বনসাই

 বনসাই

 

প্রাচীন চায়নিজ শব্দ ‘পেনজাই’ থেকে জাপানিজ ‘বনসাই’ শব্দের উৎপত্তি। বনসাই করতে ব্যবহৃত ট্রের মতো যে পাত্র ব্যবহার করা হয় এটিকেই সাধারণভাবে ‘বন’ বলা হয়। পাশ্চাত্যে পাত্রে বামণ আকৃতির গাছ বলতে ‘বনসাই’ বোঝায়।
বনসাইয়ের ইতিহাস বহু পুরনো। একটু আগে থেকেই শুরু করা যাক। প্রাচীন মিসরীয়রা বিভিন্ন পাত্রে গাছ বা গাছের চারা উৎপাদন করতো। ৪০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের রাজনৈতিক নথিপত্র থেকে পাথর কেটে তৈরি করা পাত্রে গাছ চাষের কথা জানা যায়। অনেক মন্দিরে তৃতীয় ফারাও রামেসেস এ ধরনের পাত্রে লাগানো জলপাই, খেজুর ও অন্যান্য গাছের বাগান দান করেছিলেন। প্রাচীন ভারতেও ওষুধ ও খাবারের জন্য পাত্রে গাছ লাগানোর প্রচলন ছিল।
২৬৫ থেকে ৪২০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী জিন সাম্রাজ্যের সময় লেখালেখিতে প্রথম ‘পেনজাই’ শব্দের উল্লেখ পাওয়া যায়। বিভিন্ন সময় চীনের বিভিন্ন জায়গা, জাপান, কোরিয়া, ভিয়েতনাম ও থাইল্যা-ে ভিন্ন আকারে এর চর্চা বিস্তার লাভ করে। চৈনিক ছং রাজবংশের সময় জাপানে পাত্রে উৎপাদিত গাছের জনপ্রিয়তা পায়। জাপানের সাংস্কৃতিক বিনির্মাণের ওই সময় তারা বেশকিছু চীন দেশীয় বৈশিষ্ট্য নিজেদের মতো করে আয়ত্ত করে নেয়। পাত্রের ক্ষুদ্র গাছটিকে ওই সময় ‘গামলার গাছ’ (হাচি নোকি) বলা হতো। জাপানিজ জেন পুরোহিত কোকান শিরেন-এর লেখা ‘ক্ষুদ্র আকৃতি বৃক্ষরাজির বাগান নিয়ে লেখা গদ্য’ বইয়ে ‘বনছেকি’ বা ‘বনসাই’-এর নান্দনিক বৈশিষ্ট্য ও বাগান পরিকল্পনার আলোচনা পাওয়া যায়। প্রথম দিকে জাপানিজরা পাত্রে জন্মানো বামণ আকৃতি গাছ ঘরবাড়ি ও এর আশপাশ সাজাতে ব্যবহার করতো। টোকিওয়ার সময় বিস্তীর্ণ বাগান তৈরি বিশেষ গুরুত্ব পায়। ধনীদের অবসরে বিনোদনের মাধ্যম হয়ে ওঠে আজালিয়া ও ম্যাপলের মতো গাছ পালন করা। বামণ বৃক্ষ পাত্রে পালন করাও জনপ্রিয় ছিল। মোটামুটি ১৮০০ সালের দিকে জাপানিজরা তুলনামূলকভাবে কম গভীর পাত্রে ক্ষুদ্র গাছ পরিচর্যা করার সঙ্গে সঙ্গে চৈনিক ‘পেনজাই’ শব্দের উচ্চারণ পরিবর্তন করে ফেলে। টোকিওর রাজসিক প্রাসাদে থাকা অনেক পুরনো জীবিত একটি বনসাইকে জাপানের জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।


বনসাই এক অনন্য শিল্পকর্ম। তবে এ শিল্প সম্পূর্ণ জীবন্ত। অন্য প্রাণহীন শিল্পের সঙ্গে এটুকুই শুধু প্রভেদ। শুধু প্রবন্ধ কিংবা বই পড়ে বনসাই তৈরি করা দুরূহ। এর জন্য প্রয়োজন ধৈর্য, নিষ্ঠা ও সহনশীলতাসহ চর্চা। যেসব গাছের বৃদ্ধি ধীরে ধীরে হয়, কা- মোটা হয়, বছরে একবার পাতা ঝরে, (সাধারণত চিরহরিত গাছ) বয়স হলে ছাল মোটা হয়, ঝুরি নামে এমন গাছ, শিকড় কেটে দিলে ঝুরি গাছের শিকড়ের কাজ করে, অনেক দিন সতেজ থাকে, গাছের বয়স অনুযায়ী বেঁচে থাকে (যেমন- পাকুড় বট, ডুমুর, জামরুল, হরীতকী, জাম, আম, বকুল, শিমুল, তেঁতুল, বাবলা, পলাশ, হিজল, ছাতিম, নিম, তমাল, কামিনী, ফাইকাস, আদেনিয়াম, বোগেনভিলিয়া বা বাগানবিলাস) ইত্যাদি বনসাই তৈরি করার উপযুক্ত। তবে বট গাছ সবচেয়ে উপযোগী। এর সুবিধা হলো, টবে এর ঝুরি নামে। টবের ছোট্ট গাছে ঝুরি নামলে চমৎকার লাগে। একই সঙ্গে গাছটির প্রাচীনত্ব তথা বয়সের সাক্ষ্যও ফুটে ওঠে।
বনসাই তৈরি করার প্রাথমিক কাজ এর চারা সংগ্রহ। বীজ থেকে নার্সারিতে এর চারা উৎপাদন করা হয় না। এর জন্য প্রয়োজন অনুসন্ধানী মন। প্রকৃতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে টিকে থাকা কষ্টসহিষ্ণু গাছ যেগুলোর যথেষ্ট বয়স হয়েছে অথচ তেমন বাড়েনি এমন গাছই বনসাই করার জন্য উপযুক্ত। এসব গাছ পোড়া অট্টালিকা, ভাঙা প্রাচীর, পাথুরে জমি অথবা পাহাড়ি এলাকায় পাহাড়ের খাদে জন্মে থাকে। এগুলো ঠিকমতো খাদ্য আহরণ করতে না পারায় কিছুটা বামণত্ব লাভ করে।


বনসাইয়ের টব নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রথম অবস্থায় সহজে পাওয়া যায় এবং দামেও সস্তা এমন টবই ভালো। টবের উচ্চতা ১০ সেন্টিমিটার এবং মুখের ঘের হবে ১৫ সেন্টিমিটার। তবে আকৃতি পরিবর্তনশীল হতে পারে। উল্লিখিত আকারের টব বাজারে প্রচুর পাওয়া যায়। এটি আদর্শ মাপের। মাটির টব ব্যবহারের আগে তা ২৫-৩০ মিনিট ভিজিয়ে রাখতে হবে। তলদেশে প্রতি ১ দশমিক শূন্য ৫ সেন্টিমিটার ব্যাসের জন্য একটি করে ছিদ্র থাকা চাই। ছিদ্রটি থেকে বড় মাপের একটি ছোট তারজালি কেটে তলদেশের ছিদ্রটি ঢেকে দিতে হয়। সাধারণত যেসব গাছের বনসাই করা হয় সেগুলো প্রায় প্রতিটিরই প্রধান মূল থাকে। তারজালি থাকায় তা কখনো ভেদ করে টবের বাইরে যায় না। ফলে গাছের শিকড় ছাঁটাই করার সময় প্রধান মূল কাটার আশঙ্কা থাকে না। এছাড়া টবে শিকড়ের ভালো আকৃতি আসে।
প্রথমে বিভিন্ন জাতের বনসাইয়ের জন্য আলাদাভাবে মাটি তৈরি করতে হয়। মাটি তৈরির ক্ষেত্রে জৈবসারের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি থাকে। সবক্ষেত্রেই দোআঁশ বা পলি মাটি ব্যবহার করা হয়। বনসাই টবের জন্য মাটি তৈরি করা খুব সহজ। প্রধাণত দোআঁশ মাটির সঙ্গে জৈবসার মিশিয়ে বনসাইয়ের মাটি তৈরি করা হয়।

একটি সাধারণ ধারণা আছে, বনসাই বিশেষ এক ধরনের গাছ। এ কথা সত্য, বিশেষ কয়েক ধরনের গাছ সহজেই বনসাই করা যায়। তবে এর মানে এই নয় যে, বনসাই আলাদা কোনো প্রজাতির গাছ। ছোট পাতা-ফুল-ফল হয় এমন যে কোনো বৃক্ষ বনসাইয়ে রূপ দেয়া যায়। যেমন- বট বা পাকুড় গাছের পাতা আকারে খুব বড় নয়, ফল হয়ও ছোট। আবার এ গাছ দীর্ঘায়ু এবং অনেক বড়ও হয়। তাই সহজে এটিকে বনসাই করা যায়। কিন্তু রাবার গাছের পাতার আকৃতি অত্যধিক বড় হওয়ায় এটিকে বনসাই করা যায় না। মনে রাখতে হবে, ছোট্ট একটি টবে বড় একটি গাছের ক্ষুদ্র সংস্করণই বনসাই। এও মনে রাখা দরকার- টব ও গাছের সুসমন্বয় না হলে সার্থক বনসাই সৃষ্টি হয় না। বনসাই চর্চা বৃদ্ধি পাওয়ায় এখন নতুন নতুন স্থানীয় গাছ বনসাই হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে। আমাদের দেশে বট, আমলকী, তেঁতুল, করমচা সার্থক বনসাই হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে এগুলোকে বামণ করার বিভিন্ন কৌশল আবিষ্কার হয়েছে। কখনো গাছের সঙ্গে এর ডাল-পাতাও মানানসই করতে ছোট আকৃতি দেয়ার চেষ্টা হয়েছে।
বনসাই এক জীবন্ত ভাস্কর্য। ধ্রুপদী জাপানিজ বনসাইয়ের নির্দিষ্ট কিছু আকৃতি রয়েছে। কিন্তু কোনো শিল্পকলাই যেমন নিয়মের কঠোর ঘেরাটোপে বন্দি নয় তেমনি বনসাইও ধরাবাঁধা ছাদে বন্দি নয়। বহু বনসাই আছে যা নিয়ম অমান্য করেই অপরূপ হয়ে উঠেছে। যে বনসাই দেখতে ভালো লাগে, মনে আনন্দ দেয় সেটিকেই সার্থক বনসাই বলা যায়।

 

- লেখা ও ছবি: শোভন আচার্য্য অম্বু

 

Read 340 times

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…