রাতারগুল থেকে বিছানাকান্দি

হাসান তারেক চৌধুরী

 


রাতারগুল আর বিছানাকান্দি- দুটিই আজ ভ্রমণপিপাসুদের জন্য খুবই জনপ্রিয় নাম। তাই নতুন করে আর এর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কোনো অর্থ হয় না। তবুও আজ লিখছি। এর একটি কারণ হলো সামনেই আসছে বর্ষা। এখন ওই দুটি স্থানে ভ্রমণের সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। অন্য কারণটি হলো ভ্রমণপিপাসুদের আরো একটি নতুন অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়া। সাধারণত যাতায়াত ও থাকার সমস্যার কথা বিবেচনা করে আমাদের ভ্রমণপিপাসুরা ওই দুটি গন্তব্য আলাদাভাবে পরিকল্পনা করেন। ফলে তারা অসম্ভব সুন্দর আরো একটি অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হন।
রাতারগুলের সৌন্দর্য বর্ণনা হয়তো অনেকেই পড়ে থাকবেন ভ্রমণ কাহিনীতে এবং পড়েছেন অপরূপ সৌন্দর্যমন্ডিত বিছানাকান্দির কথাও। কিন্তু রাতারগুল ও বিছানাকান্দি আপাতদৃষ্টিতে দুটি আলাদা অবস্থানে থাকলেও অনেকেই হয়তো জানেন না, রাতারগুল থেকে গোয়াইন নদী ধরে নৌপথেই আপনি পৌঁছে যেতে পারেন বিছানাকান্দি। আর এ পথে যেতে যেতে আপনি উপভোগ করতে পারেন গোয়াইন নদীর দু’ধারের অপরূপ সৌন্দর্য। তাই আজ আমরা আর রাতারগুল কিংবা বিছানাকান্দি নয়, রাতারগুল থেকে বিছানাকান্দি যাওয়ার ওই পথ ধরে আপনাদের নিয়ে যাবো প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমিতে। চলুন ঘুরে আসি গোয়াইন নদী হয়ে বিছানাকান্দি। এরপর আবার ফিরে আসবো রাতারগুলে চেঙ্গি খালের শেষ পর্যন্ত।


আমরা জানতে পারলাম রাতারগুলের খুব কাছে মাত্র এক কিলোমিটারের মধ্যেই সোয়াম্প ফরেস্ট রোডের ওপরই ফতেহপুরে নাকি একটি রিসোর্ট হয়েছে ‘রাতারগুল হলিডে হোম’। শুনলাম, ফ্যামিলি নিয়ে থাকার জন্য জায়গাটি দারুণ। এ কথা শোনা মাত্রই বেশ কিছুদিন ধরে ভেবে রাখা ওই চিন্তাটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো। এর সঙ্গে জুটলো ভ্রমণপিপাসু আরো দুটি ফ্যামিলি। যে কথা সেই কাজ।


আগস্টের প্রথম সপ্তাহেই সদলবলে হাজির হলাম রাতারগুল হলিডে হোমে। দেখালাম ভুল শুনিনি। থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা এখানে আসলেই খুব ভালো। আমরা জানতে পারলাম, রাতারগুল থেকে নৌকায় করে সরাসরি বিছানাকান্দি যেতে লাগে প্রায় তিন ঘণ্টা। আবার ফিরতেও একই সময় লাগবে। তাই পরদিন সকাল ৭টার মধ্যেই আমরা রেডি হয়ে সদলবলে রওনা হলাম। পরিকল্পনা হলো, যেহেতু রাতারগুল ঘরের কাছেই সেহেতু আমরা প্রথমে রওনা হবো বিছানাকান্দির উদ্দেশে। তারপর ফেরার পথে দেখবো রাতারগুল। রাতারগুল বিট অফিসের কাছে চেঙ্গি খালের কাছেই আমরা পেয়ে গেলাম ইঞ্জিনচালিত বোট। শুরু হলো আমাদের যাত্রা।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের নৌকা খাল পেরিয়ে গোয়াইন নদীতে এসে পড়লো। স্বচ্ছ পানির ভেতর দিয়ে নদীর নিচ পর্যন্ত অনেকটাই দেখা যায়। আশপাশে সারি সারি নৌকা। কোনোটি ছোট আবার কোনো কোনোটি বিশাল। মাঝে মধ্যে দেখা যাচ্ছিল পাথর বহনকারী নৌকা। এগুলো আবার অনেকটাই সরু। ধীরে ধীরে আমাদের পার হয়ে যায় পাহাড় থেকে কেটে আনা সারি সারি বাঁশের ভেলা। কিছুক্ষণের মধ্যেই নদী কিছুটা সরু হয়ে ওঠে। দু’পাড়ই চলে আসে সহজ দৃষ্টিসীমায়। কোথাও দু’পাড়ে শিশুরা নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে, কোথাও বা লাল-নীল পোশাক পরে শিশুরা স্কুলের পথে। আবার কোথাও নদীর ধার দিয়ে হেঁটে যায় গরু-মহিষের পাল। বাঁকে বাঁকে জেলেরা জাল পেতে, কোঁচ ফেলে মাছ ধরছেন। এভাবে যেতে যেতেই হঠাৎ আকাশজুড়ে কালো মেঘ। আর তখনই মনে পড়লো আমাদের সঙ্গে ছাতা নেই। ঝমঝম বৃষ্টি নামলো কিছুক্ষণের মধ্যেই। নদীতে স্রোতের তোড়ে আমরা ঢুকলাম এক খালে। আর তা এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। দু’পাশে সারি সারি বাঁশের ঝাড় যেন খালের ওপর নুইয়ে পড়ে মাইলের পর মাইল গেইট তৈরি করে রেখেছে! এ দৃশ্য না দেখলে বোঝানো খুব কঠিন। কোথাও আবার খালের পাড় একেবারেই সমতল- মানুষ, গরু-মহিষ প্রায় হেঁটে পার হচ্ছে।


যাহোক, ভিজতে ভিজতে এক সময় আবার আমরা চলে এলাম মূল নদীতে। তা এক অসাধারণ দৃশ্য। দূরে পাহাড় আর আকাশ মিলিয়ে তৈরি করেছে এক অপরূপ শোভা! কিছুদূর পর পর পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে এসেছে সরু সরু কিছু। ভালো করে চোখ পেতে দেখলাম, ওগুলো আসলে পাহাড় বেয়ে নামা ঝরনা। কোথাও আবার নদীর পাড় ঘেঁষে বৃক্ষের বিশাল সারি। কিছুটা এগোতেই দেখলাম, সারি সারি সরু নৌকা একটির সঙ্গে অন্যটি বাঁধা। সামনের একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা তা টেনে নিয়ে যাচ্ছে। ঠিক যেন পানিতে চলছে নৌকার রেলগাড়ি।


আরো কিছুটা এগোতেই আমরা পড়লাম পিয়াইন নদীতে। মাঝে মধ্যে দু’পাড়ে যেন পাথরের পাহাড় করে রেখেছেন পাথর ব্যবসায়ীরা। এছাড়া দূরে দেখা যাচ্ছে মেঘালয় রাজ্যের সাতটি সুউচ্চ পর্বতের সঙ্গমস্থল।
সেখানে বহু ঝরনাধারার পানি একত্র হয়ে প্রবল বেগে আছড়ে পড়ছে পিয়াইন নদীতে। পাহাড় থেকে নেমে আসা স্রোতের সঙ্গে গড়িয়ে আসছে বড় বড় পাথর। এটিই আমাদের প্রথম গন্তব্য বিছানাকান্দি। বর্ষার দিনে বিছানাকান্দির পূর্ণ যৌবন লাভ করে। ভরাট জলে মেলে ধরে এর আসল রূপের বিস্তৃত মায়াজাল। শীতল ওই স্রোতধারার স্বর্গীয় বিছানায় আপনি পেতে পারেন প্রকৃতির মনোরম লাবণ্যের স্পর্শ।  নগর জীবনের যাবতীয় ক্লান্তি বিসর্জন দিয়ে মনের তৃষ্ণা মেটানোর সুযোগ করে দিতে পারে দু’পাশে আকাশচুম্বী পাহাড়। এর মধ্যে বয়ে চলে ঝরনার স্রোত। মনে হচ্ছিল যেন পরিষ্কার, টলটলে স্বচ্ছ পানিতে অর্ধডুবন্ত পাথরে মাথা রেখে হারিয়ে যাই ঘুমের রাজ্যে। বেশ কিছুক্ষণ ঝরনার পানিতে ঝাঁপাঝাঁপির পর পেট-পূজায় বসলাম নদীর পাড়েই ড্রাম ভেলার ওপর ‘জলপরী’ রেস্টুরেন্টে। এখানে খাবার ছিল খিচুড়ি আর ডিম ভাজি। খেতে খেতেই দেখলাম পাহাড়ে মেঘ আর সুর্যের লুকোচুরি খেলা।

এবার ফেরার পালা। ফিরলাম একই পথে। প্রায় তিন ঘণ্টার যাত্রা শেষে এবার গন্তব্য রাতারগুল। ভ্রমণপিপাসুদের জন্য একটা গা ছমছমে অনুভূতির নাম রাতারগুল। সিলেটের গোয়াইনঘাটে অবস্থিত এ বনটিকে বলা যায় বাংলাদেশের আমাজন। আমাজনের মতোই গাছগাছালির বেশির ভাগ অংশই বছরের অধিকাংশ সময় ডুবে থাকে ভারতের মেঘালয় থেকে আসা জলধারায়। গোয়াইন নদী হয়ে এই জলধারা এসে প্লাবিত করে পুরো রাতারগুল জলাবনটিকে। শীতকালে পানি অনেকটা কমে যায় বলে বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী (জুন থেকে অক্টোবর) রাতারগুল ভ্রমণের উপযুক্ত সময়। বর্ষায় এই বন অপরূপ রূপ ধারণ করে। এ সময় পানি এতোটাই স্বচ্ছ হয় যে, পানিতে বনের প্রতিবিম্ব দেখে মনে হয় যেন বনের নিচে আরেকটি বন। দেখতে পেলাম, ওই পানিতেই মাছরাঙা এবং নানান প্রজাতির বক খাবার খোঁজার চেষ্টা করছে। আরো আছে বালিহাঁস ও পানকৌড়ি। বানর ও কাঠবিড়ালি ছুটছে এ-ডাল থেকে ও-ডালে। ঘন জঙ্গলের আলো-আধারিতে গাছগুলো সব ডুবে আছে পানিতে। কোনোটি কোমর পানিতে, কোনোটির অর্ধেকই পানিতে। এতোই ঘন জঙ্গল যে, ভেতরের দিকটায় সূর্যের আলো গাছের পাতা ভেদ করে পৌঁছাতে পারে না। সব মিলিয়ে কেমন একটা ভুতুড়ে পরিবেশ! ডালপালা ছড়ানো গাছগুলো পথ রোধ করে ধরে। দু’হাত দিয়ে ডালপালা সরিয়ে এগোতে হয় সরুপথে সরু নৌকায় দুলতে দুলতে। এর উপর রাতারগুল হলো সাপের আখড়া।


পানি বেড়ে যাওয়ায় এ সময় সাপগুলো ঠাঁই নেয় গাছের ওপর। আমরা হঠাৎ দেখলাম এমনই একটি সবুজ রঙের সাপ যেন পোজ দিয়ে আছে অপরূপ ভঙ্গিমায়। বনের মধ্যেই রয়েছে একটি ওয়াচ টাওয়ার। এর ওপর থেকে দেখলাম প্রায় পুরোটা বনভূমি। সন্ধ্যা হওয়ার কিছু আগেই রিসোর্টে ফেরার পথ ধরলাম। কারণ রাতে রয়েছে বারবিকিউ চিকেনের সঙ্গে ভাজা মাছের এক মজাদার আয়োজন।

কেরালায় ক’দিন

মাসুদ আলী

 

খুব গর্বভরে নিজেদের প্রদেশ সম্পর্কে বলে God's own country. কেরালায় মজার ব্যাপার হলো পাহাড়, সমুদ্র, বৃক্ষরাজি- সবই আছে। কোচি এয়ারপোর্ট থেকে মুন্নার। আর এয়ারপোর্ট থেকেই পেতে পারেন প্রিপেইড ট্যাক্সি তিন হাজার পাঁচশত রুপিতে। সেপ্টেম্বরে নাতিশীতষ্ণ কোচি। রাস্তায় অনেক গির্জা আর যিশুর মূর্তি দেখা যায় এবং এখানকার বাড়িগুলো মোটেও উঁচু নয়। সামনে উঠান আর গাছ, প্রায় সব বাড়ি একই রকম। কিন্তু নিরিবিলি আর শান্তি শান্তি ভাব!
এখানে এক সময় পর্তুগিজরা এসেছিল। ওই প্রভাবেই হয়ত ক্রিশ্চিয়ান ধর্মের প্রভাব বেশি।

মুন্নার ভারতের কেরালা রাজ্যের ইডুক্কি জেলায় অবস্থিত। পাহাড়-প্রস্তর ঘেরা মুন্নার একটি তামিল ও মালায়লাম শব্দের মিশ্রণ যার অর্থ তিন নদী। নদীগুলোর নামও দাঁতভাঙ্গা কঠিন- মুদ্রাপূজা, নাল্লাথান্নি ও কুন্ডলি। মুন্নার সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৬০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত কেরালার একটি হিল স্টেশন। কলকাতা থেকে কোচিন যেতে সবচেয়ে ভালো হবে সপ্তাহে মাত্র একটি ট্রেন যা শনিবার হাওড়া থেকে ছাড়ে। কোচিন পৌঁছাতে মাত্র পাঁচটি স্টপেজ আছে এই ট্রেনে। এই ট্রেনে গেলে সকাল ৬টায় পৌঁছাতে পারবেন। যদি আগে থেকেই হোটেল ঠিক করা থাকে তাহলে হোটেল গিয়ে ফ্রেশ হয়ে সকাল ৮টার মধ্যে বেরিয়ে পড়বেন।  কেরালা কয়েকটি সার্কিটে ভাগ করে দেখে নেয়া যায়। এর মধ্যে প্রধান দুটি হলো আলেপ্পি-কোট্টায়ম-কুইলন-ভারকালা-ত্রিবান্দ্রাম ও কোচিন-মুন্নার-পেরিয়ার।

থিরুভানান্থাপুরাম বা ত্রিবান্দ্রাম (Thiruvananthapuram/Trivandrum) : এটি পাহাড় ও সমুদ্রে ঘেরা, প্রাচীনত্ব আর আধুনিকতার গন্ধমাখা রাজধানী শহর। ইস্টফোর্ড বাসস্ট্যান্ডের কাছে শহরের প্রধান আকর্ষণ পদ্মনাভস্বামী মন্দির। ত্রিবাংকুর রাজ্যের গৃহদেবতা অনন্তশয্যায় শায়িত বিষ্ণুর মন্দির। পুরুষদের ধুতি পরে মন্দিরে ঢুকতে হয় এবং নারীদের প্রবেশ নিষেধ। মন্দির লাগোয়া পুত্তানমালিকা প্রাসাদ। ত্রিবাংকুর রাজাদের প্রাচীন ওই প্রাসাদ এখন মিউজিয়াম। শহরের মাঝখানে নেপিয়ার মিউজিয়াম। এছাড়া রয়েছে চিড়িয়াখানা ও বোটানিক্যাল গার্ডেন, আর্ট মিউজিয়াম, শ্রীচিত্রা আর্ট গ্যালারি, ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম ও সায়েন্স মিউজিয়াম। অটো বা গাড়ি ভাড়া করে অথবা কেরালা পর্যটনের কন্ডাক্টেড ট্যুরে বেড়িয়ে নেয়া যায় শহর ও এর আশপাশ।
শহর থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে শানগুমুখম সৈকত। সৈকতের ধারে পাথরের তৈরি ৩৫ মিটার লম্বা বিশাল আকারে মৎস্যকন্যার অপরূপ ভাস্কর্য। কাছেই ভেলি ট্যুরিস্ট ভিলেজ। থিরুভানান্থাপুরাম-এর কাছেই সমুদ্র উপকূলে থুম্বায় ভারতীয় স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশন ও বিক্রম সারাভাই স্পেস সেন্টার। এখানে সাধারণের প্রবেশ নিষেধ। থিরুভানান্থাপুরাম থেকে ৫১ কিলোমিটার দূরে ত্রিবাংকুর রাজাদের রাজধানী ভাস্কর্যের শহর পদ্মনাভপুরম।

কোভালাম সৈকত (Kovalam Beach) : ১৬ কিলোমিটার দক্ষিণে ভারতের অন্যতম সেরা সমুদ্র সৈকত কোভালাম। তাল, নারিকেল, পেঁপে, কলা গাছে ছাওয়া নিরালা সৈকতে শান্ত নীল সমুদ্র ছুঁয়ে যায় রুপালি বেলাভূমি।

পোনমুড়ি (Ponmuri) : থিরুভানান্থাপুরাম থেকে ৫৬ কিলোমিটার উত্তরে পশ্চিম ঘাট পর্বতে স্বাস্থ্যনিবাস পোনমুড়ি। কাছেই পিপ্পারা ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারি। হাতি, সম্বর, লেপার্ড আর নানান পাখির বাসভূমি।

কুইলন বা কোল্লাম (Quilon) : থিরুভানান্থাপুরাম থেকে ৭২ কিলোমিটার দূরে অষ্টমুড়ি লেকের ধারে ব্যাকওয়াটারের দেশ কুইলন। এটি কাজুবাদাম আর মশলার রাজ্য। লেকের পাড়ে কাজুবাদাম, নারিকেল, কলা ও কাঁঠাল গাছের সারি। শহরজুড়ে লাল টালিতে ছাওয়া কাঠের বাড়িঘর। কুইলনের সেরা আকর্ষণ ব্যাকওয়াটার ট্যুর। অষ্টমুড়ি লেক, ডিটিপিসির ট্যুরিস্ট রিসেপশন সেন্টার লাগোয়া ত্রিবান্দ্রাম, আলেপ্পি, কোচি, কোট্টায়মগামী বাস মেলে। ৫ কিলোমিটার দূরে সাগরপাড়ের ছোট্ট বন্দরগাঁ থাঙ্গাসেরি এক সময় ব্রিটিশ আর পর্তুগিজদের বাণিজ্য বন্দর ছিল।

 

 

ভারকালা (Varakala) : থিরুভানান্থাপুরাম থেকে কুইলন যাওয়ার পথেই পড়ে ভারকালা। কথিত আছে, বিষ্ণুর উপাসনার জায়গা খুঁজতে এসে এখানে নারদ তার ভাল্লাকালম বা বল্কল খুলে স্থান নির্ধারণ করেন। ওই থেকেই এ নামের উৎপত্তি। ভারকালার পাপনাশক সৈকতে স্নান করলে পাপ ধুয়ে যায়- এমনটিই বিশ্বাস করে স্থানীয় মানুষ। পাপনাশক সৈকতের পথে ২ হাজার বছরের প্রাচীন শ্রীজনার্দনস্বামী (বিষ্ণু) মন্দির।

আলেপ্পি বা আলহা পূজা (Alleppey/Alhappuza): 
সমুদ্র-নদী-খাড়ি আর মাকড়সার জালের মত অজস্র খাল নিয়ে কেরালার আলেপ্পি বা আলহাপূজা প্রাচ্যের ভেনিস নামে খ্যাত। এর একপাশে আরব সাগর, অন্যদিকে কেরালার বৃহত্তম লেক ভেম্বানাদ। এক সময় ত্রিবাংকুর রাজাদের বাণিজ্য কেন্দ্র ছিল আলেপ্পি। সমুদ্র থেকেও নিচুতে বাঁধ দিয়ে চাষ হচ্ছে নারিকেল, কলা আর নানান মশলা গাছের। এছাড়া আছে বিজয়া বিচ পার্ক, সি ভিউ পার্ক। আলেপ্পির দক্ষিণে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে আম্বালাপূজা শ্রীকৃষ্ণ মন্দির। কেরলীয় গঠনশৈলী আর দশ অবতারের ভিন্নরূপ- সব মিলিয়ে প্রাচীন এক চেহারা। ৩২ কিলোমিটার দূরে নাগরাজের মন্দির। নাগরাজ স্থানীয় এক ব্রাহ্মণ পরিবারের গৃহদেবতা। লোকবিশ্বাস, অলৌকিক এই দেবমূর্তি আসলে বিষ্ণু ও শিবের মিলিত রূপ।

কোট্টায়াম : আল্লাপূজা অথবা কোচি থেকে ব্যাকওয়াটার ভ্রমণে পৌঁছে যাওয়া যায় পশ্চিম ঘাট পর্বতমালা আর ভেম্বানাদ লেকের মাঝে কোট্টায়ামে। চিরহরিৎ আর পর্নমোচি অরণ্যে ছাওয়া কোট্টায়ামে চা, কফি, কোকো, গোল মরিচ, এলাচ ও রবারের চাষ করা হয়। ১৮ শতকের মধ্যভাগে থেক্কুমকুর রাজার রাজধানী ছিল কোট্টায়াম।

কোচিন বা কোচি (Cochin) : ভেম্বানাদ হ্রদ, আরব সাগর আর ব্যাকওয়াটারের মাঝে ১০টি দ্বীপ নিয়ে কেরালার অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্য কেন্দ্র কোচিন। নাম বদলে এখন কোচি। উইলিংডন দ্বীপ, এর্নাকুলাম আর ফোর্ট কোচি- কোচিনের তিন প্রধান দ্রষ্টব্যস্থল। কেটিডিসি-র লঞ্চ ট্যুরে দেখানো হয় ওয়েলিংডন দ্বীপ, কোচি বন্দর, জিউস সিনাগগ, মাত্তানচেরি প্রাসাদ, ফোর্ট কোচি ও বোলগেটি দ্বীপ। ফোর্ট কোচি দুর্গটি ব্রিটিশদের সৃষ্টি। কোচিতে আরেক দর্শনীয় বিষয় হলো
ঐতিহাসিক সেন্ট ফ্রান্সিস চার্চ। মাত্তানচেরি জেটির কাছে মাত্তানচেরি প্রাসাদ। কোচির আরেক আকর্ষণ কোচি মিউজিয়াম ও হিল প্যালেস মিউজিয়াম।

সারা বছর ধরেই নানান উৎসবে মেতে থাকে কেরালার মানুষ। এর মধ্যে এপ্রিলে নববর্ষের সময় ধান কাটার উৎসব ‘ওনাম’ এবং আগস্টের দ্বিতীয় শনিবারে আলেপ্পির পম্পা নদীতে নৌকাবাইচ বিশেষ আকর্ষণীয়। মার্চ-এপ্রিল ও অক্টোবর-নভেম্বরে ত্রিবান্দ্রামের পদ্মনাভস্বামীর মন্দিরে ১০ দিন ধরে উৎসব চলে। জানুয়ারিতে ত্রিসুরে হয় বর্ণাঢ্য এলিফ্যান্ট মার্চ। এই সময় ঘুরে আসা ভ্রমন পিপাসুদের জন্য সেরা সময়।

সবুজ পাহাড়ে স্নিগ্ধ জলে

গোলাম নবী রিপন



কিছুক্ষণ আগে মুষলধারে বৃষ্টি হয়েছে। সবাই ভিজেছি বৃষ্টি ও সবুজে। এখন বিকেলের হালকা রোদ। সূর্যের ওম গায়ে মেখে ঝরঝরে হয়ে পথ চলছি কখনো উঁচু পাহাড়, কখনো নিচু ঢাল বেয়ে। দলবদ্ধ হয়ে হেঁটে চলেছি আমরা ৫ জন, সঙ্গে আমাদের গাইড।
গন্তব্য সৈকতপাড়া। একটু পর পর গাইডকে জিজ্ঞাসা করছি আর কতদূর? সে বলছে, এই তো, আর মাত্র ১০ মিনিট। পাহাড়ি পথ যেন শেষই হচ্ছে না। চলতে চলতে অন্ধকার নেমে এলো। নাম না জানা পোকাগুলোর কণ্ঠস্বর জোড়ালো হয়ে উঠছে। যখন সৈকতপাড়া এলাম তখন সবাই খুব ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত। সবার আগে আমাদের বিশ্রাম দরকার। রাতে থাকার জন্য একটি ঘর জোগাড় করতে হবে। শেষ পর্যন্ত একটি ঘর পেলাম।
সেই কবে থেকে বান্দরবান যাবো যাবো, প্ল্যান করছি। কিন্তু সময় মেলাতে পারছিলাম না। ঠিক করলাম এবার রাখাইন ঝরনা দেখতে যাবো। গুগল ম্যাপ দেখে আমাদের রাস্তা ঠিক করে নিলাম। প্রথমে বগালেক থেকে হরমনপাড়া হয়ে সৈকতপাড়া। তারপর আনন্দপাড়া শেষে পুকুরপাড়া হয়ে রাখাইন ঝরনা। এবারে আমাদের ভ্রমণে সঙ্গী হলো সুব্রত, ফারুক, নজরুল, আবির। অনেক কষ্ট করে এস আলম পরিবহনের ৫টি টিকেট পেয়েছিলাম ৮ অক্টোবর ১০টার গাড়িতে। গাড়ি ছাড়লো সরাসরি বান্দরবানের উদ্দেশে। সবার চোখে-মুখে আনন্দ আর ভ্রমণপিয়াসী মন নিয়ে সকাল পৌনে ৬টায় আমরা পৌঁছে গেলাম বান্দরবানে। বাস থেকে নেমেই খুঁজতে শুরু করলাম রুমাবাজারে যাওয়ার চান্দেরগাড়ি। দুর্ভাগ্য, বান্দরবান-রুমাবাজারের মাঝপথে একটি ব্রিজ ভেঙে গেছে। তাই সরাসরি গাড়ি রুমা যেতে পারেনি। মাঝপথে গিয়ে বিপদে পরলাম। আগে থেকে ঠিক করে রাখা আমাদের গাইড সাংবুমকে ফোন দিয়ে একটি জিপ ভাড়া করলাম। রুমা থেকে এসে আমাদের বগালেক পর্যন্ত নিয়ে যাবে। অনেক অপেক্ষার পরে গাড়ি এলো, শুরু হলো বগার পথে যাত্রা। সকাল সাড়ে ৯টায় রুমা বাজার পৌঁছালাম। এখানে ৩০ মিনিটের মতো যাত্রাবিরতি করলাম। কারণ আর্মি ক্যাম্পে নাম লেখাতে এবং যাত্রাপথের শেষ কেনাকাটা সেরে ফেলতে হবেÑ রান্নার জন্য পেঁয়াজ, রসুন, তেল, মসলা ইত্যাদি।
সকাল ১০টার পর আবার শুরু হলো যাত্রা। একে তো কাঁচা-পাকা ইটের রাস্তা, এর উপর বর্ষায় আরো খারাপ অবস্থা। এভাবেই চলতে চলতে বগালেকের কাছে পৌঁছালাম। গাড়ি থেকে নেমে কিছুক্ষণ হাঁটার পর এলাম বগালেকের নিচে। মাথার উপরে প্রচ- রোদ, ঘামে সবাই যেন কাকভেজা হয়েছি। প্রায় ৩০ মিনিট পাহাড় বেয়ে উঠে এলাম বগালেকে।

 



চারদিকে পাহাড়ে ঘেরা, মাঝখানে অপূর্ব এক লেকÑ এ সৌন্দর্য আমাদের সব ক্লান্তি দূর করে দিল। স্বচ্ছ পানিতে সবাই মিলে গোসল সেরে দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম। সবাই যেন নতুন করে পূর্ণ শক্তি পেলাম।
আজ রাতের গন্তব্য সৈকতপাড়া। দুপুর আড়াইটায় বগালেক থেকে হেঁটে হরমনপাড়ায় পৌঁছালাম বিকেল ৪টা ২০ মিনিটে। বৃষ্টিতে পিচ্ছিল পাহাড়ি খাড়াপথ বেয়ে উঠে প্রায় আত্মবিশ্বাস হারানোর পালা। হরমোনপাড়া অসম্ভব সুন্দর। বোম আদিবাসীদের পাড়া বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। হাতে গোনা ১০-১২টির মতো ঘর হবে। প্রতিটি বাড়ির আশপাশ পেপে, কলা ও কমলা লেবুর গাছে সাজানো। ১০ মিনিটের বিশ্রামের মধ্যেই খেয়ে নিলাম এখানকার কমলা লেবু ও কলা। শুরু হলো সৈকতপাড়ার উদ্দেশে হাঁটা।
রাতে সৈকতপাড়া পৌঁছে হাত-মুখ ধুয়ে আমাদের থাকার ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে চলে এলো পাকা পেপে ও কলা। তা খেতে খেতে প্ল্যান করে ফেললাম রাতের খাবারের। গাইড সাংবুমকে দিয়ে পাহাড়ি মুরগি কিনে নজরুলের নেতৃত্বে রান্না হলো। রাতের খাবার খেয়ে যথানিয়মে ঘুমিয়ে পড়লাম সবাই। পরের দিন ভোর সাড়ে ৪টায় ঘুম থেকে উঠে বের হয়ে পড়লাম সূর্যোদয় দেখার জন্য। একাই ঘুরে দেখছিলাম পাড়াটি। এক সময় সূর্য উঠলো। অসম্ভব সুন্দর এক সকাল দেখলাম! সৈকতপাড়া প্রায় ২ হাজার ৬০০ ফিট উপরের একটা গ্রাম। বোম আদিবাসীর প্রায় ৩০টির মতো পরিবার বাস করে। পাড়ায় একটা চার্চ ও স্কুল এবং একটা খেলার মাঠও আছে।
সকাল ৮টায় সৈকতপাড়া থেকে হাঁটা শুরু করালাম আনন্দপাড়ার উদ্দেশে। সবার মধ্যে খুব তাড়া ছিল। কারণ আজ দুপুর ৩টার মধ্যেই আমাদের পৌঁছাতে হবে রাখাইন ঝিরিতে। পাহাড়ি জুমের ভেতর দিয়েই প্রায় ৭০০-৮০০ ফিট নিচে নেমে ঝিরিপথ ধরে হাঁটলাম। দু’পাশে বড় বড় গাছ। সূর্য়ের আলো প্রায় পড়ে না বললেই চলে। পায়ের নিচে পাথর ও ঝরনার স্রোতধারা।

এভাবে চলতে চলতে রাত সাড়ে ৯টায় চলে এলাম আনন্দপাড়া। ত্রিপুরা ও গারো আদিবাসী থাকে এই পাড়ায়। সব মিলিয়ে ১০-১২টির মতো ঘর হবে। সৈকতপাড়ার মতো অতটা উঁচু গ্রাম না হলেও এখান থেকে কেওক্রাডংসহ অনেক বড় পাহাড় দেখা যায়। এখানকার মানুষের সঙ্গে অনেক গল্প হলো।
পরদিন শুরু হলো পুকুরপাড়ার উদ্দেশে যাত্রা। এবার আমাদের প্রায় ১ হাজার ৪০০ ফিট নিচে নেমে আবার দুটি পাহাড় পাড়ি দিতে হবে। তারপর পুকুরপাড়া। সবাই খুব চিন্তিত, আনন্দপাড়া থেকে নামার পথটি নাকি অনেক ভয়ঙ্কর। এদিকে ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি পড়ছে, পাথর ও মাটির স্যাঁতসেতে রাস্তা, কোথাও কোথাও ঝোপজাড়ে রাস্তা হারিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা, এর উপর জোঁকের ভয় তো আছেই। এসব দেখে মোটামুটি সবাই কিছুটা চিন্তিত হলাম। যাহোক, সদা সতর্কতার সঙ্গে নামছি পাহাড় বেয়ে। বেশ কিছুদূর যেতেই সুব্রতর চিৎকারে মনে হলো পাহাড়ের আকাশটা ভেঙে পড়লো মাথার ওপর। কী হলো! জোঁক জোঁক। এর মানে সুব্রতকে জোঁকে ধরেছে। কেউ গিয়ে জোঁক ছাড়ালো তার পা থেকে। এরপর একে একে সবাইকেই জোঁকে ধরলো। শেষ পর্যন্ত জোঁক যেন সবার কাছে ছোট পিপড়ার ভূমিকা নিল। যতই জোঁক ধরছেÑ কিছুই আর মনে হচ্ছে না। অনেক কষ্টের পর পাহাড় বেয়ে নেমেই দেখলাম রুমা ঝিরি, অসাধারণ এক পাহাড়ি নদী প্রচ- শব্দ করে বয়ে চলেছে। মনে হচ্ছে, পুরো নদীটিই একটি ঝরনা। সবাই মিলে কিছু সময় ঝিরির পাড় ধরে হাটলাম। তারপর আবার শুরু হলো পাহাড়ে ওঠা।
প্রথম পাহাড় পার হওয়ার পর কিছুক্ষণ ঝিরির পাড় ধরে হেঁটে সামনে এসে দেখলাম আরেকটি পাহাড়। খুব বৃষ্টি এবং বিকট শব্দে
বিদুৎ চমকাচ্ছিল। সবাই ভিজে ভিজে চলে এলাম দ্বিতীয় পাহাড়ের ওপর এবং চোখে পড়লো কাক্সিক্ষত রাখাইন লেক। এটি ২ হাজর ফিট উপর থেকে দেখতে অসাধারণ লাগছিল। মনেই হচ্ছিল না, আমাদের বাংলাদেশ এত সুন্দর! লেকের একপাশ দিয়ে উঠে গেছে বিশাল পর্বতমালা, দু’পাশে দুটি গ্রাম। গ্রাম দুটির একটি পুকুরপাড়া, অন্যটি প্রাঞ্জুংপাড়া। আদিবাসী ত্রিপুরার বসবাস দু’পাড়াতেই।
তারপর শুরু হলো আবার পথ চলা। দুপুর ৩টায় নেমে এলাম পুকুরপাড়া। এখানে এসেই একটি ঘর ঠিক করে ব্যাগ রেখে গেলাম রাখাইন ঝিরিতে। পুকুরপাড়া থেকে প্রায় ১ ঘণ্টা লাগলো যেতে। সেখানে এক অপূর্ব নৈসর্গিক দৃশ্য।
রাখাইন ঝরনা প্রায় ৪০০ ফিটের মতো প্রশস্ত এবং বহু স্তরে সাজানো। প্রচ- স্রোতধারা বহুদূর বয়ে চলেছে। এর প্রতিটি বাঁকে রয়েছে লুকানো সৌন্দর্যের কারুকার্য। কোনোমতেই বিশ্বাস করা যায় না এত সুন্দর ঝরনা এ দেশে আছে। সন্ধ্যা পর্যন্ত কাটালাম এখানে। তারপর ফিরে এলাম পুকুরপাড়ায়।
পরদিন ফিরে আসার পালা। পুকুরপাড়া থেকে সকাল ১০টায় হাঁটা শুরু করে সন্ধ্যায় সৈকতপাড়া এলাম। এখান থেকে পরদিন সকাল ৬টায় হাঁটা শুরু করলাম রুমাবাজারের উদ্দেশে। সৈকতপাড়ার উঁচু পাহাড় থেকে বগামুখপাড়ার নিচ পর্যন্ত নামতে প্রায় ৩ ঘণ্টা লাগলো। এখান থেকে ঝিরিপথ ধরে হেঁটে রুমাবাজার এলাম দুপুর ২টায়।
এভাবেই শেষ করি ৪ দিনের হাঁটা ভ্রমণ। এরপর রুমা থেকে ৩টার গাড়িতে বান্দরবান এবং বান্দরবান থেকে ঢাকা।

চিনে নিতে চীন

জলি শরীফ 


আল কোরআনে আছে, ‘জ্ঞান অর্জনের জন্য সুদূর চীন দেশে যাও।’ কথাটি জানার পর সবারই ইচ্ছা করে একবার চীনে যেতে। এবার আমার সুযোগ হলো। আমার মেয়ে অন্তর ও তার পাপাসহ ঘুরে এলাম। ২০১৫ সালের ১৫ মার্চে রওনা হয়ে ২২ মার্চ ফিরলাম। যতোক্ষণ চীনে ছিলাম, উপরের কথাটির সমার্থ খুঁজেছি।
যখন বাংলা পড়তে শিখেছি তখন ‘বেগম’ পত্রিকায় ফেরদৌসী রহমানের ‘গান গেয়ে এলাম চীনে’ পড়েছি। এতো ভালো লেগেছিল যে, এখনো মনে আছে। চীন দেখার সুপ্ত ইচ্ছা তখন থেকেই। তখনকার প্যানারোমা-য় লাল পোশাকে একই উচ্চতা ও প্রায় একই চেহারার চীনা ছেলেমেয়েদের ছবি দেখেছি। মেয়েরা সবাই ‘চায়নিজ কাট’ দিতো। আর স্কুলের ঝপৎধঢ় নড়ড়শ তৈরি করতে চীনের প্রাচীর আর স্টোন ফরেস্ট-এর ছবি সংগ্রহ করেছি। সব জিনিসে গধফব রহ ঈযরহধ লেখা দেখেই বুঝতাম, তারা কতো এগিয়ে। আমি যে ক’টা দেশ ঘুরেছি, সবখানে ‘চায়না টাউন’ দেখেছি। সবখানেই চায়নিজদের দেখেছি। মনে আছে, ছোটবেলায় রেডিও বা ট্রানজিস্টর-এর নব ঘুরিয়ে ‘চিং চুং চাং’ চায়নিজ ভাষা শুনতাম আর আঁকাবুকা দিয়ে দিয়ে তাদের দেখার কায়দাও চিনেছি। তখন চীনের রাজধানী পিকিং ছিল, এখন বেইজিং। পিকিং শুধু টিকে আছে এয়ারপোর্টের চঊক হয়ে। বেইজিং সরাসরি যাওয়া যায় না। কুনমিং হয়ে যেতে হলো। আমরা দু’জায়গাতেই বেড়িয়েছি।
ঈযরহধ ঊধংঃবৎহ-এ ভ্রমণ করেছি আর উপর থেকে ঢাকার নগরায়ন দেখে গর্বিত হয়েছি। ওপর ওপর সবকিছু অবশ্য ভালোই লাগে। প্লেনের ঝুলন্ত টিভি-তে দেশের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে প্লেনের চলার পথে দৃষ্টি রেখে চট্টগ্রামের সীমার পার হতেই অন্য প্রোগ্রাম শুরু হলো- দেশের সীমা পার হয়ে অন্য দেশে ঢুকেছি তো।
এবার প্লেনের পকেটে রাখা ম্যাগাজিন দেখে এবং তাদের কথা শুনে মনে হলো, তারা যখন কথা বলে তখন পুরোপুরি চায়নিজ ভাষায় বলে বা লেখে। অন্য কোনো ভাষার মিশ্রণ নেই। লেখার কায়দাও নিজস্ব। সাধারণ মানুষ একটুও ইংরেজি বোঝে না। ১, ২ লেখে একইভাবে। কিন্তু বলে নিজেদের শব্দে। সাধে কী বলে, চায়নিজ ভাষা টিকে থাকবে পৃথিবীর শেষ দিন পর্যন্ত!
অনেক রাতে বেইজিং পৌঁছালাম। গাড়িতে ওঠার আগে লম্বা লাইনে দাঁড়াতে হলো। এ অভিজ্ঞতা চলতেই থাকলো যতোক্ষণ চীনে থাকলাম। গভীর রাতে রাস্তায় নির্ভয়ে এক মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অবাক হলাম। আমি তো অন্য কিছু ভেবেছি। আসলে তাদের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে তেমন পার্থক্য নেই। সবাই সব কাজ করছে। বড় বড় ট্রাকও মেয়েরা চালাচ্ছে। আধুনিক ছেলেমেয়েরা লম্বায় অনেক বড়। বুড়োবুড়িরা আমার আগের দেখার সঙ্গে মিললো। চুলের কাটও বদলে গেছে। লম্বা, রঙ করা চুলও প্রচুর। হোটেলের রুমে ঢুকেই প্রথম ঢাক্কা খেলাম বাথরুম দেখে। এর দরজা আর ঘিরে দেয়া গোসলের জায়গা- সবই মোটা ও স্বচ্ছ কাচের ঘরে ঢোকার পথের একপাশে। এ ব্যাপারটায় বুঝলাম, তারা কতোটা স্বচ্ছ থাকতে চায়।


প্রথম দিন শহরের আশপাশেই গেলাম। ঋড়ৎনরফফবহ ঈরঃু নিষিদ্ধ শহর মিং রাজার বাড়ি। ফটকের দু’পাল্লাতেই গোল করে ধাতুর অর্ধগোলক লাগানো। এর পাশাপাশি উপর-নিচ ৯ী৯ = ৮১টি। তাদের বিশ্বাস এক অংকের বড় সংখ্যাই সবচেয়ে শক্তিশালী। এক সময় সেখানে কেউ ঢুকতে পারতো না। আর ঢুকলেও বের হতে পারতো না। পাশে লেক, নৌকাও আছে। ৮ হাজারের বেশি ঘর ও বাগান। রাস্তায় দাঁড়িয়ে ঐতিহ্যবাহী খাবার ঈধহফরবফ ঋৎড়ঁঃ খেলাম। লম্বা কাঠির মধ্যে লাল ঐধি ফল, স্ট্রবেরি, ছোট্ট কমলা, আপেল ইত্যাদি গাঁথা ফল চিনির সিরায় ডোবানো। খেতে খুব মজা। আমি ভিন্ন স্বাদ পছন্দ করি, উপভোগ করি। বেড়াতে গেলে অনেক হাঁটা এবং সিঁড়িও লাফিয়ে চলি।
সময় নষ্ট না করে চলতে চলতেও পলক না ফেলে তাকিয়ে থাকি কিছুই যেন বাদ না যায়। এরপর পুরনো শহর ঞযরধহ গধরহ ঝয়ঁধৎব গেলাম। পুরনো কতো শিল্পকর্ম দেয়ালে দেয়ালে! পরে বিখ্যাত সিল্ক মার্কেটে গেলাম। ম্যাগডোনাল্ডস আছে, কম বয়সী চায়নিজরা খাচ্ছে। শহর সম্পূর্ণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। প্রত্যেকেই সব জায়গাকে নিজের বাড়ি মনে করে, একটুও ময়লা করে না। রাস্তা, গলি, ফুটপাথ, বাস, ট্রেন, এমনকি রাস্তার খাবার দোকানের পাশেও খাওয়া-দাওয়া হচ্ছে, রান্না হচ্ছে। তবু কোথাও ময়লা নেই। ফলের খোসা, খালি বোতল নির্দিষ্ট জায়গাতেই ফেলছে সবাই। কোনো বিশৃঙ্খলা, হট্টগোল নেই, গাড়ি, মানুষ- সবাই চলছে। সবাই নিয়ম মেনে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়েই আছে ধৈর্য ধরে, ঠেলাঠেলি, চিল্লাচিল্লি নেই- মুগ্ধ হওয়ারই মতো সব।
রাতে ‘হট প্যাট’ নামে ঐতিহ্যবাহী এক খাবারের দোকানে গেলাম। সামনে প্রত্যেকের জন্য আলাদা চুলায় মশলা দেয়া পানি ফুটতে থাকে। লাইন লাইন বৈদ্যুতিক চুলা। মেনু অনুযায়ী যে যেটি অর্ডার করবে, নিজেরাই রান্না করে খেতে হবে। গরু, খাসি, ডিম, মাছসহ বিভিন্ন সবজি, পদ্ম ফুলের চাকা, লেটুস, পালং, বহু রকমের আলু, বহু রকমের নুডলস। সবই কাঁচা, সামনের চুলায় চপস্টিক দিয়ে রান্না করে ছোট্ট একটা পাত্রে ধনিয়াপাতাসহ পিনাট বাটার সস লাগিয়ে খাও। রক্তাক্ত মাংস দেখে ঘাবড়ে গেলাম। চায়নিজরা খুব মজা করে খায়। আমি গাজর, কুমড়া, মিষ্টি আলুর সঙ্গে নুডলস ও মাংস সিদ্ধ হলে খেলাম। এখানে স্বাভাবিক তাপমাত্রার কোনো ড্রিংকস পেলাম না। সব ড্রিংকসই ঠা-া অথবা গরম। এতো চুলার কারণে ঘর বেশ গরম ছিল। অবশ্য বাইরে তখন অনেক ঠা-া। খেয়াল করে দেখলাম, তারা অনেক রঙিন খাবার খায়। বেশির ভাগ খাবার সাদা, হলুদ, কমলা, বেগুনি অথবা সবুজ। সবুজ আবার হালকা গাঢ়, বেশি গাঢ়। হাপুস-হুপুস খাওয়া যে স্বাস্থ্যকর নয়, তা তাদের চপস্টিক দিয়ে আস্তে আস্তে সব খাবার চেটে-পুটে খেতে দেখে আবারও মনে হলো। সকালে হোটেলে বিন্নি ধানের বেগুনি, আতপ চালের সাদা জর্দা ছিল এবং গুড়ের পুর দেয়া ‘মম’ ছিলো পিঠার মতো। তিন পাপড়ি ও সাদা ফুলের ওই পিঠা খাওয়ার সময় মনে পড়ে, পাউরুটি আর ঝোলা গুড়ের কথা। তারা টিসু ব্যবহার করছে দরকার অনুযায়ী, বাড়তি একটিও নয়। হোটেলের পাশে ফলের দোকানে থরে থরে ফল সাজানো- আপেল, নাসপাতি, কমলা, চেরি, বড়ই, আতা, কলা, কাঁঠাল, আনারস, আম, গাব, ব্ল্যাকবেরি, ডালিম, মিষ্টি তেঁতুল, তরমুজ, পেপে, লিচু, ডোরিয়াম ইত্যাদি। তাদের বাইকগুলোয় গ্লাভস লাগানো থাকে যাতে হাতে গরম লাগে এবং পায়ের সামনে থাকে ভারী কম্বলের পর্দা।


দ্বিতীয় দিন বাসে গ্রেট ওয়াল দেখতে রওনা হলাম। গাইড মেয়েটা বিরতিহীন চায়নিজ ভাষায় বকর বকর করতে করতে শহর চেনাতে চেনাতে যাচ্ছিল। প্রথমে তাকে দেখিনি। তাই ভেবেছিলাম, টেপ রেকর্ড অথবা সিডি চলছে। তারা কর্তব্যে কতোটা নিষ্ঠা রাখে তা বোঝা গেল। উঁচু পাহাড়ের দিকেই বিস্ময়কর গ্রেট ওয়াল। পথে দেখতে পেলাম শক্ত পাথুরে ছাই রঙের ধূসর ‘পাহা’ পাহাড় এবং বেশির ভাগ সারি সারি পাইন গাছ। মেয়েটার কথা শেষ হলেই বুঝলাম নামতে হবে। নেমে লাইনে দাঁড়িয়ে চারদিক খোলা ছোট বাসে চড়ে গ্রেট ওয়ালের একটা অংশের কাছাকাছি গেলাম। তারপর হেঁটে, সিঁড়ি ডিঙিয়ে পৃথিবীর আশ্চর্য দেয়ালের স্পর্শ পেলাম। ভেবে অবাক হলাম, কতো দিন ধরে, কতো নিঁখুতভাবে পাথর কেটে বড় ইটের মতো বানিয়ে থরে থরে গেঁথে এই স্থাপত্য তৈরি করা হয়েছে। কিছুদূর পর পর যে চারকোণা ঘরের মতো আছে (৬৪টি) এরই একটিতে বসে দেখলাম। বিশাল সিঁড়িওয়ালা চওড়া ওয়াল। আমার জন্য গ্রেট ওয়ালের এই অংশে কেবল কারের ব্যবস্থা থাকলে ভালো হতো। অনেক দূর পর্যন্ত দেখতে পেলাম না। কাছ থেকে বড় কাঠবিড়ালির ছোটাছুটি, বড় দোয়েল পাখির মতো পাখি ও ছোট্ট চড়ুই পাখির কিচিরমিচির শুনলাম। ফেরার সময় বাসে চায়নিজ গান শুনলাম। খুব মিষ্টি সুরেলা কণ্ঠস্বর ঠিক যেন সামিনা চৌধুরীর গান শুনছি, ‘ফুল ফোটে, ফুল ঝরে, ভালোবাসা ঝড়ে পড়ে না।’ সত্যিই সুরের অনেক মিল ছিল। পথে গাছের কা-ে পাখির বাসা দেখলাম। একটি কোলের শিশু অবাক চোকে ভ্রƒ কুঁচকে আমাকে দেখছিল। সে নাকি বিদেশি দেখলে বুঝতে পারে। আর আমি তো এখন বিদেশিনীই। এতো মিষ্টি তাদের শিশুরা যে, কেউ বিরক্ত করে না। হাঁটা শেখা মাত্র হাত ধরে হাঁটে। একদিনে অনেক জায়গায় গেলাম- মিউজিয়াম, শুকনো ফলের বিশাল দোকানপাট, পাথরের তৈরি জিনিস দেখা, সিল্ক দোকান, জাদু, থ্রিডি সিনেমা ইত্যাদি। দুপুরে চায়নিজ খাবার খেতেও দিল এক টেবিলে ১১ জন করে। দিন শেষে অলিম্পিক সিটির (২০০৮ সালে যেখানে অলিম্পিক হয়েছে) পাশে বাস নামিয়ে দিল। আন্ডারপাশ দিয়ে অলিম্পিক মাঠে পৌঁছালাম। সুইমিং পুল ওয়াটার কিউব এবং বার্ড নেস্ট দেখলাম। একদিকে বিশাল টেলিভিশন চলছেই। সন্ধ্যায় বিশাল ওই মাঠে হাঁটতে ভালো লাগছিল। রাতে মল-এর এক খাবারের দোকানে খেলাম। সেখানে আইসক্রিম ও প্যান কেক ছাড়া সব খাবার একটা বড় বাটিতে খেতে দিল। সবার খাবার এক সঙ্গে। পাত্র ঘুরিয়ে পছন্দের খাবার চপস্টিক দিয়ে খেতে হবে। সবার টেবিলে একই কা-। বেইজিংয়ে ফার্স্ট ফুড, মুসলিম, ভারতীয় খাবারের দোকান আছে। কিন্তু এখনো বাংলাদেশি নেই। রাতে স্ট্রিট ফেয়ারে দেখেছি কতো যে দোকান! দিনে স্ট্রিট ফুডের দোকানেও দেখেছি, কাঠির মধ্যে কতো কিছু যে গেঁথে সামনেই ভেজে দেবে। চিংড়ি, সবজি, মাছ, কাঁকড়া তো ছিলই, সাপ বা অক্টোপাসও ছিল। ভয়ে দূর থেকে শুধু দেখেছি। বেশ ক’বার পাতালরেলে উঠেছি এবং আন্ডারপাস সিঁড়িতে ফকিরও বসে থাকতে দেখেছি। মনে পড়ে যায় ভূপেন হাজারিকার সেই গান-

‘আমি দেখেছি অনেক গগনচুম্বী অট্টালিকার সারি
তার ছায়াতে দেখেছি- অনেক গৃহহীন নরনারী।’

ঠিক অনেক নন, ২-৩ জনকে দেখেছি। সব দেশেই আছে?

বেইজিং থেকে কুনমিং প্লেনেই এসেছি। অভ্যন্তরীণ প্লেন বলে চায়নিজ ভাষাতেই বলেছে। আর আমরা না বুঝে প্লেন থামলেই লাগেজ নেয়ার জন্য দাঁড়িয়েছি। এটি ছিল ‘লিউজু’ এয়ারপোর্ট। ইলশে গুঁড়ি বৃষ্টিতে নেমে আবার ওই প্লেনেই উঠেছি। ইমিগ্রেশন শেষে ওঠার সময়ও গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি ছিল।
প্রতিদিন কিছু না কিছু ঘটনা ঘটেই। আমি বাসের মধ্যে সিঁড়ি না দেখে ধপাস হয়েছি! ভ্যানিটি ব্যাগ রেখেই প্লেনেই উঠে গিয়েছি। অবশ্য সমাধানও হয়েছে। প্লেন ছাড়ার ১০ মিনিট আগে ব্যাগ উদ্ধার হয়েছে। আমার জেনারেলই উদ্ধার করেছেন। আর চীনে পৌঁছেই তো তার চোখের পাপড়িতে ফোঁড়া উঠলো এবং ফুলে চায়নিজ চোখ হয়ে গেল। প্রতিবারের মতোই এবারও থ্রিডি সিনেমা শুরুর আগে ‘ও’ সিট বেল্ট বাঁধতেই পারলো না। প্রচ- ঝাঁকুনিতে ফেলেই দিচ্ছিল। এবার আমিই ওর বেল্টের অংশ নিয়েছি। তাই ‘ও’ খুঁজে পায়নি। ওকে নাম ধরে ডাকি না। তাই সে ‘ও’।
রাতে পৌঁছালাম কুনমিং। এয়ারপোর্ট যেন সোনালি ডানার চিল। তার নিচ দিয়ে বেড়িয়ে ফুল, হ্রদে ঘেরা সুন্দর শহরে ঢুকলাম। তাদের যে লাল পছন্দ এর প্রমাণ শহরের প্রায় সব বিলবোর্ডই লাল লাইটে লেখা। অবশ্যই তা চায়নিজ ভাষায়। রাস্তায় অন্য সাজসজ্জাও লালে লাল। এখানে প্রথম অবাক হলাম চায়নিজ ড্রাইভার বিল-কে পেয়ে। সে বাংলা বোঝে এবং বলেও। তার যাত্রী বাঙালি বেশি হয়। তাই শুনে শুনে শিখে ফেলেছে। আমরা তার শব্দ ভা-ার বাড়ানোর চেষ্টা করলাম। চীন দেশে চায়নিজ ছেলের মুখে বাংলা শুনে আমার মনে হলো, বাংলা ভাষাও পৃথিবীর শেষ দিন পর্যন্ত টিকে থাকবে। দিনে কুনমিং এয়ারপোর্ট ঈগল মনে হলো। এখানে দেখার মতো অনেক স্থান। আপেল, কমলা, আঙুর, চেরির বাগান, সবুজ পাহাড় ও গাঢ় লাল মাটির ফসলের ক্ষেত। তারা ক্রিকেট বোঝেই না, নামও জানে না। ওয়ার্ল্ড কাপ ক্রিকেট ২০১৫-এর খবরই রাখে না। আবার এখানকার যুবক-যুবতীরাও মোটেই নির্লজ্জ নয়, চুমু খেলেও বাড়াবাড়ি নেই।
পরের দিন ঔরীঁরধহম পধাব দেখতে গিয়েছি। রাস্তায় কয়েকটা বেশ বড় সুড়ঙ্গপথেও যেতে হয়েছে। গুহাটির আকার বিশাল। এর একেক অংশের রূপ একেক রকম। প্রথমে সুড়ঙ্গপথে গুহার একদম নিচে সিঁড়ি দিয়ে নেমে ঝরনার পানিধারার সরুপথে নৌকা ভ্রমণ। বৈঠা আমরাও বাইলাম। সুড়ঙ্গ পানিপথের দু’পাশে শক্ত পাথর। পথ বেশি সরু হলে নৌকা উল্টা ঘুরলো। নৌকা থেকে নেমে পাহাড় ঘেঁষে সরুপথে উঁচু-নিচু পথে ঝরনার রূপ দেখতে অনেক উপরের এমন এক জায়গায় পৌঁছালাম যেখানে পাথর দিয়ে ঢাকা বেশ বড় জায়গা। সেখানে সূর্যের আলো ঢুকবেই না। আবার পাথরের সিঁড়ি বেয়ে অনেক উপরে ওঠা যায়। বয়স্কদের জন্য চেয়ার পালকির ব্যবস্থাও আছে। চেয়ারে মানুষ বসিয়ে সামনে-পেছনে লাঠি ঘাড়ে নিয়ে দু’জন দিব্বি উপরে উঠছে। আর আমাদের নিজে উঠতেই বেশ কষ্ট হয়েছে। অনেক উপরে উঠে পা ঝোলানো কেবল কারে আবার নিচে এলাম। এরপর স্টোন ফরেস্ট দেখেছি। পথে মুরগি, ছাগল, মহিষের পাল ও রঙিন সবজি ক্ষেত, পাইন তো আছেই। অনেক জায়গা নিয়ে স্টোন ফরেস্ট। বড় বড় পাথরের স্তূপ, সারি সারি সাজানো-গোছানো পাথরের কতো রূপ, কোথাও হাতির মতো। এখানেও অনেক সিঁড়ি, সরু-নির্জন জায়গা আছে। কিন্তু নির্ভয়ে সবাই ঘুরে বেড়ায়। একটি অংশ ঘরের মতো বিশাল, খাটো পাতা আছে বালিশসহ। তা সবই পাথরের। হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে মনে হলো, কিছুক্ষণ শুয়ে থাকি, পাথরের বিছানা আর কোথায় পাবো! পরের দিন ফুলের জগৎ দেখেছি। ডড়ৎষফ ঐড়ৎঃর ঊীঢ়ড় ঋষড়বিৎ বিশাল ফুলের বাগান। ফুলের ঘড়ি, স্তম্ভ, জীবজন্তু, ছাতা, ফুলের ক্ষেত মুগ্ধ হয়ে দেখেছি। কিন্তু বড় জাহাজে কিছু কৃত্রিম ফুলও ছিল। কোথাও নানান রঙের শুধুই অর্কিড, একপাশে সুন্দর লেক। এরপর আমরা সাইট সিং কেবল কারে ‘ডিয়াঞ্চি’ লেক ও ‘ওয়েস্টার্ন হিল’ দেখলাম। যাদের উচ্চতাভীতি আছে তারা উঠলেও চোখ বন্ধ রাখবেন। কারণ ওই কেবল কার লেক রাস্তার ওভার ব্রিজের ওপর থেকে একেবারে খাড়া পাহাড়ের ওপর নিয়ে যাবে। উপর থেকে সুন্দর কুনমিং শহর দেখা যাবে। পাহাড়ের একদম ওপরে পার্কের মতো। একপাশে একটা বিশাল ঘণ্টাও আছে। ঘণ্টা বাজিয়ে নেমে এসে বিশাল লেকের ধারে দাঁড়িয়ে মোটা মোটা গাংচিলের ওড়া দেখেছি। এগুলো হাত থেকে খপ করে পাউরুটি নিয়ে খেয়ে যায়। এখানেও দেখলাম পরিষ্কারের জন্য সদা ব্যস্ত কর্মী। শেষে কেনাকাটার জন্য নাইট মার্কেটে গেলাম। অন্যসব মার্কেট বিকাল ৫টায় বন্ধ হয়ে যায়। জুতা কেনার সময় বড় মাপের জুতাই নেই। মনে পড়ে গেল, ছোটবেলায় শুনেছি চায়নিজ মেয়েদের লোহার জুতা পায়ে দিতে হয় যাতে পা ছোটই থাকে। দোকানে কাজ করতে করতে মেয়েদের সেলাই করতেও দেখলাম। কেউ ক্রুশকাঁটায় জুতা বুনছে, কেউ ঢ ক্রস স্টিচ-এ সুন্দর ওয়ালম্যাট সেলাই করছে। সময়ের মূল্য দিতে জানে তারা। কুনমিং পুরো শহরটাই ফুলে ভরা- সাদা, হলুদ, কমলা, পপি ফুলে। গোলাপের ঝাড়ও আছে। শেষের দিন ট্রাফিক জ্যামে গাড়ি আটকালো। আর এতেই মন ফিরলো ঢাকায়। বাসায় এসে স্মৃতি লিখতে গিয়ে কাছ থেকেই শুনতে পেলাম মর্মস্পর্শী কোকিলের পঞ্চমী সুর কু-উ-উ, কু-উ-উ। ওই সুর একই স্কেলে অপরিবর্তিত। ছোট্ট থেকে প্রতি বছর শুনি একই গলা, গলা সাধা। ওই সুর আমার ভেতরে ঢুকে কেমন যেন করে দেয়। তাই ‘চীন’ লেখা বাদ দিয়ে গেয়ে উঠলাম প্রিয় দীজেন্দ্রগীতি- যে গান আমার আব্বার খুব প্রিয় ছিল। জ্যোৎস্না রাতে সবাইকে নিয়ে গাইতেন-

‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে না কো তুমি
সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি।’

উদয়-অস্তের কুয়াকাটা

মাসুদ আলী 

 

‘কুয়া’ শব্দটি এসেছে ‘কূপ’ থেকে। আঠারো শতকে মোঘল শাসকদের দ্বারা মিয়ানমার (বার্মা) থেকে বিতাড়িত হয়ে আরকানিরা এই অঞ্চলে এসে বসবাস শুরু করে। তখন এখানে সুপেয় জলের অভাব পূরণ করতে তারা প্রচুর কুয়া বা কূপ খনন করেছিল। তখন থেকেই এ অঞ্চলের নাম হয়ে যায় ‘কুয়াকাটা’।
কুয়াকাটা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের একটি সমুদ্র সৈকত ও পর্যটন কেন্দ্র। পর্যটকদের কাছে কুয়াকাটা ‘সাগরকন্যা’ হিসেবে পরিচিত। ১৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য সৈকতের কুয়াকাটা বাংলাদেশের অন্যতম নৈসর্গিক সমুদ্র সৈকত। এটি বাংলাদেশের একমাত্র সৈকত। যেখান থেকে সূর্য উদয় ও অস্তÑ দুটিই দেখা যায়।
পটুয়খালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার লতাচাপলী ইউনিয়নে কুয়াকাটা অবস্থিত। ঢাকা থেকে সড়কপথে এর দূরত্ব ৩৮০ কিলোমিটার এবং বরিশাল থেকে ১০৮ কিলোমিটার।
কুয়াকাটা বেড়িবাঁধ পার হয়ে সমুদ্র সৈকতের দিকে যেতেই বাম দিকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে মিউজিয়াম স্থাপন করা হয়েছে। এরপরই কয়েক গজ দক্ষিণে ‘ফার্মস অ্যান্ড ফার্মস’-এর রয়েছে বিশাল নারিকেল বাগানসহ ফল ও ফুলের বাগান। এ বাগানের মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে বেশ কয়েকটি পিকনিক স্পট। এটি পরিদর্শনের পরই রয়েছে কাক্সিক্ষত ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে বিশাল সমুদ্র সৈকত। এর পূর্ব দিকে এগোলেই প্রথমে দেখা যাবে নারিকেল বাগান ও সুন্দর আকৃতির ঝাউ বাগান। বন বিভাগের উদ্যোগে বিভিন্ন প্রজাতির ঝাউ গাছ লাগিয়ে সমুদ্র সৈকতের শোভাবর্ধন করা হয়েছে। এই নারিকেল ও ঝাউ বাগানের মধ্যেও রয়েছে পিকনিক স্পট। এখানে পর্যটকরা দল বেঁধে বনভোজনের অনাবিল আনন্দে নিজেদের একাকার হয়ে যান। এ জায়গা থেকে একটু পূর্ব দিকে আগালেই চর-গঙ্গামতির লেক। সেখান থেকে আর একটু ভেতরে দিকে এগোলেই সৎসঙ্গের শ্রীশ্রী অনুকূল ঠাকুরের আশ্রম ও মিশ্রীপাড়ার বিশাল বৌদ্ধবিহার। সমুদ্র সৈকতের পশ্চিম দিকে লেম্বুপাড়ায় প্রতি বছর আশ্বিন থেকে চৈত্র মাস পর্যন্ত জেলেরা প্রাকৃতিক উপায়ে গড়ে তোলেন শুঁটকি পল্লী। এই পল্লীতে সাগরের বিভিন্ন প্রজাতির মাছ প্রাকৃতিক উপায়ে শুঁটকিতে রূপান্তরিত করে সারা দেশে সরবরাহ করা হয়। এছাড়া কুয়াকাটায় উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থানগুলো হচ্ছে-

ফাতরার বন
সমুদ্র সৈকতের পশ্চিম দিকে ম্যানগ্রোভ বন শুরু হয়েছে। এর নাম ‘ফাতরার বন’। সংরক্ষিত বনভূমি ফাতরার বন ইতোমধ্যে দ্বিতীয় সুন্দরবন হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। এখানে রয়েছে কেওড়া, গেওয়া, সুন্দরী, ফাতরা, গরান, বাইন, গোলপাতা ইত্যাদি ম্যানগ্রোভ প্রজাতির উদ্ভিদ। এছাড়া বানর, শূকরসহ অসংখ্য জীবজন্তু ও পাখি বয়েছে। সমুদ্র সৈকত থেকে ইঞ্জিনচালিত বোটে এক ঘণ্টার যাত্রাপথে ফাতরার বনে যাওয়ার ব্যবস্থা আছে।

কুয়াটারা ‘কুয়া’
কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের কাছে রাখাইন পল্লী কেরানিপাড়ার শুরুতেই একটা বৌদ্ধমন্দিরের কাছে রয়েছে প্রাচীন কূপগুলোর মধ্যে একটি কূপ। তবে বারবার সংস্কারের কারণে এর প্রাচীন রূপটা এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না।
সীমা বৌদ্ধমন্দির
কুয়াকাটার প্রাচীন কুয়াটির সামনেই রয়েছে প্রাচীন একটি বৌদ্ধমন্দির (সীমা বৌদ্ধমন্দির)। এতে রয়েছে প্রায় ৩৭ মণের অষ্টধাতুর তৈরি ধ্যানমগ্ন বুদ্ধের মূর্তি।

কেরানিপাড়া
সীমা বৌদ্ধমন্দিরের সামনে থেকেই শুরু হয়েছে রাখাইন আদিবাসীদের পল্লী কেরানিপাড়া। এখানকার রাখাইন নারীদের প্রধান কাজ হলো কাপড় বুনন।

আলীপুর বন্দর
কুয়াকাটা থেকে প্রায় চার কিলোমিটার উত্তরে রয়েছে দক্ষিণ অঞ্চলের অন্যতম বড় একটি মাছ ব্যবসা কেন্দ্র আলীপুর। এ বন্দর থেকে প্রতিদিন শত শত ট্রলার বঙ্গোপসাগরে যায় মাছ ধরতে।

মিশ্রিপাড়া বৌদ্ধমন্দির
কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার পূর্বে রাখাইন আদিবাসীদের অন্য একটি আবাসস্থল মিশ্রিপাড়ায় রয়েছে আরেকটি বৌদ্ধমন্দির। এ মন্দিরেই রয়েছে উপমহাদেশের সবচেয়ে বড়
বৌদ্ধমূর্তি। এখান থেকে কিছুদূরে আমখোলাপাড়ায় রয়েছে এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় রাখাইন বসতি।

গঙ্গামতির জঙ্গল
কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত শেষ হয়েছে পূর্ব দিকে গঙ্গামতির খালে গিয়ে। এখানে শুরু হয়েছে গঙ্গামতি বা গজমতির জঙ্গল। বিভিন্ন গাছ ছাড়াও এই জঙ্গলে দেখা মিলতে পারে বনমোরগ, বানরসহ বহু প্রজাতির পাখি। প্রতি বছর রাস পূর্ণিমা ও মাঘী পূর্ণিমা উপলক্ষে অনেক দর্শনার্থী কুয়াকাটায় আসেন। এ দুটি উৎসবের দিনে দর্শনার্থীরা পুণ্যস্নান করেন। এছাড়া লোকজ মেলা বসে সাগরতীরে।

যাতায়াত
ঢাকা থেকে পটুয়াখালী জেলা সদরে বাস বা লঞ্চে আসা যায়। সেখান থেকে সড়কপথে কুয়াকাটা। বিমানে বরিশাল এসে সেখান থেকে লঞ্চ বা বাসে কুয়াকাটায় যেতে হয়। বিআরটিসিসহ বেশ কয়েকটি প্রাইভেট বাস সার্ভিসে সরাসরি ঢাকা থেকে কুয়াকাটায় আসা যাবে।

 

ছবিঃ লেখক 

সীমান্তের অপার সৌন্দর্য!

- ম্যাক সুমন

 

দমদমায় যখন পৌঁছালাম তখন সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই। পাথুরে ঝিরিপথে গড়ানো পানি দেখে কেউই লোভ সামলাতে পারলাম না। কোনোমতে কাঁধের ব্যাগটা নামিয়ে সবাই ঝাঁপ দিলাম দমদমায়। দমদমার আরেকটা নাম রয়েছে। স্থানীয়রা একে থুরুং ছড়া বা থ্ররুং ছড়া বলে। যতোটুকু জানতে পারলাম, সীমান্তবর্তী ওই এলাকার পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ভাষায় থুরুং অর্থ হলো ‘ছোট ঝুড়ি’।

আমাদের উদ্দেশ্য ছিল ‘হাইকিং ফ্রম জাফলং টু ভোলাগঞ্জ’! জাফলং আর ভোলাগঞ্জ কারো কাছে অচেনা বলে মনে হয় না। সিলেটের সীমান্তবর্তী একটি উপজেলা গোয়াইনঘাট, আরেকটা কোম্পানীগঞ্জ। অপার সৌন্দর্য ও প্রকৃতির লীলাভূমিখ্যাত ওই দুই উপজেলায় ভোলাগঞ্জ-জাফলং সীমান্তের সৌন্দর্য ছাড়াও অগণিত নাম জানা, না জানা ছোট-বড় পাথুরে নদী ও ঝিরি রয়েছে। এগুলোর স্বচ্ছ জলধারার শীতল প্রবাহ ভ্রমণপ্রিয় মানুষের তীর্থস্থান। জাফলংয়ের পিয়াইন নদী, বিছনাকান্দির পাথুরে নদীটা দেশ-বিদেশে অত্যন্ত সুপরিচিত।

আমাদের ‘হাইকিং ফ্রম জাফলং টু ভোলাগঞ্জ’-এ যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল পরিচিত এই নদীগুলো ছাড়া কম পরিচিত ও অপেক্ষাকৃত দুর্গম এলাকায় কোনো ঝিরি বা ছড়া থাকলে সেগুলো ভ্রমণপিপাসুদের সামনে তুলে ধরা। আমাদের ধারণা ছিল, এই পথ ধরে স্থানীয় লোকজন ছাড়া হয়তো কেউ হাইকিং করেননি। ফলে এই সীমান্ত অঞ্চলের সৌন্দর্যটা সম্ভবত বেশিরভাগের কাছে অজানা।

যাহোক, সকাল ১০টার দিকে যখন আমরা জাফলংয়ে পৌঁছালাম তখনো মানুষের কর্মব্যস্ততা শুরু হয়নি। রমজানের সময় সবাই একটু দেরি করে শুরু করেন সম্ভবত। আর ঝামেলা এড়ানোর জন্যই আমরা রমজানের দিনেই হাইকিং শুরু করি। খেয়া করে পিয়াইন নদী পার হতে হতে সিদ্ধান্ত নিলাম, পথে যা-ই পড়বে, কোনোকিছু বাদ দেবো নাÑ সেটি টুরিস্ট স্পট হোক আর এক্সট্রিম কিছু হোক। যেই ভাবা, সেই কাজ।

নদী পার হয়েই সংগ্রামপুঞ্জি। ঐতিহ্যবাহী এই পুঞ্জিতে খাসিয়া জনগোষ্ঠীর বসবাস। গ্রামটা বেশ সুন্দর, গোছানো। মজার ব্যাপার হলো, যারাই জাফলং ঘুরতে আসেন তারাই একবারের জন্য হলেও ওই গ্রামে পা ফেলে যান। সংগ্রামপুঞ্জি হলো এদিকের সীমান্তবর্তী শেষ গ্রাম। তবে এই গ্রামের ঠিক উত্তরপাশে একটা ঝরনা আছে। আমাদের দেখা সবচেয়ে সুন্দর ঝরনাগুলোর একটি। আমার জানা মতে, দুর্ভাগ্যবশত ওই ঝরনাটাই ভারত সীমান্তের ভেতরে অবস্থিত। সৌভাগ্যের ব্যাপার হলো, বাংলাদেশের সবাই অবাধে ওই ঝরনা পর্যন্ত যেতে-আসতে পারেন। আর ঝরনাটার নামকরণও হয়েছে বাংলাদেশের এই গ্রামের নামেÑ সংগ্রামপুঞ্জি ঝরনা। আমরা ঝরনায় পৌঁছে শরীর শীতল করে নিলাম। ঝরনাটা যেমন সুন্দর তেমন ভয়ঙ্করও। ঝরনার উপরের পিচ্ছিল ধাপগুলোয় পৌঁছাতে গিয়ে ইতোমধ্যে বেশ কয়েক পর্যটক প্রাণ হারিয়েছেন।

সংগ্রামপুঞ্জি ঝরনা থেকে বের হতে হতে দুপুর সাড়ে ১২টা। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য পান্থুমাই। পান্থুমাই আমাদের যাত্রাপথেই পড়ে। সংগ্রামপুঞ্জির ভেতরের সবুজে ঘেরা ঢালাই করা রাস্তা ধরে আমরা লামাপুঞ্জি ও হাজীপুর পাড়ি দিলাম। খেয়া পার হয়ে পান্থুমাই পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় দুপুর গড়িয়েছে। দেখলাম, কয়েকদিন আগের বৃষ্টির প্রভাবে পান্থুমাই নতুন যৌবন পেয়েছে। পানির শব্দে আশপাশের সবকিছু যেন সংগীতময়। আমরা সেখানে বড়জোর ১০ মিনিট থামলাম সময় বাঁচানোর তাগিদে।

এরপর বিছনাকান্দির দিকে আমরা এগোতে থাকলাম। সীমান্ত ঘেঁষা এই পাথুরে নদীর ওপর দিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম। না থেমে যতোটুকু সৌন্দর্য উপভোগ করা গেল ততোটুকু করলাম। ততোক্ষণে প্রায় বিকাল সাড়ে ৪টা। সীমান্ত ছুঁয়ে ছুঁয়ে আমরা এগোতে থাকলাম সোজা পশ্চিম দিকে। সামনের দিকে আনুমানিক ২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হবে।

আমাদের টিমে আমি ছাড়া অন্য চার অভিযাত্রী হলেন বিনয়, গোপাল, অঞ্জন ও নাম না জানা আরেকজন। সবাই হাঁটতে পারদর্শী। আমাদের আশা ছিল, সন্ধ্যার পর পর আমরা উতমা ছড়ায় পৌঁছাবো অর্থাৎ আরো প্রায় ৩ ঘণ্টার পথ। কিন্তু মাঝখানে বাদ সাধল ভাঙা রাস্তা ও বন্যার পানি। আমরা যখন প্রথম ঝিরিটার কাছাকাছি পৌঁছালাম তখন প্রায় সন্ধ্যা। সিদ্ধান্ত নিলাম, ওই ঝিরিটার পাশেই আমরা তাঁবু খাটাবো। পৌঁছে জানলাম, এ ঝিরিটার নাম ‘দমদমা’ বা থ্ররুং ছড়া। দমদমা সম্পর্কে আমাদের তেমন কিছুই জানা ছিল না। আমাদের সবকিছু জানালেন স্থানীয় আলী হোসেন। ওই দমদমা ছড়াই এ গ্রামের পানির উৎস। খাওয়ার পানি থেকে ধোয়া-মোছাÑ সবই চলে এ পানিতে। ১২ মাসই প্রায় সমানতালে দমদমা বহে। আরো মজার ব্যাপার হলো, এই দমদমার পূর্বপাশ গোয়াইনঘাট আর পশ্চিমপাশ কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা।

আমাদের সন্ধ্যা ও রাতে খাবারের ব্যবস্থা করলেন আলী হোসেন। ছোলা-মুড়ি ছিল সন্ধ্যায়। আর রাতে মুরগির মাংস। প্রকৃতির কাছাকাছি বসবাসকারী বেশির ভাগ মানুষ কী পরিমাণ উদার ও অতিথিপরায়ণ হয়, আলী হোসেনদের সঙ্গে না মিশলে তা বোঝা যাবে না। তার নিজস্ব কিছু সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও ছিলেন খুবই আন্তরিক।

যাহোক, সন্ধ্যার খাবারের পর আমরা তাঁবু খাটালাম ঠিক দমদমার তীরে। পানির কল কল শব্দে কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা ঘুমিয়ে পড়লাম। কতোক্ষণ ঘুমিয়েছিলাম তা জানি না। হঠাৎ মানুষের কথাবার্তার তীব্রতায় জেগে উঠলাম। এখানকার মানুষ খুব আগ্রহী হয়ে আমাদের তাঁবুবাস দেখছে। তাঁবুর চারপাশ ঘুরে ঘুরে কেউ কেউ সবজান্তার মতো মন্তব্য করছেÑ তাঁবুতে বৃষ্টির পানি ঢুকবে কি না, বাতাস ভেতরে ঢুকছে কি না ইত্যাদি। রাত প্রায় ১টা। তাঁবু থেকে বের হয়ে ১০-১২ মধ্যবয়সী ও যুবককে আবিষ্কার করলাম। এর মধ্যে আলী হোসেনও আছেন। পরে জানলাম, আমাদের পাহারা দিতে তিনি এসেছিলেন যাতে কোনো ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন না হই।

আমরা রাতের খাবার শেষে স্থানীয় স্কুলে রাত যাপন করলাম। ফ্ল্যাশ ফ্লাডের ভয় ছিল। তাই এই ব্যবস্থা। সকাল সকাল উঠে উতমা ছড়ার উদ্দেশে রওনা হলাম। সামনে ৫-৬ কিলোমিটার পথ। মাঝখানে আরেকটা ঝিরি। নাম ‘থানচিনি’ ছড়া। স্থানীয়রা এটিকে কুলি ছড়া বলে। আশপাশে কুলি সম্প্রদায়ের বসবাস হওয়ার কারণে খুব সম্ভবত এটির নাম কুলি ছড়া। এ ছড়ায় পৌঁছে বুঝলাম, এই টুরে দেখা সব ছড়া, ঝরনার মধ্যে এটিই সবচেয়ে পাথুরে ও গভীর, আকর্ষণীয়ও বটে। এটি দেখে দেখে শেষ করার মতো নয়। একেবারে সীমান্তের কাছ থেকে ঝিরিপথ ধরে হেঁটে হেঁটে অনেক সময় ধরে আমরা এটি দেখলাম। স্বচ্ছ পানি, গভীরে বড় বড় সাদা-লাল পাথর। স্থানীয়রা এখানে মাছ ধরছে। কেউ কেউ গোসল সেরে বাড়ি ফিরছেন। আমরা পা ভিজালাম, শরীর ভিজালাম, শীতল হলাম।

কুলি ছড়া থেকে উতমা ছড়া পৌঁছাতে আমাদের খুব একটা সময় লাগেনি। মোটে আধা ঘণ্টা হবে হয়তো। এখানে কিছুটা ধ্বংসের ছোঁয়া লেগেছে। যেদিকে তাকানো যায়, বড় বড় গাড়ি আর খননযন্ত্র। বাড়ির উঠান থেকে নদীর মাঝখান পর্যন্ত চলছে ধ্বংসযজ্ঞ। পাথর যেন নয়, টাকা খুঁড়ে খুঁড়ে তুলছে মানুষ আর দানব আকৃতির যন্ত্র। আমরা একটা গ্রামের ভেতর দিয়ে হাঁটছি, নাকি কারখানার ভেতর দিয়ে হাঁটছি তা শব্দ শুনে বোঝার উপায় নেই।

আমরা অবশেষে উতমা ছড়ায় পৌঁছায়। মাথার উপর কড়া রোদ, পা শীতল জলে। এখানেও একই রকমের কর্মযজ্ঞ। লোকজন সারি ধরে পাথর তুলছে। বাংলাদেশের প্রায় ৭০ শতাংশ পাথর নাকি এ অঞ্চল থেকে সরবরাহ করা হয়। সবচেয়ে ভালো মানের পাথর নাকি এখানেই পাওয়া যায়।

আমরা কাউকে বিরক্ত করতে চাইলাম না। কিন্তু আমাদের দেখে শ্রমিকদের মধ্য থেকে কয়েকজন ছুটে এলেন। তারা হয়তো ভেবেছিলেন, আমরা কোনো শুটিংয়ের কাজে গিয়েছি। কুশল বিনিময় সেরে আমরা তাদের থেকে খানিকটা দূরে চলে গেলাম। এই অঞ্চলের প্রতিটি ঝরনা বা ঝিরির পানি খুবই পরিষ্কার। পানির নিচে অনেক গভীর পর্যন্ত দেখা যায়। আমরা একটু অগভীর অঞ্চলে জায়গা করে নিলাম। স্বচ্ছ পানির লোভ সামলানো দায়। সবাই আবার ঝাঁপাঝাঁপি শুরু করলাম। কীভাবে যে প্রায় ২ ঘণ্টা পার হলো তা বুঝতে পারিনি। উতমার জল থেকে যখন উঠলাম তখন দুপুর প্রায় ১টা। ফিরতে হবে।

ভোলাগঞ্জ-সিলেটের রাস্তার অবস্থা ভালো নয়। অনেক ভাঙা। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, হেঁটে আসার পথ ধরেই বিছনাকান্দি হাদারপার বাজারে পৌঁছাবো। এরপর সেখান থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশাযোগে শহরে। উতমা ছড়া থেকে হাদারপার বাজার যখন পৌঁছালাম তখন প্রায় সাড়ে ৪টা বাজে। প্রায় বিরতিহীন ১৯ কিলোমিটার রাস্তা হেঁটে আসা রীতিমতো ভয়ঙ্কর ব্যাপার। মোটামুটি সমতল ও কাদামাটির রাস্তা হওয়ায় কোনো অসুবিধা হয়নি আমাদের।

শহরের দিকে রওনা হলাম। পেছনে পড়ে থাকলো পানির কল কল শব্দ, বিশাল পাথরের বাগান ও পাহাড়ি সৌন্দর্য। দুর্গম হলেও এই জায়গাগুলোয় পৌঁছানো একেবারে অসম্ভব নয়। কিন্তু এ অঞ্চলের সৌন্দর্যের বিকল্প বের করা একেবারেই অসম্ভব।

About Us

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Duis aute irure dolor in reprehenderit in voluptate velit esse cillum dolore eu fugiat nulla pariatur.

Read More

Twitter feed

We use cookies to improve our website. By continuing to use this website, you are giving consent to cookies being used. More details…