Page 2 of 2

থার্ড আই পারস্পেক্টিভ - আব্বাস কিয়ারোস্তমি

 

দুনিয়ার সোনালি পর্দা ছেড়ে গত ৪ জুলাই আব্বাস কিয়ারোস্তামি চলে গেলেন অন্য জগতে। ‘ইরানিয়ান নিউ ওয়েভ অফ সিনেমা’র জনক কিয়ারোস্তামি ষাটের দশকে যে কাজ করে গেছেন তা আরো হয়তো এক শতাব্দী ধরে শুধু ইরান নয়, গোটা বিশ্বের চলচ্চিত্রকারদেরই অনুপ্রেরণা জুগিয়ে যাবে। ব্যক্তিগত জীবনে কবি ও শিল্পী কিয়ারোস্তামির প্রতিটি কাজই কবিতার মতো ছন্দবদ্ধ, বিমূর্ত শিল্পের মতো বহুমুখী। এ কারণে রুপালি পর্দায় তার প্রতিটি কাজেই বিভিন্ন চলচ্চিত্র সমালোচকের কাছ থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার দেখা পেয়েছে। কিন্তু কালের অবগাহনে তার সৃষ্টিগুলোই টিকে গেছে। তার এ রকমই একটা অনন্যসাধারণ সৃষ্টি ১৯৯৭ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবে স্বর্ণপাম বিজয়ী  ‘টেস্ট অফ চেরি’।

ঘণ্টাব্যাপী টেস্ট অফ চেরি ছবির মূল কাহিনী একদমই সোজাসাপ্টা আপাতদৃষ্টিতে। একজন তার গাড়ি নিয়ে তেহরানের রাস্তায় চক্কর দিচ্ছে। সে একটা কাজ করাবে। এ জন্য লোক খুঁজছে। কিন্তু কাজটির কথা সরাসরি বলতেও পারছে না। রাস্তার মানুষকে ডেকে বলছে অনেক টাকার কাজ। তবে কেউ তেমন একটা আগ্রহ দেখাচ্ছে না আবার কেউ সরাসরি গালাগালিও করছে। কাজটা কী? বদি আত্মহত্যা করতে চায়। সে ঘুমের ওষুধ খাবেন রাতে। তার কবর খোঁড়াই আছে। সেখানে রাতেই ওষুধ খেয়ে শুয়ে থাকবে সে। কাজটি হলো সকালে কবরের সামনে গিয়ে বদির নাম ধরে ডাকতে হবে। সে যদি সাড়া দেয় তাহলে ভালো। আর সাড়া না দিলে কবরে মাটি দিয়ে চলে আসতে হবে। খুবই সহজ কাজ! এ কাজের জন্য সে প্রথম পাকড়াও করে এক কিশোর বয়সী আর্মির ক্যাডেটকে। তারপর এক যুবক বয়সী ইসলামি স্কলারকে। সবশেষে এক বৃদ্ধ ট্যাক্সি ডার্মিস্টকে। কাজের কথা শুনে প্রত্যেকের রি-অ্যাকশন এবং তাদের চিন্তাভাবনা নিয়েই এ ছবির কাহিনী।

টেস্ট অফ চেরি চলচ্চিত্রটির সংলাপ অনেক ক্ষেত্রেই বেশ খাপছাড়া। যেন আনাড়ি কোনো পরিচালক আনাড়ি অভিনেতাদের দিয়ে কোনোমতে কাজটি সেরেছেন। কিন্তু কিয়ারোস্তামি এখানে বদির মনস্তত্ত্ব ও তার আজব ওই অনুরোধের পর ভিন্ন বয়সী তিন আগন্তুকের প্রতিক্রিয়া নিয়ে কাজ করেছেন বলেই এমনভাবে ব্যাপারটি চিত্রায়িত করেছেন। বদির মনস্তত্ত্ব¡ বুঝতে খেয়াল রাখতে হবে কিয়ারোস্তামির ক্যামেরার কাজের দিকে। প্রথম আগন্তুককে গাড়িতে ওঠানোর আগ পর্যন্ত ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল ছিল বদির চোখ থেকে। প্রথমজনের সঙ্গে কথাবার্তার সময় ক্যামেরা ছিল ড্রাইভিং সিটের আশপাশে। দ্বিতীয়জনের সময় গাড়ির বাইরে এবং সর্বশেষ জনের সঙ্গে কথোপকথনের সময় ক্যামেরা ছিল এরিয়াল শটে। আত্মহত্যার পরিকল্পনা মাথায় আসা মাত্রই কেউ আত্মকেন্দ্রিক চিন্তা করতে থাকে। এরপর বিভিন্ন অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কথাবার্তা বলার পর সে আসলে আরেকটু দূর থেকে থার্ড আই পারস্পেক্টিভে নিজেকে এবং নিজের জীবন যাচাই করা শুরু করে। এ ব্যাপারটিই সুচারু শিল্পীর মতো করেই পরিচালক সেলুলয়েডে ফুটিয়ে তুলেছেন। আবহ সঙ্গীতের বালাই নেই বলে শুরুর দিকে চলচ্চিত্রটি সবার কাছে বদির ইতস্তত রাস্তায় ঘোরাঘুরির মতোই উদ্দেশ্যহীন মনে হতে পারে। অজানা মানুষের সঙ্গে কথাবার্তা যতোই এগোতে থাকে, ক্যামেরার কাজ ও সংলাপ ততোই স্থিতিশীলতার দিকে এগোয়। বদি চরিত্রে রূপদানকারী হুমায়ুন এরশাদি চমৎকারভাবে পুরো ব্যাপারটি শুধু কণ্ঠস্বর ও বাচনভঙ্গির পরিবর্তনের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন যাতে করে ফার্সি জানা না থাকলেও দর্শক তার মনোজগৎ পরিবর্তনের পয়েন্টগুলো সহজেই ধরতে পারে।

দর্শক হিসেবে সবার জানতে ইচ্ছা করবে বদির সম্পর্কে। কেন সে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিল? তার জীবনে কী হয়েছে? কীভাবে সে শহরের বাইরে কারো সাহায্য ছাড়া কবর খুঁড়ে ফেললো? এসব প্রশ্নের উত্তর দেয়ার চেষ্টা কিয়ারোস্তামি করেননি।

 

ধীরগতির ওই চলচ্চিত্র নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে, আছে অনেক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ। সাধারণ চলচ্চিত্রের দর্শক হিসেবে আমার মতামতটুকু সবার কাছে পৌঁছে দিলাম। কবিসত্তার কারণে কখনোই কিয়ারোস্তামির ছবির আসল ব্যাখ্যা প্রকাশ করেননি। দর্শকের কাছে যা ভালো মনে হবে সেটিই চলচ্চিত্রের আসল ব্যাখ্যাÑ এমনটিই তার দর্শন।

Page 2 of 2

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…