চিনে নিতে চীন

চিনে নিতে চীন

জলি শরীফ 


আল কোরআনে আছে, ‘জ্ঞান অর্জনের জন্য সুদূর চীন দেশে যাও।’ কথাটি জানার পর সবারই ইচ্ছা করে একবার চীনে যেতে। এবার আমার সুযোগ হলো। আমার মেয়ে অন্তর ও তার পাপাসহ ঘুরে এলাম। ২০১৫ সালের ১৫ মার্চে রওনা হয়ে ২২ মার্চ ফিরলাম। যতোক্ষণ চীনে ছিলাম, উপরের কথাটির সমার্থ খুঁজেছি।
যখন বাংলা পড়তে শিখেছি তখন ‘বেগম’ পত্রিকায় ফেরদৌসী রহমানের ‘গান গেয়ে এলাম চীনে’ পড়েছি। এতো ভালো লেগেছিল যে, এখনো মনে আছে। চীন দেখার সুপ্ত ইচ্ছা তখন থেকেই। তখনকার প্যানারোমা-য় লাল পোশাকে একই উচ্চতা ও প্রায় একই চেহারার চীনা ছেলেমেয়েদের ছবি দেখেছি। মেয়েরা সবাই ‘চায়নিজ কাট’ দিতো। আর স্কুলের ঝপৎধঢ় নড়ড়শ তৈরি করতে চীনের প্রাচীর আর স্টোন ফরেস্ট-এর ছবি সংগ্রহ করেছি। সব জিনিসে গধফব রহ ঈযরহধ লেখা দেখেই বুঝতাম, তারা কতো এগিয়ে। আমি যে ক’টা দেশ ঘুরেছি, সবখানে ‘চায়না টাউন’ দেখেছি। সবখানেই চায়নিজদের দেখেছি। মনে আছে, ছোটবেলায় রেডিও বা ট্রানজিস্টর-এর নব ঘুরিয়ে ‘চিং চুং চাং’ চায়নিজ ভাষা শুনতাম আর আঁকাবুকা দিয়ে দিয়ে তাদের দেখার কায়দাও চিনেছি। তখন চীনের রাজধানী পিকিং ছিল, এখন বেইজিং। পিকিং শুধু টিকে আছে এয়ারপোর্টের চঊক হয়ে। বেইজিং সরাসরি যাওয়া যায় না। কুনমিং হয়ে যেতে হলো। আমরা দু’জায়গাতেই বেড়িয়েছি।
ঈযরহধ ঊধংঃবৎহ-এ ভ্রমণ করেছি আর উপর থেকে ঢাকার নগরায়ন দেখে গর্বিত হয়েছি। ওপর ওপর সবকিছু অবশ্য ভালোই লাগে। প্লেনের ঝুলন্ত টিভি-তে দেশের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে প্লেনের চলার পথে দৃষ্টি রেখে চট্টগ্রামের সীমার পার হতেই অন্য প্রোগ্রাম শুরু হলো- দেশের সীমা পার হয়ে অন্য দেশে ঢুকেছি তো।
এবার প্লেনের পকেটে রাখা ম্যাগাজিন দেখে এবং তাদের কথা শুনে মনে হলো, তারা যখন কথা বলে তখন পুরোপুরি চায়নিজ ভাষায় বলে বা লেখে। অন্য কোনো ভাষার মিশ্রণ নেই। লেখার কায়দাও নিজস্ব। সাধারণ মানুষ একটুও ইংরেজি বোঝে না। ১, ২ লেখে একইভাবে। কিন্তু বলে নিজেদের শব্দে। সাধে কী বলে, চায়নিজ ভাষা টিকে থাকবে পৃথিবীর শেষ দিন পর্যন্ত!
অনেক রাতে বেইজিং পৌঁছালাম। গাড়িতে ওঠার আগে লম্বা লাইনে দাঁড়াতে হলো। এ অভিজ্ঞতা চলতেই থাকলো যতোক্ষণ চীনে থাকলাম। গভীর রাতে রাস্তায় নির্ভয়ে এক মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অবাক হলাম। আমি তো অন্য কিছু ভেবেছি। আসলে তাদের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে তেমন পার্থক্য নেই। সবাই সব কাজ করছে। বড় বড় ট্রাকও মেয়েরা চালাচ্ছে। আধুনিক ছেলেমেয়েরা লম্বায় অনেক বড়। বুড়োবুড়িরা আমার আগের দেখার সঙ্গে মিললো। চুলের কাটও বদলে গেছে। লম্বা, রঙ করা চুলও প্রচুর। হোটেলের রুমে ঢুকেই প্রথম ঢাক্কা খেলাম বাথরুম দেখে। এর দরজা আর ঘিরে দেয়া গোসলের জায়গা- সবই মোটা ও স্বচ্ছ কাচের ঘরে ঢোকার পথের একপাশে। এ ব্যাপারটায় বুঝলাম, তারা কতোটা স্বচ্ছ থাকতে চায়।


প্রথম দিন শহরের আশপাশেই গেলাম। ঋড়ৎনরফফবহ ঈরঃু নিষিদ্ধ শহর মিং রাজার বাড়ি। ফটকের দু’পাল্লাতেই গোল করে ধাতুর অর্ধগোলক লাগানো। এর পাশাপাশি উপর-নিচ ৯ী৯ = ৮১টি। তাদের বিশ্বাস এক অংকের বড় সংখ্যাই সবচেয়ে শক্তিশালী। এক সময় সেখানে কেউ ঢুকতে পারতো না। আর ঢুকলেও বের হতে পারতো না। পাশে লেক, নৌকাও আছে। ৮ হাজারের বেশি ঘর ও বাগান। রাস্তায় দাঁড়িয়ে ঐতিহ্যবাহী খাবার ঈধহফরবফ ঋৎড়ঁঃ খেলাম। লম্বা কাঠির মধ্যে লাল ঐধি ফল, স্ট্রবেরি, ছোট্ট কমলা, আপেল ইত্যাদি গাঁথা ফল চিনির সিরায় ডোবানো। খেতে খুব মজা। আমি ভিন্ন স্বাদ পছন্দ করি, উপভোগ করি। বেড়াতে গেলে অনেক হাঁটা এবং সিঁড়িও লাফিয়ে চলি।
সময় নষ্ট না করে চলতে চলতেও পলক না ফেলে তাকিয়ে থাকি কিছুই যেন বাদ না যায়। এরপর পুরনো শহর ঞযরধহ গধরহ ঝয়ঁধৎব গেলাম। পুরনো কতো শিল্পকর্ম দেয়ালে দেয়ালে! পরে বিখ্যাত সিল্ক মার্কেটে গেলাম। ম্যাগডোনাল্ডস আছে, কম বয়সী চায়নিজরা খাচ্ছে। শহর সম্পূর্ণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। প্রত্যেকেই সব জায়গাকে নিজের বাড়ি মনে করে, একটুও ময়লা করে না। রাস্তা, গলি, ফুটপাথ, বাস, ট্রেন, এমনকি রাস্তার খাবার দোকানের পাশেও খাওয়া-দাওয়া হচ্ছে, রান্না হচ্ছে। তবু কোথাও ময়লা নেই। ফলের খোসা, খালি বোতল নির্দিষ্ট জায়গাতেই ফেলছে সবাই। কোনো বিশৃঙ্খলা, হট্টগোল নেই, গাড়ি, মানুষ- সবাই চলছে। সবাই নিয়ম মেনে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়েই আছে ধৈর্য ধরে, ঠেলাঠেলি, চিল্লাচিল্লি নেই- মুগ্ধ হওয়ারই মতো সব।
রাতে ‘হট প্যাট’ নামে ঐতিহ্যবাহী এক খাবারের দোকানে গেলাম। সামনে প্রত্যেকের জন্য আলাদা চুলায় মশলা দেয়া পানি ফুটতে থাকে। লাইন লাইন বৈদ্যুতিক চুলা। মেনু অনুযায়ী যে যেটি অর্ডার করবে, নিজেরাই রান্না করে খেতে হবে। গরু, খাসি, ডিম, মাছসহ বিভিন্ন সবজি, পদ্ম ফুলের চাকা, লেটুস, পালং, বহু রকমের আলু, বহু রকমের নুডলস। সবই কাঁচা, সামনের চুলায় চপস্টিক দিয়ে রান্না করে ছোট্ট একটা পাত্রে ধনিয়াপাতাসহ পিনাট বাটার সস লাগিয়ে খাও। রক্তাক্ত মাংস দেখে ঘাবড়ে গেলাম। চায়নিজরা খুব মজা করে খায়। আমি গাজর, কুমড়া, মিষ্টি আলুর সঙ্গে নুডলস ও মাংস সিদ্ধ হলে খেলাম। এখানে স্বাভাবিক তাপমাত্রার কোনো ড্রিংকস পেলাম না। সব ড্রিংকসই ঠা-া অথবা গরম। এতো চুলার কারণে ঘর বেশ গরম ছিল। অবশ্য বাইরে তখন অনেক ঠা-া। খেয়াল করে দেখলাম, তারা অনেক রঙিন খাবার খায়। বেশির ভাগ খাবার সাদা, হলুদ, কমলা, বেগুনি অথবা সবুজ। সবুজ আবার হালকা গাঢ়, বেশি গাঢ়। হাপুস-হুপুস খাওয়া যে স্বাস্থ্যকর নয়, তা তাদের চপস্টিক দিয়ে আস্তে আস্তে সব খাবার চেটে-পুটে খেতে দেখে আবারও মনে হলো। সকালে হোটেলে বিন্নি ধানের বেগুনি, আতপ চালের সাদা জর্দা ছিল এবং গুড়ের পুর দেয়া ‘মম’ ছিলো পিঠার মতো। তিন পাপড়ি ও সাদা ফুলের ওই পিঠা খাওয়ার সময় মনে পড়ে, পাউরুটি আর ঝোলা গুড়ের কথা। তারা টিসু ব্যবহার করছে দরকার অনুযায়ী, বাড়তি একটিও নয়। হোটেলের পাশে ফলের দোকানে থরে থরে ফল সাজানো- আপেল, নাসপাতি, কমলা, চেরি, বড়ই, আতা, কলা, কাঁঠাল, আনারস, আম, গাব, ব্ল্যাকবেরি, ডালিম, মিষ্টি তেঁতুল, তরমুজ, পেপে, লিচু, ডোরিয়াম ইত্যাদি। তাদের বাইকগুলোয় গ্লাভস লাগানো থাকে যাতে হাতে গরম লাগে এবং পায়ের সামনে থাকে ভারী কম্বলের পর্দা।


দ্বিতীয় দিন বাসে গ্রেট ওয়াল দেখতে রওনা হলাম। গাইড মেয়েটা বিরতিহীন চায়নিজ ভাষায় বকর বকর করতে করতে শহর চেনাতে চেনাতে যাচ্ছিল। প্রথমে তাকে দেখিনি। তাই ভেবেছিলাম, টেপ রেকর্ড অথবা সিডি চলছে। তারা কর্তব্যে কতোটা নিষ্ঠা রাখে তা বোঝা গেল। উঁচু পাহাড়ের দিকেই বিস্ময়কর গ্রেট ওয়াল। পথে দেখতে পেলাম শক্ত পাথুরে ছাই রঙের ধূসর ‘পাহা’ পাহাড় এবং বেশির ভাগ সারি সারি পাইন গাছ। মেয়েটার কথা শেষ হলেই বুঝলাম নামতে হবে। নেমে লাইনে দাঁড়িয়ে চারদিক খোলা ছোট বাসে চড়ে গ্রেট ওয়ালের একটা অংশের কাছাকাছি গেলাম। তারপর হেঁটে, সিঁড়ি ডিঙিয়ে পৃথিবীর আশ্চর্য দেয়ালের স্পর্শ পেলাম। ভেবে অবাক হলাম, কতো দিন ধরে, কতো নিঁখুতভাবে পাথর কেটে বড় ইটের মতো বানিয়ে থরে থরে গেঁথে এই স্থাপত্য তৈরি করা হয়েছে। কিছুদূর পর পর যে চারকোণা ঘরের মতো আছে (৬৪টি) এরই একটিতে বসে দেখলাম। বিশাল সিঁড়িওয়ালা চওড়া ওয়াল। আমার জন্য গ্রেট ওয়ালের এই অংশে কেবল কারের ব্যবস্থা থাকলে ভালো হতো। অনেক দূর পর্যন্ত দেখতে পেলাম না। কাছ থেকে বড় কাঠবিড়ালির ছোটাছুটি, বড় দোয়েল পাখির মতো পাখি ও ছোট্ট চড়ুই পাখির কিচিরমিচির শুনলাম। ফেরার সময় বাসে চায়নিজ গান শুনলাম। খুব মিষ্টি সুরেলা কণ্ঠস্বর ঠিক যেন সামিনা চৌধুরীর গান শুনছি, ‘ফুল ফোটে, ফুল ঝরে, ভালোবাসা ঝড়ে পড়ে না।’ সত্যিই সুরের অনেক মিল ছিল। পথে গাছের কা-ে পাখির বাসা দেখলাম। একটি কোলের শিশু অবাক চোকে ভ্রƒ কুঁচকে আমাকে দেখছিল। সে নাকি বিদেশি দেখলে বুঝতে পারে। আর আমি তো এখন বিদেশিনীই। এতো মিষ্টি তাদের শিশুরা যে, কেউ বিরক্ত করে না। হাঁটা শেখা মাত্র হাত ধরে হাঁটে। একদিনে অনেক জায়গায় গেলাম- মিউজিয়াম, শুকনো ফলের বিশাল দোকানপাট, পাথরের তৈরি জিনিস দেখা, সিল্ক দোকান, জাদু, থ্রিডি সিনেমা ইত্যাদি। দুপুরে চায়নিজ খাবার খেতেও দিল এক টেবিলে ১১ জন করে। দিন শেষে অলিম্পিক সিটির (২০০৮ সালে যেখানে অলিম্পিক হয়েছে) পাশে বাস নামিয়ে দিল। আন্ডারপাশ দিয়ে অলিম্পিক মাঠে পৌঁছালাম। সুইমিং পুল ওয়াটার কিউব এবং বার্ড নেস্ট দেখলাম। একদিকে বিশাল টেলিভিশন চলছেই। সন্ধ্যায় বিশাল ওই মাঠে হাঁটতে ভালো লাগছিল। রাতে মল-এর এক খাবারের দোকানে খেলাম। সেখানে আইসক্রিম ও প্যান কেক ছাড়া সব খাবার একটা বড় বাটিতে খেতে দিল। সবার খাবার এক সঙ্গে। পাত্র ঘুরিয়ে পছন্দের খাবার চপস্টিক দিয়ে খেতে হবে। সবার টেবিলে একই কা-। বেইজিংয়ে ফার্স্ট ফুড, মুসলিম, ভারতীয় খাবারের দোকান আছে। কিন্তু এখনো বাংলাদেশি নেই। রাতে স্ট্রিট ফেয়ারে দেখেছি কতো যে দোকান! দিনে স্ট্রিট ফুডের দোকানেও দেখেছি, কাঠির মধ্যে কতো কিছু যে গেঁথে সামনেই ভেজে দেবে। চিংড়ি, সবজি, মাছ, কাঁকড়া তো ছিলই, সাপ বা অক্টোপাসও ছিল। ভয়ে দূর থেকে শুধু দেখেছি। বেশ ক’বার পাতালরেলে উঠেছি এবং আন্ডারপাস সিঁড়িতে ফকিরও বসে থাকতে দেখেছি। মনে পড়ে যায় ভূপেন হাজারিকার সেই গান-

‘আমি দেখেছি অনেক গগনচুম্বী অট্টালিকার সারি
তার ছায়াতে দেখেছি- অনেক গৃহহীন নরনারী।’

ঠিক অনেক নন, ২-৩ জনকে দেখেছি। সব দেশেই আছে?

বেইজিং থেকে কুনমিং প্লেনেই এসেছি। অভ্যন্তরীণ প্লেন বলে চায়নিজ ভাষাতেই বলেছে। আর আমরা না বুঝে প্লেন থামলেই লাগেজ নেয়ার জন্য দাঁড়িয়েছি। এটি ছিল ‘লিউজু’ এয়ারপোর্ট। ইলশে গুঁড়ি বৃষ্টিতে নেমে আবার ওই প্লেনেই উঠেছি। ইমিগ্রেশন শেষে ওঠার সময়ও গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি ছিল।
প্রতিদিন কিছু না কিছু ঘটনা ঘটেই। আমি বাসের মধ্যে সিঁড়ি না দেখে ধপাস হয়েছি! ভ্যানিটি ব্যাগ রেখেই প্লেনেই উঠে গিয়েছি। অবশ্য সমাধানও হয়েছে। প্লেন ছাড়ার ১০ মিনিট আগে ব্যাগ উদ্ধার হয়েছে। আমার জেনারেলই উদ্ধার করেছেন। আর চীনে পৌঁছেই তো তার চোখের পাপড়িতে ফোঁড়া উঠলো এবং ফুলে চায়নিজ চোখ হয়ে গেল। প্রতিবারের মতোই এবারও থ্রিডি সিনেমা শুরুর আগে ‘ও’ সিট বেল্ট বাঁধতেই পারলো না। প্রচ- ঝাঁকুনিতে ফেলেই দিচ্ছিল। এবার আমিই ওর বেল্টের অংশ নিয়েছি। তাই ‘ও’ খুঁজে পায়নি। ওকে নাম ধরে ডাকি না। তাই সে ‘ও’।
রাতে পৌঁছালাম কুনমিং। এয়ারপোর্ট যেন সোনালি ডানার চিল। তার নিচ দিয়ে বেড়িয়ে ফুল, হ্রদে ঘেরা সুন্দর শহরে ঢুকলাম। তাদের যে লাল পছন্দ এর প্রমাণ শহরের প্রায় সব বিলবোর্ডই লাল লাইটে লেখা। অবশ্যই তা চায়নিজ ভাষায়। রাস্তায় অন্য সাজসজ্জাও লালে লাল। এখানে প্রথম অবাক হলাম চায়নিজ ড্রাইভার বিল-কে পেয়ে। সে বাংলা বোঝে এবং বলেও। তার যাত্রী বাঙালি বেশি হয়। তাই শুনে শুনে শিখে ফেলেছে। আমরা তার শব্দ ভা-ার বাড়ানোর চেষ্টা করলাম। চীন দেশে চায়নিজ ছেলের মুখে বাংলা শুনে আমার মনে হলো, বাংলা ভাষাও পৃথিবীর শেষ দিন পর্যন্ত টিকে থাকবে। দিনে কুনমিং এয়ারপোর্ট ঈগল মনে হলো। এখানে দেখার মতো অনেক স্থান। আপেল, কমলা, আঙুর, চেরির বাগান, সবুজ পাহাড় ও গাঢ় লাল মাটির ফসলের ক্ষেত। তারা ক্রিকেট বোঝেই না, নামও জানে না। ওয়ার্ল্ড কাপ ক্রিকেট ২০১৫-এর খবরই রাখে না। আবার এখানকার যুবক-যুবতীরাও মোটেই নির্লজ্জ নয়, চুমু খেলেও বাড়াবাড়ি নেই।
পরের দিন ঔরীঁরধহম পধাব দেখতে গিয়েছি। রাস্তায় কয়েকটা বেশ বড় সুড়ঙ্গপথেও যেতে হয়েছে। গুহাটির আকার বিশাল। এর একেক অংশের রূপ একেক রকম। প্রথমে সুড়ঙ্গপথে গুহার একদম নিচে সিঁড়ি দিয়ে নেমে ঝরনার পানিধারার সরুপথে নৌকা ভ্রমণ। বৈঠা আমরাও বাইলাম। সুড়ঙ্গ পানিপথের দু’পাশে শক্ত পাথর। পথ বেশি সরু হলে নৌকা উল্টা ঘুরলো। নৌকা থেকে নেমে পাহাড় ঘেঁষে সরুপথে উঁচু-নিচু পথে ঝরনার রূপ দেখতে অনেক উপরের এমন এক জায়গায় পৌঁছালাম যেখানে পাথর দিয়ে ঢাকা বেশ বড় জায়গা। সেখানে সূর্যের আলো ঢুকবেই না। আবার পাথরের সিঁড়ি বেয়ে অনেক উপরে ওঠা যায়। বয়স্কদের জন্য চেয়ার পালকির ব্যবস্থাও আছে। চেয়ারে মানুষ বসিয়ে সামনে-পেছনে লাঠি ঘাড়ে নিয়ে দু’জন দিব্বি উপরে উঠছে। আর আমাদের নিজে উঠতেই বেশ কষ্ট হয়েছে। অনেক উপরে উঠে পা ঝোলানো কেবল কারে আবার নিচে এলাম। এরপর স্টোন ফরেস্ট দেখেছি। পথে মুরগি, ছাগল, মহিষের পাল ও রঙিন সবজি ক্ষেত, পাইন তো আছেই। অনেক জায়গা নিয়ে স্টোন ফরেস্ট। বড় বড় পাথরের স্তূপ, সারি সারি সাজানো-গোছানো পাথরের কতো রূপ, কোথাও হাতির মতো। এখানেও অনেক সিঁড়ি, সরু-নির্জন জায়গা আছে। কিন্তু নির্ভয়ে সবাই ঘুরে বেড়ায়। একটি অংশ ঘরের মতো বিশাল, খাটো পাতা আছে বালিশসহ। তা সবই পাথরের। হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে মনে হলো, কিছুক্ষণ শুয়ে থাকি, পাথরের বিছানা আর কোথায় পাবো! পরের দিন ফুলের জগৎ দেখেছি। ডড়ৎষফ ঐড়ৎঃর ঊীঢ়ড় ঋষড়বিৎ বিশাল ফুলের বাগান। ফুলের ঘড়ি, স্তম্ভ, জীবজন্তু, ছাতা, ফুলের ক্ষেত মুগ্ধ হয়ে দেখেছি। কিন্তু বড় জাহাজে কিছু কৃত্রিম ফুলও ছিল। কোথাও নানান রঙের শুধুই অর্কিড, একপাশে সুন্দর লেক। এরপর আমরা সাইট সিং কেবল কারে ‘ডিয়াঞ্চি’ লেক ও ‘ওয়েস্টার্ন হিল’ দেখলাম। যাদের উচ্চতাভীতি আছে তারা উঠলেও চোখ বন্ধ রাখবেন। কারণ ওই কেবল কার লেক রাস্তার ওভার ব্রিজের ওপর থেকে একেবারে খাড়া পাহাড়ের ওপর নিয়ে যাবে। উপর থেকে সুন্দর কুনমিং শহর দেখা যাবে। পাহাড়ের একদম ওপরে পার্কের মতো। একপাশে একটা বিশাল ঘণ্টাও আছে। ঘণ্টা বাজিয়ে নেমে এসে বিশাল লেকের ধারে দাঁড়িয়ে মোটা মোটা গাংচিলের ওড়া দেখেছি। এগুলো হাত থেকে খপ করে পাউরুটি নিয়ে খেয়ে যায়। এখানেও দেখলাম পরিষ্কারের জন্য সদা ব্যস্ত কর্মী। শেষে কেনাকাটার জন্য নাইট মার্কেটে গেলাম। অন্যসব মার্কেট বিকাল ৫টায় বন্ধ হয়ে যায়। জুতা কেনার সময় বড় মাপের জুতাই নেই। মনে পড়ে গেল, ছোটবেলায় শুনেছি চায়নিজ মেয়েদের লোহার জুতা পায়ে দিতে হয় যাতে পা ছোটই থাকে। দোকানে কাজ করতে করতে মেয়েদের সেলাই করতেও দেখলাম। কেউ ক্রুশকাঁটায় জুতা বুনছে, কেউ ঢ ক্রস স্টিচ-এ সুন্দর ওয়ালম্যাট সেলাই করছে। সময়ের মূল্য দিতে জানে তারা। কুনমিং পুরো শহরটাই ফুলে ভরা- সাদা, হলুদ, কমলা, পপি ফুলে। গোলাপের ঝাড়ও আছে। শেষের দিন ট্রাফিক জ্যামে গাড়ি আটকালো। আর এতেই মন ফিরলো ঢাকায়। বাসায় এসে স্মৃতি লিখতে গিয়ে কাছ থেকেই শুনতে পেলাম মর্মস্পর্শী কোকিলের পঞ্চমী সুর কু-উ-উ, কু-উ-উ। ওই সুর একই স্কেলে অপরিবর্তিত। ছোট্ট থেকে প্রতি বছর শুনি একই গলা, গলা সাধা। ওই সুর আমার ভেতরে ঢুকে কেমন যেন করে দেয়। তাই ‘চীন’ লেখা বাদ দিয়ে গেয়ে উঠলাম প্রিয় দীজেন্দ্রগীতি- যে গান আমার আব্বার খুব প্রিয় ছিল। জ্যোৎস্না রাতে সবাইকে নিয়ে গাইতেন-

‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে না কো তুমি
সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি।’

Read 1490 times

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…