বিশাখাপত্তনম

বিশাখাপত্তনম

মাসুদ আলী

 

 

প্রেয়সীকে আমরা নানান নামেই ডাকি। আদুরে শিশুটিকে কত নামেই না ডাকে মা-বাবা। মানুষ তার বসবাসের স্থান, ঠিকানার নামেও পরিচিতি পায়। তবে মানুষ কিংবা স্থানের বহুবিধ নাম থাকাটা যেমন মজার ঠিক তেমনি বিপত্তিও কম নয়। বিশাখাপত্তনম কিংবা ভাইজ্যাগ যে নামেই ডাকুন এই অপরূপ শহর কিন্তু একটিই। দেবসেনাপতি কার্তিকের আরেক নাম বিশাখাস্বামী। একাদশ শতকে অন্ধ্রের রাজা যুদ্ধে জয়লাভের জন্য এখানে মন্দির গড়ে বিশাখাস্বামীর পূজা করেন। সেই থেকেই ধারণা করা হয় বিশাখাপত্তনম। তবে এ শহরের নামকরণ নিয়ে একাধিক গল্প শোনা যায়। অন্ধ্রপ্রদেশের মহারাজা, বারাণসী যাত্রার সময় এখানে বিশ্রাম নিয়েছিলেন। সেই সময় তিনি কার্তিকের (বিশাখা) মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে পূজা করেন। সেই থেকেই জায়গার নাম বিশাখাপত্তনম। ইতিহাস সাক্ষী বিশাখাপত্তনম ১৭৬৮ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হস্তগত হয়ে নাম বদলে হয় ভাইজ্যাগ।

যাই হোক, অনেক নামের ভিড়েও বিশাখাপত্তনমের প্রধান আর্কষণ শহর থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে রামকৃষ্ণ বিচ। পাহাড়ের গা ঘেঁষে উথালপাথাল সমুদ্র আর সৈকতে রয়েছে একটি কালী মন্দির। পেছনে রামকৃষ্ণ মিশন। শহর থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে ঋষিকোন্ডা বিচ। ঝাউবন, পাহাড় আর সোনালি বালুকাবেলা। রয়েছে সাবমেরিন মিউজিয়াম। ভারতের প্রথম সাবমেরিনের কলাকৌশল দেখতে হলে এখানে আসতে হয়। বিশাখা মিউজিয়ামে ঢুকলে অন্ধ্রের অতীত ইতিহাস প্রত্যক্ষ করা যায়। একে একে দেখে নেয়া যায় রোজ হিলে রোমান ক্যাথলিক গির্জা, দুর্গকোন্ডায় মসজিদ, ভেঙ্কটেশকোন্ডায় ভেঙ্কটেশ্বরের মন্দির। পাশাপাশি এই মিশ্র ধর্ম সংস্কৃতির সহাবস্থান যেন ভারতবর্ষেরই প্রকৃত চিত্র। ডলফিন নোজ পয়েন্ট লাইট হাউসের চূড়া থেকে নীল সাগরের অপরূপ রূপ অনুভব করাও দারুণ অভিজ্ঞতা। ঠিক তেমনি আরেক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা কৈলাসগিরি বা মাউন্ট কৈলাসের শিখর থেকে সাগরের রূপমালা দর্শন।

 

বিশাখাপত্তনম আরবান ডেভেলপমেন্ট অথরিটি নির্মিত পার্কটি ছোট-বড় সবার কাছেই দারুণ আকর্ষণীয়। বিশাখাপত্তনমের আরেক বেলাভূমি
ভিমানিপতনম বা ভিমিলি ঋষিকোন্ডা ছাড়িয়ে। শহর থেকে দূরত্ব ২৫ কিলোমিটার। লাইট হাউস, ডাচদুর্গের ভগ্নাবশেষ, নৃসিংহ মন্দির, সীতাকু- পায়ে পায়ে বেড়ানো যায়। ভিমিলি যাওয়ার পথে বভিকোন্ডা ও থোতলাকোন্ডায় বৌদ্ধবিহার, চৈত্য ও স্তূপের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে। পাখি দেখতে যেতে হবে শহর থেকে ৪৮ কিলোমিটার দূরে কোন্ডাকারলায়। বিশাখাপত্তনম থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরে নৃসিংহ দেবের মন্দিরের জন্য খ্যাত সীমাচলম। চতুষ্কোণ আকারের কারুকার্যময় ও মন্দিরটি চোল স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন।


আরাকু ভ্যালি
সমুদ্র ও পাহাড়ের সহাবস্থান বিশাখাপত্তনম দেখতে এক ছুটির দিনে এখানে এসে পৌঁছালাম। সাথে একটা ছোট্ট দল। বঙ্গোপসাগরের তীরে বন্দর শহর নয়নাভিরাম বিশাখাপটনম বা বিশাখাপত্তনম। তখন ভোর ৪টা। নামলাম বিশাখাপত্তনম বেল স্টেশনে। নির্ধারিত হোটেলে গিয়ে উঠলাম। তারপরই তৈরি হয়ে নিলাম চটপট। ভাড়া গাড়িতে চেপে সকাল ৭টার মধ্যেই বেরিয়ে পড়লাম আরাকু ভ্যালির উদ্দেশে। বিশাখাপত্তনম থেকে ৯০ কিলোমিটার পথ। পাহাড়ের পর পাহাড় ডিঙিয়ে আমাদের গাড়ি যখন বোরা কেভএ পৌঁছলো, তখন বুঝলাম কেন দলে দলে মানুষ এখানে আসে। লক্ষাধিক বছরের পুরনো চুনাপাথরের এই গুহায় অদ্ভুত সব প্রাকৃতিক ভাস্কর্য। স্ট্যালাগমাইট ও স্ট্যালাগটাইট পাথরের প্রাকৃতিক স্থাপত্যে এই গুহার যে কী অপরূপ সৌন্দর্য তা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।
বোরা থেকে বরে দূরত্ব প্রায় ৩০ কিলোমিটার। কফি বাগান দেখতে যাওয়া যাবে পূর্বঘাট পর্বতমালার এই সুন্দর উপত্যকায়। এরপর রয়েছে আদিবাসী মিউজিয়াম। আদিবাসী গ্রাম দেখে সাপরাইল নামের একটি পাহাড়ি নদী দেখলাম কেমন চালাকি করে পাহাড়ের পাশ দিয়ে নেমে যাচ্ছে। ওই নদীর জলে খেলা করছে পর্যটকরা। আরাকুর পার্ক দেখে পাহাড়ি পথ বেয়ে আমরা হোটেলে ফিরলাম রাত ৮টায়।

 

সীমাচলম মন্দির
এরপর আমাদের ভাইজ্যাগ ভ্রমণ শুরু হলো সীমাচলম মন্দির দর্শনের মাধ্যমে। সীমাচলম মন্দিরটি ভাইজ্যাগ থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরে পাহাড়ের ওপর ১১ শতকে তৈরি। মন্দিরে আছে বিষ্ণুর নৃসিংহ অবতারের মূর্তি যাতে সব সময় চন্দনের প্রলেপ লাগানো থাকে। অসংখ্য ভক্ত এই মন্দিরে পূজা দিতে আসে। শোনা যায়, শ্রী চৈতন্যদেবও এই মন্দিরে এসেছিলেন। ঘণ্টাতিনেক যাত্রার পর গাড়ি এসে দাঁড়ালো সীমাচলম পাহাড়ের পাদদেশে। এবার উপরে ওঠার পালা। গাড়ি না থাকলে পাহাড়ে ওঠার জন্য আলাদা বাসও পাওয়া যায়। পাকদ-ী বেয়ে গাড়ি উঠে চললো। নিচের বাড়িঘর, গাছপালা মন্দির ছোট থেকে আরো ছোট হতে লাগলো। মিনিট ১৫ পর গাড়ি এসে থামলো হাজার ফুট উঁচুঁ পাহাড়ের ওপর অবস্থিত সীমাচলম মন্দিরে। দ্রুত মন্দিরে প্রবেশ করতে হলে টিকিট কাটতে হয়। টিকিট কেটে লাইনে দাঁড়ালাম। বেশ ভিড়, প্রায় ঘণ্টাখানেক সময় লাগলো দেবদর্শনে। টিকিট কেটেই এই অবস্থা, ফ্রি দর্শন লাইনে ভিড়টা তো বলাই বাহুল্য। প্রাচীন এ মন্দির। মন্দিরের গায়ে অপূর্ব সব কারুƒকার্য। ডিম্বাকৃতি পাথরের গায়ে নৃসিংহ দেবের ছোট্ট মূর্তি ভালো করে বোঝা যায় না হলুদ, চন্দন আর ফুলমালার আধিক্যের জন্য। ঠেলা আর গুঁতো খেয়ে কোনো রকমে দেব দর্শন সেরে এসে দাঁড়ালাম প্রসাদ কাউন্টারের সামনে। দুটি বড় সাইজের লাড্ডু প্রসাদ হিসেবে পাওয়া গেল। মন্দিরের নিচের ছোট দোকানগুলো থেকে কিছু কেনাকাটা করে গাড়ি ছুটলাম হোটেলের উদ্দেশে।

ঋষিকোন্ডা বিচ
সোনালি বালিতে মোড়া ঋষিকোন্ডা বিচটি ছবির মতো সুন্দর। সমুদ্র, পাহাড়ও ছোট ছোট কটেজ মিলিয়ে এক অপূর্ব দৃশ্য। এখানে ওয়াটার স্পোর্টসেরও বন্দোবস্ত আছে। বিচ থেকে উঠে গেছে উঁচু পাহাড়, পাহাড়ের কোলে ছবির মতো সুন্দর অন্ধ্রপ্রদেশের সরকারের পর্যটন বিভাগের রিসোর্ট-হারিতার কটেজের সারি। ঋষিকোন্ডা বিচের ডান দিকে বেশ বড় বড় পাথর। এখানে স্নান করতে নামা বিপদজ্জনক। তবু জলে নেমে পড়েছে অনেক উৎসাহী মানুষ। ঋষিকোন্ডা বিচে আসার পথে পড়ল লাল মাটির পাহাড়। পাহাড়ের মাথায় রামা নাইডু ফিল্ম স্টুডিও। ছবির মতো সুন্দর সাজানো এই ছোট্ট ফিল্ম সিটিতে সিনেমার শুটিং হয়। খানিকক্ষণ ঘুরে দেখতে মন্দ লাগবে না। এখান থেকেও নিচে সমুদ্রের অসাধারণ রূপ দেখলে প্রাণভরে যায়।

 

Read 163 times

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…