রাতারগুল থেকে বিছানাকান্দি

রাতারগুল থেকে বিছানাকান্দি

হাসান তারেক চৌধুরী

 


রাতারগুল আর বিছানাকান্দি- দুটিই আজ ভ্রমণপিপাসুদের জন্য খুবই জনপ্রিয় নাম। তাই নতুন করে আর এর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কোনো অর্থ হয় না। তবুও আজ লিখছি। এর একটি কারণ হলো সামনেই আসছে বর্ষা। এখন ওই দুটি স্থানে ভ্রমণের সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। অন্য কারণটি হলো ভ্রমণপিপাসুদের আরো একটি নতুন অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়া। সাধারণত যাতায়াত ও থাকার সমস্যার কথা বিবেচনা করে আমাদের ভ্রমণপিপাসুরা ওই দুটি গন্তব্য আলাদাভাবে পরিকল্পনা করেন। ফলে তারা অসম্ভব সুন্দর আরো একটি অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হন।
রাতারগুলের সৌন্দর্য বর্ণনা হয়তো অনেকেই পড়ে থাকবেন ভ্রমণ কাহিনীতে এবং পড়েছেন অপরূপ সৌন্দর্যমন্ডিত বিছানাকান্দির কথাও। কিন্তু রাতারগুল ও বিছানাকান্দি আপাতদৃষ্টিতে দুটি আলাদা অবস্থানে থাকলেও অনেকেই হয়তো জানেন না, রাতারগুল থেকে গোয়াইন নদী ধরে নৌপথেই আপনি পৌঁছে যেতে পারেন বিছানাকান্দি। আর এ পথে যেতে যেতে আপনি উপভোগ করতে পারেন গোয়াইন নদীর দু’ধারের অপরূপ সৌন্দর্য। তাই আজ আমরা আর রাতারগুল কিংবা বিছানাকান্দি নয়, রাতারগুল থেকে বিছানাকান্দি যাওয়ার ওই পথ ধরে আপনাদের নিয়ে যাবো প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমিতে। চলুন ঘুরে আসি গোয়াইন নদী হয়ে বিছানাকান্দি। এরপর আবার ফিরে আসবো রাতারগুলে চেঙ্গি খালের শেষ পর্যন্ত।


আমরা জানতে পারলাম রাতারগুলের খুব কাছে মাত্র এক কিলোমিটারের মধ্যেই সোয়াম্প ফরেস্ট রোডের ওপরই ফতেহপুরে নাকি একটি রিসোর্ট হয়েছে ‘রাতারগুল হলিডে হোম’। শুনলাম, ফ্যামিলি নিয়ে থাকার জন্য জায়গাটি দারুণ। এ কথা শোনা মাত্রই বেশ কিছুদিন ধরে ভেবে রাখা ওই চিন্তাটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো। এর সঙ্গে জুটলো ভ্রমণপিপাসু আরো দুটি ফ্যামিলি। যে কথা সেই কাজ।


আগস্টের প্রথম সপ্তাহেই সদলবলে হাজির হলাম রাতারগুল হলিডে হোমে। দেখালাম ভুল শুনিনি। থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা এখানে আসলেই খুব ভালো। আমরা জানতে পারলাম, রাতারগুল থেকে নৌকায় করে সরাসরি বিছানাকান্দি যেতে লাগে প্রায় তিন ঘণ্টা। আবার ফিরতেও একই সময় লাগবে। তাই পরদিন সকাল ৭টার মধ্যেই আমরা রেডি হয়ে সদলবলে রওনা হলাম। পরিকল্পনা হলো, যেহেতু রাতারগুল ঘরের কাছেই সেহেতু আমরা প্রথমে রওনা হবো বিছানাকান্দির উদ্দেশে। তারপর ফেরার পথে দেখবো রাতারগুল। রাতারগুল বিট অফিসের কাছে চেঙ্গি খালের কাছেই আমরা পেয়ে গেলাম ইঞ্জিনচালিত বোট। শুরু হলো আমাদের যাত্রা।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের নৌকা খাল পেরিয়ে গোয়াইন নদীতে এসে পড়লো। স্বচ্ছ পানির ভেতর দিয়ে নদীর নিচ পর্যন্ত অনেকটাই দেখা যায়। আশপাশে সারি সারি নৌকা। কোনোটি ছোট আবার কোনো কোনোটি বিশাল। মাঝে মধ্যে দেখা যাচ্ছিল পাথর বহনকারী নৌকা। এগুলো আবার অনেকটাই সরু। ধীরে ধীরে আমাদের পার হয়ে যায় পাহাড় থেকে কেটে আনা সারি সারি বাঁশের ভেলা। কিছুক্ষণের মধ্যেই নদী কিছুটা সরু হয়ে ওঠে। দু’পাড়ই চলে আসে সহজ দৃষ্টিসীমায়। কোথাও দু’পাড়ে শিশুরা নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে, কোথাও বা লাল-নীল পোশাক পরে শিশুরা স্কুলের পথে। আবার কোথাও নদীর ধার দিয়ে হেঁটে যায় গরু-মহিষের পাল। বাঁকে বাঁকে জেলেরা জাল পেতে, কোঁচ ফেলে মাছ ধরছেন। এভাবে যেতে যেতেই হঠাৎ আকাশজুড়ে কালো মেঘ। আর তখনই মনে পড়লো আমাদের সঙ্গে ছাতা নেই। ঝমঝম বৃষ্টি নামলো কিছুক্ষণের মধ্যেই। নদীতে স্রোতের তোড়ে আমরা ঢুকলাম এক খালে। আর তা এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। দু’পাশে সারি সারি বাঁশের ঝাড় যেন খালের ওপর নুইয়ে পড়ে মাইলের পর মাইল গেইট তৈরি করে রেখেছে! এ দৃশ্য না দেখলে বোঝানো খুব কঠিন। কোথাও আবার খালের পাড় একেবারেই সমতল- মানুষ, গরু-মহিষ প্রায় হেঁটে পার হচ্ছে।


যাহোক, ভিজতে ভিজতে এক সময় আবার আমরা চলে এলাম মূল নদীতে। তা এক অসাধারণ দৃশ্য। দূরে পাহাড় আর আকাশ মিলিয়ে তৈরি করেছে এক অপরূপ শোভা! কিছুদূর পর পর পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে এসেছে সরু সরু কিছু। ভালো করে চোখ পেতে দেখলাম, ওগুলো আসলে পাহাড় বেয়ে নামা ঝরনা। কোথাও আবার নদীর পাড় ঘেঁষে বৃক্ষের বিশাল সারি। কিছুটা এগোতেই দেখলাম, সারি সারি সরু নৌকা একটির সঙ্গে অন্যটি বাঁধা। সামনের একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা তা টেনে নিয়ে যাচ্ছে। ঠিক যেন পানিতে চলছে নৌকার রেলগাড়ি।


আরো কিছুটা এগোতেই আমরা পড়লাম পিয়াইন নদীতে। মাঝে মধ্যে দু’পাড়ে যেন পাথরের পাহাড় করে রেখেছেন পাথর ব্যবসায়ীরা। এছাড়া দূরে দেখা যাচ্ছে মেঘালয় রাজ্যের সাতটি সুউচ্চ পর্বতের সঙ্গমস্থল।
সেখানে বহু ঝরনাধারার পানি একত্র হয়ে প্রবল বেগে আছড়ে পড়ছে পিয়াইন নদীতে। পাহাড় থেকে নেমে আসা স্রোতের সঙ্গে গড়িয়ে আসছে বড় বড় পাথর। এটিই আমাদের প্রথম গন্তব্য বিছানাকান্দি। বর্ষার দিনে বিছানাকান্দির পূর্ণ যৌবন লাভ করে। ভরাট জলে মেলে ধরে এর আসল রূপের বিস্তৃত মায়াজাল। শীতল ওই স্রোতধারার স্বর্গীয় বিছানায় আপনি পেতে পারেন প্রকৃতির মনোরম লাবণ্যের স্পর্শ।  নগর জীবনের যাবতীয় ক্লান্তি বিসর্জন দিয়ে মনের তৃষ্ণা মেটানোর সুযোগ করে দিতে পারে দু’পাশে আকাশচুম্বী পাহাড়। এর মধ্যে বয়ে চলে ঝরনার স্রোত। মনে হচ্ছিল যেন পরিষ্কার, টলটলে স্বচ্ছ পানিতে অর্ধডুবন্ত পাথরে মাথা রেখে হারিয়ে যাই ঘুমের রাজ্যে। বেশ কিছুক্ষণ ঝরনার পানিতে ঝাঁপাঝাঁপির পর পেট-পূজায় বসলাম নদীর পাড়েই ড্রাম ভেলার ওপর ‘জলপরী’ রেস্টুরেন্টে। এখানে খাবার ছিল খিচুড়ি আর ডিম ভাজি। খেতে খেতেই দেখলাম পাহাড়ে মেঘ আর সুর্যের লুকোচুরি খেলা।

এবার ফেরার পালা। ফিরলাম একই পথে। প্রায় তিন ঘণ্টার যাত্রা শেষে এবার গন্তব্য রাতারগুল। ভ্রমণপিপাসুদের জন্য একটা গা ছমছমে অনুভূতির নাম রাতারগুল। সিলেটের গোয়াইনঘাটে অবস্থিত এ বনটিকে বলা যায় বাংলাদেশের আমাজন। আমাজনের মতোই গাছগাছালির বেশির ভাগ অংশই বছরের অধিকাংশ সময় ডুবে থাকে ভারতের মেঘালয় থেকে আসা জলধারায়। গোয়াইন নদী হয়ে এই জলধারা এসে প্লাবিত করে পুরো রাতারগুল জলাবনটিকে। শীতকালে পানি অনেকটা কমে যায় বলে বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী (জুন থেকে অক্টোবর) রাতারগুল ভ্রমণের উপযুক্ত সময়। বর্ষায় এই বন অপরূপ রূপ ধারণ করে। এ সময় পানি এতোটাই স্বচ্ছ হয় যে, পানিতে বনের প্রতিবিম্ব দেখে মনে হয় যেন বনের নিচে আরেকটি বন। দেখতে পেলাম, ওই পানিতেই মাছরাঙা এবং নানান প্রজাতির বক খাবার খোঁজার চেষ্টা করছে। আরো আছে বালিহাঁস ও পানকৌড়ি। বানর ও কাঠবিড়ালি ছুটছে এ-ডাল থেকে ও-ডালে। ঘন জঙ্গলের আলো-আধারিতে গাছগুলো সব ডুবে আছে পানিতে। কোনোটি কোমর পানিতে, কোনোটির অর্ধেকই পানিতে। এতোই ঘন জঙ্গল যে, ভেতরের দিকটায় সূর্যের আলো গাছের পাতা ভেদ করে পৌঁছাতে পারে না। সব মিলিয়ে কেমন একটা ভুতুড়ে পরিবেশ! ডালপালা ছড়ানো গাছগুলো পথ রোধ করে ধরে। দু’হাত দিয়ে ডালপালা সরিয়ে এগোতে হয় সরুপথে সরু নৌকায় দুলতে দুলতে। এর উপর রাতারগুল হলো সাপের আখড়া।


পানি বেড়ে যাওয়ায় এ সময় সাপগুলো ঠাঁই নেয় গাছের ওপর। আমরা হঠাৎ দেখলাম এমনই একটি সবুজ রঙের সাপ যেন পোজ দিয়ে আছে অপরূপ ভঙ্গিমায়। বনের মধ্যেই রয়েছে একটি ওয়াচ টাওয়ার। এর ওপর থেকে দেখলাম প্রায় পুরোটা বনভূমি। সন্ধ্যা হওয়ার কিছু আগেই রিসোর্টে ফেরার পথ ধরলাম। কারণ রাতে রয়েছে বারবিকিউ চিকেনের সঙ্গে ভাজা মাছের এক মজাদার আয়োজন।

Read 930 times

77 comments

  • bahis siteleri
    18 February 2018

    Spot on with this write-up, I actually assume this web site needs rather more consideration. I all probably be once more to read way more, thanks for that info.

  • canl1 bahis oyna
    18 February 2018

    Well I definitely liked studying it. This subject provided by you is very constructive for accurate planning.

  • online bahis
    18 February 2018
    posted by online bahis

    Very informative article.Thanks Again. Cool.

  • canl1 bahis oyna
    18 February 2018

    Simply a smiling visitant here to share the love (:, btw outstanding layout. Everything should be made as simple as possible, but not one bit simpler. by Albert Einstein.

  • canl1 bahis siteleri
    18 February 2018

    very nice publish, i actually love this web site, carry on it

  • bahis siteleri
    18 February 2018

    There is visibly a lot to identify about this. I consider you made certain good points in features also.

  • online bahis _irketleri
    18 February 2018

    Perfect piece of work you have done, this site is really cool with fantastic info.

  • cannabis terpenes for sale
    18 February 2018

    This website truly has all the information I wanted about this subject and didn at know who to ask.

  • junkyards
    18 February 2018
    posted by junkyards

    Thanks-a-mundo for the blog. Fantastic.

  • greg bahnsen apologetics books
    17 February 2018

    Fantastic blog post. Fantastic.

Leave a comment

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

Twitter feed

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…