বাসা সাজবে গৃহ উদ্ভিদে

 

 

দক্ষিণ দুয়ারি যে ঘরটায় থাকি এর বাসিন্দা রয়েছে তিনটি। এগুলোর মধ্যে মানিপ্লান্টের চারাটিই সবচেয়ে সুস্থ্য ও সজীব। এর ধারেকাছেও আমি বা আমার মা নেই। ওইটুকু একটা গাছ আর সবুজ-হলুদ পাতা কয়টায় প্রাণের কী অসম্ভব প্রকাশ! ঘরটায় বিশেষভাবে ঝোলানো ওই গাছটি জীবনের অনিন্দ্যসুন্দর প্রতীক হয়ে আছে। আপনিও ইচ্ছা করলে বারান্দা, ঘরের কোণ, জানালার তাক, বসার ঘর, এমনকি রান্নাঘরেও গৃহ উদ্ভিদ বা ইনডোর প্লান্ট রাখতে পারেন। সামান্য যত্ন ও ভালোবাসায় গৃহে আসবে সবুজের এমন এক আবহ যা আপনার জীবনটি সাজাবে নতুন নান্দনিকতায়। এ ছাড়া সবুজ প্রাণ ফ্ল্যাট বা বাসস্থান সুন্দর করে সাজাতে পারলে প্রকাশ ঘটবে আপনার সুরুচির।

গৃহ সবুজায়ন কীভাবে করবেন
গৃহ সবুজায়নের জন্য প্রথমেই চাই ইচ্ছা এবং তা বাস্তবায়নের আগ্রহ। খুব বেশি খরচের বিষয় নয় এটি। এ বিষয়ে ইতিবাচক হলে আপনার বাসস্থানে যে জায়গাগুলো গাছ রাখার উপযোগী তা প্রথমেই নির্বাচন করতে হবে। কারণ নগর জীবনে জায়গার বড়ই অভাব। নির্বাচিত জায়গার জন্য বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য নার্সারি থেকে আপনার পছন্দ এবং বাজেট অনুযায়ী গাছ নির্বাচন করবেন। একটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, ঘরে বেশি গাছ রেখে দিলেই তা দেখতে ভাল হবে না। এক্ষেত্রে গাছ রাখার পাত্র বা টবও গুরুত্বপূর্ণ। এখন বাজারে মাটি, চিনামাটি, লোহা, পিতলসহ সুন্দর সুন্দর টব পাওয়া যায়। তা আপনি ইচ্ছা অনুসারে ব্যবহার করতে পারেন।

গাছ নির্বাচন
আপনার নির্ধারিত জায়গাগুলোয় কতটা সময় রোদ, দিনের আলো, ছায়া, বাতাস ও অন্ধকার থাকে এর ওপর গৃহ উদ্ভিদ নির্বাচন নির্ভর করবেন। ঘরের আলো বা অল্প রোদ কিংবা কৃত্রিম আলোয় ভালো থাকে- এমন অনেক গাছ এখন বাজারে কিনতে পাওয়া যায়। নানান প্রজাতির ক্যাকটাস, পাতাবাহার, এমনকি ফুল হয়- এমন ইনডোর প্লান্টও হয়। এসবের ভেতর থেকে আপনার পছন্দের গাছগুলো বেছে নিতে পারেন। তবে শুরুতেই খুব দামি বা বেশি বড় গাছ না কেনাই ভাল। এর চেয়ে ছোট গাছগুলো কিনে এনে যত্ন ও ভালোবাসায় বড় করলেই আপনার ভাল লাগবে। প্রথমে মানিপ্লান্ট, স্পাইডার প্লান্ট ও কিছু ক্যাকটাস কেনাই ভালো। 

 

যেভাবে যত্ন নেবেন
গৃহ উদ্ভিদ বা ইনডোর প্লান্টের জন্য সারাদিন সরাসরি রোদের প্রয়োজন নেই। সামান্য রোদ আসে এবং দিনের কিছু সময় আলো-বাতাস থাকে- এমন জায়গাতেই গৃহ উদ্ভিদ ভালো হয়। প্রতিদিন পানি দেয়ার দরকার নেই। একদিন পর পর গাছের গোড়ায় অল্প করে পানি ও দু’তিনদিন পর পর পাতা স্প্রে করে দিলেই গাছ ভালো থাকবে। যখন শিকড় টবের পানি নিষ্কাশনের পথে চলে আসবে তখন টব বদলে দিতে হবে। টব পরিবর্তনের সময় সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে যাতে শিকড়ের ক্ষতি না হয়।

খুব বেশি বড় হলে ভাল লাগে না। ধারালো কাঁচি দিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী ডালপালা ছেঁটে রাখবেন। এয়ার কুলার, ওয়াশিং মেশিন, রেফ্রিজারেটরের মতো বড় বড় বৈদ্যুতিক যন্ত্রের কাছে গাছ রাখবেন না। এসব যন্ত্র থেকে বের হওয়া সার্বক্ষণিক তাপ গাছের জন্য ক্ষতিকর। শোবারঘরের গাছ রাতে বাইরে রাখবেন অথবা জানালা খোলা রাখবেন। আমরা জানি, গাছ রাতে কার্বন ডাই-অক্সাইড ছাড়ে। শিশুদের নাগালের বাইরে গাছ রাখবেন যাতে নষ্ট করতে না পারে। প্রায় প্রতিটি গাছের জাত, আকার, ধরন ইত্যাদি কারণে এগুলোর যত্নে কিছুটা পার্থক্য থাকে। তা গাছ সংগ্রহের সময় বিক্রেতার কাছ থেকে জেনে নিতে হবে।

সাকলেন্টস
সাধারণত মোটা ও পুরু পাতার উদ্ভিদটিকে সাকলেন্টস (Succlents) বলে। এগুলোর পাতা সাধারণের চেয়ে বেশি তরল ধারণ করে। যেমন- ঘৃতকুমারী বা অ্যালোভেরা এক ধরনের সাকলেন্ট প্লান্ট। বর্তমানে গৃহসজ্জায় এর রয়েছে শৈল্পিক ভূমিকা। আপনার খাবার বা পড়ার টেবিলে এ রকম দু’একটা চারাগাছ পুরো দৃশ্যপটেই এনে দেবে স্নিগ্ধতা। এখন শহরের বড় বড় নার্সারিতে নানান সাকলেন্টস পাওয়া যায়, বিশেষ করে ঢাকার মিরপুরে।

গৃহ উদ্ভিদ আপনার পরিবারের সদস্য। বাসার অন্যদেরও এগুলোর যত্ন নিতে উৎসাহিত করবেন, বিশেষ করে শিশু-কিশোরকে। ফলে তারা দায়িত্ব নেয়া যেমন শিখবে তেমনি এগুলো নষ্টও করবে না। সবুজের সঙ্গে বন্ধুত্ব তাদের সহনশীলতা বাড়াবে। আপনার আবাস সবুজ, সুন্দর ও নতুনে প্রাণবন্ত হয়ে থাক।

 

______________________

লেখা : কাজী সোহেল
ছবি : শোভন আচার্য্য অম্বু
কৃতজ্ঞতা : মারিয়ান ফয়সাল

সবুজ ব্যালকনি

কাজী সোহেল

 



নিজে ও সন্তানের জন্য সবুজকে ভালোবাসুন। জাগিয়ে তুলুন সবুজের জন্য আপনার গভীরে লুকিয়ে থাকা প্রেম। এই শীতে উঠানের কোণ, ব্যালকনি, বারান্দা ও টবে জেগে উঠতে পারে জীবন। আপনিই তা পারেন। সামান্য শ্রমে সেখানে লাউ, শিম, ধনিয়াপাতা, ধুন্দুল, ফুলকপি, বাঁধাকপি ফলতে পারে। ফুটতে পারে সবুজে বর্ণিল হাসি। আপনার একনিষ্ঠ যতœ প্রকৃতি ফিরিয়ে দেবে বহুগুণ। আপনার শিশু সন্তানটিকেও সঙ্গে নিয়ে নিন এ কাজে। এতে  সে দায়িত্ব নিতে শিখবে এবং বুঝবে ভালোবাসার পরিচর্যা করতে হয়। প্রকৃতির সঙ্গে তার গড়ে উঠবে বন্ধুত্ব। তা সত্যিকারের মানুষ হয়ে ওঠার অন্যতম অনুষঙ্গ।
বাসস্থানে আপনার সবজি চাষ শুধু যে বিশুদ্ধ ও সতেজ সবজির জোগানই দেবে তা নয়, বরং আপনার উপস্থাপন এবং পরিচর্যায় এটি রূপে নান্দনিকতায় বাহারি গাছের প্রবল প্রতিপক্ষ হয়ে উঠতে পারে।
বর্তমানে বাড়ির ছাদে বাগান করা বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। অধিকাংশ বাড়ির ছাদের দিকে তাকালেই চোখে পড়ে সবুজের উঁকি-ঝুঁকি। অবশ্য বিভিন্ন ছাদে যেসব বাগান দেখা যায়, এর অধিকাংশই অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠে। পরিকল্পিতভাবে উদ্যোগ নেয়া হলে বাড়ির ছাদ বা উঠানের কোণে শাকসবজিও ফলানো সম্ভব। যে সবজি লাগানো হবে, এর ধরন বুঝে মাটি, সেচ ও সার প্রয়োগ নিশ্চিত করলে সুফল পাওয়া যায়। এছাড়া ছাদে বেশি রোদ বা গরম সহ্য করতে পারেÑ এমন সবজি লাগানোই উত্তম। ছাদ বা টবে বাগান করতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে নিয়মিত পানি সেচ দেয়া। গাছগুলো যেহেতু সাধারণ মাটির সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকে সেহেতু নিয়মিত পানি সেচ না দিলে গাছগুলো যে কোনো সময় মারা যেতে পারে। সাধারণত দোআঁশ ও বেলে-দোআঁশ মাটিতেই সবজি ভালো জন্মে।


ইচ্ছা করলেই নগরবাসী সবজি লাগিয়ে পেতে পারেন বিষমুক্ত তাজা সবজি। এটি শৌখিন কৃষকের পরিবারের দেহ-মনই কেবল চাঙ্গা করবে না। এতে চাপ কমাবে দেশের কৃষিভূমির ওপরও।
ছাদের জন্য ইট বা কাঠের বেড করে চারা লাগানো সম্ভব। টব, ড্রাম, পট, কনটেইনারÑ এসব ব্যবহার করা যায় রোদ পড়ে এমন যে কোনো জায়গায়। জলছাদের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। জলছাদ না থাকলে আলকাতরার প্রলেপ দিয়ে মোটা পলিথিন বিছিয়ে এর ওপর মাটি দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, মাটির পুরুত্ব হতে হবে। অন্তত দুই ফিট পুরু মাটির স্তর থাকতে হবে। শাকসবজির বীজতলার জন্য মাটি হতে হবে ঝুরঝুরে, হালকা ও পানি ধরে রাখার ক্ষমতা সম্পন্ন। চালনি দিয়ে চেলে মাটি জীবাণুমুক্ত করে নিতে হবে। দুই ভাগ বেলে-দোআঁশ মাটির সঙ্গে দুই ভাগ জৈবসার মিলিয়ে নিয়ে বীজতলার মাটি তৈরি করতে হয়। মাটি যদি এটেল হয় তাহলে বীজের অঙ্কুরোদগমের সুবিধার জন্য এক ভাগ বালি মিশিয়ে হালকা করে নিতে হবে। মাটি শোধনের পর জীবাণুমুক্ত করে চারাটিরে রোগবালাই থেকে রক্ষা করা সহজ। সাধারণত এক লিটার ফরমালডিহাইডের ৪০ ভাগ ৪০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ওই দ্রবণের ২৫ লিটার প্রতি ঘন মিটার মাটিতে কয়েক কিস্তিতে ভিজিয়ে দিতে হয়। এরপর দু’দিন চটের কাপড় দিয়ে মাটি ঢেকে রাখার পর চট উঠিয়ে দিলে মাটি জীবাণুমুক্ত হবে। তবে যতো বেশি দিন থাকবে ততো ভালো। অতিরিক্ত পানি, সার পাওয়ার সুষ্ঠু পথ রাখতে হবে। পরে প্রয়োজনীয় পরিমাণ রাসায়নিক সার ব্যবহার করতে হবে। ফ্রেম তৈরির ক্ষেত্রে কাঠ, লোহা, স্টিল, মোটা রবার ব্যবহার করা যায়। তবে যা কিছু দিয়ে বা যেভাবেই বেড তৈরি হোক না কেন, ৩-৪ বছর পর পুরো বেড ভেঙে নতুন করে তৈরি করতে হবে। এতে রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়। ড্রাম, বালতি, টব, কনটেইনারÑ এসবের যে কোনো একটি বা দুটি নির্বাচন করার পর পাত্রের তলায় কিছু খোয়া (ইট-পাথরের কণা) দিতে হবে। ইটের খোয়া পানি নিষ্কাশন ও অতিরিক্ত পানি বের করে দেয়া এবং পাত্রের ভেতরে বাতাস চলাচলের সহায়তা করে। এক্ষেত্রেও অর্ধেক মাটি ও অর্ধেক পচা জৈবসারের মিশ্রণ হতে হবে। মনে রাখতে হবে, শাকসবজির খাট টব বা পাত্র হলেও চলে। সুন্দরভাবে বাঁশের চাটাই, পিলার, রড দিয়ে জাংলা বা মাচা বানিয়ে চমৎকার আবাদ করা যায়। এক্ষেত্রে ঝুলন্ত টব বা পাত্র মাঝখানে না ঝুলিয়ে পাশে ডিজাইন করে সেট করা যায় বলে জায়গার সদ্ব্যবহার হয়, দেখতেও সুন্দর লাগে। লাউ গাছের জন্য মাচা খুব জরুরি এবং তা দেখতেও ভালো। আবার জায়গা কাজেও লাগানো যায়।


ঢাকাসহ দেশের বড় বড় শহরে যারা বাস করেন, তাদের শেষ ভরসা বাড়ির ছাদ বা রোদেলা বারান্দা কিংবা এক চিলতে উঠান। টবে চাষের ক্ষেত্রে ছিদ্র থাকা জরুরি। কয়েকটি ভাঙা চাড়া ছিদ্রের মুখে দিয়ে মাটি ভরতে হবে। তিন ভাগ মাটি, দুই ভাগ গোবর সার ও এক ভাগ পাতা পচা সার দিয়ে মিশ্রণ তৈরি করে টব পূর্ণ করতে হবে। বর্ষার আগে আগে টবে চারা কলম লাগাতে হবে। ওই টবে সবজির চাষ করা যেতে পারে। ফুলকপি, লাউ, শিম, কুমড়া, পুদিনাপাতা, ধনিয়পাতাসহ প্রায় সব সবজি টবে ফলানো সম্ভব।
ছাদের ওপর টবে গাছ লাগানো অনেকেই পছন্দ করেন। টবে সার-মাটি দেয়া খুব সহজ। আজকাল অনেকেই পোড়ামাটি ও প্লাস্টিকের টব ব্যবহার করেন। আবার টবের গায়ে রঙ দিয়ে সৌন্দর্য বাড়ানো যায়। বাজারে আজকাল সুন্দর বিভিন্ন টব পাওয়া যায়। এগুলো নান্দনিকতায় অনন্য। পছন্দমতো টব কিনে সাজাতে পারেন আপনার সবুজ স্বর্গ। বড় আকারের ড্রামের মাঝামাঝি কেটে দুই টুকরো করে বড় দুটি টব তৈরি করা যায়। ছাদে এক থেকে দেড় ফিট উঁচু এবং তিন থেকে চারটি পিলারের ওপর পানির ট্যাংক বা চৌবাচ্চা আকারের রিং সøাব বসিয়ে ইটের টুকরো ও সিমেন্টের ঢালাই দিয়ে স্থায়ী চৌবাচ্চা তৈরি করা যায়। এ ধরনের চৌবাচ্চায় মাছ ও জলজ উদ্ভিদ চাষ করে ছাদের পরিবেশ সুন্দর রাখা যায় সহজেই।


টব ব্যবহারের আগে এতে ব্যবহার করা ছোবড়া বা ইটের টুকরো ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে। গরম পানিতে ধুয়ে নিতে পারলে ভালো। যে গাছের চারা লাগানো হবে তা সাধারণ পানিতে ধুয়ে নিতে হয়। ফলে রোগের সংক্রমণ অনেক কমে যায়। চারা কেনার সময় অপেক্ষাকৃত ছোট আকারের চারা সংগ্রহ করা দরকার। গাছ বড় হলে প্রয়োজনে বড় টবে সাবধানে চারা স্থানান্তর করে নেয়া যায়। তবে টব ভেঙে চারা বের করা যাবে না। মনে রাখতে হবে, চারাটি যেন কোনোভাবেই আঘাত না পায়। টবে সবজি আবাদের বিশেষ কয়েকটি সুবিধা রয়েছে। যেমনÑ প্রাকৃতিক দুর্যোগ, প্রচ- গরম, অতিরিক্ত বৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, ঝড়-ঝঞ্ঝার কবল থেকে টবের সবজি রক্ষা করা যায়। পশুপাখির উপদ্রব থেকে বাঁচানো যায় জাল দিয়ে ঘিরে রেখে। সংসারের অব্যবহৃত বিভিন্ন পাত্র ও সরঞ্জাম ব্যবহার করে খরচ কমিয়ে আনা যায়। অতিরিক্ত বীজ, সার, কীটনাশক ইত্যাদি অপব্যয় হয় না। নিজেরা তৈরি করে জৈবসার ব্যবহার করা যায় সবজিতে। ঘরের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য এগুলো সাজিয়ে রাখা যায় ঘরের বিভিন্ন জায়গায়।


সবজির খাদ্য-পুষ্টি চাহিদা মেটানোর জন্য মাটিতে দরকারি সার মেশাতে হবে। মাটি, গোবর সার, কম্পোস্ট, পচা পাতার সার মেশাতে হবে। টবের মাটির মাঝামাঝি শুকনো দূর্বা ঘাসের ওপর মাটি দিয়ে চারা লাগানো ভালো।
যতœ-সেবা যেহেতু সীমিত আকারে সীমিত জায়গায় উৎপাদন করা হয় সেহেতু অতিরিক্ত যত্ম-সেবা নিশ্চিত এবং বিভিন্ন পরিচর্যায় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। বিশেষ করে সার প্রয়োগের ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি। কেননা সার কমবেশি হলে কিংবা গাছের সঙ্গে লেগে গেলে মরে যাবে এবং পরিমাণমতো না হলে অপুষ্টিতে ভুগবে।
স্থানান্তরের সময় আলতো করে মাটিতে শুইয়ে গড়াগড়ি দিলে গাছটি টব থেকে বেরিয়ে আসবে। পরে অতিরিক্ত মূল কেটে মাটি বদলিয়ে সার প্রয়োগসহ নতুনভাবে গাছ বসাতে হবে সময়মতো। বছরে অন্তত একবার পুরনো মাটি বদলিয়ে নতুন মাটি জৈবসারসহ দিতে হবে। ইদানীং বাজারে টবের মাটি সেচ নিষ্কাশন ছাদ বা টবে সেচ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেননা মাটির আর্দ্রতার জন্য সহজেই গাছপালা নেতিয়ে যাবে। আবার অতি পানি বা পানির আর্দ্রতার জন্যও গাছ নেতিয়ে পড়ে মরে যেতে পারে। তাই অবশ্যই ছাদের বাগানে প্রতিনিয়ত সেচের ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে। ঝাঁঝরি দিয়ে সেচ দেয়া ভালো। এছাড়া প্লাস্টিকের চিকন পাইপ দিয়েও পানি সরবরাহ করা বা দেয়া যায়। এক্ষেত্রে ডেলিভারি পাইপের মাথায় চাপ দিয়ে ধরলে পানি হালকাভাবে ছিটিয়ে পড়ে। সুতরাং ইচ্ছা করলে ওই পদ্ধতিও অনুসরণ করা যায়।
অনেক সময় বিভিন্ন পাখি, পিঁপড়া, মাকড়সা ইত্যাদি শাকসবজির চারা নষ্ট করে ফেলতে পারে। এ জন্য হেপ্টোক্লোর ৪০ পরিমাণমতো দিয়ে যাবতীয় পিঁপড়া ও মাকড়সার আক্রমণ থেকে সবজি রক্ষা করা যায়। তবে পাখির হাত থেকে ফসল বাঁচাতে হলে টবের ওপর তার বা নাইলনের জাল দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, টবের মাটিতে বীজ বপনের আগে বিভিন্ন আগাছা জন্মাতে পারে। আগাছাগুলো নিড়ানি দিয়ে খুঁচিয়ে তুলে ফেলে দিতে হবে। টবে চারা জন্মালে এর গোড়ায় যেন আঘাত না লাগে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। টবগুলোয় শাকসবজি অবশ্যই আলো-বাতাস পায়Ñ এমন জায়গায় রাখা দরকার। তবে অতিরিক্ত ঝড়-বৃষ্টি ও রোদ-তাপ থেকে রক্ষা করার জন্য সাময়িকভাবে টব নিরাপদ স্থানে সরানো যেতে পারে।


সবজি সময়মতো সংগ্রহ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সবজি বেশিদিন গাছে না রেখে বেশি পোক্ত না করে কচি থাকতেই তুলে খাওয়া ভালো। এতে একদিকে যেমন নরম খাওয়া যায়, অন্যদিকে তেমনি গাছে আরও সবজি আসে। সবজি গাছ থেকে ছিঁড়ে সংগ্রহ করা যাবে না। আস্তে করে কেটে সংগ্রহ করতে হবে। তাহলে সবজি গাছের কোনো ক্ষতি হবে না।
আপনার নিজে করে দেয়া মাচার সবুজ প্রেক্ষাপটে পবিত্রতার প্রতীক দুধসাদা লাউ ফুলের অপার্থিব রূপ, ধুন্দল ফুলের ঢলে পড়া আয়েশি হলুদ সুখ, কচি ধুন্দল, এক চিলতে বেডে কিশোরী ধনিয়াপাতার কোলজুড়ে তুষার শুভ্র ফুল শিশুর দল, স্বচ্ছন্দ অহঙ্কারে বেড়ে ওঠা ফুলকপির রূপ অন্য কেঊ না জানুক, আপনি তো জানেন! দেখবেন, পরিবারের এমন সদস্য আপনার সাহায্যে এগিয়ে এসেছেনÑ যার কথা আপনি ভাবতেও পারেননি। শুরু করুন আজই। ভালো থাকুন সবুজের সঙ্গে।

 বনসাই

 

প্রাচীন চায়নিজ শব্দ ‘পেনজাই’ থেকে জাপানিজ ‘বনসাই’ শব্দের উৎপত্তি। বনসাই করতে ব্যবহৃত ট্রের মতো যে পাত্র ব্যবহার করা হয় এটিকেই সাধারণভাবে ‘বন’ বলা হয়। পাশ্চাত্যে পাত্রে বামণ আকৃতির গাছ বলতে ‘বনসাই’ বোঝায়।
বনসাইয়ের ইতিহাস বহু পুরনো। একটু আগে থেকেই শুরু করা যাক। প্রাচীন মিসরীয়রা বিভিন্ন পাত্রে গাছ বা গাছের চারা উৎপাদন করতো। ৪০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের রাজনৈতিক নথিপত্র থেকে পাথর কেটে তৈরি করা পাত্রে গাছ চাষের কথা জানা যায়। অনেক মন্দিরে তৃতীয় ফারাও রামেসেস এ ধরনের পাত্রে লাগানো জলপাই, খেজুর ও অন্যান্য গাছের বাগান দান করেছিলেন। প্রাচীন ভারতেও ওষুধ ও খাবারের জন্য পাত্রে গাছ লাগানোর প্রচলন ছিল।
২৬৫ থেকে ৪২০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী জিন সাম্রাজ্যের সময় লেখালেখিতে প্রথম ‘পেনজাই’ শব্দের উল্লেখ পাওয়া যায়। বিভিন্ন সময় চীনের বিভিন্ন জায়গা, জাপান, কোরিয়া, ভিয়েতনাম ও থাইল্যা-ে ভিন্ন আকারে এর চর্চা বিস্তার লাভ করে। চৈনিক ছং রাজবংশের সময় জাপানে পাত্রে উৎপাদিত গাছের জনপ্রিয়তা পায়। জাপানের সাংস্কৃতিক বিনির্মাণের ওই সময় তারা বেশকিছু চীন দেশীয় বৈশিষ্ট্য নিজেদের মতো করে আয়ত্ত করে নেয়। পাত্রের ক্ষুদ্র গাছটিকে ওই সময় ‘গামলার গাছ’ (হাচি নোকি) বলা হতো। জাপানিজ জেন পুরোহিত কোকান শিরেন-এর লেখা ‘ক্ষুদ্র আকৃতি বৃক্ষরাজির বাগান নিয়ে লেখা গদ্য’ বইয়ে ‘বনছেকি’ বা ‘বনসাই’-এর নান্দনিক বৈশিষ্ট্য ও বাগান পরিকল্পনার আলোচনা পাওয়া যায়। প্রথম দিকে জাপানিজরা পাত্রে জন্মানো বামণ আকৃতি গাছ ঘরবাড়ি ও এর আশপাশ সাজাতে ব্যবহার করতো। টোকিওয়ার সময় বিস্তীর্ণ বাগান তৈরি বিশেষ গুরুত্ব পায়। ধনীদের অবসরে বিনোদনের মাধ্যম হয়ে ওঠে আজালিয়া ও ম্যাপলের মতো গাছ পালন করা। বামণ বৃক্ষ পাত্রে পালন করাও জনপ্রিয় ছিল। মোটামুটি ১৮০০ সালের দিকে জাপানিজরা তুলনামূলকভাবে কম গভীর পাত্রে ক্ষুদ্র গাছ পরিচর্যা করার সঙ্গে সঙ্গে চৈনিক ‘পেনজাই’ শব্দের উচ্চারণ পরিবর্তন করে ফেলে। টোকিওর রাজসিক প্রাসাদে থাকা অনেক পুরনো জীবিত একটি বনসাইকে জাপানের জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।


বনসাই এক অনন্য শিল্পকর্ম। তবে এ শিল্প সম্পূর্ণ জীবন্ত। অন্য প্রাণহীন শিল্পের সঙ্গে এটুকুই শুধু প্রভেদ। শুধু প্রবন্ধ কিংবা বই পড়ে বনসাই তৈরি করা দুরূহ। এর জন্য প্রয়োজন ধৈর্য, নিষ্ঠা ও সহনশীলতাসহ চর্চা। যেসব গাছের বৃদ্ধি ধীরে ধীরে হয়, কা- মোটা হয়, বছরে একবার পাতা ঝরে, (সাধারণত চিরহরিত গাছ) বয়স হলে ছাল মোটা হয়, ঝুরি নামে এমন গাছ, শিকড় কেটে দিলে ঝুরি গাছের শিকড়ের কাজ করে, অনেক দিন সতেজ থাকে, গাছের বয়স অনুযায়ী বেঁচে থাকে (যেমন- পাকুড় বট, ডুমুর, জামরুল, হরীতকী, জাম, আম, বকুল, শিমুল, তেঁতুল, বাবলা, পলাশ, হিজল, ছাতিম, নিম, তমাল, কামিনী, ফাইকাস, আদেনিয়াম, বোগেনভিলিয়া বা বাগানবিলাস) ইত্যাদি বনসাই তৈরি করার উপযুক্ত। তবে বট গাছ সবচেয়ে উপযোগী। এর সুবিধা হলো, টবে এর ঝুরি নামে। টবের ছোট্ট গাছে ঝুরি নামলে চমৎকার লাগে। একই সঙ্গে গাছটির প্রাচীনত্ব তথা বয়সের সাক্ষ্যও ফুটে ওঠে।
বনসাই তৈরি করার প্রাথমিক কাজ এর চারা সংগ্রহ। বীজ থেকে নার্সারিতে এর চারা উৎপাদন করা হয় না। এর জন্য প্রয়োজন অনুসন্ধানী মন। প্রকৃতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে টিকে থাকা কষ্টসহিষ্ণু গাছ যেগুলোর যথেষ্ট বয়স হয়েছে অথচ তেমন বাড়েনি এমন গাছই বনসাই করার জন্য উপযুক্ত। এসব গাছ পোড়া অট্টালিকা, ভাঙা প্রাচীর, পাথুরে জমি অথবা পাহাড়ি এলাকায় পাহাড়ের খাদে জন্মে থাকে। এগুলো ঠিকমতো খাদ্য আহরণ করতে না পারায় কিছুটা বামণত্ব লাভ করে।


বনসাইয়ের টব নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রথম অবস্থায় সহজে পাওয়া যায় এবং দামেও সস্তা এমন টবই ভালো। টবের উচ্চতা ১০ সেন্টিমিটার এবং মুখের ঘের হবে ১৫ সেন্টিমিটার। তবে আকৃতি পরিবর্তনশীল হতে পারে। উল্লিখিত আকারের টব বাজারে প্রচুর পাওয়া যায়। এটি আদর্শ মাপের। মাটির টব ব্যবহারের আগে তা ২৫-৩০ মিনিট ভিজিয়ে রাখতে হবে। তলদেশে প্রতি ১ দশমিক শূন্য ৫ সেন্টিমিটার ব্যাসের জন্য একটি করে ছিদ্র থাকা চাই। ছিদ্রটি থেকে বড় মাপের একটি ছোট তারজালি কেটে তলদেশের ছিদ্রটি ঢেকে দিতে হয়। সাধারণত যেসব গাছের বনসাই করা হয় সেগুলো প্রায় প্রতিটিরই প্রধান মূল থাকে। তারজালি থাকায় তা কখনো ভেদ করে টবের বাইরে যায় না। ফলে গাছের শিকড় ছাঁটাই করার সময় প্রধান মূল কাটার আশঙ্কা থাকে না। এছাড়া টবে শিকড়ের ভালো আকৃতি আসে।
প্রথমে বিভিন্ন জাতের বনসাইয়ের জন্য আলাদাভাবে মাটি তৈরি করতে হয়। মাটি তৈরির ক্ষেত্রে জৈবসারের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি থাকে। সবক্ষেত্রেই দোআঁশ বা পলি মাটি ব্যবহার করা হয়। বনসাই টবের জন্য মাটি তৈরি করা খুব সহজ। প্রধাণত দোআঁশ মাটির সঙ্গে জৈবসার মিশিয়ে বনসাইয়ের মাটি তৈরি করা হয়।

একটি সাধারণ ধারণা আছে, বনসাই বিশেষ এক ধরনের গাছ। এ কথা সত্য, বিশেষ কয়েক ধরনের গাছ সহজেই বনসাই করা যায়। তবে এর মানে এই নয় যে, বনসাই আলাদা কোনো প্রজাতির গাছ। ছোট পাতা-ফুল-ফল হয় এমন যে কোনো বৃক্ষ বনসাইয়ে রূপ দেয়া যায়। যেমন- বট বা পাকুড় গাছের পাতা আকারে খুব বড় নয়, ফল হয়ও ছোট। আবার এ গাছ দীর্ঘায়ু এবং অনেক বড়ও হয়। তাই সহজে এটিকে বনসাই করা যায়। কিন্তু রাবার গাছের পাতার আকৃতি অত্যধিক বড় হওয়ায় এটিকে বনসাই করা যায় না। মনে রাখতে হবে, ছোট্ট একটি টবে বড় একটি গাছের ক্ষুদ্র সংস্করণই বনসাই। এও মনে রাখা দরকার- টব ও গাছের সুসমন্বয় না হলে সার্থক বনসাই সৃষ্টি হয় না। বনসাই চর্চা বৃদ্ধি পাওয়ায় এখন নতুন নতুন স্থানীয় গাছ বনসাই হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে। আমাদের দেশে বট, আমলকী, তেঁতুল, করমচা সার্থক বনসাই হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে এগুলোকে বামণ করার বিভিন্ন কৌশল আবিষ্কার হয়েছে। কখনো গাছের সঙ্গে এর ডাল-পাতাও মানানসই করতে ছোট আকৃতি দেয়ার চেষ্টা হয়েছে।
বনসাই এক জীবন্ত ভাস্কর্য। ধ্রুপদী জাপানিজ বনসাইয়ের নির্দিষ্ট কিছু আকৃতি রয়েছে। কিন্তু কোনো শিল্পকলাই যেমন নিয়মের কঠোর ঘেরাটোপে বন্দি নয় তেমনি বনসাইও ধরাবাঁধা ছাদে বন্দি নয়। বহু বনসাই আছে যা নিয়ম অমান্য করেই অপরূপ হয়ে উঠেছে। যে বনসাই দেখতে ভালো লাগে, মনে আনন্দ দেয় সেটিকেই সার্থক বনসাই বলা যায়।

 

- লেখা ও ছবি: শোভন আচার্য্য অম্বু

 

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

Twitter feed

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…