সবুজ ব্যালকনি

সবুজ ব্যালকনি

কাজী সোহেল

 



নিজে ও সন্তানের জন্য সবুজকে ভালোবাসুন। জাগিয়ে তুলুন সবুজের জন্য আপনার গভীরে লুকিয়ে থাকা প্রেম। এই শীতে উঠানের কোণ, ব্যালকনি, বারান্দা ও টবে জেগে উঠতে পারে জীবন। আপনিই তা পারেন। সামান্য শ্রমে সেখানে লাউ, শিম, ধনিয়াপাতা, ধুন্দুল, ফুলকপি, বাঁধাকপি ফলতে পারে। ফুটতে পারে সবুজে বর্ণিল হাসি। আপনার একনিষ্ঠ যতœ প্রকৃতি ফিরিয়ে দেবে বহুগুণ। আপনার শিশু সন্তানটিকেও সঙ্গে নিয়ে নিন এ কাজে। এতে  সে দায়িত্ব নিতে শিখবে এবং বুঝবে ভালোবাসার পরিচর্যা করতে হয়। প্রকৃতির সঙ্গে তার গড়ে উঠবে বন্ধুত্ব। তা সত্যিকারের মানুষ হয়ে ওঠার অন্যতম অনুষঙ্গ।
বাসস্থানে আপনার সবজি চাষ শুধু যে বিশুদ্ধ ও সতেজ সবজির জোগানই দেবে তা নয়, বরং আপনার উপস্থাপন এবং পরিচর্যায় এটি রূপে নান্দনিকতায় বাহারি গাছের প্রবল প্রতিপক্ষ হয়ে উঠতে পারে।
বর্তমানে বাড়ির ছাদে বাগান করা বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। অধিকাংশ বাড়ির ছাদের দিকে তাকালেই চোখে পড়ে সবুজের উঁকি-ঝুঁকি। অবশ্য বিভিন্ন ছাদে যেসব বাগান দেখা যায়, এর অধিকাংশই অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠে। পরিকল্পিতভাবে উদ্যোগ নেয়া হলে বাড়ির ছাদ বা উঠানের কোণে শাকসবজিও ফলানো সম্ভব। যে সবজি লাগানো হবে, এর ধরন বুঝে মাটি, সেচ ও সার প্রয়োগ নিশ্চিত করলে সুফল পাওয়া যায়। এছাড়া ছাদে বেশি রোদ বা গরম সহ্য করতে পারেÑ এমন সবজি লাগানোই উত্তম। ছাদ বা টবে বাগান করতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে নিয়মিত পানি সেচ দেয়া। গাছগুলো যেহেতু সাধারণ মাটির সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকে সেহেতু নিয়মিত পানি সেচ না দিলে গাছগুলো যে কোনো সময় মারা যেতে পারে। সাধারণত দোআঁশ ও বেলে-দোআঁশ মাটিতেই সবজি ভালো জন্মে।


ইচ্ছা করলেই নগরবাসী সবজি লাগিয়ে পেতে পারেন বিষমুক্ত তাজা সবজি। এটি শৌখিন কৃষকের পরিবারের দেহ-মনই কেবল চাঙ্গা করবে না। এতে চাপ কমাবে দেশের কৃষিভূমির ওপরও।
ছাদের জন্য ইট বা কাঠের বেড করে চারা লাগানো সম্ভব। টব, ড্রাম, পট, কনটেইনারÑ এসব ব্যবহার করা যায় রোদ পড়ে এমন যে কোনো জায়গায়। জলছাদের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। জলছাদ না থাকলে আলকাতরার প্রলেপ দিয়ে মোটা পলিথিন বিছিয়ে এর ওপর মাটি দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, মাটির পুরুত্ব হতে হবে। অন্তত দুই ফিট পুরু মাটির স্তর থাকতে হবে। শাকসবজির বীজতলার জন্য মাটি হতে হবে ঝুরঝুরে, হালকা ও পানি ধরে রাখার ক্ষমতা সম্পন্ন। চালনি দিয়ে চেলে মাটি জীবাণুমুক্ত করে নিতে হবে। দুই ভাগ বেলে-দোআঁশ মাটির সঙ্গে দুই ভাগ জৈবসার মিলিয়ে নিয়ে বীজতলার মাটি তৈরি করতে হয়। মাটি যদি এটেল হয় তাহলে বীজের অঙ্কুরোদগমের সুবিধার জন্য এক ভাগ বালি মিশিয়ে হালকা করে নিতে হবে। মাটি শোধনের পর জীবাণুমুক্ত করে চারাটিরে রোগবালাই থেকে রক্ষা করা সহজ। সাধারণত এক লিটার ফরমালডিহাইডের ৪০ ভাগ ৪০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ওই দ্রবণের ২৫ লিটার প্রতি ঘন মিটার মাটিতে কয়েক কিস্তিতে ভিজিয়ে দিতে হয়। এরপর দু’দিন চটের কাপড় দিয়ে মাটি ঢেকে রাখার পর চট উঠিয়ে দিলে মাটি জীবাণুমুক্ত হবে। তবে যতো বেশি দিন থাকবে ততো ভালো। অতিরিক্ত পানি, সার পাওয়ার সুষ্ঠু পথ রাখতে হবে। পরে প্রয়োজনীয় পরিমাণ রাসায়নিক সার ব্যবহার করতে হবে। ফ্রেম তৈরির ক্ষেত্রে কাঠ, লোহা, স্টিল, মোটা রবার ব্যবহার করা যায়। তবে যা কিছু দিয়ে বা যেভাবেই বেড তৈরি হোক না কেন, ৩-৪ বছর পর পুরো বেড ভেঙে নতুন করে তৈরি করতে হবে। এতে রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়। ড্রাম, বালতি, টব, কনটেইনারÑ এসবের যে কোনো একটি বা দুটি নির্বাচন করার পর পাত্রের তলায় কিছু খোয়া (ইট-পাথরের কণা) দিতে হবে। ইটের খোয়া পানি নিষ্কাশন ও অতিরিক্ত পানি বের করে দেয়া এবং পাত্রের ভেতরে বাতাস চলাচলের সহায়তা করে। এক্ষেত্রেও অর্ধেক মাটি ও অর্ধেক পচা জৈবসারের মিশ্রণ হতে হবে। মনে রাখতে হবে, শাকসবজির খাট টব বা পাত্র হলেও চলে। সুন্দরভাবে বাঁশের চাটাই, পিলার, রড দিয়ে জাংলা বা মাচা বানিয়ে চমৎকার আবাদ করা যায়। এক্ষেত্রে ঝুলন্ত টব বা পাত্র মাঝখানে না ঝুলিয়ে পাশে ডিজাইন করে সেট করা যায় বলে জায়গার সদ্ব্যবহার হয়, দেখতেও সুন্দর লাগে। লাউ গাছের জন্য মাচা খুব জরুরি এবং তা দেখতেও ভালো। আবার জায়গা কাজেও লাগানো যায়।


ঢাকাসহ দেশের বড় বড় শহরে যারা বাস করেন, তাদের শেষ ভরসা বাড়ির ছাদ বা রোদেলা বারান্দা কিংবা এক চিলতে উঠান। টবে চাষের ক্ষেত্রে ছিদ্র থাকা জরুরি। কয়েকটি ভাঙা চাড়া ছিদ্রের মুখে দিয়ে মাটি ভরতে হবে। তিন ভাগ মাটি, দুই ভাগ গোবর সার ও এক ভাগ পাতা পচা সার দিয়ে মিশ্রণ তৈরি করে টব পূর্ণ করতে হবে। বর্ষার আগে আগে টবে চারা কলম লাগাতে হবে। ওই টবে সবজির চাষ করা যেতে পারে। ফুলকপি, লাউ, শিম, কুমড়া, পুদিনাপাতা, ধনিয়পাতাসহ প্রায় সব সবজি টবে ফলানো সম্ভব।
ছাদের ওপর টবে গাছ লাগানো অনেকেই পছন্দ করেন। টবে সার-মাটি দেয়া খুব সহজ। আজকাল অনেকেই পোড়ামাটি ও প্লাস্টিকের টব ব্যবহার করেন। আবার টবের গায়ে রঙ দিয়ে সৌন্দর্য বাড়ানো যায়। বাজারে আজকাল সুন্দর বিভিন্ন টব পাওয়া যায়। এগুলো নান্দনিকতায় অনন্য। পছন্দমতো টব কিনে সাজাতে পারেন আপনার সবুজ স্বর্গ। বড় আকারের ড্রামের মাঝামাঝি কেটে দুই টুকরো করে বড় দুটি টব তৈরি করা যায়। ছাদে এক থেকে দেড় ফিট উঁচু এবং তিন থেকে চারটি পিলারের ওপর পানির ট্যাংক বা চৌবাচ্চা আকারের রিং সøাব বসিয়ে ইটের টুকরো ও সিমেন্টের ঢালাই দিয়ে স্থায়ী চৌবাচ্চা তৈরি করা যায়। এ ধরনের চৌবাচ্চায় মাছ ও জলজ উদ্ভিদ চাষ করে ছাদের পরিবেশ সুন্দর রাখা যায় সহজেই।


টব ব্যবহারের আগে এতে ব্যবহার করা ছোবড়া বা ইটের টুকরো ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে। গরম পানিতে ধুয়ে নিতে পারলে ভালো। যে গাছের চারা লাগানো হবে তা সাধারণ পানিতে ধুয়ে নিতে হয়। ফলে রোগের সংক্রমণ অনেক কমে যায়। চারা কেনার সময় অপেক্ষাকৃত ছোট আকারের চারা সংগ্রহ করা দরকার। গাছ বড় হলে প্রয়োজনে বড় টবে সাবধানে চারা স্থানান্তর করে নেয়া যায়। তবে টব ভেঙে চারা বের করা যাবে না। মনে রাখতে হবে, চারাটি যেন কোনোভাবেই আঘাত না পায়। টবে সবজি আবাদের বিশেষ কয়েকটি সুবিধা রয়েছে। যেমনÑ প্রাকৃতিক দুর্যোগ, প্রচ- গরম, অতিরিক্ত বৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, ঝড়-ঝঞ্ঝার কবল থেকে টবের সবজি রক্ষা করা যায়। পশুপাখির উপদ্রব থেকে বাঁচানো যায় জাল দিয়ে ঘিরে রেখে। সংসারের অব্যবহৃত বিভিন্ন পাত্র ও সরঞ্জাম ব্যবহার করে খরচ কমিয়ে আনা যায়। অতিরিক্ত বীজ, সার, কীটনাশক ইত্যাদি অপব্যয় হয় না। নিজেরা তৈরি করে জৈবসার ব্যবহার করা যায় সবজিতে। ঘরের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য এগুলো সাজিয়ে রাখা যায় ঘরের বিভিন্ন জায়গায়।


সবজির খাদ্য-পুষ্টি চাহিদা মেটানোর জন্য মাটিতে দরকারি সার মেশাতে হবে। মাটি, গোবর সার, কম্পোস্ট, পচা পাতার সার মেশাতে হবে। টবের মাটির মাঝামাঝি শুকনো দূর্বা ঘাসের ওপর মাটি দিয়ে চারা লাগানো ভালো।
যতœ-সেবা যেহেতু সীমিত আকারে সীমিত জায়গায় উৎপাদন করা হয় সেহেতু অতিরিক্ত যত্ম-সেবা নিশ্চিত এবং বিভিন্ন পরিচর্যায় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। বিশেষ করে সার প্রয়োগের ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি। কেননা সার কমবেশি হলে কিংবা গাছের সঙ্গে লেগে গেলে মরে যাবে এবং পরিমাণমতো না হলে অপুষ্টিতে ভুগবে।
স্থানান্তরের সময় আলতো করে মাটিতে শুইয়ে গড়াগড়ি দিলে গাছটি টব থেকে বেরিয়ে আসবে। পরে অতিরিক্ত মূল কেটে মাটি বদলিয়ে সার প্রয়োগসহ নতুনভাবে গাছ বসাতে হবে সময়মতো। বছরে অন্তত একবার পুরনো মাটি বদলিয়ে নতুন মাটি জৈবসারসহ দিতে হবে। ইদানীং বাজারে টবের মাটি সেচ নিষ্কাশন ছাদ বা টবে সেচ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেননা মাটির আর্দ্রতার জন্য সহজেই গাছপালা নেতিয়ে যাবে। আবার অতি পানি বা পানির আর্দ্রতার জন্যও গাছ নেতিয়ে পড়ে মরে যেতে পারে। তাই অবশ্যই ছাদের বাগানে প্রতিনিয়ত সেচের ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে। ঝাঁঝরি দিয়ে সেচ দেয়া ভালো। এছাড়া প্লাস্টিকের চিকন পাইপ দিয়েও পানি সরবরাহ করা বা দেয়া যায়। এক্ষেত্রে ডেলিভারি পাইপের মাথায় চাপ দিয়ে ধরলে পানি হালকাভাবে ছিটিয়ে পড়ে। সুতরাং ইচ্ছা করলে ওই পদ্ধতিও অনুসরণ করা যায়।
অনেক সময় বিভিন্ন পাখি, পিঁপড়া, মাকড়সা ইত্যাদি শাকসবজির চারা নষ্ট করে ফেলতে পারে। এ জন্য হেপ্টোক্লোর ৪০ পরিমাণমতো দিয়ে যাবতীয় পিঁপড়া ও মাকড়সার আক্রমণ থেকে সবজি রক্ষা করা যায়। তবে পাখির হাত থেকে ফসল বাঁচাতে হলে টবের ওপর তার বা নাইলনের জাল দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, টবের মাটিতে বীজ বপনের আগে বিভিন্ন আগাছা জন্মাতে পারে। আগাছাগুলো নিড়ানি দিয়ে খুঁচিয়ে তুলে ফেলে দিতে হবে। টবে চারা জন্মালে এর গোড়ায় যেন আঘাত না লাগে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। টবগুলোয় শাকসবজি অবশ্যই আলো-বাতাস পায়Ñ এমন জায়গায় রাখা দরকার। তবে অতিরিক্ত ঝড়-বৃষ্টি ও রোদ-তাপ থেকে রক্ষা করার জন্য সাময়িকভাবে টব নিরাপদ স্থানে সরানো যেতে পারে।


সবজি সময়মতো সংগ্রহ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সবজি বেশিদিন গাছে না রেখে বেশি পোক্ত না করে কচি থাকতেই তুলে খাওয়া ভালো। এতে একদিকে যেমন নরম খাওয়া যায়, অন্যদিকে তেমনি গাছে আরও সবজি আসে। সবজি গাছ থেকে ছিঁড়ে সংগ্রহ করা যাবে না। আস্তে করে কেটে সংগ্রহ করতে হবে। তাহলে সবজি গাছের কোনো ক্ষতি হবে না।
আপনার নিজে করে দেয়া মাচার সবুজ প্রেক্ষাপটে পবিত্রতার প্রতীক দুধসাদা লাউ ফুলের অপার্থিব রূপ, ধুন্দল ফুলের ঢলে পড়া আয়েশি হলুদ সুখ, কচি ধুন্দল, এক চিলতে বেডে কিশোরী ধনিয়াপাতার কোলজুড়ে তুষার শুভ্র ফুল শিশুর দল, স্বচ্ছন্দ অহঙ্কারে বেড়ে ওঠা ফুলকপির রূপ অন্য কেঊ না জানুক, আপনি তো জানেন! দেখবেন, পরিবারের এমন সদস্য আপনার সাহায্যে এগিয়ে এসেছেনÑ যার কথা আপনি ভাবতেও পারেননি। শুরু করুন আজই। ভালো থাকুন সবুজের সঙ্গে।

Read 128 times

Leave a comment

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

Twitter feed

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…