেনি। তাই তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘হলিউড আমাকে সম্মান দিয়েছে। এর সঙ্গে সঙ্গে আরো একাকিত্বও দিয়েছে। এখানে আসার পর আমি আমার ভূমি, আমার দেশের পরিচিত মুখ এবং নিজের স্বদেশটি খুব মিস করি। তাদের সঙ্গ অনুভব করি সব সময়।’
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ওমর শরিফ অভিনয় থেকে অবসর নেয়ার ঘোষণা দেন। তবে ২০০৩ সালে ফরাসি সিনেমা ‘মসিয়ে ইব্রাহিম’-এ অভিনয় করেন। এতে ইহুদি বালককে দত্তক নেয়া প্যারিসের দোকানির চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। এ অভিনয় তার ঝুলিতে এনে দেয় ফ্রান্সের শীর্ষ চলচ্চিত্র পুরস্কার ‘সিজার অ্যাওয়ার্ড’।
শেষ বয়সে এসেও পশ্চিমা ও মিসরীয় চলচ্চিত্রের প্রতি অনুরাগ ছিল ওমর শরিফের। এরপর কয়েক দশক চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনে অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অভিনয় জীবনের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ২০০৬ সালে চলচ্চিত্রের রঙিন দুনিয়া থেকে অবসর নেন তিনি। ওমর শরিফকে ২০১৩ সালে ‘রক দ্য কাসবাহ’ ছবিতে শেষবারের মতো দেখা গিয়েছিল। চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি তাসের প্রতি দারুণ আগ্রহ ছিল তার। তুখোড় কনট্রাক্ট ব্রিজ খেলোয়াড় হিসেবে তার সুনাম ছিল। সত্তর ও আশির দশকে তিনি ব্রিজ খেলা নিয়ে ‘শিকাগো ট্রিবিউন’-এ কলাম এবং কয়েকটি বইও লিখেছেন। ১৯৯২ সালে বাজারজাত হওয়া একটি কম্পিউটার গেম ‘ওমর শরিফ ব্রিজ’ও রয়েছে। ২০০৫ সালের নভেম্বর বিশ্ব চলচ্চিত্রের প্রতি অসামান্য অবদানের জন্য তাকে ‘সের্গেই আইজেনস্টাইন মেডেল’ দেয়া হয় ইউনেস্কোর তরফ থেকে। ওমর শরিফ শেষ জীবনে নিজ দেশেই ফিরে গিয়েছিলেন। একমাত্র ছেলে ও নাতি-
নাতনিদের সঙ্গে খুব চমৎকার সময় কাটিয়েছেন। কিন্তু বরিস পাস্তেরনাক-এর উপন্যাসের নায়কের মতোই নিঃসঙ্গ মৃত্যু হয় তার এবং তা নিজ ভূমেই। ৮৩ বছর বয়সি এই অভিনেতা আলঝেইমারস রোগে ভুগছিলেন। হাসপাতালে ভর্তির পর তার হার্ট অ্যাটাক হয়। এর কিছুক্ষণ পর কায়রোর হাসপাতালে গত ১০ জুলাই এই অভিনেতা শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। এছাড়া ১৭ জানুয়ারি মৃত্যু হয় তার সাবেক সহধর্মিণী ফাতেনেরও।

আমারে দিয়েছ স্বর আমি গাই গান

ফেরদৌসী রহমান

 

মানুষের গান
স্বভাবধর্মে পাখি গায় গান। কিন্তু স্বর আর সুরের সমন্বয়ে মানুষের যে গান তা শুধু তাঁর নিজের জন্য নয়। মানষের গান হৃদয় স্পর্শ করার জন্য। যে গান মন ছুঁয়ে যায় না তা মানুষের গান হয়ে ওঠে না। কিছু গান আছে যা এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে। কিছু গান আছে যা শুনলে হৃদয় দ্রবীভূত হয়, প্রাণ স্পন্দিত হয়। কথাগুলো যেন নিজের কথা বলেই মনে হয়। সর্বোপরি মানুষের গান হয় আবেগে পরিপূর্ণ। সবার গান কি গান হয়ে ওঠে? গান হয়ে ওঠার জন্য গীতিকবিতাঁর পাশাপাশি সুরের জাদু থাকতে হয়। কথাগুলো ধীরলয়ে বলেন দেশের প্রখ্যাত শিল্পী ফেরদৌসী রহমান।

গানের মানুষ
যাদের গানগুলো এখনো বুকে বাজে, মুখে মুখে ফেরে তাঁরাই গানের মানুষ। যাদের গান মানুষ গ্রহণ করে, সেটিই মানুষের গান। তবে সব গান সব মানুষের জন্য নয়। গান মানুষেরই তৈরি মানুষের শোনার জন্য। ফেরদৌস শব্দের অর্থ স্বগীয়। ফেরদৌসী শব্দের অর্থ ‘শ্রবণের স্বর্গ’। বাস্তবে অর্থাৎ শিল্পী জীবনেও এটিই প্রামাণ করে যাচ্ছেন ফেরদৌসী রহমান। গানের পাখি ফেরদৌসী রহমান সঙ্গীত ভুবনে কিংবদন্তি। জন্ম তাঁর ১৯৪১ সালের ২৮ জুন। এ দেশের সিনেমার গানকে তিনিই প্রথম জনপ্রিয় করে তুলেছেন। সিনেমার স্বর্ণযুগের এই গুণি শিল্পীকে স্বরণীয় করে রাখবে।

সঙ্গীত জীবন
সহজ এর সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি জানান তাঁর গানে হাতেখড়ি হয় তাঁর পিতার কাছে। পরবর্তীকালে ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরু, ইউসুফ খান
কোরেইশী, কাদের জামেরী, গুল মোহাম্মদ খান প্রমুখ সঙ্গীতজ্ঞের কাছে তালিম নিয়েছেন। খুব অল্প বয়স থেকে তাঁর স্টেজ পারফরম্যান্স শুরু হয়। মাত্র ৮ বছর বয়সে রেডিওতে ‘খেলাঘর’ অনুষ্ঠানে অংশ নেন। ১৯৬০ সালে ‘আসিয়া’ চলচ্চিত্রে প্রথম প্লে-ব্যাক করেন। ষাট ও সত্তরের দশকের বহু চলচ্চিত্রে তিনি নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী হিসেবে যুক্ত ছিলেন। তাঁর প্লে-ব্যাক করা চলচ্চিত্রের সংখ্যা ২৫০টির কাছাকাছি। তিনি ১৯৪৮ সালে রেডিওতে প্রথম গান করেন। তখন রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেন। ১৯৫৬ সালে বড়দের অনুষ্ঠানে প্রথম গান করেন। ১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি গান করেন। ১৯৫৭ সালে গান প্রথম রেকর্ড করেন এইচএমভি থেকে। ফেরদৌসী রহমানের শিল্পী জীবনের একটি বিরাট সৌভাগ্য এ দেশের গুণী অনেক সুরকারের সুরে গান গাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। আবদুল আহাদের সুর করা আধুনিক গান সবচেয়ে বেশি তিনিই গেয়েছেন। এছাড়া খন্দকার নুরুল আলম, আজাদ রহমান, জালাল আহমদ, আবদুল লতিফ, ওসমান খান, কানাইলাল শীল, আনোয়ার উদ্দিন আহমেদ, সমর দাস, সুবল দাস, অজিত রায় প্রমুখ খ্যাতনামা সুরকারের সুরেও গান গেয়েছেন বলে জানান।
শিল্পী ফেরদৌসী রহমানের জন্ম পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহারে। জন্ম থেকেই গানের সঙ্গে সখ্য তাঁর। বাবা শিল্পী আব্বাস উদ্দীন স্বপ্ন দেখতেন মেয়েও তাঁর মতো গান গাইবে। বাবার কাছেই গানের হাতেখড়ি ফেরদৌসী রহমানের। প্রায় ছয় দশকের গানের ক্যারিয়ারে ফোক, আধুনিক, উচ্চাঙ্গসঙ্গীত, নজরুলগীতি, রবীন্দ্রসংগীত, প্লে-ব্যাকÑ সব ধরনের গানই গেয়েছেন। বিটিভির সূচনালগ্ন থেকে সেখানে গাইছেন। বিটিভির জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘এসো গান শিখি’ দিয়ে সবার কাছে ‘খালামণি’ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি। ফেরদৌসী রহমানের গান এক সময় বাংলা ছবিতে শুধু জনপ্রিয়তা ও সফলতাই দেয়নি, দিয়েছিল এক ধরনের সুরমগ্ন মাদকতাঁর। ‘মনে যে লাগে এতো রঙ ও রঙিলা’, ‘নিশি জাগা চাঁদ হাসে কাঁদে আমার মন’, ‘আমি রূপনগরের রাজকন্যা রূপের জাদু এনেছি’, ‘এই সুন্দর পৃথিবীতে আমি এসেছিনু নিতে’, ‘এই রাত বলে ওগো তুমি আমার’, ‘বিধি বইসা বুঝি নিরালে’, ‘এই যে নিঝুম রাত ওই যে মায়াবী চাঁদ’, ‘মনে হলো যেন এই নিশি লগনে’, ‘ঝরা বকুলের সাথী আমি সাথীহারা’, ‘আমার প্রাণের ব্যথা কে বুঝবে সই’, ‘যেজন প্রেমের ভাব জানে না’, ও কী গাড়িয়াল ভাই’, ‘পদ্মার ঢেউ রে’Ñ এমন শত শত গান সিনেমা আর রেকর্ডে গাওয়ার কারণে তাঁর জনপ্রিয়তা হয়ে ওঠে গগনচুম্বী। ১৯৬০ সালে ‘আসিয়া’ চলচ্চিত্রে প্রথম প্লে-ব্যাক করেন। ষাট ও সত্তরের দশকের অনেক চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। তিনি চলচ্চিত্রে প্রায় ২৫০ গান গেয়েছেন। ১৯৪৮ সালে প্রথম রেডিওতে গান করেন। তখন রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেন। ১৯৫৬ সালে তিনি প্রথম বড়দের অনুষ্ঠানে গান করেন। ১৯৬৪ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গান করেছেন। ১৯৫৭ সালে প্রথম গান রেকর্ড করেন এইচএমভি থেকে।

ঢাকার সিনেমা হিট হওয়ার অনিবার্য হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল তাঁর গান। ১৯৫৯ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ফেরদৌসী রহমান ছাড়া সিনেমার গান ছিল প্রায় অচল। ফিল্মে গান গাওয়া তিনি ছেড়ে দিয়েছেন বহু বছর হয়েছে। অথচ তাঁর গাওয়া অতীতের সেসব গান আজও জনপ্রিয় হয়ে আছে। তবে ‘আসিয়া’ ছবিটি একটু বিলম্বে মুক্তি পাওয়ার কারণে প্লে-ব্যাক শিল্পী হিসেবে তাঁর প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ছিল ‘এ দেশ তোমার আমার’। এটি ১৯৫৯ সালে মুক্তি পায়। এতে গেয়েছিলেন, ‘চুপিসারে এতো করে কামিনী ডাকে’ গানটি। ১৯৫৯ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ফিল্মে যেসব গান করেছেন এর সবই আজও জনপ্রিয় হয়ে আছে। তাঁর সময়ের গানগুলোর আবেদন কোনোদিন ফুরিয়ে যাওয়ার নয়। এ প্রজন্মের শিল্পীরাও তাঁর গাওয়া সেদিনের গান আজও নতুন করে গাইছেন। ১৯৬০ সালে ইউনেস্কো ফেলোশিপ পেয়ে লন্ডনের ট্রিনিটি কলেজ অব মিউজিক থেকে ৬ মাসের সঙ্গীতের ওপর স্টাফ নোটেশন কোর্স সম্পন্ন করেন। প্রথম সুরকার হিসেবে তাঁর আত্মপ্রকাশ ১৯৬১ সালে ‘রাজধানীর বুকে’ ছবির মাধ্যমে। ওই ছবিতে তাঁর সঙ্গে রবীন ঘোষও সুরকার হিসেবে ছিলেন। স্বাধীনতাঁর পর ‘মেঘের অনেক রং’, ‘গাড়িয়াল ভাই’ ও ‘নোলক’ ছবির সঙ্গীত পরিচালক হিসেবেও কাজ করেছেন বলে তিনি সহজকে জানান। বিয়ের পরই (১৯৬৬ সালে) ফেরদৌসী বেগম থেকে তিনি হলেন ফেরদৌসী রহমান। তাঁর দুই ছেলে রুবাইয়াত ও রাজন। নবীন শিল্পীদের লোকসঙ্গীত গাইবার ব্যাপারে উৎসাহ দেয়া ছাড়াও শিশু-কিশোরদের বহু বছর ধরে গান শিখিয়ে আসছেন। এভাবেই একের পর এক কাজ নিয়ে তিনি এখনো ব্যস্ত। বিদেশি গান গাওয়ার স্মৃতি এখনো তাঁর মনে নাড়া দেয়। সহজের সাথে সাক্ষাৎকারে এ প্রসঙ্গে তিনি জানান ১৯৬৩ সালের কথা এখনো আমার বার বার মনে পড়ে। ওই বছর আমি ও লায়লা আরজুমান্দ বানু একত্রে মস্কোয় গিয়ে গান করেছিলাম। এককভাবে এক অনুষ্ঠানে আমি গাইলাম ‘ও মোর চান্দ রে ও মোর সোনা রে’ গানটি। এ গান শেষ হতেই প্রচুর হাততালি শুরু হলো। আমি তো গান গেয়ে চলে এসেছি। কিন্তু হাততালি থামছে না, চলছেই। পরে লোকজন আমাকে টেনে-টুনে আবার স্টেজে পাঠালো। তখন বুঝলাম এই হাততালি মানে আরো গান গাইতে হবে। তাই করলাম। চীনে গান গাইতে গেলাম ১৯৬৬ সালে। চৌ এন লাই তখন চীনের প্রধানমন্ত্রী। তাঁর সামনে গাইলাম ‘চুং ফাং হোং’ গানটি। এটি ছিল চীনা ভাষার গান। এ গান শুনে প্রধানমন্ত্রী আমার প্রশংসা করে বললেন, তুমি তো চীনা ভাষা জানো না। এতো দরদ দিয়ে গাইলে কীভাবে? তিনি বার বার আমার প্রশংসা করে যাচ্ছিলেন। এটা আমার জীবনের স্মরণীয় ঘটনা। সেই কবেকার ঘটনা যা আজও ক্ষণে ক্ষণে মনে পড়ে। ৩টি লং প্লেসহ প্রায় ৫০০টি ডিস্ক রেকর্ড এবং ১৮টিরও বেশি গানের অ্যালবাম বের হয়েছে তাঁর। একটি মাত্র সিডি ‘এসো আমার দরদী’ বের হয়েছে। এ পর্যন্ত তাঁর প্রায় ৫ হাজার গানের রেকর্ড হয়েছে।

প্রাপ্তি
কিছু পাবো ভেবে কখনো গান করিনি। তবে প্রাপ্তির পাল্লাটাই ভারী। বরং আমার মনে হয়, যা দেয়ার ছিল কিংবা যতোটুকু দেয়ার ছিল তা দেয়া হয়নি বা পারিনি। এখনো ভাবি, আমার অনেক কিছু করার আছে, দেয়ার আছে বলেন তিনি। ‘সিটিসেল-চ্যানেল আই সঙ্গীত পুরস্কার ২০১৩’ আয়োজনে আজীবন সম্মাননা পেয়েছেন তিনি। তিনিই প্রথম মহিলা সংগীত পরিচালক। ১৯৬০ সালে রবীন ঘোষের সঙ্গে ‘রাজধানীর বুকে’ চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা করেন।

স্বপ্ন
স্বপ্ন অনেক। অজগ্র যেমনÑ বাবা আব্বাস উদ্দীনের গানগুলো পরবর্তী প্রজন্মে ছড়িয়ে দেয়া, বাবার নামে বিশাল একটা প্রতিষ্ঠান করার ইচ্ছা, পল্লীগীতি নিয়ে রিসার্চ করা ও গানগুলো দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে দেয়া। এসব গান স্কুল-কলেজ ও মিল-ফ্যাক্টরিতে ছড়িয়ে দিতে হবে। স্বপ্ন সফল না করতে পারলেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে এর বীজ বপন করে যাবো। আজকাল ফেরদৌসী রহমান তাঁর বাবার নামে প্রতিষ্ঠিত আব্বাস উদ্দীন সঙ্গীত একাডেমির পেছনেও বেশ সময় দিচ্ছেন। এ একাডেমিটি আরও সম্প্রসারণের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। বাবা আব্বাস উদ্দীনের গাওয়া গানগুলো তাঁর মনে আগের মতোই নাড়া দেয়। শুধু তাঁর অন্তরে নয়, এ প্রজন্মের সঙ্গীতশিল্পীরাও আবার গাইছেন আব্বাস উদ্দীনের গান।

সঙ্গীত নিয়ে ভাবনা
এখন সময় এসেছে সঙ্গীত নিয়ে ভাবার। যারা সঙ্গীতে আগ্রহী তাদের আরও মনোযোগী হতে হবে। মনে রাখতে হবে, ধ্যান ও সাধনার চেয়ে ওই বিষয়ে তাদের অন্য কিছুই সাহায্য করতে পারবে না। সাধনাটি আনন্দের সঙ্গে নিতে হবে। শুধু যোগ্যতা থাকলেই চলবে না, তা রেওয়াজের মাধ্যমে শানিত করে তুলতে হবে। প্রচুর গান শুনতে হবে, বিশেষত গান শুনতে শুনতেই আত্মস্থ করতে হবে। শিক্ষা লাভ করে আগে বিকশিত হয়ে পরে প্রকাশের ভাবনা মাথায় রাখতে হবে। উচ্চাঙ্গ শিখলে সব গানই গাওয়া সম্ভব। ইদানীং ‘ট্যালেন্ট হান্ট’ নামে যেসব উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে সেগুলোকে সাধুবাদ জানাই। এসব ট্যালেন্ট যেন সঠিকভাবে নিজেদের গড়ে তুলতে পারে এদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। একটা স্তরে পৌঁছানো সোজা। তবে তা ধরে রাখাটাই বেশি কঠিন। গানের মানে বুঝতে হবে, গানের সঙ্গে মিশে যেতে হবে।

আর্কাইভ
ডকুমেন্টারি করে এক প্রজন্মের গান পরবর্তী প্রজন্মে পৌঁছে দিতে হবে। এমন কিছু উদ্যোগ নিতে হবে যাতে শিল্পীরা কখনোই হারিয়ে না যান। কারণ একটি দেশের শিল্পী ওই দেশের সংস্কৃতির বাহক। সব ভুলে যাওয়ার পরও যা মনে থাকবে সেটিই যদি সংস্কৃতি হয় তাহলে এই মনে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে আমাদের সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার জন্য।

 

ইনসাইড আউট

ফুয়াদ বিন নাসের আবির

 

হুমায়ূন আহমেদ একবার জানিয়েছিলেন, তিনি এক বাসায় গিয়ে দেখলেন, ওই বাসার বুয়া তার নির্মিত একটি নাটক দেখতে দেখতে হাপুস নয়নে কাঁদছে। তার ভাষায়Ñ এটি ছিল তার সাহিত্যিক জীবনের সেরা দৃশ্যগুলোর একটি। আমিও মনে করি, কোনো চলচ্চিত্র পরিচালকের সাফল্য নির্ভর করে ওই স্বল্প সময়ের মধ্যে রুপালি পর্দায় এমন কিছু তাকে দেখানো, অনুভব করানো যা ওই দর্শকের মনে একটা ছাপ রেখে যাবে, হাসাবে, কাঁদাবে। ‘পিক্সার’ যখন তাদের নতুন মুভি ‘ইনসাইড আউট’-এর ঘোষণা দেয় তখন খুব একটা গা করিনি। এ কথা সত্যি, আমার পছন্দের চলচ্চিত্রের তালিকা করলে সেখানে পিক্সার-এর বেশকিছু অ্যানিমেশন চোখ বন্ধ করেই জায়গা করে নেবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো ২০০৬ সালের ‘আপ’-এর পর থেকে পিক্সার তার আগের অতো তাক লাগানো বা মনে দাগ কাটার মতো কোনো কাজ দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। কাজেই খুব একটা উচ্চাশা ছাড়াই গিয়েছিলাম ছবিটা দেখতে এবং হল থেকে বেরিয়ে সব বন্ধু একবাক্যে মেনে নিলাম, এটাই সম্ভবত পিক্সারের শ্রেষ্ঠ কাজ।
‘ইনসাইড আউট’ হচ্ছে সেই ঘরানার পিক্সারের চলচ্চিত্র যে চলচ্চিত্র থেকে বড় ও ছোটরা সমানভাবে আন্দোলিত হবে। কিন্তু বড়রা যে অর্থ বের করবেন, ছোটরা হয়তো একদম ভিন্ন কারণে মজা পাবে। ইনসাইড আউট-এর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, বড়রা এ মুভির প্রায় প্রতিটি দিকের সঙ্গে নিজেদের স্মৃতি, আবেগ মিলিয়ে দেখে নিতে পারবেন। এটি ১১ বছর বয়সী রাইলি-র জীবনের ক্ষুদ্র অংশ নিয়ে তৈরি একটি অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র। মুভির লোকেশন মাত্র দুটি। একটি হলো সান ফ্রান্সিসকোর বিষণœ, অপরিচ্ছন্ন আবাসিক এলাকা এবং অন্যটি রাইলির মাথার ভেতরের আলো ঝলমলে, বৈচিত্র্যময় একটি অভিনব জগৎ! ওই জগতের শুরু হয় আঁধারময় এক ছোট্ট রুমে। প্লেটো সম্ভবত এটিকেই ঈধাব ড়ভ ঁহভড়ৎসবফ ংবষভ বলেছিলেন।


ওই জগতের শুরু হলো রাইলির জন্মের মাধ্যমে। তার মাথার ভেতর হঠাৎ করেই আবির্ভূত হয় পরীর মতো এক জয় (আনন্দ)। সে দেখে, তার সামনে একটা ছোট স্ক্রিন। সেখানে দু’জন আনন্দিত পুরুষ ও নারীকে দেখা যাচ্ছে। স্ক্রিনের সামনে একটি কন্ট্রোল প্যানেল। এর বড় বাটনটায় ইতস্তত করে চাপ দেয় জয়। হেসে ওঠে ১ মিনিট বয়সী রাইলি। তৈরি হয় তার প্রথম স্মৃতি। এভাবে ক্রমেই আরো কর্মী বাহিনী যোগ দেয় জয়ের সঙ্গেÑ স্যাডনেস, অ্যাঙ্গার ও ডিসগাস্ট। তারা সবাই মিলে ছোট্ট রাইলির আবেগ-অনুভূতি ঠিক করে দেয়, রক্ষণাবেক্ষণ করে রাইলির স্মৃতি। ছোট্ট রাইলি বড় হতে থাকে। মা-বাবা, বন্ধু-বান্ধব, স্কুল, আইস হকিÑ সব মিলিয়ে তার জীবনে আনন্দের পরিমাণই বেশি। তবে হঠাৎ তার মা-বাবা সিদ্ধান্ত নেন বাসা পরিবর্তন করার। সান ফ্রান্সিসকোর এক বিষণœ এলাকায় গিয়ে ওঠে রাইলি। এদিকে তার মনের অন্দর মহলের জগতে এক ম্যালফাংশনের দরুন শুরু হয়ে গেছে মহাগ্যাঞ্জাম। এখান থেকেই শুরু হয় ইনসাইড আউটের মূল কাহিনী।
পিক্সারের লোকজন ৫ বছর ধরে খেটে-খুটে ওই ছবিটি তৈরি করেছে। সাইকোলজি বিষয়ে যদি আপনার খুচরা পড়াশোনা করা থাকে তাহলে ওই শ্রমের ফসল আপনার চোখে পড়তে বাধ্য। মানুষের মনের ভেতরকার অতি জটিল রসায়নগুলোও যে এতো চমৎকারভাবে উপস্থাপন করা যায় তা ইনসাইড আউট দেখার আগে আমার ধারণাতেই ছিল না। ব্যক্তিত্বের দ্বীপ, স্বপ্ন প্রডাকশন হাউস, চিন্তার ট্রেইন, লং টার্ম মেমোরি লেইন, বিমূর্ত চিন্তার ঘর ইত্যাদি বিমূর্ত ধারণা চোখের সামনে তুলে ধরা হয়েছে।
পরিচালক পিটার ডক্টর অবশ্য ওই ধরনের আলাদা জগৎ তৈরি করার ব্যাপারে ওস্তাদ। ‘মুনস্টারস ইনকরপোরেটেড’ চলচ্চিত্রে কাল্পনিক শহর মনস্ট্রাপোলিস তৈরি করে যেভাবে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন দর্শককে, এবারো এর ব্যত্যয় ঘটেনি।


জয় চরিত্রটির কণ্ঠ দিয়েছেন ‘পার্কস অ্যান্ড অ্যামিউজমেন্ট’খ্যাত এমি পোয়েলার। আমার ধারণা, এর থেকে ভালো কণ্ঠাভিনয় আর কেউ হতো করতে পারতেন না।
ছবিটিতে দুই রকম আবহ সৃষ্টি করা হয়েছে। সান ফ্রান্সিসকোর বিমর্ষ, বিষণœœ, ধূসর ধরনের শহুরে এলাকা ও আলো ঝলমলে রাইলির
মনোজগৎ। আরেকটি মজার ব্যাপার হলো, সাদা চোখে দেখলে (কাল্পনিক মনোজগতের ব্যাপারটি বাদ দিয়ে) এর কাহিনী খুবই সাধারণ একটা গল্প। নতুন জায়গায় মানিয়ে নিতে না পারা, একাকিত্ব, বাড়ি থেকে পালানোÑ এ রকম ঘটনা আমার-আপনার অনেকেরই হয়তো ১১ বছর বয়সীর জীবনে ঘটেছে। অন্যদিকে ওই স্বাভাবিক ঘটনার পর্দার অন্তরালে এই ১১ বছর বয়সীর মনের ভেতরে যে তোলপাড়টা হয় তা কি কেউ মনে রেখেছে? ওই ব্যাপারটিই পিক্সার বাহিনী নিয়ে এসেছে আমার-আপনার চোখের সামনে। অনেকে এই মুভির জগৎটাকে ডক্টরের আগের মুনস্টারস ইনকরপোরেটেডের সঙ্গে তুলনা করলেও ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, এই মুভির তুলনা হতে পারে আরেকটি অ্যানিমেশন মুভির সঙ্গে যেটিকে অনেক আগেই আমার দেখা সেরা চলচ্চিত্রগুলোর একটির আসনে বসিয়ে রেখেছি। ওই ছবিটিও একজন ১১ বছর বয়সী মেয়ের কাল্পনিক জগৎ নিয়ে তৈরি। তবে প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণই ভিন্ন। চলচ্চিত্রটি হলো হায়াকো মিয়াজাকির ‘স্পিরিটেড অ্যাওয়ে’।
ওই চলচ্চিত্র যারা দেখতে যাবেন তাদের জন্য কিছু উপদেশÑ প্রথমত. ভালো হয় মানুষের ব্যক্তিত্ব, স্বপ্ন, স্মৃতি কীভাবে তৈরি হয় এসব ব্যাপারে টুকটাক পড়াশোনা করে গেলে অন্যদের থেকে একটু বেশিই মজা পাবেন (যেমন আমি পেয়েছি)। দ্বিতীয়ত. মুভি দেখে কান্নাকাটি করার স্বভাব থাকলে টিস্যু নিতে ভুলবেন না। এটি দরকার হবে। সবশেষে বলাবো, অবশ্যই মুভিটি নির্দ্বিধায় দেখে ফেলুন। আমার মতে, এটিই এখন পর্যন্ত পিক্সারের সেরা সৃষ্টি। আশা করি, ইনসাইড আউটের দেড় ঘণ্টার সফর শেষে আপনিও আমার সঙ্গে একমত হবেন।

সিনেমা-আমার

হামীম কামরুল হক

 

ছোটবেলা থেকেই আমরা কতো না সিনেমা দেখেছি যেগুলো আসলে সিনেমাই ছিল না। এগুলোর বরং মুভি বা মোশান পিকচার বলা যায়। বাংলায় বলা যায় ছায়াছবি বা ছবি। বাংলায় টকি বা বায়োস্কোপ কথাটাও এক সময় খুব চালু ছিল। আর সিনেমার নামে কাহিনীচিত্রের এতোই প্রকোপ ছিল যে, লোকে সিনেমাকে বলতো ‘বই’। ‘একটা বই দেখলাম। হলে এবারের নতুন বইটা খুবই ভালো।’ তো এ বই-ই আসলে আমরা দেখছিলাম। সেলুলয়েডে এই যে স্রেফ একটা কাহিনী দেখা- এটা যে সিনেমা নয়, বুঝতে সময় লেগেছে। এমনকি হলিউডের অসাধারণ নির্মাণ কৌশল সমৃদ্ধ শ্বাসরুদ্ধকর অনেক ছবি- সেগুলোও সিনেমা নয়, কাহিনীচিত্র মাত্র। রোমান্স, থ্রিলারের সঙ্গে উপন্যাসের পার্থ্যক যা, এসব কাহিনীচিত্রর সঙ্গে সিনেমার ততোটাই তফাত কিংবা এর চেয়েও বেশি।


নবম-দশম শ্রেণীতে পড়ার সময় যখন মৃণাল সেনের ‘খারিজ’ সিনেমা দেখি তখন সেটিও বই হিসেবেই দেখেছিলাম। এরও অনেক আগে বিটিভিতে ‘হীরকরাজার দেশে’ও দেখিয়েছিল। ওই সময় আমার দেখা হয়নি। তখনো সিনেমা এবং এসব মুভির তফাত জানা হয়নি। জানাটা শুরুটা হয় ঋত্বিক ঘটকের ‘সুবর্ণরেখা’ দিয়ে। সত্যিকারের সিনেমা বলতে যা বোঝায়, ‘সুবর্ণরেখা’ দেখার অভিজ্ঞতাটা আমাকে সিনেমা দেখার নেশায় ফেলে দেয়।
তখন অনার্সের ছাত্র। পরীক্ষাও কাছে এসেছে। এদিকে আমার মাথায় সিনেমা দেখার পোকাগুলো কিলবিল করতে শুরু করে। জহির রায়হান চলচ্চিত্র সংসদ, চলচ্চিত্রমসহ আরো কারা যেন নানান পরিচালকের রেট্রোস্পেকটিভ করে। শুরুতে ঋত্বিকেরই একটা পর একটা ছবি- ‘সুবর্ণরেখা’, ‘কোমলগান্ধার’, ‘অযান্ত্রিক’। তারপর দেখা হয় সত্যজিতের ‘জনঅরণ্যে’, ‘সীমাবদ্ধ’, বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ‘লাল দরজা’। শ্যাম বেনগালের কী একটা ছবিও দেখা হয়েছিল ওই পর্বে। ছিল প্রিয়দর্শনের হিন্দি ছবি ‘বিরাসাত’। এরপর গ্যেটে ইনস্টিটিউটেই মূলত সিনেমা দেখার পর্ব চলেছে। মাঝখানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চে বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের রেট্রোস্পেকটিভে একের পর এক সিনেমা দেখার সুযোগ। দেখলাম ‘দূরত্ব’, ‘গৃহযুদ্ধ’, ‘চরাচর’, ‘সংক্রমণ’, ‘বাঘবাহাদুর’-এর মতো সিনেমা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন অডিটোরিয়াম তৈরি হলে সেখানে আইজেনস্টাইনের কয়েকটি সিনেমাসহ আরো কী কী যেন দেখা হয়!
একটি সেশনটা খুবই স্মরণীয়। বিখ্যাত গল্প-উপন্যাস বা সাহিত্য থেকে করা সিনেমার একটা রেট্রোস্পেকটিভের আয়োজন করে জহির রায়হান চলচ্চিত্র সংসদ। এতে প্রথম দেখা হয় ‘পথের পাঁচালী’, ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’, ‘সূর্যদীঘল বাড়ি’, ‘জাগো হুয়া সাবেরা’, ‘দ্য টিন ড্রাম’, ‘আন বিয়ারেবল লাইটনেস অব বিইংস’, ‘ডোনা ফ্লোরা অ্যান্ড আর টু হাসব্যান্ডস’, ‘থর্ন অব ব্লাড’। মার্কেসের বিখ্যাত গল্প ‘দি ইনক্রিডিবল অ্যান্ড স্যাড টেল অব ইনোসেন্ট এরিন্দিয়েরা অ্যান্ড হার হার্টলেস গ্রান্ডমাদার’ থেকে করা ছবিরটাও দেখা হয় এই পর্বে। আলবার্তো মেরাভিয়ার কী একটা গল্প থেকে করা জাঁ লুক গোদারের একটা সিনেমাও দেখেছিলাম। এরপর থেকে সুযোগ পেলেই গ্যেটে ইনস্টিটিউটে যাওয়া-আসা শুরু হয়।
সিনেমা দেখানো আয়োজনের খবর পেলেই ছুটে যেতাম। এর অনেক পর লুই বুনুয়েল রেট্রোস্পেকটিভে প্রায় ৯টা সিনেমা দেখা হয়। এর আগে কী পরেই হতে পারে, আন্দ্রে তারকাভস্কির দু’তিনটি ছবি দেখেছিলাম ‘স্টকার’, ‘মিরর’। ওই গ্যেটে-তে এবং এবারও আয়োজক জহির রায়হান চলচ্চিত্র সংসদ। এগুলো মাঝখানে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র গোদারের ‘ব্রেথলেস’ দেখি। নানান সময় দেখা হয় ফেলিনির ‘লা ডলচে ভিটা’, জ্যাঁ রেনোয়ার ‘দি রুলস অব দ্য গেম’, ইঙ্গমার বার্গম্যানের ‘ওয়াইল্ড স্টবেরিস’সহ কিছু ছবি। সবই প্রায় গ্যেটেতে। অ্যালা রেনের ‘হিরোমিশা মনা আমুর’। এখানে বলে রাখা ভালো, এগুলোর বেশির ভাগই যে খুব বুঝ-জ্ঞান নিয়ে দেখেছিলাম তা তো নয়। সত্যিকার অর্থে অনেক ছবির অনেক কিছুই প্রায় বুঝিইনি।
যতো দিন ঘরে বসে ডিভিডি-তে সিনেমা দেখার সুযোগ হয়ে ওঠেনি ততো দিন পর্যন্ত এভাবে সিনেমা দেখা চলেছে। ডিভিডিতে অবশ্য সিনেমা দেখাটা কোনো সিনেমা দেখা নয়, এমনকি গ্যেটেতে যেভাবে ছবি দেখা হয়েছে তাও ডিভিডির বদৌলতে। সিনেমা হলে বসে সিনেমা দেখা না হলে এর সত্যিকারের নির্মাণ কৌশল, বিশেষ করে আলোক প্রক্ষেপণ, লেন্সের কাজ এবং অনেক কিছু নাকি বাদ পড়ে যায়।
সেদিক থেকে সুন্দর সুন্দর সিনেমা ভালো করে দেখাটা আমাদের এখনো হয়ে ওঠেনি। আরো জোর দিয়ে বললে বলতে হয়, আজও সিনেমার মতো করে সিনেমা দেখার সুযোগই হলো না। তারপরও দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতো করে এই যে ডিভিডিতে সিনেমা দেখা- এর কাছে কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। এরই কল্যাণে কয়েক চলচ্চিত্র পরিচালকের বলতে গেলে প্রায় সব ছবিই দেখার সুযোগ ঘটেছে।
এখন কথা হলো, কেন এতো সিনেমা দেখা? কী আছে এসব সিনেমায়? কে বড় পরিচালক? সত্যজিৎ, না ঋত্বিক- এমন তর্কে মাতা কেন? বুনুয়েলের মতো এমন আক্রমণাত্মক সিনেমা কী আমাদের দেশে কেউ নির্মাণ করতে পারবেন? আরে, আগে সিনেমাটাই তো বানাতে জানুন, তারপর না হয় বুনুয়েল? বাংলাদেশে সিনেমা প্রায় নেই-ই বলতে গেলে। এর কারণ কী? এমন বিচিত্র সব প্রশ্ন নিজেকে যে নিত্যই করে দেখেছি তাও নয়। স্রেফ ভালো লাগা থেকে ছবিগুলো দেখা বা দেখার জন্য দেখা তাও নয়। তবু কেন যে মনে হয়েছে, আমরা যারা লেখালেখি করি তাদের জন্য সিনেমা দেখাটা বেশ কাজে দেয়। ক্যামেরা ও কলম ধরা মানুষের জীবনের এমন কিছু অনুষঙ্গ, এমন আবহ নিয়ে আমাদের মনে প্রায় সময়ই কিছু না কিছু ঘটিয়ে দিয়ে চলে যায়। এর কিছুটা সচেতনাভাবে টের পাওয়া যায়, বেশির ভাগটাই পাওয়া যায় না।


হলিউডি কাহিনীধর্মী চলচ্চিত্রও তো কম দেখা হয়নি। কম দেখা হয়নি ভারতীয় হিন্দি, বাংলাদেশি বাংলা কোমর দোলানো নাচা-গানাময় ছবি। তবে হলে গিয়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র দেখার ভরসা হয়েই ওঠে না। এক সময় সরকারি অনুদান, পরে এক বা একাধিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতায় যেসব চলচ্চিত্র বাংলাদেশে তৈরি হয়েছে এর বেশির ভাগই অপচয় ছাড়া আর কিছু নয়। কারণ সিনেমা নির্মাণের জন্য যে মেধা, প্রতিভা ও সাহসের দরকার পড়ে এর সমন্বয় এ দেশে খুব একটা দৃষ্টান্ত নেই। সততাটাই তো সবার আগে দরকার। সেটিই তো নেই। সততা মানে সৎ শিল্পী হওয়ার সততা। সিনেমা যে একটি মিশ্র মাধ্যম, এতে সাহিত্য-নাটক-সঙ্গীত-চিত্রকলা-নৃত্য থেকে শুরু করে সমাজ-রাজনীতি-অর্থনীতি-বিজ্ঞান কী নেই! দেখা যায়, এ দেশের বেশির ভাগ চলচ্চিত্রকারের সঙ্গীতবোধটাই নেই। কোনো সঙ্গীত পরিচালকের হাতে তা ছেড়ে দিয়ে বসে থাকেন তিনি।
এ দেশে ভালো সিনেমা তৈরি না হওয়ার অনেক কারণ নিশ্চয়ই আছে। অর্থলগ্নিটাই বিশাল প্রশ্ন হয়ে সামনে ঝুলে থাকে। ভালো অভিনেতা, সঙ্গীতজ্ঞ, শব্দ প্রকৌশলী, সম্পাদনার কাজ করা তেমন মানের ব্যক্তিরও অভাব আছে। কিন্তু এর কোনোটাই বোধ করি প্রধান সমস্যা নয়। প্রধান সমস্যা হলো যারা সিনেমার নামে যা করতে আসেন সেসব তথাকথিত পরিচালক। সিনেমার মতো একটি জটিল ও মিশ্র মাধ্যমে কাজ করার জন্য শিল্পবোধ এবং নান্দনিকতার যে স্তরে পৌঁছানো দরকার, সিনেমা সংক্রান্ত জ্ঞান-বুদ্ধি অর্জনের জন্য প্রচুর পরিশ্রম ও পড়ালেখা করার দরকারÑ এর লেশ মাত্রও তাদের কেউ করেন কি না সন্দেহ। সন্দেহটা নিশ্চিত হয়ে যায় তাদের নির্মিত নামকাওয়াস্তে চলচ্চিত্রগুলো দেখার পর। মনে হয়, এফডিসি-তে একেবারেই সিনেমা সম্পর্কে অজ্ঞ এককালের যেসব পরিচালকের যে ফিল্ম সেন্স ছিল, তাদের চলচ্চিত্রবোধ এর চেয়েও নিম্নস্তরের। অনেকে আছেন রেডিওতে শুনে শুনে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে পারেন। তারা যদি পৃথিবীর সেরা সিনেমাগুলো দেখেও কিছু একটা করতে পারতেন! তাও না। মূল সমস্যা চেতনাগত। মূলত ফিল্ম সেন্সের প্রচুর ঘাটতিই এর কারণ।


আমরা একটা বিষয় নিরাবেগভাবেই দেখতে চাই। কারণ শূন্যের মধ্যে ঢাক বাজিয়ে কোনো লাভ নেই। তেমন আবেগহীনভাবে দেখলে আমরা একটি সত্য স্বীকার না করে পারি না যে, বাংলাদেশে ঔপন্যাসিক নেই। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মধ্যে আমরা কেবল উপন্যাসের দিকে যাত্রা করার উদ্যোগটা দেখেছিলাম মাত্র। কিন্তু যে পূর্ণতার বিকাশ নিয়ে উপন্যাসের জন্ম হবে ওই উপন্যাস এখানে কোথায়? আকারে বিশাল উপন্যাসের কথা বলা হচ্ছে না। নতুন বোধ, ভাষা, চরিত্র ও আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে যে উপন্যাসের উদ্ভব হয় এমন উপন্যাস কোথায় (কথাটা ওয়ার অ্যান্ড পিস, আনা কারেনিনা, ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট, দ্য ব্রাদার্স কারামাজভ, দ্য ম্যাজিক মাউন্টেইন, দ্য ট্রায়াল, ইউলিসিস, দ্য সাউন্ড অ্যান্ড দ্য ফিউরি, মিসেস ডালওয়ে, দ্য আউটসাইডার, দ্য আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিইংস, দ্য টিন ড্রাম, ওয়ান হান্ড্রেড ইয়াস অব সলিচুড, ব্লাইন্ডনেস প্রভৃতি উপন্যাসের কথা মনে রেখেই বলা)? তেমনি কোনো ডিরেক্টরেরও আগমন ঘটেনি (ডিরেক্টর বলতে আমরা আইজেনস্টাইন, ফেলিনি, বুনুয়েল, কুরাশাওয়া, বার্গম্যান, জ্যাঁ রেনোয়া, জাঁ লুক গোদার, ফ্রাঁসোয়া ক্রফো, অ্যাল রেনে, সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, তারকাভস্কি, আব্বাস কিরোস্তয়ামি, মহসিন মাখমালবাফ, মজিদ মাজেদি, ওসমান সেমবেনের মতো ডিরেক্টরদের কথা মনে রেখেই বলা)।


বাঙালি মুসলমানদের ভেতরে ঔপন্যাসিক ও ডিরেক্টররা কেন এলেন না এখানো পর্যন্ত? এ দুটি নিয়ে আরো গভীরভাবে ভাবার আছে। এর ঠিক উল্টোদিকে আছে কার জন্য উপন্যাস ও চলচ্চিত্রটা নির্মিত হবে? সর্বক্ষেত্রে সমঝদারের মারাত্মক অভাব। সমাজে কতো ব্যক্তি আছেন যারা জানেন সত্যিকার উপন্যাস বলতে কী বোঝায়, এর লক্ষণগুলো কেমন- এসব জানেন-বোঝেন? একেবারে হুবহু কথা খাটে চলচ্চিত্রের গ্রহীতাদের নিয়েও। কয়েকজন আছেন যারা সিনেমা বিষয়টির মূল্যয়ান বা আপ্রিসিয়েশন-এর ক্ষমতা সম্পন্ন? বড় বড় ডিগ্রি পাওয়া বা অর্থনীতির জটিল মারপ্যাঁচ বোঝা ব্যক্তি মাত্রই যে চলচ্চিত্র বুঝবেন তা তো নয়। চলচ্চিত্র দেখার জন্য ও দেখে বোঝার জন্য যে চর্চা এবং চর্চার জন্য যে আগ্রহ ওই আগ্রহের ঘাটতি এতোটাই ব্যাপক যে, এর ভেতর থেকে কোনো চলচ্চিত্রকারের জন্মগ্রহণ করাটা প্রায় অসম্ভব। চলচ্চিত্র সংসদগুলোর কার্যক্রমও গুটিকয়েক ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ।
এ তো গেল ভেতরবার বাধা-বিপত্তির কথা। বাইরের বাধাগুলোও কম প্রবল নয়। আমরা ছোটবেলায় শুনেছি, মসজিদে যাওয়ার লোক বেশি নয়, সিনেমায় যাওয়ার লোক বেশি। এই দিয়ে সমাজের সৎ-অসৎ, ভালো মানুষ-মন্দ মানুষ যাচাই করা হতো। সিনেমা দেখাটা একটা ‘পাপ’ ছাড়া আর কিছু নয়। বিশ্ববিদ্যাবিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমাদের অতিশয় ভালো মানুষ এক বন্ধুর কথা বলা যাক। তাকে তার প্রয়াত পিতা বলেছিলেন জীবনে দুটি কাজ না করতে। এক. সিনেমা হলে না যেতে এবং দুই. কোনো রকম রাজনীতির সঙ্গে না জড়াতে। আমাদের সেই বন্ধু প্রয়াত পিতার ওই আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। গ্রামের বলতে গেলে একেবারেই সাধারণ পরিবার থেকে আসা সেই বন্ধুকে দেখেছি টিউশুনি করে নিজের খরচ নিজে চালাতে। কোনো নম্র-ভদ্র ছেলের দৃষ্টান্ত ছিলেন তিনি। পড়লেখা ও টিউশুনি করা ছাড়া আর কোনোদিকে মনোযোগ দেননি। কোনো রকম বিরোধে জড়াতে দেখিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ সময়ে গভীর মনোযোগ সেসব পড়ালেখা করেছেন যা তাকে সরকারের একটি ভালো চাকরির জন্য পুরোপুরি তৈরি করে দেবে এবং পাস করার পর কিছুদিন কষ্টে-সৃষ্টে জীবন চালালেও শেষ পর্যন্ত তিনি অত্যন্ত সম্মানজনক একটি জীবিকার ব্যবস্থা করে নিতে পারেন। তার ঈপ্সিত জীবিকা গ্রহণেরই সুযোগও পান। পরে জানতে পারি, তিনি যে চাকরি করেন এতে পদে পদে আপস করে চলা ছাড়া উপায় নেই। সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিক ও বিভিন্ন ক্ষমতাপ্রবল অধিকারীর সামনে তার চুপ হয়ে যাওয়া ছাড়া আর কিছু করার থাকে না। মেনে নেন এ জীবন তার নিজের হাতে গড়া।


যাই হোক। আমি মূলত দেখাতে চেয়েছি, এই যদি হয় বিশ্ববিদ্যালয় পাস করা একজনের পরিণতি তাহলে সে দেশে চলচ্চিত্র বা উপন্যাসের গ্রহীতার কারা হবেন? গল্পের বই পড়া অন্যায়, সিনেমা দেখা পাপ। ফলে ওই সিনেমায় বানানো ও অভিনয় করা সম্পর্কে মানুষের ধারণা কী হতে পারে? এ প্রসঙ্গে আরেকটি ঘটনার কথাও মনে পড়ে গেল। আমার এক আত্মীয়। তিনি একটি নামকরা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত একটি বিনোদন পত্রিকার উচ্চপদে কাজ করেন। চাকরি জীবনে তার সততটার কারণে তিনি চলচ্চিত্র অঙ্গনে সম্মানিত। একটি বিয়ের নিমন্ত্রণপত্র দিতে তাকে নিয়ে আমাদের আরেক আত্মীয়ের বাসায় গিয়েছি। বাড়িতে দুই বৃদ্ধা ছাড়া আর কেউ তখন ছিলেন না। তাকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার সময় আমি বলি, তিনি সিনেমা পত্রিকায় কাজ এবং টিভিতে অনুষ্ঠান করেন। কিন্তু নিজের কর্মস্থল হিসেবে ওই ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নাম ও পরিচয় বলেন। এক পর্যায়ে বসার ঘরে যখন কেউ ছিল না তখন আমাকে তিনি বলেন, সিনেমা-টিভিতে কাজ করার কথা শুনলে সবাই ভালো চোখে দেখে না। ওটা বলার দরকার নেই। জাস্ট...তে চাকরি করিÑ এটা বললেই চলে, তাই না? এমন পরিস্থিতিতে চলচ্চিত্রের অবস্থা অনুমেয়। যে দেশে সিনেমা দেখা পাপ, সিনেমার সঙ্গে কোনো সংশ্লিষ্টতা দেখা হয় খারাপ চোখে সে দেশে সিনেমার বিকাশ হবে কোন পথে? এই বাস্তবতা একেবারে ভিত্তিহীন নয়।
স্বাধীনতার পর পরই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত এবং একেবারে শিল্পবোধহীন প্রযেজোক-পরিচালকের চক্র এতোটাই শক্তি অর্জন করে যে, সেখানে ভালো কোনো কাজের কথা ভাবাও বাতুলতার পর্যায়ে পৌঁছে যায়। চলচ্চিত্র হয়ে ওঠে স্রেফ লগ্নিকৃত অর্থের মুনাফা আদায়ের ক্ষেত্র। ভারতীয় ছবির চিত্রনাট্য থেকে শুরু করে সঙ্গীত- সবই নকল করে সত্তরের দশকের শেষে এক বছরে দেড়শ’-দুইশ’ ছবি করার মাত্রায় পৌঁছে গিয়েছিল আমাদের চলচ্চিত্র শিল্প। এতে শিল্পমান স¤পন্ন সিনেমা গোয়েন্দা লাগিয়েও আবিষ্কার করা সম্ভব নয়। দিনে দিনে পরিস্থিতি করুণ থেকে করুণতর হতে থাকে। নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত এই ধারাই চলে। এরপর বিংশ শতাব্দীর শেষ অংশে যেন বাংলাদেশে বাংলা চলচ্চিত্রের এক রকম মৃত্যুঘণ্টা বেজে ওঠে। সিনেমা ব্যবসায়ীদের বদলে সিনেমা শিল্প চলে যায় কালো টাকা সাদা করনেওয়ালা লোকদের দখলে। একের পর এক সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যেতে থাকে। এর মানে দেশে পুণ্যবান মানুষের সংখ্যা বাড়ছিল এবং সিনেমা যে পাপ এ সম্পর্কে ধারণা প্রকট থেকে প্রকট আকার হচ্ছিল তাও নয়। স্যাটেলাইট, ঘরে ঘরে সিডি-ডিভিডিতে সিনেমা দেখা সহজ হয়ে ওঠাটাও বোধ করি কারণ নয়। তাই যদি হতো তাহলে ইউরোপ-আমেকিরায় একজনও সিনেমা দেখতে যেতো না। এর কারণ আমাদের অন্যত্র খুঁজতে হবে। স্যাটেলাইট, সিডি-ডিভিডিতে সহজেই ছবি দেখার সুযোগ মেলে বলে মানুষ সিনেমা হলে যায় নাÑ এ ধারণা মূলে আপাত সত্য থাকলেও মূল কারণ হলো, আমাদের দেশের চলচ্চিত্র মাধ্যমে জড়িত ব্যক্তিরা এমন একটি পরিবেশ ও পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছেন যেখানে সৃষ্টিশীলতার পথ প্রায় রুদ্ধ হয়ে গেছে। বাইরে কোনো কিছু নয়, এর ভেতরের ব্যক্তিরাই এটিকে তিলে তিলে ধ্বংসের পথে নিয়ে দাঁড় করিয়েছেন। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে রাজনৈতিক দলাদলি।


এদিকে সুস্থধারা নামে যেসব চলচ্চিত্র নির্মিত হচ্ছে এর কাহিনী, চিত্রনাট্য ও পরিচালনার মান আমাদের ওই কাক্সিক্ষত মানের কাছাকাছিও নয়। এর মানে আমরা আমাদের দেশের চলচ্চিত্র দেখার ক্ষেত্রে বিশাল এক শূন্যতার ভেতর অবস্থান করছি। সিনেমায় আমরা এ দেশের মানুষের মুখ ও বাস্তবতা দেখতে চাই, বানোয়াট কোনো কিছু নয়। স্বাধীনতার পর থেকে ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পারিবারিক বিবর্তনগুলোর নিরিখে মানব সম্পর্কে যে বিচিত্র বিন্যাস এ দেশের শহর-নগর, গ্রাম-গঞ্জে ঘটেছে সেটুকুর বিশ্বস্ত চিত্রায়ণই তো যথেষ্ট ছিল। কিন্তু ওই চিত্রায়ণের জন্য অবলম্বন কোথায়? যেসব গল্প-উপন্যাসের অনুসারে সিনেমাটির চিত্রনাট্য তৈরি হবে তা কোথায়? আর সাহিত্য ছাড়া চিত্রনাট্য তৈরি করার মতো মেধাবী ব্যক্তিরাই বা কোথায়? বিচ্ছিন্নভাবে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নামে কিছু ভালো কাজ কেউ কেউ করেছেন। কিন্তু এর ধারাবাহিকতাও কেউ ধরে রাখতে পারেননি। বাংলাদেশের মানুষের দক্ষতার সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে কন্সিস্টেন্সি না থাকা। এ বিষয়টি এ দেশের হেন বিষয় নেই যাতে পরিলক্ষিত হয়নি। তা ওই ক্রিকেট খেলাই বলি, কী চলচ্চিত্র! কেউ কেউ দু’একটি চলচ্চিত্র তৈরি করে সম্ভবনার ইঙ্গিত দেন। এরপর পুরস্কার, নাম-খ্যাতি আর আত্মতৃপ্তির কোন গহ্বরে যে তারা তলিয়ে যান তা কে জানে। তাই বাধ্য হয়ে আমরা যারা ভালো ছবির সঙ্গে থাকতে চাই তাদের সম্বল হয়ে ওঠে আইজেনস্টাইন, ফেলিনি, বুনুয়েল, কুরাশাওয়া, বার্গম্যান, জ্যাঁ রেনোয়া, জাঁ লুক গোদার, ফ্রাঁসোয়া ক্রফো, অ্যালা রেনে, সত্যাজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, তারকাভস্কি, আব্বাস কিরোস্তয়ামি, মহসিন মাখমালবাফ, মজিদ মাজেদি, ওসমান সেমবেনের মতো পরিচলকদের নির্মিত চলচ্চিত্র। সিনেমার কাছে আমাদের যা কিছু চাওয়া তা তাদের চলচ্চিত্র থেকেই আমরা পেতে চাই।


বার বার ঘুরে-ফিরে দেখা হয় কখনো ‘ব্যাটেলশিপ পটেমকিন’, ‘লা ডলচে ভিটা’, ‘দ্য ডিসক্রিট চার্ম অব বুর্জোয়া’, ‘রশোমন’, ‘দ্য রুল অব দ্য গেম’, ‘বেথ্রলেস’, ‘ডে ফর নাইট’, ‘লাস্ট ইয়ার ইন মেরিয়েনবাদ’, ‘পথের পাঁচালী’, ‘সুর্বণরেখা’, ‘খ-হর’, ‘মিরর’, ‘টেস্ট অব চেরি, কান্দাহার’, ‘চিলড্রেন অব হ্যাভেন’, ‘দ্য মানিঅর্ডার’-এর মতো কতো সিনেমা। কিন্তু এতো সিনেমা দেখার পরও কোথায় যেন একটা খামতি ও অতৃপ্তি রয়ে যায়। কারণ এর ভেতরে আমার দেশের আমাদের চলচ্চিত্রকারের নির্মাণ করা আমাদের সিনেমা নেই যে সিনেমা ফিরে ফিরে বার বার দেখা যায়। যে সিনেমার প্রতিটি দৃশ্য আমার দেশের মানুষের মুখ, প্রকৃতি ও প্রতিবেশ তুলে আনে। স্বদেশের সত্যিকারে ওই স্বরূপ দেখে আমরা এ দেশের সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠ হই। এক অচ্ছেদ্য নান্দনিক বন্ধনে আবদ্ধ হই। ওই সিনেমার জন্য তৃষিত হয়ে থাকি। হয়তো পরিস্থিতির বদলাবে। এটুকু আশা না রাখলে তো আর এতো সিনেমা দেখে কী বা পেলাম প্রশ্নও ওঠে। নিশ্চয়ই এমন অনেকেই এভাবে এসব ডিরেক্টর ও তাদের নির্মিত সিনেমা দেখে থাকেন এবং ভবিষ্যতেও দেখবেন। তাদের কারো ভেতর থেকে জন্ম নেবেন ওইসব ডিরেক্টর যারা মেধা, প্রতিভা ও সাহসে অনন্য এবং সিনেমা করা জন্য বোধ করবেন প্রচ- তাড়না। এ জন্য শ্রম দেবেন এবং তাদের হাতেই সিনেমা আমার হয়ে উঠবে আমার সিনেমা, আমাদের সিনেমা হয়ে উঠবে।
হ্যাঁ, খেয়াল করুন পাঠক, আমরা একক চলচ্চিত্রকারদের কথা বলছি না। এ জন্য সম্মিলিতভাবে একযোগে একদল চলচ্চিত্রকারকে এগিয়ে আসতে হবে। যেমনটা ঘটেছে ফ্রান্স, ইটালি, জার্মানি, স্পেন, জাপান, ভারত, ইরান, এমনকি সেনেগালের মতো দেশে। আমাদের দেশেও একদল পরিচালকের মাধ্যমে হয়তো ভবিষ্যতে বদলে যাবে বাংলাদেশের সিনেমা জগৎ। তাদের হাত দিয়ে নির্মিত সিনেমায় আমাদের আরো নিবিড়ভাবে তখন পাবো। আমাদের চলচ্চিত্রকাররা এবং তাদের চলচ্চিত্র বিশ্ব চলচ্চিত্রের জগতে চিরদিনের জন্য ঠাঁই করে নেবে।

এভার বার্নিং

 

হলিউডে ‘ভেতরে-বাইরে সমান সৌন্দর্য’-এর অধিকারীর নামের তালিকায় প্রথমেই যে নামটি উঠে আসে, তা হলো অড্রে হেপবার্ন। ১৯২৯ সালের ৪ মে বেলজিয়ামে জন্ম নেওয়া এ সুন্দরীর নাগরিকত্ব ব্রিটেনে হলেও চোস্ত ইংরেজিসহ ডাচ, ফ্রেঞ্চ, ইটালিয়ান, স্প্যানিশ ও জার্মান ভাষায় ছিল অগাধ দখল। শুধু হলিউড নয়, গোটা বিশ্বের কোটি কোটি দর্শকের হৃদয়ে বাস নিয়েছিলেন হেপবার্ন তার রূপ ও প্রতিভা দিয়ে। দুর্দান্ত অভিনয়ের সঙ্গে ফ্যাশন আইকনে স্থান করে নেন পাকাপোক্তভাবে।

বাবা জোসেফ এন্টনি রাস্টন-এর চাকরির সুবাদে বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ হয় হেপবার্ন-এর। অবশ্য সুখকর শৈশব স্থায়ী হয়নি তার। ১৯৩৫ সালে তার বাবা যেন হঠাৎ করেই হাওয়া হয়ে গেলেন একদিন। এরপরই ১৯৩৮ সালে মা ব্যারোনেস এলা ভ্যান হিমস্টা-র সঙ্গে বিয়ে বিচ্ছেদ। ঘটনা দুটি ছোট্ট হেপবার্নের হৃদয়ে বিশাল ক্ষত তৈরি করে। যদিও তিনি ২০-২৫ বছর পর বাবাকে খুঁজে পান তবুও ছোটবেলার ওই বাঁধন কবেই না জীর্ণ হয়ে গেছে! এরপরও হেপবার্ন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বাবাকে আর্থিক সহয়তা দিয়েছেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর পর অড্রে হেপবার্নের পরিবার আর্থিকসহ রীতিমতো খাবার ও জ্বালানি সংকটে পড়ে। তিনি এ সময় অ্যানিমিয়া ও অপুষ্টিজনিত রোগে আক্রান্ত হন। যুদ্ধ শেষে ১৯৪৫ সালে মা ও ভাইয়ের সঙ্গে আমস্টাডারম-এ আসেন। সেখানেই বিখ্যাত ব্যালে ডান্সার সোনিয়া গাস্কেলের কাছে নতুন করে ব্যালে শুরু করেন তিনি। পাঁচ বছর বয়সে শুরু করা ব্যালের প্রতি নিদারুণ আকর্ষণ তাকে বেশি পারদর্শী করে তোলে। প্রাইভেটে ছোটদের নাচ শিখিয়ে কিছু আয়-রোজগারও শুরু করেন। কিন্তু খাবারের অভাব তাকে এতোটাই দুর্বল করে যে, সাময়িকভাবে নাচ বন্ধ করতে হয় তার। পরে ১৯৪৯ সালে ‘ব্যালে রাম্বারটে’ স্কলারশিপ নিয়ে লন্ডনে যাত্রা করেন। ব্যালেতে অসামান্য প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও শুধু শারীরিক গঠন তার জন্য পাহাড়সম বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়।

হাল ছাড়ার পাত্রী নন হেপবার্ন মনোযোগী হন মডেলিং ও অভিনয়ে। প্রথম দিকে কয়কটি ব্রিটিশ ফিল্মে ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয় করলেও ১৯৫৩ সালে প্রিন্সেস এনা-র চরিত্রে ‘রোমান হলিডে’ ছবিতে অভিনয় করে তারকা বনে যান তিনি। এ ছবিতে অভিনয়ের সুবাদে তারকা খ্যাতিসহ বহু পুরস্কারে ঝুলি ভরে ওঠে তার। শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর অস্কার, শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর একাডেমি অ্যাওয়ার্ড, শ্রেষ্ঠ ব্রিটিশ অভিনেত্রীর ‘বাফটা’ অ্যাওয়ার্ড, গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ডÑ কী নেই ওই ছবিতে? বিধাতা যেন সুদ-আসলে পুষিয়ে দিলেন ভাগ্য বিড়ম্বিত কৃশকায় মেয়েটিকে।

এ ছবির জন্য প্রথমে এলিজাবেথ টেলর-এর কথা চিন্তা করা হলেও পরিচালক উইলিয়াম ওয়েলার গোঁ ধরলেন সেই মেয়ের জন্য যিনি স্ক্রিন টেস্টে অভিনয়শৈলী ও সরলতামাখা মুখে মুগ্ধ করেছিলেন তাকে। পরে উইললিয়াম বলেছিলেন, ‘রোমান হলিডের জন্য আমরা শিশুসুলভ, সরল, নিষ্পাপ, একই সঙ্গে বুদ্ধিদীপ্ত ম্যাজিকাল চেহারা খুঁজছিলাম। হেপবার্নকে দেখে মনে হয়েছিল, আরে, এ তো সেই মেয়ে!’

যাহোক, যারা রোমান হলিডে দেখেছেন, তারা জানেনÑ বহুবার দেখার মতো ওই ছবিতে প্রাসাদের নিয়মানুবর্তিতায় হাঁপিয়ে ওঠা রাজকুমারী এনার পালিয়ে যাওয়া এবং পরে আমেরিকার এক রিপোর্টারের (গ্রেগরি পেক) সঙ্গে প্রেম কী দুর্দান্তভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন হেপবার্ন! তাকে ছাড়া আর কাকেই বা কল্পনা করা যায়?

১৯৫৪ সালে আবার মঞ্চে ফিরে যায় অড্রে হেপবার্ন। ‘অন্ডিন’ নাটকে অভিনয়ের জন্য সেরা অভিনেত্রী টনি অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন তিনি। এই প্রডাকশনে কাজ করতে গিয়ে মন দেয়া-নেয়া হয় কো-আর্টিস্ট মেল ফেরের-এর সঙ্গে। এর পরিণাম ওই বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর বিয়ের পিঁড়িতে বসা। এরপর বেশ কয়কটি সফল চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন তিনি।

যেমনÑ ‘সাবরিনা’, দি নানস স্টোরি’, ‘ব্রেকফাস্ট অ্যাট টিফানিস’, ‘চ্যারেড’, ‘মাই ফেয়ার লেডি, ‘ওয়েট আনটিল ডার্ক’।

‘দি নানস স্টোরি’ (১৯৫৯) ছবিতে অড্রে হেপবার্ন-কে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়েছে তার শিশুসুলভ নারীর ইমেজ থেকে বেরিয়ে এসে পরিপূর্ণ নান-এর অভিব্যক্তিগুলো ফুটিয়ে তুলতে। নিন্দুকের মুখে ছাই দিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো ‘বাফটা’ ও তৃতীয়বারের মতো ‘একাডেমি’ পুরস্কারের মনোনয়ন পান এ ছবির জন্য। ‘ওয়েট আনটিল ডার্ক’ ছবির জন্য দ্বিতীয় একাডেমি অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন এবং ‘গোল্ডেন গ্লোব’ ও ‘বাফটা’ মনোনয়ন পান তিনি।

শুধু অভিনয় আর সৌন্দর্যেই নয়, মানবসেবায়ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত রেখেছেন অড্রে হেপবার্ন। অভিনয় জগৎ থেকে সরে আসার পর ইউনিসেফ-এর হয়ে জনহিতৈষী কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। অবশ্য ১৯৫৪ সাল থেকেই ওই সংগঠনের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। ১৯৮৮ থেকে ১৯৯২ সালের মধ্যে আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও এশিয়ার প্রতিকূল সম্প্রদায়ের জন্য কাজ করে যান। জাতিসংঘের হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিশুদের জন্য কাজ করেছেন তিনি। ১৯৮৯ সালের শুরুতে ঢাকায় আসেন ওই ব্রিটিশ অভিনেত্রী ইউনিসেফের দূত হয়ে। ইউনিসেফের গুডউইল দূত হিসেবে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯২ সালে তাকে ‘প্রেসিডেনশিয়াল মেডেল ও ‘ফ্রিডম’ পদকে ভূষিত করা হয়।

অড্রে হেপবার্ন হাতে গোনা সেই তারকাদের মধ্যে একজন যিনি এতো আঙ্গিকে এতো পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এরই মধ্যে ন্যাচারাল বিউটিখ্যাত ওই অভিনেত্রীর শরীরে ক্যানসার বাসা বাঁধে। ১৯৯৩ সালের ২০ জানুয়ারি ঘুমের মধ্যে খুব

নিশ্চিন্তেই না ফেরার দেশে পা বাড়ান ৬৩ বছর বয়সী কালজয়ী এই

 

‘অনন্ত প্রেম’ কবিতাটি তার খুব প্রিয় ছিল

 

 

‘তোমারেই যেন ভালােবাসিয়াছি শতরূপে শতবার

জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার।

চিরকাল ধরে মুগ্ধ হৃদয় গাঁথিয়াছে গীতহার

কতরূপ ধরে পরেছ গলায়, নিয়েছ সে উপহার

জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার।’

 

এই কবিতার চরণগুলো কোথাও কি একাকার হয় অড্রে হেপবার্নের সঙ্গে?

 

 

 

Page 7 of 8

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…