অদ্ভুত আবেশে সুন্দরবন

অদ্ভুত আবেশে সুন্দরবন

হাসান তারেক চৌধুরী

 

একাধিকবার সুন্দরবন ঘুরে এলেও সুন্দরবন নিয়ে লেখা হয়ে ওঠেনি কোনোবারই। কারণও আছে বেশ কয়েকটি। প্রথমত. সুন্দরবন ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এতোই জনপ্রিয় একটি নাম যে, নতুন করে এটিকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কোনো অর্থ হয় না। দ্বিতীয়ত. সুন্দরবন এমন এক জায়গা যার প্রকৃত সৌন্দর্য না লিখে প্রকাশ করা যায়, না যায় ছবিতে ধরা। আর তৃতীয় কারণটি, না হয় কোনোরকমে জায়গাটার বর্ননা দিলাম; কিন্তু সুন্দরবনের বিশালতা, নিঃশব্দের কবিতা আর পবিত্র শান্তিময় অনুভূতি এই স্বল্প পরিসরে কীভাবে বোঝাবো। তবে এবারের সুন্দরবন ভ্রমণের পর কেন জানি কলমটি হাতে তুলেই নিলাম। ভাবলাম, যাই হোক না কেন, আমার অনুভূতি আর কিছু দৃশ্যের বর্ননা অন্তত দিতে পারি! প্রতি বছরের মতো এবারও আমাদের সুন্দরবন ভ্রমণের আয়োজন করে ট্যুর কোম্পানি ‘সাফারি প্লাস’। আমাদের গ্রুপটায় ছিলাম ৩৫ জন, সবাই বন্ধু। তাই এই সুযোগে গোটা একটা বাসই আমরা রিজার্ভ করলাম। হই চই আর নানান আনন্দের মধ্যে আমাদের যাত্রা শুরু হলো আরামবাগ থেকে। বাসটি রিজার্ভ হওয়ার সুবিধায় আমরা খুলনা না গিয়ে সরাসরি মোংলা এসে আমাদের রিজার্ভ জাহাজ ‘কোকিলমনি’তে উঠলাম। ভোর হতে না হতেই শুরু হলো আমাদের সুন্দরবন সফর। ভোরের অদ্ভুত সুন্দর আলোয় জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে পশুর নদীর দৃশ্য যে কতোটা সুন্দর তা বলে বোঝানো মুশকিল। দুপুর হতে হতেই আমরা পৌঁছে গেলাম হারবাড়িয়ায়।

এখানে রয়েছে বন বিভাগের একটা টাওয়ার যার ওপর থেকে বনের ভেতরে অনেকখানি দূর পর্যন্ত দেখা যায়। আর রয়েছে বনের ভেতর দিয়ে প্রায় মাইল দেড়েক লম্বা এক কাঠের ব্রিজ। টাওয়ার থেকে বিস্তৃত বনভূমির একটা অংশ দেখেই আমরা হাঁটা শুরু করলাম কাঠের ব্রিজ ধরে। ওই ব্রিজের সুবিধা হলো, এতে খুব কাছ থেকে গভীরভাবে বনের গাছপালা আর বেরিয়ে থাকা অদ্ভুত সুন্দর শ্বাসমূলগুলোর গঠন দেখা যায়। বের হওয়ার পথে রয়েছে লাল শাপলায় আবৃত এক দৃষ্টিনন্দন পুকুর।
হারবাড়িয়ায় সংক্ষিপ্ত সফর শেষ করে রওনা হলাম কটকার পথে। আমাদের এবারের ভ্রমণের মূল অংশ ছিল এটিই। সন্ধ্যার কিছুটা আগেই কটকায় পৌঁছে রাতের জন্য ওখানেই নোঙ্গর করলো আমাদের জাহাজ।

পরদিন সূর্য ওঠার আগেই জাহাজের সঙ্গে থাকা বড় এক নৌকা নিয়ে আমরা বের হলাম বনের সৌন্দর্য উপভোগ করতে। বনের মধ্যে ছোট ছোট খাল ধরে এগিয়ে চললো আমাদের নৌকা। কিছুক্ষণ পর পর মাথার উপর দিয়ে কিচিরমিচির করতে করতে উড়ে যাচ্ছে পাখির দল, নিচে নৌকার দাঁড়ের শব্দ। এছাড়া চারধারে শান্ত-সৌম্য এক নীরবতা। এরই মধ্যে ধীরে ধীরে আলো ফুটতে শুরু করলো। হঠাৎই শুরু হলো মাছরাঙাগুলোর ছোটাছুটি। খালের দু’ধারের গাছে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে কাঠবিড়ালিগুলো। দূরের আকাশে ফুটে উঠেছে গোলাপি আর আকাশির রঙের অদ্ভুত কারুকাজ- ঠিক যেন কোনো নারীর শাড়ির আঁচল।
আলো পুরোটা ছড়িয়ে পড়তেই আশপাশের মনোরম দৃশ্য ফুটে উঠলো।

প্রথমেই চোখে পড়লো দু’ধারে সারি সারি গোলপাতা গাছ। অদ্ভুত সুন্দর সবুজ রঙের ওই গাছগুলো দেখতে অনেকটা নারিকেল গাছের পাতার মতো, শুধু আকৃতিতে অনেক বড়। এগুলো বনের অন্যতম আকর্ষণ। এগুলো দিয়ে এসব অঞ্চলের মানুষ ঘরের ছাওনি বা ছাদ তৈরি করে। এখন কেউ আমাকে প্রশ্ন করতেই পারেন, তাহলে লম্বা লম্বা ওই পাতার গাছের কেন গোলপাতা বলা হয়? উত্তরটা হলো, আসলে পাতার জন্য গাছের ওই নাম নয়। গাছের ফলটি একেবারে গোল। অনেকটা ৩ নম্বর সাইজের ফুটবল যেন। তাই ওই ফলটিকে স্থানীয়ভাবে ডাকা হয় গোল ফল, গাছ হলো গোল গাছ আর পাতা হলো গোলপাতা। সুন্দরবনটি আসলে ছোট ছোট খালের মধ্যে অসংখ্য দ্বীপের মতো এলাকা নিয়ে তৈরি। এর মধ্য দিয়েই এগিয়ে চলে আমাদের নৌকা। দু’ধারে কাদা-চর আর ছোট বালুকাবেলা। খালটা একটা মোড় নিয়ে সামনে যেতেই চোখে পড়লো সারি সারি লম্বা গাছ। দেখেই বুঝলাম ওইগুলো সুন্দরী গাছ। ধারণা করা হয় গাছগুলো এই বনে প্রচুর পাওয়া যায় বলেই এ বনের নাম সুন্দরবন।
চলতে চলতে হঠাৎ মনে হলো, আরে! কয়েকটা বানর যদিও দেখেছি, পাখা মেলে উড়ে যাওয়া সাদা বক

দেখলাম প্রচুর, শঙ্খচিল দেখছি এখানে-ওখানে। কিন্তু একটি হরিণও তো দেখলাম না এখনো। মনটা একটু খারাপ হলো। তবে বিধাতার কী অদ্ভুত খেলা! এটি ভাবতে ভাবতেই এক বন্ধু হঠাৎ হরিণ হরিণ করে চেঁচিয়ে উঠলো। তা এতোই উৎসাহে যে, প্রথমে ভেবেছিলাম হরিণের হার্টফেল হবে। হরিণটি চমকে উঠে চোখ মেলে আমাদের দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। ঝট করে ক্যামেরাটি তুলে হরিণটির একটি ছবি তুলে নিলাম। দৃশ্যটি ছিল বাকরুদ্ধ করা।
জাহাজে ফিরে ডেকে উঠে দাঁড়াতেই নদীর পাড়ে কেওড়া বনের দিকে চোখ পড়লো। দেখি প্রায় ডজনখানেক হরিণ, কয়েকটি বানর ও কয়েকটি বন্যশূকর নদীর ধারে পানি খাচ্ছে আর মাঝে মধ্যে বনের ভেতরে চলে যাচ্ছে। অদ্ভুত সুন্দর এক দৃশ্য! ওই কেওড়া দেখতেও দারুণ মজার। মনে হয় যে, গাছের নিচে মাইলের পর মাইল ধরে কেউ সমান করে কাঁচি দিয়ে গোল করে কেটে রেখেছে অনেকটা কাঠবাদাম গাছের আকৃতিতে। হঠাৎ দেখলে ব্যাখ্যা পেতে কঠিন হয়। কিন্তু একটু ভাবলেই বোঝা যায় আসলে তা হরিণের উচ্চতা। হরিণ ওই পর্যন্তই মাথা তুলে পাতা খেতে পারে বলে মনে হয় যেন কেউ ওভাবে কাঁচি দিয়ে কেটে রেখেছে। হরিণ, বানর আর ওই কেওড়া বনের এই অদ্ভুত মিতালি অনন্তকাল ধরে চোখ মেলে দেখা যায়। পরবর্তী গন্তব্য জামতলা সৈকত।


নৌকা করে কটকা ওয়াচ টাওয়ারে পৌঁছে তৃণভূমি আর মাঝে মধ্যে বনের ভেতর দিয়ে প্রায় পৌনে তিন কিলোমিটার হেঁটে যেতে হয় জামতলা বিচে। এখানে মাঝে মধ্যে বাঘের যাতায়াত আছে বলে একটু গা ছমছম ভাবও আছে সবার ভেতর। এরই মধ্যে গাইড জানালেন, এখানে নাকি একটা বাঘ বাচ্চা দিয়েছে। শুনেই হাত-পা ঠা-া হয়ে এলো। এর মানে, বাঘ আশপাশেই থাকবে! গাইড সাহস দিলেন, ভয় নেই। বাঘ কাছে আসবে না। আর এলেও আমি আছি। আমি একটু সাহস করে গার্ডের দিকে ঘুরে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘এলে কী করবেন? বন্দুক দিয়ে বাঘটিকে গুলি করবেন?’ তিনি হেসে বললেন, ’না, বাঘকে সরাসরি গুলি করার নিয়ম নেই। ফাঁকা গুলি করবো।’ ঘাবড়ে গিয়ে গোলমাল করে ফেললাম। জানতে চাইলাম, ‘বন্দুকে গুলি আছে তো?’ তিনি কোনো উত্তর দিলেন না।


কিছুদূর যেতেই চোখে পড়লো বাঘের পায়ের ছাপ। আমি কাঁপতে কাঁপতে দ্রুত একটি ছবি তুলে নিলাম। ভয়ে আমার বুকের রক্ত হিম হয়ে আসছিল। কিন্তু আমরা মোটামুটি কোনো ঘটনা ছাড়াই নিরাপদে জামতলা বিচে পৌঁছে গেলাম।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা সব ভুলে গেলাম। ম্যাংগ্রোভ বনের মধ্যে ওই বালুর বিচের সৌন্দর্যে আমরা মুগ্ধ। বন আর বিচের মধ্যে দৌড়াদৌড়ি করে সময় যে কোথায় দিয়ে গড়িয়ে গেল তা আমরা বুঝতেই পারলাম না। এরপর এক সময় ফিরতি পথ ধরলাম। পুরোটাই কোনো ঝামেলা ছাড়া এলাম। কিন্তু বন পেরিয়ে প্রায় ঘাটের কাছে পৌঁছে গিয়েছি, এমন সময় তীব্র গন্ধে আমাদের গার্ড থমকে দাঁড়ালেন। আমরাও সবাই ভয়ে অ্যাটেনশন হয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। গার্ড আস্তে আস্তে বললেন, একটু আগেই বাঘ এখান দিয়ে গেছে, এটি তারই গন্ধ। আমারা গার্ডের নির্দেশমতো লাইন করে আস্তে আস্তে হেঁটে আমরা শেষ র্যন্ত নৌকায় পৌঁছালাম।
এ ভ্রমণে আমাদের বাঘ দেখা হয়নি। ওই অদ্ভুত অভিজ্ঞতায় এখনো আচ্ছন্ন হয়ে আছি। এরপরও আমরা করমজলে গিয়ে কুমিরের প্রজনন কেন্দ্র দেখেছি। দেখলাম রোমিও-জুলিয়েট আর পিলপিল নামের তিন কুমির। সূর্যাস্ত দেখেছি ডিমের চরে। কিন্তু এখনো আচ্ছন্ন হয়ে আছি বাঘের ওই অদ্ভুত গন্ধে।

 

ছবি : লেখক

Read 272 times

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…