সীমান্তের অপার সৌন্দর্য!

সীমান্তের অপার সৌন্দর্য!

- ম্যাক সুমন

 

দমদমায় যখন পৌঁছালাম তখন সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই। পাথুরে ঝিরিপথে গড়ানো পানি দেখে কেউই লোভ সামলাতে পারলাম না। কোনোমতে কাঁধের ব্যাগটা নামিয়ে সবাই ঝাঁপ দিলাম দমদমায়। দমদমার আরেকটা নাম রয়েছে। স্থানীয়রা একে থুরুং ছড়া বা থ্ররুং ছড়া বলে। যতোটুকু জানতে পারলাম, সীমান্তবর্তী ওই এলাকার পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ভাষায় থুরুং অর্থ হলো ‘ছোট ঝুড়ি’।

আমাদের উদ্দেশ্য ছিল ‘হাইকিং ফ্রম জাফলং টু ভোলাগঞ্জ’! জাফলং আর ভোলাগঞ্জ কারো কাছে অচেনা বলে মনে হয় না। সিলেটের সীমান্তবর্তী একটি উপজেলা গোয়াইনঘাট, আরেকটা কোম্পানীগঞ্জ। অপার সৌন্দর্য ও প্রকৃতির লীলাভূমিখ্যাত ওই দুই উপজেলায় ভোলাগঞ্জ-জাফলং সীমান্তের সৌন্দর্য ছাড়াও অগণিত নাম জানা, না জানা ছোট-বড় পাথুরে নদী ও ঝিরি রয়েছে। এগুলোর স্বচ্ছ জলধারার শীতল প্রবাহ ভ্রমণপ্রিয় মানুষের তীর্থস্থান। জাফলংয়ের পিয়াইন নদী, বিছনাকান্দির পাথুরে নদীটা দেশ-বিদেশে অত্যন্ত সুপরিচিত।

আমাদের ‘হাইকিং ফ্রম জাফলং টু ভোলাগঞ্জ’-এ যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল পরিচিত এই নদীগুলো ছাড়া কম পরিচিত ও অপেক্ষাকৃত দুর্গম এলাকায় কোনো ঝিরি বা ছড়া থাকলে সেগুলো ভ্রমণপিপাসুদের সামনে তুলে ধরা। আমাদের ধারণা ছিল, এই পথ ধরে স্থানীয় লোকজন ছাড়া হয়তো কেউ হাইকিং করেননি। ফলে এই সীমান্ত অঞ্চলের সৌন্দর্যটা সম্ভবত বেশিরভাগের কাছে অজানা।

যাহোক, সকাল ১০টার দিকে যখন আমরা জাফলংয়ে পৌঁছালাম তখনো মানুষের কর্মব্যস্ততা শুরু হয়নি। রমজানের সময় সবাই একটু দেরি করে শুরু করেন সম্ভবত। আর ঝামেলা এড়ানোর জন্যই আমরা রমজানের দিনেই হাইকিং শুরু করি। খেয়া করে পিয়াইন নদী পার হতে হতে সিদ্ধান্ত নিলাম, পথে যা-ই পড়বে, কোনোকিছু বাদ দেবো নাÑ সেটি টুরিস্ট স্পট হোক আর এক্সট্রিম কিছু হোক। যেই ভাবা, সেই কাজ।

নদী পার হয়েই সংগ্রামপুঞ্জি। ঐতিহ্যবাহী এই পুঞ্জিতে খাসিয়া জনগোষ্ঠীর বসবাস। গ্রামটা বেশ সুন্দর, গোছানো। মজার ব্যাপার হলো, যারাই জাফলং ঘুরতে আসেন তারাই একবারের জন্য হলেও ওই গ্রামে পা ফেলে যান। সংগ্রামপুঞ্জি হলো এদিকের সীমান্তবর্তী শেষ গ্রাম। তবে এই গ্রামের ঠিক উত্তরপাশে একটা ঝরনা আছে। আমাদের দেখা সবচেয়ে সুন্দর ঝরনাগুলোর একটি। আমার জানা মতে, দুর্ভাগ্যবশত ওই ঝরনাটাই ভারত সীমান্তের ভেতরে অবস্থিত। সৌভাগ্যের ব্যাপার হলো, বাংলাদেশের সবাই অবাধে ওই ঝরনা পর্যন্ত যেতে-আসতে পারেন। আর ঝরনাটার নামকরণও হয়েছে বাংলাদেশের এই গ্রামের নামেÑ সংগ্রামপুঞ্জি ঝরনা। আমরা ঝরনায় পৌঁছে শরীর শীতল করে নিলাম। ঝরনাটা যেমন সুন্দর তেমন ভয়ঙ্করও। ঝরনার উপরের পিচ্ছিল ধাপগুলোয় পৌঁছাতে গিয়ে ইতোমধ্যে বেশ কয়েক পর্যটক প্রাণ হারিয়েছেন।

সংগ্রামপুঞ্জি ঝরনা থেকে বের হতে হতে দুপুর সাড়ে ১২টা। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য পান্থুমাই। পান্থুমাই আমাদের যাত্রাপথেই পড়ে। সংগ্রামপুঞ্জির ভেতরের সবুজে ঘেরা ঢালাই করা রাস্তা ধরে আমরা লামাপুঞ্জি ও হাজীপুর পাড়ি দিলাম। খেয়া পার হয়ে পান্থুমাই পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় দুপুর গড়িয়েছে। দেখলাম, কয়েকদিন আগের বৃষ্টির প্রভাবে পান্থুমাই নতুন যৌবন পেয়েছে। পানির শব্দে আশপাশের সবকিছু যেন সংগীতময়। আমরা সেখানে বড়জোর ১০ মিনিট থামলাম সময় বাঁচানোর তাগিদে।

এরপর বিছনাকান্দির দিকে আমরা এগোতে থাকলাম। সীমান্ত ঘেঁষা এই পাথুরে নদীর ওপর দিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম। না থেমে যতোটুকু সৌন্দর্য উপভোগ করা গেল ততোটুকু করলাম। ততোক্ষণে প্রায় বিকাল সাড়ে ৪টা। সীমান্ত ছুঁয়ে ছুঁয়ে আমরা এগোতে থাকলাম সোজা পশ্চিম দিকে। সামনের দিকে আনুমানিক ২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হবে।

আমাদের টিমে আমি ছাড়া অন্য চার অভিযাত্রী হলেন বিনয়, গোপাল, অঞ্জন ও নাম না জানা আরেকজন। সবাই হাঁটতে পারদর্শী। আমাদের আশা ছিল, সন্ধ্যার পর পর আমরা উতমা ছড়ায় পৌঁছাবো অর্থাৎ আরো প্রায় ৩ ঘণ্টার পথ। কিন্তু মাঝখানে বাদ সাধল ভাঙা রাস্তা ও বন্যার পানি। আমরা যখন প্রথম ঝিরিটার কাছাকাছি পৌঁছালাম তখন প্রায় সন্ধ্যা। সিদ্ধান্ত নিলাম, ওই ঝিরিটার পাশেই আমরা তাঁবু খাটাবো। পৌঁছে জানলাম, এ ঝিরিটার নাম ‘দমদমা’ বা থ্ররুং ছড়া। দমদমা সম্পর্কে আমাদের তেমন কিছুই জানা ছিল না। আমাদের সবকিছু জানালেন স্থানীয় আলী হোসেন। ওই দমদমা ছড়াই এ গ্রামের পানির উৎস। খাওয়ার পানি থেকে ধোয়া-মোছাÑ সবই চলে এ পানিতে। ১২ মাসই প্রায় সমানতালে দমদমা বহে। আরো মজার ব্যাপার হলো, এই দমদমার পূর্বপাশ গোয়াইনঘাট আর পশ্চিমপাশ কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা।

আমাদের সন্ধ্যা ও রাতে খাবারের ব্যবস্থা করলেন আলী হোসেন। ছোলা-মুড়ি ছিল সন্ধ্যায়। আর রাতে মুরগির মাংস। প্রকৃতির কাছাকাছি বসবাসকারী বেশির ভাগ মানুষ কী পরিমাণ উদার ও অতিথিপরায়ণ হয়, আলী হোসেনদের সঙ্গে না মিশলে তা বোঝা যাবে না। তার নিজস্ব কিছু সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও ছিলেন খুবই আন্তরিক।

যাহোক, সন্ধ্যার খাবারের পর আমরা তাঁবু খাটালাম ঠিক দমদমার তীরে। পানির কল কল শব্দে কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা ঘুমিয়ে পড়লাম। কতোক্ষণ ঘুমিয়েছিলাম তা জানি না। হঠাৎ মানুষের কথাবার্তার তীব্রতায় জেগে উঠলাম। এখানকার মানুষ খুব আগ্রহী হয়ে আমাদের তাঁবুবাস দেখছে। তাঁবুর চারপাশ ঘুরে ঘুরে কেউ কেউ সবজান্তার মতো মন্তব্য করছেÑ তাঁবুতে বৃষ্টির পানি ঢুকবে কি না, বাতাস ভেতরে ঢুকছে কি না ইত্যাদি। রাত প্রায় ১টা। তাঁবু থেকে বের হয়ে ১০-১২ মধ্যবয়সী ও যুবককে আবিষ্কার করলাম। এর মধ্যে আলী হোসেনও আছেন। পরে জানলাম, আমাদের পাহারা দিতে তিনি এসেছিলেন যাতে কোনো ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন না হই।

আমরা রাতের খাবার শেষে স্থানীয় স্কুলে রাত যাপন করলাম। ফ্ল্যাশ ফ্লাডের ভয় ছিল। তাই এই ব্যবস্থা। সকাল সকাল উঠে উতমা ছড়ার উদ্দেশে রওনা হলাম। সামনে ৫-৬ কিলোমিটার পথ। মাঝখানে আরেকটা ঝিরি। নাম ‘থানচিনি’ ছড়া। স্থানীয়রা এটিকে কুলি ছড়া বলে। আশপাশে কুলি সম্প্রদায়ের বসবাস হওয়ার কারণে খুব সম্ভবত এটির নাম কুলি ছড়া। এ ছড়ায় পৌঁছে বুঝলাম, এই টুরে দেখা সব ছড়া, ঝরনার মধ্যে এটিই সবচেয়ে পাথুরে ও গভীর, আকর্ষণীয়ও বটে। এটি দেখে দেখে শেষ করার মতো নয়। একেবারে সীমান্তের কাছ থেকে ঝিরিপথ ধরে হেঁটে হেঁটে অনেক সময় ধরে আমরা এটি দেখলাম। স্বচ্ছ পানি, গভীরে বড় বড় সাদা-লাল পাথর। স্থানীয়রা এখানে মাছ ধরছে। কেউ কেউ গোসল সেরে বাড়ি ফিরছেন। আমরা পা ভিজালাম, শরীর ভিজালাম, শীতল হলাম।

কুলি ছড়া থেকে উতমা ছড়া পৌঁছাতে আমাদের খুব একটা সময় লাগেনি। মোটে আধা ঘণ্টা হবে হয়তো। এখানে কিছুটা ধ্বংসের ছোঁয়া লেগেছে। যেদিকে তাকানো যায়, বড় বড় গাড়ি আর খননযন্ত্র। বাড়ির উঠান থেকে নদীর মাঝখান পর্যন্ত চলছে ধ্বংসযজ্ঞ। পাথর যেন নয়, টাকা খুঁড়ে খুঁড়ে তুলছে মানুষ আর দানব আকৃতির যন্ত্র। আমরা একটা গ্রামের ভেতর দিয়ে হাঁটছি, নাকি কারখানার ভেতর দিয়ে হাঁটছি তা শব্দ শুনে বোঝার উপায় নেই।

আমরা অবশেষে উতমা ছড়ায় পৌঁছায়। মাথার উপর কড়া রোদ, পা শীতল জলে। এখানেও একই রকমের কর্মযজ্ঞ। লোকজন সারি ধরে পাথর তুলছে। বাংলাদেশের প্রায় ৭০ শতাংশ পাথর নাকি এ অঞ্চল থেকে সরবরাহ করা হয়। সবচেয়ে ভালো মানের পাথর নাকি এখানেই পাওয়া যায়।

আমরা কাউকে বিরক্ত করতে চাইলাম না। কিন্তু আমাদের দেখে শ্রমিকদের মধ্য থেকে কয়েকজন ছুটে এলেন। তারা হয়তো ভেবেছিলেন, আমরা কোনো শুটিংয়ের কাজে গিয়েছি। কুশল বিনিময় সেরে আমরা তাদের থেকে খানিকটা দূরে চলে গেলাম। এই অঞ্চলের প্রতিটি ঝরনা বা ঝিরির পানি খুবই পরিষ্কার। পানির নিচে অনেক গভীর পর্যন্ত দেখা যায়। আমরা একটু অগভীর অঞ্চলে জায়গা করে নিলাম। স্বচ্ছ পানির লোভ সামলানো দায়। সবাই আবার ঝাঁপাঝাঁপি শুরু করলাম। কীভাবে যে প্রায় ২ ঘণ্টা পার হলো তা বুঝতে পারিনি। উতমার জল থেকে যখন উঠলাম তখন দুপুর প্রায় ১টা। ফিরতে হবে।

ভোলাগঞ্জ-সিলেটের রাস্তার অবস্থা ভালো নয়। অনেক ভাঙা। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, হেঁটে আসার পথ ধরেই বিছনাকান্দি হাদারপার বাজারে পৌঁছাবো। এরপর সেখান থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশাযোগে শহরে। উতমা ছড়া থেকে হাদারপার বাজার যখন পৌঁছালাম তখন প্রায় সাড়ে ৪টা বাজে। প্রায় বিরতিহীন ১৯ কিলোমিটার রাস্তা হেঁটে আসা রীতিমতো ভয়ঙ্কর ব্যাপার। মোটামুটি সমতল ও কাদামাটির রাস্তা হওয়ায় কোনো অসুবিধা হয়নি আমাদের।

শহরের দিকে রওনা হলাম। পেছনে পড়ে থাকলো পানির কল কল শব্দ, বিশাল পাথরের বাগান ও পাহাড়ি সৌন্দর্য। দুর্গম হলেও এই জায়গাগুলোয় পৌঁছানো একেবারে অসম্ভব নয়। কিন্তু এ অঞ্চলের সৌন্দর্যের বিকল্প বের করা একেবারেই অসম্ভব।

Read 129 times

Leave a comment

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

Twitter feed

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…