সবুজ পাহাড়ে স্নিগ্ধ জলে

সবুজ পাহাড়ে স্নিগ্ধ জলে

গোলাম নবী রিপন



কিছুক্ষণ আগে মুষলধারে বৃষ্টি হয়েছে। সবাই ভিজেছি বৃষ্টি ও সবুজে। এখন বিকেলের হালকা রোদ। সূর্যের ওম গায়ে মেখে ঝরঝরে হয়ে পথ চলছি কখনো উঁচু পাহাড়, কখনো নিচু ঢাল বেয়ে। দলবদ্ধ হয়ে হেঁটে চলেছি আমরা ৫ জন, সঙ্গে আমাদের গাইড।
গন্তব্য সৈকতপাড়া। একটু পর পর গাইডকে জিজ্ঞাসা করছি আর কতদূর? সে বলছে, এই তো, আর মাত্র ১০ মিনিট। পাহাড়ি পথ যেন শেষই হচ্ছে না। চলতে চলতে অন্ধকার নেমে এলো। নাম না জানা পোকাগুলোর কণ্ঠস্বর জোড়ালো হয়ে উঠছে। যখন সৈকতপাড়া এলাম তখন সবাই খুব ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত। সবার আগে আমাদের বিশ্রাম দরকার। রাতে থাকার জন্য একটি ঘর জোগাড় করতে হবে। শেষ পর্যন্ত একটি ঘর পেলাম।
সেই কবে থেকে বান্দরবান যাবো যাবো, প্ল্যান করছি। কিন্তু সময় মেলাতে পারছিলাম না। ঠিক করলাম এবার রাখাইন ঝরনা দেখতে যাবো। গুগল ম্যাপ দেখে আমাদের রাস্তা ঠিক করে নিলাম। প্রথমে বগালেক থেকে হরমনপাড়া হয়ে সৈকতপাড়া। তারপর আনন্দপাড়া শেষে পুকুরপাড়া হয়ে রাখাইন ঝরনা। এবারে আমাদের ভ্রমণে সঙ্গী হলো সুব্রত, ফারুক, নজরুল, আবির। অনেক কষ্ট করে এস আলম পরিবহনের ৫টি টিকেট পেয়েছিলাম ৮ অক্টোবর ১০টার গাড়িতে। গাড়ি ছাড়লো সরাসরি বান্দরবানের উদ্দেশে। সবার চোখে-মুখে আনন্দ আর ভ্রমণপিয়াসী মন নিয়ে সকাল পৌনে ৬টায় আমরা পৌঁছে গেলাম বান্দরবানে। বাস থেকে নেমেই খুঁজতে শুরু করলাম রুমাবাজারে যাওয়ার চান্দেরগাড়ি। দুর্ভাগ্য, বান্দরবান-রুমাবাজারের মাঝপথে একটি ব্রিজ ভেঙে গেছে। তাই সরাসরি গাড়ি রুমা যেতে পারেনি। মাঝপথে গিয়ে বিপদে পরলাম। আগে থেকে ঠিক করে রাখা আমাদের গাইড সাংবুমকে ফোন দিয়ে একটি জিপ ভাড়া করলাম। রুমা থেকে এসে আমাদের বগালেক পর্যন্ত নিয়ে যাবে। অনেক অপেক্ষার পরে গাড়ি এলো, শুরু হলো বগার পথে যাত্রা। সকাল সাড়ে ৯টায় রুমা বাজার পৌঁছালাম। এখানে ৩০ মিনিটের মতো যাত্রাবিরতি করলাম। কারণ আর্মি ক্যাম্পে নাম লেখাতে এবং যাত্রাপথের শেষ কেনাকাটা সেরে ফেলতে হবেÑ রান্নার জন্য পেঁয়াজ, রসুন, তেল, মসলা ইত্যাদি।
সকাল ১০টার পর আবার শুরু হলো যাত্রা। একে তো কাঁচা-পাকা ইটের রাস্তা, এর উপর বর্ষায় আরো খারাপ অবস্থা। এভাবেই চলতে চলতে বগালেকের কাছে পৌঁছালাম। গাড়ি থেকে নেমে কিছুক্ষণ হাঁটার পর এলাম বগালেকের নিচে। মাথার উপরে প্রচ- রোদ, ঘামে সবাই যেন কাকভেজা হয়েছি। প্রায় ৩০ মিনিট পাহাড় বেয়ে উঠে এলাম বগালেকে।

 



চারদিকে পাহাড়ে ঘেরা, মাঝখানে অপূর্ব এক লেকÑ এ সৌন্দর্য আমাদের সব ক্লান্তি দূর করে দিল। স্বচ্ছ পানিতে সবাই মিলে গোসল সেরে দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম। সবাই যেন নতুন করে পূর্ণ শক্তি পেলাম।
আজ রাতের গন্তব্য সৈকতপাড়া। দুপুর আড়াইটায় বগালেক থেকে হেঁটে হরমনপাড়ায় পৌঁছালাম বিকেল ৪টা ২০ মিনিটে। বৃষ্টিতে পিচ্ছিল পাহাড়ি খাড়াপথ বেয়ে উঠে প্রায় আত্মবিশ্বাস হারানোর পালা। হরমোনপাড়া অসম্ভব সুন্দর। বোম আদিবাসীদের পাড়া বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। হাতে গোনা ১০-১২টির মতো ঘর হবে। প্রতিটি বাড়ির আশপাশ পেপে, কলা ও কমলা লেবুর গাছে সাজানো। ১০ মিনিটের বিশ্রামের মধ্যেই খেয়ে নিলাম এখানকার কমলা লেবু ও কলা। শুরু হলো সৈকতপাড়ার উদ্দেশে হাঁটা।
রাতে সৈকতপাড়া পৌঁছে হাত-মুখ ধুয়ে আমাদের থাকার ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে চলে এলো পাকা পেপে ও কলা। তা খেতে খেতে প্ল্যান করে ফেললাম রাতের খাবারের। গাইড সাংবুমকে দিয়ে পাহাড়ি মুরগি কিনে নজরুলের নেতৃত্বে রান্না হলো। রাতের খাবার খেয়ে যথানিয়মে ঘুমিয়ে পড়লাম সবাই। পরের দিন ভোর সাড়ে ৪টায় ঘুম থেকে উঠে বের হয়ে পড়লাম সূর্যোদয় দেখার জন্য। একাই ঘুরে দেখছিলাম পাড়াটি। এক সময় সূর্য উঠলো। অসম্ভব সুন্দর এক সকাল দেখলাম! সৈকতপাড়া প্রায় ২ হাজার ৬০০ ফিট উপরের একটা গ্রাম। বোম আদিবাসীর প্রায় ৩০টির মতো পরিবার বাস করে। পাড়ায় একটা চার্চ ও স্কুল এবং একটা খেলার মাঠও আছে।
সকাল ৮টায় সৈকতপাড়া থেকে হাঁটা শুরু করালাম আনন্দপাড়ার উদ্দেশে। সবার মধ্যে খুব তাড়া ছিল। কারণ আজ দুপুর ৩টার মধ্যেই আমাদের পৌঁছাতে হবে রাখাইন ঝিরিতে। পাহাড়ি জুমের ভেতর দিয়েই প্রায় ৭০০-৮০০ ফিট নিচে নেমে ঝিরিপথ ধরে হাঁটলাম। দু’পাশে বড় বড় গাছ। সূর্য়ের আলো প্রায় পড়ে না বললেই চলে। পায়ের নিচে পাথর ও ঝরনার স্রোতধারা।

এভাবে চলতে চলতে রাত সাড়ে ৯টায় চলে এলাম আনন্দপাড়া। ত্রিপুরা ও গারো আদিবাসী থাকে এই পাড়ায়। সব মিলিয়ে ১০-১২টির মতো ঘর হবে। সৈকতপাড়ার মতো অতটা উঁচু গ্রাম না হলেও এখান থেকে কেওক্রাডংসহ অনেক বড় পাহাড় দেখা যায়। এখানকার মানুষের সঙ্গে অনেক গল্প হলো।
পরদিন শুরু হলো পুকুরপাড়ার উদ্দেশে যাত্রা। এবার আমাদের প্রায় ১ হাজার ৪০০ ফিট নিচে নেমে আবার দুটি পাহাড় পাড়ি দিতে হবে। তারপর পুকুরপাড়া। সবাই খুব চিন্তিত, আনন্দপাড়া থেকে নামার পথটি নাকি অনেক ভয়ঙ্কর। এদিকে ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি পড়ছে, পাথর ও মাটির স্যাঁতসেতে রাস্তা, কোথাও কোথাও ঝোপজাড়ে রাস্তা হারিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা, এর উপর জোঁকের ভয় তো আছেই। এসব দেখে মোটামুটি সবাই কিছুটা চিন্তিত হলাম। যাহোক, সদা সতর্কতার সঙ্গে নামছি পাহাড় বেয়ে। বেশ কিছুদূর যেতেই সুব্রতর চিৎকারে মনে হলো পাহাড়ের আকাশটা ভেঙে পড়লো মাথার ওপর। কী হলো! জোঁক জোঁক। এর মানে সুব্রতকে জোঁকে ধরেছে। কেউ গিয়ে জোঁক ছাড়ালো তার পা থেকে। এরপর একে একে সবাইকেই জোঁকে ধরলো। শেষ পর্যন্ত জোঁক যেন সবার কাছে ছোট পিপড়ার ভূমিকা নিল। যতই জোঁক ধরছেÑ কিছুই আর মনে হচ্ছে না। অনেক কষ্টের পর পাহাড় বেয়ে নেমেই দেখলাম রুমা ঝিরি, অসাধারণ এক পাহাড়ি নদী প্রচ- শব্দ করে বয়ে চলেছে। মনে হচ্ছে, পুরো নদীটিই একটি ঝরনা। সবাই মিলে কিছু সময় ঝিরির পাড় ধরে হাটলাম। তারপর আবার শুরু হলো পাহাড়ে ওঠা।
প্রথম পাহাড় পার হওয়ার পর কিছুক্ষণ ঝিরির পাড় ধরে হেঁটে সামনে এসে দেখলাম আরেকটি পাহাড়। খুব বৃষ্টি এবং বিকট শব্দে
বিদুৎ চমকাচ্ছিল। সবাই ভিজে ভিজে চলে এলাম দ্বিতীয় পাহাড়ের ওপর এবং চোখে পড়লো কাক্সিক্ষত রাখাইন লেক। এটি ২ হাজর ফিট উপর থেকে দেখতে অসাধারণ লাগছিল। মনেই হচ্ছিল না, আমাদের বাংলাদেশ এত সুন্দর! লেকের একপাশ দিয়ে উঠে গেছে বিশাল পর্বতমালা, দু’পাশে দুটি গ্রাম। গ্রাম দুটির একটি পুকুরপাড়া, অন্যটি প্রাঞ্জুংপাড়া। আদিবাসী ত্রিপুরার বসবাস দু’পাড়াতেই।
তারপর শুরু হলো আবার পথ চলা। দুপুর ৩টায় নেমে এলাম পুকুরপাড়া। এখানে এসেই একটি ঘর ঠিক করে ব্যাগ রেখে গেলাম রাখাইন ঝিরিতে। পুকুরপাড়া থেকে প্রায় ১ ঘণ্টা লাগলো যেতে। সেখানে এক অপূর্ব নৈসর্গিক দৃশ্য।
রাখাইন ঝরনা প্রায় ৪০০ ফিটের মতো প্রশস্ত এবং বহু স্তরে সাজানো। প্রচ- স্রোতধারা বহুদূর বয়ে চলেছে। এর প্রতিটি বাঁকে রয়েছে লুকানো সৌন্দর্যের কারুকার্য। কোনোমতেই বিশ্বাস করা যায় না এত সুন্দর ঝরনা এ দেশে আছে। সন্ধ্যা পর্যন্ত কাটালাম এখানে। তারপর ফিরে এলাম পুকুরপাড়ায়।
পরদিন ফিরে আসার পালা। পুকুরপাড়া থেকে সকাল ১০টায় হাঁটা শুরু করে সন্ধ্যায় সৈকতপাড়া এলাম। এখান থেকে পরদিন সকাল ৬টায় হাঁটা শুরু করলাম রুমাবাজারের উদ্দেশে। সৈকতপাড়ার উঁচু পাহাড় থেকে বগামুখপাড়ার নিচ পর্যন্ত নামতে প্রায় ৩ ঘণ্টা লাগলো। এখান থেকে ঝিরিপথ ধরে হেঁটে রুমাবাজার এলাম দুপুর ২টায়।
এভাবেই শেষ করি ৪ দিনের হাঁটা ভ্রমণ। এরপর রুমা থেকে ৩টার গাড়িতে বান্দরবান এবং বান্দরবান থেকে ঢাকা।

Read 1251 times

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…