উদয়-অস্তের কুয়াকাটা

উদয়-অস্তের কুয়াকাটা

মাসুদ আলী 

 

‘কুয়া’ শব্দটি এসেছে ‘কূপ’ থেকে। আঠারো শতকে মোঘল শাসকদের দ্বারা মিয়ানমার (বার্মা) থেকে বিতাড়িত হয়ে আরকানিরা এই অঞ্চলে এসে বসবাস শুরু করে। তখন এখানে সুপেয় জলের অভাব পূরণ করতে তারা প্রচুর কুয়া বা কূপ খনন করেছিল। তখন থেকেই এ অঞ্চলের নাম হয়ে যায় ‘কুয়াকাটা’।
কুয়াকাটা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের একটি সমুদ্র সৈকত ও পর্যটন কেন্দ্র। পর্যটকদের কাছে কুয়াকাটা ‘সাগরকন্যা’ হিসেবে পরিচিত। ১৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য সৈকতের কুয়াকাটা বাংলাদেশের অন্যতম নৈসর্গিক সমুদ্র সৈকত। এটি বাংলাদেশের একমাত্র সৈকত। যেখান থেকে সূর্য উদয় ও অস্তÑ দুটিই দেখা যায়।
পটুয়খালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার লতাচাপলী ইউনিয়নে কুয়াকাটা অবস্থিত। ঢাকা থেকে সড়কপথে এর দূরত্ব ৩৮০ কিলোমিটার এবং বরিশাল থেকে ১০৮ কিলোমিটার।
কুয়াকাটা বেড়িবাঁধ পার হয়ে সমুদ্র সৈকতের দিকে যেতেই বাম দিকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে মিউজিয়াম স্থাপন করা হয়েছে। এরপরই কয়েক গজ দক্ষিণে ‘ফার্মস অ্যান্ড ফার্মস’-এর রয়েছে বিশাল নারিকেল বাগানসহ ফল ও ফুলের বাগান। এ বাগানের মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে বেশ কয়েকটি পিকনিক স্পট। এটি পরিদর্শনের পরই রয়েছে কাক্সিক্ষত ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে বিশাল সমুদ্র সৈকত। এর পূর্ব দিকে এগোলেই প্রথমে দেখা যাবে নারিকেল বাগান ও সুন্দর আকৃতির ঝাউ বাগান। বন বিভাগের উদ্যোগে বিভিন্ন প্রজাতির ঝাউ গাছ লাগিয়ে সমুদ্র সৈকতের শোভাবর্ধন করা হয়েছে। এই নারিকেল ও ঝাউ বাগানের মধ্যেও রয়েছে পিকনিক স্পট। এখানে পর্যটকরা দল বেঁধে বনভোজনের অনাবিল আনন্দে নিজেদের একাকার হয়ে যান। এ জায়গা থেকে একটু পূর্ব দিকে আগালেই চর-গঙ্গামতির লেক। সেখান থেকে আর একটু ভেতরে দিকে এগোলেই সৎসঙ্গের শ্রীশ্রী অনুকূল ঠাকুরের আশ্রম ও মিশ্রীপাড়ার বিশাল বৌদ্ধবিহার। সমুদ্র সৈকতের পশ্চিম দিকে লেম্বুপাড়ায় প্রতি বছর আশ্বিন থেকে চৈত্র মাস পর্যন্ত জেলেরা প্রাকৃতিক উপায়ে গড়ে তোলেন শুঁটকি পল্লী। এই পল্লীতে সাগরের বিভিন্ন প্রজাতির মাছ প্রাকৃতিক উপায়ে শুঁটকিতে রূপান্তরিত করে সারা দেশে সরবরাহ করা হয়। এছাড়া কুয়াকাটায় উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থানগুলো হচ্ছে-

ফাতরার বন
সমুদ্র সৈকতের পশ্চিম দিকে ম্যানগ্রোভ বন শুরু হয়েছে। এর নাম ‘ফাতরার বন’। সংরক্ষিত বনভূমি ফাতরার বন ইতোমধ্যে দ্বিতীয় সুন্দরবন হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। এখানে রয়েছে কেওড়া, গেওয়া, সুন্দরী, ফাতরা, গরান, বাইন, গোলপাতা ইত্যাদি ম্যানগ্রোভ প্রজাতির উদ্ভিদ। এছাড়া বানর, শূকরসহ অসংখ্য জীবজন্তু ও পাখি বয়েছে। সমুদ্র সৈকত থেকে ইঞ্জিনচালিত বোটে এক ঘণ্টার যাত্রাপথে ফাতরার বনে যাওয়ার ব্যবস্থা আছে।

কুয়াটারা ‘কুয়া’
কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের কাছে রাখাইন পল্লী কেরানিপাড়ার শুরুতেই একটা বৌদ্ধমন্দিরের কাছে রয়েছে প্রাচীন কূপগুলোর মধ্যে একটি কূপ। তবে বারবার সংস্কারের কারণে এর প্রাচীন রূপটা এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না।
সীমা বৌদ্ধমন্দির
কুয়াকাটার প্রাচীন কুয়াটির সামনেই রয়েছে প্রাচীন একটি বৌদ্ধমন্দির (সীমা বৌদ্ধমন্দির)। এতে রয়েছে প্রায় ৩৭ মণের অষ্টধাতুর তৈরি ধ্যানমগ্ন বুদ্ধের মূর্তি।

কেরানিপাড়া
সীমা বৌদ্ধমন্দিরের সামনে থেকেই শুরু হয়েছে রাখাইন আদিবাসীদের পল্লী কেরানিপাড়া। এখানকার রাখাইন নারীদের প্রধান কাজ হলো কাপড় বুনন।

আলীপুর বন্দর
কুয়াকাটা থেকে প্রায় চার কিলোমিটার উত্তরে রয়েছে দক্ষিণ অঞ্চলের অন্যতম বড় একটি মাছ ব্যবসা কেন্দ্র আলীপুর। এ বন্দর থেকে প্রতিদিন শত শত ট্রলার বঙ্গোপসাগরে যায় মাছ ধরতে।

মিশ্রিপাড়া বৌদ্ধমন্দির
কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার পূর্বে রাখাইন আদিবাসীদের অন্য একটি আবাসস্থল মিশ্রিপাড়ায় রয়েছে আরেকটি বৌদ্ধমন্দির। এ মন্দিরেই রয়েছে উপমহাদেশের সবচেয়ে বড়
বৌদ্ধমূর্তি। এখান থেকে কিছুদূরে আমখোলাপাড়ায় রয়েছে এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় রাখাইন বসতি।

গঙ্গামতির জঙ্গল
কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত শেষ হয়েছে পূর্ব দিকে গঙ্গামতির খালে গিয়ে। এখানে শুরু হয়েছে গঙ্গামতি বা গজমতির জঙ্গল। বিভিন্ন গাছ ছাড়াও এই জঙ্গলে দেখা মিলতে পারে বনমোরগ, বানরসহ বহু প্রজাতির পাখি। প্রতি বছর রাস পূর্ণিমা ও মাঘী পূর্ণিমা উপলক্ষে অনেক দর্শনার্থী কুয়াকাটায় আসেন। এ দুটি উৎসবের দিনে দর্শনার্থীরা পুণ্যস্নান করেন। এছাড়া লোকজ মেলা বসে সাগরতীরে।

যাতায়াত
ঢাকা থেকে পটুয়াখালী জেলা সদরে বাস বা লঞ্চে আসা যায়। সেখান থেকে সড়কপথে কুয়াকাটা। বিমানে বরিশাল এসে সেখান থেকে লঞ্চ বা বাসে কুয়াকাটায় যেতে হয়। বিআরটিসিসহ বেশ কয়েকটি প্রাইভেট বাস সার্ভিসে সরাসরি ঢাকা থেকে কুয়াকাটায় আসা যাবে।

 

ছবিঃ লেখক 

Read 666 times

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…