কেরালায় ক’দিন

কেরালায় ক’দিন

মাসুদ আলী

 

খুব গর্বভরে নিজেদের প্রদেশ সম্পর্কে বলে God's own country. কেরালায় মজার ব্যাপার হলো পাহাড়, সমুদ্র, বৃক্ষরাজি- সবই আছে। কোচি এয়ারপোর্ট থেকে মুন্নার। আর এয়ারপোর্ট থেকেই পেতে পারেন প্রিপেইড ট্যাক্সি তিন হাজার পাঁচশত রুপিতে। সেপ্টেম্বরে নাতিশীতষ্ণ কোচি। রাস্তায় অনেক গির্জা আর যিশুর মূর্তি দেখা যায় এবং এখানকার বাড়িগুলো মোটেও উঁচু নয়। সামনে উঠান আর গাছ, প্রায় সব বাড়ি একই রকম। কিন্তু নিরিবিলি আর শান্তি শান্তি ভাব!
এখানে এক সময় পর্তুগিজরা এসেছিল। ওই প্রভাবেই হয়ত ক্রিশ্চিয়ান ধর্মের প্রভাব বেশি।

মুন্নার ভারতের কেরালা রাজ্যের ইডুক্কি জেলায় অবস্থিত। পাহাড়-প্রস্তর ঘেরা মুন্নার একটি তামিল ও মালায়লাম শব্দের মিশ্রণ যার অর্থ তিন নদী। নদীগুলোর নামও দাঁতভাঙ্গা কঠিন- মুদ্রাপূজা, নাল্লাথান্নি ও কুন্ডলি। মুন্নার সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৬০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত কেরালার একটি হিল স্টেশন। কলকাতা থেকে কোচিন যেতে সবচেয়ে ভালো হবে সপ্তাহে মাত্র একটি ট্রেন যা শনিবার হাওড়া থেকে ছাড়ে। কোচিন পৌঁছাতে মাত্র পাঁচটি স্টপেজ আছে এই ট্রেনে। এই ট্রেনে গেলে সকাল ৬টায় পৌঁছাতে পারবেন। যদি আগে থেকেই হোটেল ঠিক করা থাকে তাহলে হোটেল গিয়ে ফ্রেশ হয়ে সকাল ৮টার মধ্যে বেরিয়ে পড়বেন।  কেরালা কয়েকটি সার্কিটে ভাগ করে দেখে নেয়া যায়। এর মধ্যে প্রধান দুটি হলো আলেপ্পি-কোট্টায়ম-কুইলন-ভারকালা-ত্রিবান্দ্রাম ও কোচিন-মুন্নার-পেরিয়ার।

থিরুভানান্থাপুরাম বা ত্রিবান্দ্রাম (Thiruvananthapuram/Trivandrum) : এটি পাহাড় ও সমুদ্রে ঘেরা, প্রাচীনত্ব আর আধুনিকতার গন্ধমাখা রাজধানী শহর। ইস্টফোর্ড বাসস্ট্যান্ডের কাছে শহরের প্রধান আকর্ষণ পদ্মনাভস্বামী মন্দির। ত্রিবাংকুর রাজ্যের গৃহদেবতা অনন্তশয্যায় শায়িত বিষ্ণুর মন্দির। পুরুষদের ধুতি পরে মন্দিরে ঢুকতে হয় এবং নারীদের প্রবেশ নিষেধ। মন্দির লাগোয়া পুত্তানমালিকা প্রাসাদ। ত্রিবাংকুর রাজাদের প্রাচীন ওই প্রাসাদ এখন মিউজিয়াম। শহরের মাঝখানে নেপিয়ার মিউজিয়াম। এছাড়া রয়েছে চিড়িয়াখানা ও বোটানিক্যাল গার্ডেন, আর্ট মিউজিয়াম, শ্রীচিত্রা আর্ট গ্যালারি, ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম ও সায়েন্স মিউজিয়াম। অটো বা গাড়ি ভাড়া করে অথবা কেরালা পর্যটনের কন্ডাক্টেড ট্যুরে বেড়িয়ে নেয়া যায় শহর ও এর আশপাশ।
শহর থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে শানগুমুখম সৈকত। সৈকতের ধারে পাথরের তৈরি ৩৫ মিটার লম্বা বিশাল আকারে মৎস্যকন্যার অপরূপ ভাস্কর্য। কাছেই ভেলি ট্যুরিস্ট ভিলেজ। থিরুভানান্থাপুরাম-এর কাছেই সমুদ্র উপকূলে থুম্বায় ভারতীয় স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশন ও বিক্রম সারাভাই স্পেস সেন্টার। এখানে সাধারণের প্রবেশ নিষেধ। থিরুভানান্থাপুরাম থেকে ৫১ কিলোমিটার দূরে ত্রিবাংকুর রাজাদের রাজধানী ভাস্কর্যের শহর পদ্মনাভপুরম।

কোভালাম সৈকত (Kovalam Beach) : ১৬ কিলোমিটার দক্ষিণে ভারতের অন্যতম সেরা সমুদ্র সৈকত কোভালাম। তাল, নারিকেল, পেঁপে, কলা গাছে ছাওয়া নিরালা সৈকতে শান্ত নীল সমুদ্র ছুঁয়ে যায় রুপালি বেলাভূমি।

পোনমুড়ি (Ponmuri) : থিরুভানান্থাপুরাম থেকে ৫৬ কিলোমিটার উত্তরে পশ্চিম ঘাট পর্বতে স্বাস্থ্যনিবাস পোনমুড়ি। কাছেই পিপ্পারা ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারি। হাতি, সম্বর, লেপার্ড আর নানান পাখির বাসভূমি।

কুইলন বা কোল্লাম (Quilon) : থিরুভানান্থাপুরাম থেকে ৭২ কিলোমিটার দূরে অষ্টমুড়ি লেকের ধারে ব্যাকওয়াটারের দেশ কুইলন। এটি কাজুবাদাম আর মশলার রাজ্য। লেকের পাড়ে কাজুবাদাম, নারিকেল, কলা ও কাঁঠাল গাছের সারি। শহরজুড়ে লাল টালিতে ছাওয়া কাঠের বাড়িঘর। কুইলনের সেরা আকর্ষণ ব্যাকওয়াটার ট্যুর। অষ্টমুড়ি লেক, ডিটিপিসির ট্যুরিস্ট রিসেপশন সেন্টার লাগোয়া ত্রিবান্দ্রাম, আলেপ্পি, কোচি, কোট্টায়মগামী বাস মেলে। ৫ কিলোমিটার দূরে সাগরপাড়ের ছোট্ট বন্দরগাঁ থাঙ্গাসেরি এক সময় ব্রিটিশ আর পর্তুগিজদের বাণিজ্য বন্দর ছিল।

 

 

ভারকালা (Varakala) : থিরুভানান্থাপুরাম থেকে কুইলন যাওয়ার পথেই পড়ে ভারকালা। কথিত আছে, বিষ্ণুর উপাসনার জায়গা খুঁজতে এসে এখানে নারদ তার ভাল্লাকালম বা বল্কল খুলে স্থান নির্ধারণ করেন। ওই থেকেই এ নামের উৎপত্তি। ভারকালার পাপনাশক সৈকতে স্নান করলে পাপ ধুয়ে যায়- এমনটিই বিশ্বাস করে স্থানীয় মানুষ। পাপনাশক সৈকতের পথে ২ হাজার বছরের প্রাচীন শ্রীজনার্দনস্বামী (বিষ্ণু) মন্দির।

আলেপ্পি বা আলহা পূজা (Alleppey/Alhappuza): 
সমুদ্র-নদী-খাড়ি আর মাকড়সার জালের মত অজস্র খাল নিয়ে কেরালার আলেপ্পি বা আলহাপূজা প্রাচ্যের ভেনিস নামে খ্যাত। এর একপাশে আরব সাগর, অন্যদিকে কেরালার বৃহত্তম লেক ভেম্বানাদ। এক সময় ত্রিবাংকুর রাজাদের বাণিজ্য কেন্দ্র ছিল আলেপ্পি। সমুদ্র থেকেও নিচুতে বাঁধ দিয়ে চাষ হচ্ছে নারিকেল, কলা আর নানান মশলা গাছের। এছাড়া আছে বিজয়া বিচ পার্ক, সি ভিউ পার্ক। আলেপ্পির দক্ষিণে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে আম্বালাপূজা শ্রীকৃষ্ণ মন্দির। কেরলীয় গঠনশৈলী আর দশ অবতারের ভিন্নরূপ- সব মিলিয়ে প্রাচীন এক চেহারা। ৩২ কিলোমিটার দূরে নাগরাজের মন্দির। নাগরাজ স্থানীয় এক ব্রাহ্মণ পরিবারের গৃহদেবতা। লোকবিশ্বাস, অলৌকিক এই দেবমূর্তি আসলে বিষ্ণু ও শিবের মিলিত রূপ।

কোট্টায়াম : আল্লাপূজা অথবা কোচি থেকে ব্যাকওয়াটার ভ্রমণে পৌঁছে যাওয়া যায় পশ্চিম ঘাট পর্বতমালা আর ভেম্বানাদ লেকের মাঝে কোট্টায়ামে। চিরহরিৎ আর পর্নমোচি অরণ্যে ছাওয়া কোট্টায়ামে চা, কফি, কোকো, গোল মরিচ, এলাচ ও রবারের চাষ করা হয়। ১৮ শতকের মধ্যভাগে থেক্কুমকুর রাজার রাজধানী ছিল কোট্টায়াম।

কোচিন বা কোচি (Cochin) : ভেম্বানাদ হ্রদ, আরব সাগর আর ব্যাকওয়াটারের মাঝে ১০টি দ্বীপ নিয়ে কেরালার অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্য কেন্দ্র কোচিন। নাম বদলে এখন কোচি। উইলিংডন দ্বীপ, এর্নাকুলাম আর ফোর্ট কোচি- কোচিনের তিন প্রধান দ্রষ্টব্যস্থল। কেটিডিসি-র লঞ্চ ট্যুরে দেখানো হয় ওয়েলিংডন দ্বীপ, কোচি বন্দর, জিউস সিনাগগ, মাত্তানচেরি প্রাসাদ, ফোর্ট কোচি ও বোলগেটি দ্বীপ। ফোর্ট কোচি দুর্গটি ব্রিটিশদের সৃষ্টি। কোচিতে আরেক দর্শনীয় বিষয় হলো
ঐতিহাসিক সেন্ট ফ্রান্সিস চার্চ। মাত্তানচেরি জেটির কাছে মাত্তানচেরি প্রাসাদ। কোচির আরেক আকর্ষণ কোচি মিউজিয়াম ও হিল প্যালেস মিউজিয়াম।

সারা বছর ধরেই নানান উৎসবে মেতে থাকে কেরালার মানুষ। এর মধ্যে এপ্রিলে নববর্ষের সময় ধান কাটার উৎসব ‘ওনাম’ এবং আগস্টের দ্বিতীয় শনিবারে আলেপ্পির পম্পা নদীতে নৌকাবাইচ বিশেষ আকর্ষণীয়। মার্চ-এপ্রিল ও অক্টোবর-নভেম্বরে ত্রিবান্দ্রামের পদ্মনাভস্বামীর মন্দিরে ১০ দিন ধরে উৎসব চলে। জানুয়ারিতে ত্রিসুরে হয় বর্ণাঢ্য এলিফ্যান্ট মার্চ। এই সময় ঘুরে আসা ভ্রমন পিপাসুদের জন্য সেরা সময়।

Read 2366 times

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…